প্রেম ভালবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়াতে কলকাতার গান্ধী ভবন থেকে শান্তিনিকেতন পদযাত্রা


  • October 15, 2026
  • (0 Comments)
  • 161 Views

গত ২ রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে সর্বসেবা সংঘের নেতৃত্বে কলকাতার গান্ধী ভবন থেকে বোলপুর শান্তিনিকেতন অব্দি সর্ব সেবা সংঘের নেতৃত্বে এক পদযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এই পদযাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে প্রেম ভালবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়ানো। প্রায় ২৫৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তারা আগামী ১৬ই অক্টোবর বোলপুরে পৌঁছবেন। এই যাত্রাপথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষজন এই কাফিলার সাথে যুক্ত হয়েছেন। ঠিক তেমনই আমরা কয়েকজন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র-ছাত্রী, এই পদযাত্রায় ওনাদের সাথে যোগ দিই ১০ই অক্টোবর রাত্রিবেলা। পরের দিন ১১ তারিখে বর্ধমান থেকে আমরা সবাই তালিতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেই সম্মন্ধে অভিজ্ঞতা ও এই উদ্যোগের পেছনের যারা প্রধান কারিগর তাদের সাথে কিছু কথাবার্তার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই প্রতিবেদন লেখা হয়েছে।

 

সর্ব সেবা সংঘের নেতৃত্বে হওয়া পদযাত্রা সম্পর্কে প্রতিবেদন

 

“आग लगी इस वृक्ष को, जलने लगे सब पात,

तुम क्यों जलो पंखेरुओं, पंख तुम्हारे साथ।

फल फूल खाये इस वृक्ष के, भीत भरे हैं पात,

उड़ना हमारा धरम नहीं, जलना वृक्ष के साथ।”

~ संत कबीर

 

খবরটা পেয়েছিলাম চাঁপাডাঙ্গা থাকতেই। শুনে যেমন অবাক হয়েছিলাম, তেমনই একটা অদম্য জেদ অনুভব করেছিলাম এই উদ্যোগে। কী উদ্যোগ? হাঁটার উদ্যোগ। যে উদ্যোগে বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন হিউয়েন সাঙের মতো পর্যটকেরা, তৈরি হয়েছে ভারতের বিশ্ব ইতিহাসের পাতা; আবার এই সেই হাঁটা, যার দৃঢ়চেতা জেদ, সাহস জুগিয়েছে লাখো লাখো ভারতবাসীর বুকে অস্ত্রের সামনে নিরস্ত্র হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর। হাঁটার ঐতিহ্য বহুকালের, একটু বিচার করলে দেখা যায়, মানুষের সম্পূর্ণ ইতিহাস আসলে হেঁটে চলার ইতিহাস। কখনও এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ড; আবার কখনও মননের জটিল স্তর বেয়ে মনুষ্যত্বের চরম সীমাগুলোতে। এই বিবিধ ভারতবর্ষ ও তার ব্যতিক্রম নয়। সম্পূর্ণ ভারতের রাজনৈতিক ভৌগোলিক চরিত্র পাল্টে গিয়েছিল একজন ব্যক্তির হাঁটার ডাকে! লাখে লাখে মানুষ সেদিন হাঁটতে শুরু করেছিল শুধুমাত্র তাদের সম্বলটুকুকে বাঁচানোর তাগিদেই নয়, বরং নিজেদের অধিকারটা বুঝে নিতে। অত্যাচারের শিকল ভাঙতে সেই হাঁটার প্রয়োজন ছিল। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ঔপনিবেশিকতা বুকের শ্বাস আটকে দিলে মানুষ হাঁটতে চেয়েছিল, শিরদাঁড়া উঁচু করে। আইন নামে প্রহসনকে ঠেকাতে তাই আজও মানুষ রাস্তায় নেমেছে, হাঁটতে শুরু করেছে। হিংসা, ভেদাভেদের বিপরীতে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর বিভিন্নতার বাণী নিয়ে ২ রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিমন্ডিত এই বাংলার শান্তিনিকেতন অবধি হেঁটে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগের পিছনে মূলত রয়েছেন গান্ধীবাদী সংগঠন সর্ব সেবা সংঘ, সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বেশ কিছু গণতান্ত্রিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকবৃন্দ। ২ রা অক্টোবর কলকাতার গান্ধী ভবন, অর্থাৎ সেই ঐতিহাসিক হায়দরি মঞ্জিল থেকে শুরু হয় ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা নিয়ে এই পদযাত্রা। ১৫ ই অক্টোবর সে যাত্রা পৌঁছাবে শান্তিনিকেতনে। প্রায় কুড়িটি রাজ্যের প্রতিনিধিরা এই পথে পা মেলাচ্ছেন, অর্থাৎ হাঁটার এই ডাক আর শুধু বাংলার নয়, ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের নানা প্রান্তে।

 

ইতিহাস ঘাঁটলেই বোঝা যাবে, জায়গাটা বেছে নেওয়াও কোনো আকস্মিকতা নয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট, যখন সারা দেশ স্বাধীনতার উৎসবে মেতেছিল, তখন কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার আগুন নেভাতে মহাত্মা গান্ধী এই হায়দরি মঞ্জিলেই অনশনে বসেছিলেন। আবার ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার সামাজিক বিভাজনের উদ্দেশ্যে বঙ্গভঙ্গ করলে তার জবাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ১৬ ই অক্টোবর রাখিবন্ধনের ডাক দিয়েছিলেন, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখার জন্য। এই দুটো তারিখই ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে, আর এই দুইয়ের মধ্যে দিয়েই আমরা ডাক দিতে পারি সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা। সেই দুই প্রান্তকে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টাই যেন এই পদযাত্রা, হায়দরি মঞ্জিল বা গান্ধী ভবন থেকে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত। সংগঠকদের মতে, প্রতিটি যুগের নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে এবং সমকালীন প্রজন্ম সেগুলোকে নিজস্ব পদ্ধতিতে মোকাবিলা করে। চ্যালেঞ্জের রূপ বদলায়, কিন্তু মানবসমাজের বিকাশের ইতিহাসে এমন কখনও ঘটেনি যে চ্যালেঞ্জ একেবারেই থাকবে না। আজও নানা সংকট আমাদের সামনে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ আর পরিবেশগত বিপর্যয় মানবজাতিকে নতুন কোনো পথের সন্ধানে ঠেলে দিচ্ছে। নেপালের ধ্বংসাত্মক বন্যা তারই সাক্ষী, যা মানুষের হাতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ-ব্যবস্থায় নির্বিচার হস্তক্ষেপের পরিণতি। যুদ্ধ বরাবরই সম্পদ দখল নেওয়ার একটা পন্থা ছিল। আজ তা সম্পূর্ণ অস্ত্র-বাণিজ্যের এক কৌশলগত কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। তাই তাঁরা স্বপ্ন দেখেন যুদ্ধ ও অস্ত্রমুক্ত এক পৃথিবীর, আর অঙ্গীকার করেন প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য ও সহযোগিতার পথে হাঁটার। আবার আমাদের ঘরের ভিতরের চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভারতের সংবিধান সংসদীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি আইনের শাসন এবং আইনের চোখে নাগরিকদের সমতার নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। অথচ বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও সমানাধিকারের আদর্শ রক্ষার নামে শপথ নিয়ে দেশ ও রাজ্যের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁরাই ক্রমাগত ধর্ম ও জাতপাতের ভিত্তিতে ঘৃণা ও বিদ্বেষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে চলেছেন। এই রাজনীতি আসলে সংবিধানের প্রতি অপমানই শুধু নয়, এতো রক্তদান ও বলিদানের পরিবর্তে পাওয়া দেশের স্বাধীনতার ওপর এক চরম কালো দিন। যখন স্বাধীন ভারতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল এই অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রধান শক্তি ও ভরসা। কিন্তু এখন সেগুলোই দুর্বল, শিথিল ও সন্দেহজনক হয়ে পড়লে বিপদ নেমে আসে গণতন্ত্রের ওপরেই, আর আজ ঠিক তেমনটাই ঘটে চলেছে।

 

আমরা জানি, ভারতের সংবিধানই প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে তাঁদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত করেছে। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ও বাস্তব ঘটনাগুলোকে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, আজ অবৈধভাবে পরিচালিত SIR-এর কারণে সেই নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারই বিরাট সংকটের মুখে, সংকটের মুখে ভারতের লোকতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি। নির্বাচন কমিশনের সন্দেহজনক ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠা এক গুরুতর বিপদের সংকেত। শুধু তাই নয়, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মহিলা, দলিত, আদিবাসী এবং অন্যান্য দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে সমস্ত সম্পদ কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার যে তাড়াহুড়ো চলছে, তা চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলছে। তবে এই হাঁটা শুধু প্রতিবাদ করার জন্যে নয়, তার থেকেও বেশি কথা বলার, মানুষের সাথে যোগাযোগের। এই উদ্যোগের সংগঠকেরা জানিয়েছেন, সত্য, অহিংসা, সত্যাগ্রহ ও মানবতার আদর্শকে সামনে রেখে তাঁরা পথে পথে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করবেন। আজকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন কোন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করবেন। সেই অর্থে এই যাত্রা একই সঙ্গে সংলাপের, শেখার, আর সামনে এগিয়ে চলার দিকনির্দেশনার যাত্রা। তাদের এই পথচলার সারকথা: ভালোবাসা ও শান্তির ভিত্তিতে একটি মানবিক সমাজ ও পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। সর্ব সেবা সংঘের (অখিল ভারত সর্বোদয় মণ্ডল) সভাপতি শ্রী চন্দন পালের এই আহ্বানে মনে হচ্ছিল, হাঁটার সেই পুরোনো ইতিহাসে আরও একটা পাতা যোগ হতে চলেছে। পোস্টারের হিসেব বলছে, পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ কিলোমিটার, সময় পনেরো দিন। বেলেঘাটা থেকে ডানলপ, বারাকপুর, চুঁচুড়া, ত্রিবেণী, পাণ্ডুয়া, বর্ধমান, গুসকরা, ভেদিয়া হয়ে সেই পথ গিয়ে মিশবে শান্তিনিকেতনের লালমাটিতে। দূরত্বটা হয়তো কয়েকটা সংখ্যামাত্র, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপের ওজন আলাদা। প্রতিটা পদক্ষেপে এই বৃহৎ ভারতের অসংখ্য পরিচয়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের লড়াই, মতাদর্শ আজ স্ব স্ব মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে এক হয়ে এই পথে পা মিলিয়েছে।

 

এবার আসা যাক, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। সম্পূর্ণ এই পদযাত্রায় বিভিন্ন সময়ে আমাদের মতোই বিভিন্ন মানুষও এসে যোগ দিয়েছেন। আমরা এই যাত্রায় যোগ দিয়েছিলাম বর্ধমান থেকে, গন্তব্য ছিল তালিত। পৌঁছে একবারের জন্য মনে হয়নি যে এনাদের কাউকে আগে থেকে চিনতাম না। সবাই এমন ভাবেই কথা বলছে বা আমরাও তাদের সাথে এমন ভাবে মিশে যেতে পারছি, যেন মনে হচ্ছে অনেক দিন ধরেই তো চিনি তাদের, আবার দেখা হল কিছুটা সময় আবার একসাথে পথ চলা। এই যাত্রায় বিভিন্নতার রং ছড়িয়ে ছিল অনেক স্তরে। যেমন এসেছে ১০-১২ বছরের ছোট্ট বাচ্চা, তেমনই এসেছেন ষাটোর্ধ্ব বা সত্তরোর্ধ্ব বয়সের লোকজন। এসেছে পরিবার, এসেছে একা কেউ এই বড়ো পরিবারে অংশ হতে। এমনকি আসাম থেকে এসেছেন একজন বয়স্ক ক্যান্সার রুগীও। কীসের তাড়নায়, সেই বিচার করতে হলে ভালোবাসতে হবে আগে, আপন করতে হবে অজানাকে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে অচেনার সাথে। কিছুক্ষনেই সমস্ত অ- গুলো সরে যাবে নিজের তরেই। গিয়েই সবাই মিলে ধরা হলো জিতেন নন্দীকে। জিতেন নন্দী জীবনের বেশিরভাগটা সময়েই রাজনীতির সাথে সাথে নিজের চেষ্টায় করেছেন ধ্রুপদী ও অন্যান্য সংগীত সাধনা। তার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, পথে চলতে চলতে কিছু শিক্ষক পেয়েছেন; কিন্তু আবার শিক্ষক হিসাবে বেছে নিয়েছেন সেই সাধারণ মানুষকেই। তার গলায় সেই সন্ধ্যে সন্ত কবিরের দোহা মনের মধ্যে তুলেছিল এক অনন্য রাগ। এই রাগের প্রধান, সুর নয়; বরং একটা ঘরে গোল হয়ে বসা এক টুকরো ভারত। ঝাড়খন্ড থেকে আসা এক দাদা আমাদের তার নিজের লেখা গান শোনালেন। ঐদিকে জিতেন নন্দীর সাথে সাথে যোগ দিলেন রাজস্থান থেকে আসা জগদীশ বাবু। জগদীশ বাবু তার সহজ সরল দৃঢ় গানের ভাষায় জানালো, রাম যেমন কোনো এক জন কেউ নন, ঠিক তেমনই নন কারোর একারও। আজ যখন সমগ্র ভারতবর্ষে সংস্কৃতি, ধর্ম, জ্ঞানের এবং ইতিহাসের একরৈখিকীকরণ চলছে, জগদীশের মত মানুষেরা আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়, এই ভারত বিভিন্ন রামের ভারত, এই ভারত সন্ত কবিরের ভারত, এই ভারত লালনের ভারত। এই ভারত আজ যতটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, যতটা গান্ধীজীর, ঠিক ততটাই কোন অজানা প্রান্তের ঘরে বসে থাকা এক মুসলিম মহিলার, যার নাম এই ঘৃণ্য SIR প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাকে ভয়ে ভয়ে কাটাতে হচ্ছে প্রতিটা দিন, কখন রাতের অন্ধকারে কিছু সরকার পোষিত বাহিনী এসে তাকে বা তার স্বামী এবং বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছুঁড়ে দেবে কাঁটাতারের ওইপারে।

 

যেদিন আমরা যাত্রা শুরু করছি, সেই দিনটা অকস্মাৎ কিনা জানিনা, এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সময়ে এসে পড়েছি বলে মনে হল। একদিকে ইলেকশন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সেই সময় দিল্লীতে ছাত্রছাত্রী, সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ গণ আন্দোলনকে হিংস্র ভাবে দমন করার চেষ্টা করছিল সরকারের বর্বর পুলিশ বাহিনী; ট্রেন বাস মেট্রো বন্ধ করে, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে, গণ অভ্যুত্থানের ভয়ে লাখে লাখে সশস্ত্র সেনা বাহিনী নামিয়ে একপ্রকার অঘোষিত জরুরী ব্যবস্থা জারি করে দিয়েছে বিজেপি সরকার। শুধু তাই নয়, আন্দোলনকারীদের নৃশংস ভাবে অমানুষের মতো মারা হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের শ্লীলতাহানি করার চেষ্টাও করেছে দিল্লির পুলিশবাহিনী। সেই সমস্ত ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ১১ তারিখেই আবার জন্মদিন বিখ্যাত গান্ধীবাদী সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ শ্রীবাস্তবের; ১৯৭৫ সালের কংগ্রেস সরকারের জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী চরিত্র। আজ দিল্লির রাজপথের দিকে তাকালে জয়প্রকাশ নারায়ণের সেই পুরোনো কথাগুলোই যেন নতুন করে কানে বাজে। ১৯৭৪ সালের পাটনার সেই জনসভায় একেবারে শুরুতেই জয়প্রকাশ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তাঁদের এই লড়াই কোনো আন্দোলন নয়, এ হল সম্পূর্ণ ক্রান্তি। আর সেই ক্রান্তির জন্য যাঁরা পথে নামবেন, তাঁদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, কষ্ট সইতে হবে, লাঠি আর গুলির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, ভরে তুলতে হবে জেলখানা। দিল্লির ছাত্রছাত্রীরা আর সাধারণ নাগরিকেরা যখন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমে লাঠির আঘাত সইছেন, তখন মনে হয়, এই কথাগুলো বুঝি আজও অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। পাটনার সেই সমাবেশের তাৎক্ষণিক দাবি ছিল বিহার বিধানসভা ভেঙে দেওয়া। কিন্তু জয়প্রকাশ নারায়ণ জানতেন, কাজ তার চেয়ে ঢের বড়ো। যে স্বাধীনতার জন্য দেশের হাজার হাজার তরুণ একদিন আত্মবলিদান দিয়েছিল, তাকে সত্যিকারের অর্থে অর্জন করতে চাইলে লড়াইয়ের পরিসর যেমন বিস্তৃত হতে হবে, তেমনই লাগবে অনেক বেশি সময়। আজও ঠিক তাই। একজন কমিশনারের পদত্যাগ হয়তো একটা দৃশ্যমান দাবি, কিন্তু তার পিছনে রয়েছে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অনেক বড়ো এক লড়াই, যা একদিনে ফুরোবে না। সেদিন জয়প্রকাশ নারায়ণ নিজেই তৎকালীন পরিস্থিতির এক নির্মম হিসেব দিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে, হাজার হাজার তরুণের সামনে কেবলই অন্ধকার ভবিষ্যৎ, বেকারত্ব বেড়েই চলেছে, গরিব মানুষের হাতে কাজ আরও কমছে। জমির উর্ধ্বসীমা আইন পাস হয় ঠিকই, অথচ ভূমিহীনের সংখ্যা কমে না, উলটে বাড়ে; ছোটো চাষিরা হারিয়েছে নিজেদের জমি। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানেও এই তালিকা পড়তে গিয়ে কেমন যেন অস্বস্তি হয়, কারণ শব্দগুলো সময়ের ধুলো ঝেড়ে আজকের সংবাদপত্রের পাতাতেই মানিয়ে যায়। আমরা সবাই যখন আজ  যখন গান্ধী ভবন থেকে শান্তিনিকেতনের পথ ধরে হাঁটছি, তখন তো আসলে সেই একই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলেছি।

 

আসলে প্রশ্নটা শুধু একজন কমিশনারের পদত্যাগ বা ভুল তালিকার নয়; প্রশ্নটা হল, দেশ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি। গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ, দুজনেই এই প্রশ্নে এসে একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও পৌঁছেছিলেন আলাদা পথ ধরে। রবীন্দ্রনাথের কাছে নেশনের ধারণা ছিল সংগঠিত স্বার্থপরতার এক যন্ত্র, যেখানে মানুষ ক্রমে একটা মানচিত্রের ভিতরের সংখ্যায় পরিণত হয়, আর রাষ্ট্র হয়ে ওঠে মানুষের চেয়ে বড়ো। তাঁর ধারণায় তাই ভারতকে তিনি শুধুমাত্র কোনো সীমানাঘেরা ভূখণ্ড হিসেবে দেখতে চাননি, চেয়েছিলেন এক তীর্থক্ষেত্র রূপে, যেখানে আর্য, অনার্য, শক, হুন, পাঠান, মোগল সবাই এসে মিশেছে, কেউ বাদ পড়েনি। ‘গোরা’ উপন্যাসের শেষে এসে সব জাত, সব পরিচয় ঘুচে যায় এই বোধেই, যে ভারতবর্ষ কারও একার দখলে নেই। গান্ধীও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে কখনও স্বাধীনতার শেষ কথা বলে মানেননি। ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ব্রিটিশ চলে গিয়ে ব্রিটিশ ব্যবস্থাটাই থেকে গেলে তাকে স্বরাজ বলা যায় না। স্বরাজ মানে নিজের ওপর নিজের শাসন, অর্থাৎ ক্ষমতার আসনে বসার আগে নিজের ভয়, লোভ আর ঘৃণাকে জয় করা। তাঁর কাছে দেশের মাপকাঠি ছিল সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির মুখ, আর অহিংসা ছিল সেই মাপকাঠিতে টিকে থাকার একমাত্র নৈতিক উপায়। দুজনের ভারতে তাই একটা জায়গায় গভীর মিল; দেশ একটা অন্তহীন নৈতিক সাধনা। যে ভারত একজনও মানুষের পরিচয় কেটে বাদ দিতে পারে, নির্মম ভাবে তারই নাগরিকদের ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে, সে ভারত গান্ধীর স্বরাজও নয়, রবীন্দ্রনাথের তীর্থও নয়; সে কেবলই এখনও এক ঔপনিবেশিক ক্ষমতার ভূগোলেই আটকে আছে। আজ আমরা যখন সেই মানুষদের নাম নিয়ে, তাদের আদর্শকে পাথেয় করে পথে নেমেছি, তখন বুঝতে পারি, দেশকে ভালোবাসা আর রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এক জিনিস নয়। কখনও কখনও দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সৎ উপায় হল রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা, এবং সেই প্রশ্ন করতে করতে এগিয়ে চলা, ঘৃণার জবাবে ঘৃণা না ছুঁড়ে।

 

আমরা হাঁটা শুরু করলাম, তখন ঘড়িতে সকাল ৮ টা বেজে ৪০ মিনিট। ‘জয় জগৎ’ এর ডাকের সাথে সাথে আর বিপ্লব নায়েকের দরাজ গলায় এই পদযাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল আমাদের ছোট্টো কাফিলা। আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ যে সদস্য, সে তখন দৌড়ে দৌড়ে রাস্তার ধারের মানুষজনদের প্রচণ্ড উৎসাহের সাথে এই উদ্যোগের প্যামফ্লেট বিলি করতে ব্যস্ত। রবিবারের সকালে যখন মানুষ রাস্তায় সবে বেরিয়েছে, দোকান পাট খুলতে আরম্ভ করেছে, গাড়ি ঘোড়ার দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে প্রায়, সেই সময়ে আমাদের এই কাফিলাকে দেখে মানুষের কৌতুহলী চোখগুলো এবং এগিয়ে এসে কয়েকজন মানুষের হাসি মুখে প্যামফ্লেট নেওয়া মনের কোণে একটু হাসি ফোটায়। কেউ কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ কেউ তুলছেন ভিডিও। জানি না, কারণ কী, জানতেও চাওয়ার নেই। কিন্তু বিপ্লবদার ক্রমাগত অক্লান্ত উদ্যমে “আমরা শান্তির বার্তা দিতে এসেছি, আমরা সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসার কথা শুনতে এসেছি’’ এই সহজ কথাটুকু বলে যাওয়া যদি একটু হলেও মানুষের মনে গিয়ে ভাবায়, সেইটুকুই হয়তো পাওনা হবে এই হাঁটার। হাঁটতে হাঁটতে আমরা সবাই বেঁধেছি গান, নিজেদের মতো করে মন খুলে এক দিদি ওড়িয়া ভাষায় গান ধরলেন, তারপর এক এক করে বাকিদের গলায় বেজে উঠল বাংলা, ঝাড়খণ্ডী, হিন্দি গানের সুরের মালা। রাস্তার দৈর্ঘ্য খুব একটা বেশি যেমন ছিল না তেমন ওই রোদের তাপ মাথায় নিয়ে খুব একটা কমও মনে হয়নি। এইভাবে চলতে চলতে একটা সময় আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে উঠলাম সুদূর বিস্তৃত ধানক্ষেতের মাঝে। সেখানে রাস্তা পাকা তবে ধুলো ধোয়া যানজটের অত্যাচার ছেড়ে একটুখানি ঠান্ডা বাতাস ঘেরা শান্তি। কাফিলা তখনও এগিয়ে চলেছে তার নিজস্ব অনাবিল ছন্দে। গন্তব্য তালিতের একটা স্কুল; পৌঁছে আবার কিছু খেয়ে বিশ্রাম পরের দিনের সফরের জন্যে। এই হেঁটে চলা আসলে একটা নদীর মতো। নদীর মতো প্রবাহে এই হাঁটার মধ্যে দিয়ে অসংখ্য মানুষের বহু আবেগ, অভিজ্ঞতা, গল্প, কথা ও ভিন্নমত নিয়ে বয়ে চলেছে এই কাফিলা।

 

 

Share this
Leave a Comment