এসআরএফটিআই-তে শিক্ষার্থী বরখাস্ত, উপাচার্যের ইস্তফার দাবিতে চলছে ধর্না মঞ্চ, পরিস্থিতি জটিল


  • October 17, 2026
  • (0 Comments)
  • 75 Views

“… আমরা চেয়ারম্যান ও মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ দাবি করেই যাব ও উপাচার্য ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে,” বললেন বরখাস্ত হওয়া এসআরএফটিআই-এর এক শিক্ষার্থী।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এ পরপর দু’বার বিজেপি-আরএসএস আশ্রিত হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতিদের আক্রমণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের কার্যৎ শিক্ষার্থী-বিরোধী মনোভাব ও পদক্ষেপের জন্য শিক্ষার্থীরা ক্লাস বয়কট ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান-ধর্ণার পথ বেছে নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের পঠন-পাঠনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

 

এরই মাঝে গত ১৫ অক্টোবর ছ’জন পড়ুয়াকে বরখাস্তের চিঠি পাঠানো হয়েছে। যে চিঠিতে বরখাস্তের কারণ ও সময়সীমা কিছুই সঠিকভাবে উল্লিখিত নয়। এই বরখাস্তের চিঠির বিষয়ে পড়ুয়ারা ইতিমধ্যেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে এগিয়েছে। আচমকাই ১৫ অক্টোবর এই বরখাস্তের চিঠি পাওয়ার পর ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা জরুরি ভিত্তিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের ডাক দেন। তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ধর্ণা মঞ্চের সামনে এই সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইলেও কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দীর্ঘ সময় টালবাহানার পর সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত বন্ধ মূল ফটকের ভেতর থেকেই বাইরে দাঁড়ানো সাংবাদিকদের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা।

 

এই সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বারেবারেই যে বিষয়টির উপর জোর দিচ্ছিলেন তা হল – উপাচার্য নিজের বিবৃতি, কাজকর্ম, শিক্ষার্থীদের প্রতি নির্দেশের মধ্যে দিয়ে বারেবারেই যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন তা হল, প্রতিষ্ঠানে সব কিছু স্বাভাবিক আছে এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ তুলে নিয়ে ক্লাসে ফেরার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এবং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর হাতে গোনা কয়েক জন শিক্ষার্থীই এই ক্লাস বয়কট ও অবস্থান বিক্ষোভে মদত দিচ্ছেন, বাকিরা সকলেই ক্লাস চালু করার পক্ষে। ১৫ অক্টোবর, সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়ারা এই বিষয়ে স্পষ্টতই জানান একেবারেই নতুন ও চলতি ব্যাচের সিনিয়র পড়ুয়ারা, এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ছাত্রছাত্রী একজোটভাবে এই প্রতিবাদে শামিল, তা আদপেই বরখাস্তের নোটিস পাঠানো পাঁচ-ছ’জন শিক্ষার্থী বা শুধুই স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর বিষয় নয়।

 

বরখাস্তের বিষয়টির পাশে এদিন শিক্ষার্থীরা সরাসরি অভিযোগ আনেন সিকিওরিটি অফিসার পি কে মুন্সি-র বিরূদ্ধে। উপাচার্যের পাশাপাশি মূলত তিনিই শিক্ষার্থীর বিরূদ্ধে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া, তাঁদের নানাভাবে হেনস্থা করছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। অন্যদিকে উপাচার্য বা অন্য কোনো কর্মীদের সঙ্গে কোনোরকম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা বলেও জানান তাঁরা। এই পি কে মুন্সির বিরূদ্ধে প্রতিষ্ঠানের একজন অত্যন্ত বরিষ্ঠ মহিলা কর্মী, যিনি ১৯৯৫ থেকে কর্মরত ও শিক্ষার্থীদের প্রতি সমমনোভাবাপন্ন তিনি হেনস্থার অভিযোগ আনলেও কোনো রকম পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও সেই অভিযোগপত্র সহ শিক্ষার্থীরা জানান।

 

তারেক, সুদীপ, অ্যারন, জয়দীপ, আকাঙ্খা, ব্লসম (স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর সভাপতি) বক্তব্য রাখেন।

 

“আমরা সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক ফিল্ম স্কুলে পড়ার সুযোগ ছেড়ে এখানে পড়তে আসি। অথচ আমাদের হস্টেলের সুবিধা প্রথম থেকেই দেওয়া হয় না। আর আমরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এখানে যা দেখছি তাতে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। একজন মুসলিম হিসাবেও এখানে উপাচার্য ও প্রতিষ্ঠানের আচরণে আমি প্রান্তিক বোধ করছি,” বলেন তারেক।

 

২৭ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবরের আক্রমণের পরেও প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করা হয়নি। বাইরের যে ফ্যাসিবাদী শক্তির আক্রমণ সারা দেশ জুড়ে দেখা যাচ্ছে, তারই প্রতিফলন যেন প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও দেখা যাচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা মন্তব্য করেন। এই আক্রমণের বিরূদ্ধে যাঁরাই উপাচার্যকে দায় স্বীকার করতে বলেছেন তাঁদেরই টার্গেট করা হচ্ছে। যাঁরা ৪ অক্টোবরের পর উপাচার্যকে সাময়িক ঘেরাও ও প্রতিবাদে অংশ নেন, তাঁরা বাদেও যাঁরা সেদিন ছিলেন না বা এমনকি কলকাতার বাইরে ছিলেন তাঁদেরও শো-কজ চিঠি পাঠানো হয়েছে। নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের বিরূদ্ধে, যেখানে তাঁদের নিরাপত্তার দায় প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে না। কেবলই তাঁদের নানা রকম ভয় দেখিয়ে ও তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করে ক্লাস শুরু করতে বলা হচ্ছে – যার চরম উদাহরণ কোনো রকম আগাম ইঙ্গিত ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বরখাস্তের নোটিস পাঠানো। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা সকলেই জানান যে নব নিযুক্ত উপাচার্য এতদিন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের করা সমস্ত অভিযোগের প্রতিই কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না জানানোয় এবং তাঁর পুরোপুরি ফ্যাসিবাদীসুলভ শিক্ষার্থী বিরোধী আচরণের জন্য শিক্ষার্থীরা একজোট ও একমত হয়ে তাঁর ইস্তফার দাবিতেই অনড় থাকছেন।

 

জয়দীপ যিনি দুষ্কৃতিদের আক্রমে আহত হয়েছিলেন ও এখনো যাঁর একটি অস্ত্রোপচার বাকি, তিনি জানান উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও তিনি পারেননি। উপাচার্য কোনো অবস্থাতেই আন্দোলনরত ও দাবিপত্র জমা দেওয়া শিক্ষার্থী বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। এমতাবস্থায় পড়ুয়াদের দাবি – “সব কিছু স্বাভাবিক এমনটা ভান করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং সংবাদমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক সর্বত্র আসল ছবিটি, পড়ুয়াদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।”

 

ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ পরিচিতি নিয়ে সদ্য আসা উপাচার্য সন্তোষ আজমের চূড়ান্ত বৈষম্য করছেন বলেও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। দলিত, আদিবাসী ও মূলত দক্ষিণ ভারত থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে তাঁদের বিরূদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে এদিন অভিযোগ করেন তাঁরা। উপাচার্য তাঁর প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যেভাবে তাঁকে নিগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও তা প্রমাণের জন্য ভিডিও ফুটেজ আছে বলেও পড়ুয়ারা জানান। “আমরা ওনাকে জল দিতে চেয়েছিলাম। তিনি তাঁর উত্তরে তাঁর কর্মীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন – জলটা এঁটো নয় তো? আমরা না বললেও তিনি বিশ্বাস করেননি। এর থেকেই তাঁর মানসিকতা বোঝা যায়,” – জানালেন এই পড়ুয়া।

 

“এই উপাচার্য পূরোপুরি আর এস এস-এর ভাবধারায় চালিত। একজন দমন-পীড়নকারী। আর এস এস যেমন এ দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে, সেই উদ্দেশ্যেই এই উপাচার্যকে নিয়োগ করা হয়েছে এস আর এফ টি আই-তে যে শান্তিপূর্ণ বাক স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটত তা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেওয়ার জন্য। সমস্ত রকম প্রান্তিক পরিচিতির বিরোধী এরা। হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ ঠেকানো নয়, পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, তাঁদের বিরূদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। আমরা চেয়ারম্যান ও মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ দাবি করেই যাব ও উপাচার্য ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে,” বললেন বরখাস্ত হওয়া এক শিক্ষার্থী অ্যারন।

 

সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালীনই খবর আসে মালায়লম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির কিছু মানুষ চেয়ারম্যান সুরেশ গোপীকে এই বিষয়টি জানালে, তিনি জানিয়ে দিয়েছেন কোনোভাবেই তিনি এতে হস্তক্ষেপ করবেন না! প্রশ্ন ওঠে যখন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ভবিষ্যত প্রশ্নের মুখে, তখন চেয়ারম্যান কোথায়? “হোয়ার ইজ সুরেশ গোপী?”

 

স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর পক্ষ থেকে ব্লসম জানান, প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো রকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ দেওয়া সমস্ত নির্দেশ পড়ুয়ারা মেনে চললেও, আক্রমণকারীদের বিরূদ্ধে একটি পাথরও ছোঁড়া না হলেও, উপাচার্য ও প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, তাঁদের দাবির একটিও মেনে নিচ্ছে না।

 

সারা দেশ দেখেছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ আর দেখছে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা না দেওয়া। এক্ষেত্রে তাহলে ফ্যাসিস্ট প্রশাসনের বিরূদ্ধে তাঁরা কীভাবে দাঁড়াবেন? অ্যারন বললেন, “আমরা সত্যিই জানি না। অসহায় বোধ করছি। তবে আন্দোলনের পথ ছাড়ব না। আগামী দিনে তা কোন পথে যাবে বোঝা যাবে।”

 

উৎসবের দিনে ছুটি পড়ে যাবে, পড়ুয়ারা কী করবেন? “আমরা কেউ ক্যাম্পাস ছেড়ে যাব না। শিক্ষার্থীরা এই সময়েও একটূ বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন, যদি কোনোভাবে আক্রান্ত হন। অন্যদিকে ভেতরেও আমরা যে পুরোপুরি নিরাপদ তা তো নয়,” বললেন তিনি।

 

সিনেমা শেখার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসাবে অন্ধকার সময়ের সিনেমা তৈরি হবে কী? “আমরা নিজেদের মতো করে সবটা ডকুমেন্ট করছি। সিনেমা ছাড়া আমাদের তো প্রতিবাদের অন্য ভাষা নেই। নিশ্চয়ই এই সময়ও আমাদের সিনেমাই ভাষা হয়ে উঠবে,” স্পষ্ট ভাবনা অ্যারন-এর।

         

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য একজন ব্যুরোক্র্যাট যখন একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন, তখন পরিস্থিতি এরকমই হয়ে ওঠে। তাঁরা ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরূদ্ধে সমস্ত লড়াইতে নিজেদের শামিল মনে করেন এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন বলেই জানান।

 

১৬ অক্টোবর বিকেলেই ১৫ অক্টোবরের তারিখে এক বিজ্ঞপ্তি দায়ের করে জানানো হয় উৎসবের ছুটিতে প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েক জন ছাড়া সমস্ত পড়ুয়াদের ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রতিষ্ঠান খালি করে চলে যেতে হবে। ১৭ অক্টোবর গ্রাউণ্ডজিরো-কে দূরভাষে ইউনিয়ন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট শুভম জানান, “আমরা এর বিরূদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। ভুল তারিখটি উল্লেখ করার পর তা বদলে ১৬ করে প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে নোটিস আটকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কোনো মেইল করা হয়নি। তাই এই নোটিস অফিশিয়াল বা আইনি নয়। এবং অবাক করার বিষয় হল, দেশের নানা প্রান্তের পড়ুয়ারা ২৪ ঘন্টার মধ্যে কীভাবে কোথায় যাবে। আমাদের আইনজীবী বিষয়টি দেখছে। আমরা কোনোভাবেই কোথাও যাচ্ছি না, ক্যাম্পাস ছাড়ছি না।”           

 

Share this
Leave a Comment