“ভোট আমাদের অধিকার, তা এত সহজে কেড়ে নেওয়া যাবে না” – কলকাতার মিছিলে যন্তর-মন্তরের বহুস্বরের প্রতিধ্বনি 


  • October 12, 2026
  • (0 Comments)
  • 162 Views

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আটটি বাম ছাত্র সংগঠনেরর উদ্যোগে ১১ অক্টোবর, কলকাতার শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত এক দীর্ঘ মিছিল সংঘটিত হয়।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তী প্রতিবেদন

 

একটা মিছিল মানে জনরাশি। যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের চিন্তাচেতনা কোথাও গিয়ে একটি সাধারণ বিন্দুতে মিলেছে বলেই তারা পা মেলাচ্ছেন জোটবদ্ধ হয়ে, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঠছে আকাশে, সমবেত কন্ঠের স্লোগান শোনা যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। সারা দেশের নজর যখন দিল্লির যন্তর-মন্তরে দেশের ছাত্র-যুবদের নাছোড়, জীবনপণ লড়াইতে, যেখানে শামিল সব বয়সের মানুষ, তখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আটটি বাম ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য বাম সংগঠনের উদ্যোগে ১১ অক্টোবর, কলকাতার শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত এক দীর্ঘ মিছিল সংঘটিত হয়।

ছবি: অর্ক

এই মিছিলেই কথা বলা গেল কয়েক জন ছাত্র-যুবদের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক ভাবনার স্পষ্ট ছবি বোঝার জন্য। তাঁদের কাছে প্রশ্ন ছিল দিল্লির যন্তর-মন্তরের আন্দোলনের প্রতি প্রতিক্রিয়া, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্র ও পুলিসের দমন-পীড়ন, মহিলা আন্দোলনকারীদের প্রতি ঘটা সহিংসিতা ও রাজ্য তথা দেশে বিজেপি সরকারের বিষয়ে তাঁদের মনোভাব সংক্রান্ত।

 

স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রী কলকাতার পার্ক সার্কাসের শবনম খাতুন বললেন, “যেভাবে জ্ঞানেশ কুমার এত জন ভোটারের নাম বাদ দিয়েছেন, আমরা চাই, যে ভুল্ভাবে তারা এই কাজটা করছেন, সেই প্রক্রিয়াটা বন্ধ করা হোক, জ্ঞানেশ কুমার নিজের অ্যাকাউন্টিবিলিটি নিন, আর যদি তিনি তা না মেনে নেন, তাহলে তাকে ইস্তফা দিতেই হবে। অউর হাম তামাম জনতা কি এঁহি রায় হ্যায় কে উনহে ইস্তিফা দেনা পড়েগা, হর হাল মে দেনা পড়েগা।

 

দিল্লি পুলিস পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছে। তারা জানেও না যে সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে কে। শুধু সরকারের কথা শুনে জনতার উপর লাঠি চালানোই তাদের কাজ হয়ে গেছে। আমরা জানি যে, তাদের উপরে অর্ডার আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা নিজের বিবেক ভুলে গিয়ে সব আন্দোলনকারীদের উপর এমন জুলুম করবেন। এর জবাব ওদের দিতেই হবে।

 

দেখুন, ভোটারদের কাছে, আমাদের মূল জিনিস হল ভোট। যদি আমাদের থেকে আমাদের ভোটই ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কীকরে বলব যে এই সরকার সিস্টেম মেনে গঠিত না কি ভোটচুরি করে তৈরি হয়েছে। সামনের নির্বাচনে কে থাকবে না থাকবে তা তো জানি না, কিন্তু আমি চাই যেন একটা সঠিক প্রক্রিয়া, সঠিক সিস্টেম মেনে কাজ হোক। ভোটচুরি, গদ্দারি যেন না হয়।

 

ভোট হামারা অধিকার হ্যায় অউর হামারা অধিকার ইতনি আসানি সে ছিনা নেহি যা সকতা। আর যখনই আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে তামাম জনতা একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াবে। 

 

বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতেই দেশ চালাতে চায়। হিন্দু থাকবে, মুসলমানদের হঠাতে হবে। এইভাবে যারাই শাসন করতে চেয়ে ইতিহাসে দেখুন, তাদের পরিণতি খারাপই হয়েছে। হিন্দুস্তানকে চালানোর জন্য, আমাদের সংবিধান যেভাবে বলে সেভাবেই একটি সরকারের উচিৎ দেশ চালানো, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।”

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র কৌশিক মন্ডল মনে করেন, “ছাত্রছাত্রীদের উপর যে অত্যাচার নামিয়ে আনছে…জ্ঞানেশকুমার আজ শুধু গণতন্ত্রের উপির একটা বড় আঘাত নামিয়ে আনছে তাই নয়, সব রকমভাবে আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। উচ্চশিক্ষার উপর চরম আঘাত আনা হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ক্ষেত্রেও একটা অবৈজ্ঞানিক সিস্টেম চালু করেছে। এই কারণেই গোটা দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে।

 

দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনে প্রবল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন দেখে ভয় তো একেবারেই পাচ্ছি না, বরং মনে করছি বাঁধন যত শক্ত হবে, সে বাঁধন তত তাড়াতাড়ি টুটে যাবে। আমরা এই আন্দোলনকে আরো দীর্ঘতর, আরো শক্তিশালী করার জন্য আমরা লাগাতার চালিয়ে যাব। আমি বাঁকুড়া থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, এবং এখানে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে তা হরণ করার প্রক্রিয়া হিসাবেই তার উপরেও আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে।” 

 

কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজ-এ ভূতত্ত্ববিদ্যার স্নাতক স্তরের চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্রী পূর্ব মেদিনীপুরের মণীষা প্রধান স্পষ্টই জানালেন, “শুধু আজকে নয়, আমরা ইতিহাসের ধারাপথে এটা দেখে এসেছি যে, রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে কোনো আন্দোলন করলে রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাঁদের উপর এক বর্বরোচিত আক্রমণ নামিয়ে আনে। বিভিন্ন বাম সংগঠনের মহিলা কমরেডরা তাঁদের জান-প্রাণ দিয়ে এই লড়াইটা শেষ তক লড়ছেন। তাঁদের উপর যে ধরনের আক্রমণ পুলিসের তরফ থেকে করা হচ্ছে তা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা দমে যাইনি। বরং দেশ জুড়ে এই আন্দোলন আরোও বেড়ে চলেছে। জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনের অবৈধভাবে ১৩ কোটি নাগরিকের নাগরিকত্ব বকলমে হরণ করা এসআইআর-এর মাধ্যমে – তার আমরা তীব্র বিরোধীতা করছি, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চাইছি। বৈধ নাগরিকদের নাগরিকত্ব হরণ করার যে চক্রান্ত তার জন্য আমরা এস আই আর-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি করছি।

বাঁ দিক থেকে প্রথম মণীষা প্রধান

বিজেপি-আরএসএস-এর যে আদর্শ তা একেবারেই মনুবাদের আদর্শ, এবং তারা পিতৃতন্ত্রকেই একমাত্র বলে মনে করে যেখানে তারা মহিলাদের ভোগ্যপণ্যবস্তু হিসাবে দেখে। মহিলাদের তারা মানুষ বলে মনে করে না। তাদের কাজকর্মে তাই যে এটাই প্রতিফলিত হবে তা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তাদের আক্রমণ, তাদের ভাষা প্রয়োগে এটাই বারংবার ফুটে উঠছে যে তারা মহিলাদের গায়ে হাত দেওয়া থেকে তাদের উপর নৃশংস আক্রমণ করছে। এটা বিজেপির আদর্শের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাম মহিলা কমরেডরা এদের মোকাবিলা করার সাহস রাখেন।

 

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভয় পাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই নেই। বাংলার সংগ্রামী বামপন্থী চেতনার সমস্ত মানুষ, তাঁরা সরকার ও রাষ্ট্রের চোখ রাঙানিকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।”

 

দশম শ্রেণীর পড়ুয়া সুমি, নিজেকে আরশোলা বলতে আপত্তি নেই, তবে তারচেয়েও বেশি উৎসাহী নিজেকে চরম বামপন্থী হিসাবে পরিচয় দিতে। “পশ্চিমবঙ্গের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, খুবই হতাশাজনক। কারণ দেশের বাকি শহরগুলোতে যেখানে সবাই বিজেপিকে তাড়াতে চাইছে সেখানে এ বছর এখানে বিজেপিকে জিতিয়ে দিল! এটা হতাশাজনক শুধু নয়, খুবই লজ্জাজনক।

বিজেপি-আরএসএস হিন্দুত্ব মানে। তারা উগ্র পিতৃতান্ত্রিক। তাই আন্দোলনকারী মেয়েদের সঙ্গে এমনটা হবে এটা জানা কথাই ছিল। দেখবেন উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই মূলত বিজেপিকে সমর্থন করে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়, এখনো পর্যন্ত। ভবিষ্যতে তাদের উপরেও প্রভাব পড়বে, কিন্তু এখন পড়ছে না, তাই তারা সমর্থন করছে।

 

পুলিসরা আসলে নিজেদের কাজের সুবিধা লুটছে। সরকার তো তাদের বিরূদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। পুরুষ পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের যেভাবে হেনস্থা করছে, তারপরেও তাদের কিচ্ছু বলা হচ্ছে না, তাই তারা এটা চালিয়ে যাচ্ছে। ওদের (পুলিস) মধ্যে কোনো ভয় নেই, কোনো ভয় নেই।

 

সবকিছু দেখে রাগ হচ্ছে, আর সেটাই স্বাভাবিক। নাহ, ভয় পাচ্ছি না। কারণ কতজন মানুষকে আটকাবে? আমরা যখন একসঙ্গে আসব, ওরা কিচ্ছু করতে পারবে না। ব্যস শুধু রাস্তায় নামার সময়টুকুর অপেক্ষা।

 

আমার কথা হল, এই সরকারকেই ফেলে দাও। কারণ এই সরকারটাই ঠিক নয়। আমাদের সকলের একজন ঠিকঠাক প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন। জ্ঞানেশ কুমারকে সরালে যেটা হবে দায়বদ্ধতা স্বীকারের একটা ‘ট্রেন্ড’ চালু হবে। কেউ যখন কিছু ভুল করবে আমরা ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ দাবি করব। যা প্রয়োজন। কারণ এত বছর ধরে যে যা করেছে আমরা অ্যাকাউন্টিবিলিটি চাইনি। তারা ভুল করেও পার পেয়ে গেছে। সবাই বলে জেন-জি ট্রেন্ড ফলো করে। তাহলে যদি অ্যাকাউন্টিবিলিটি নেওয়ার ট্রেন্ড চালু হয়, তাহলে তা খুব সঠিক একটা কাজ হবে।” 

  

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া অনুষ্ণার বক্তব্য, “গত প্রায় ৭২ ঘন্টা ধরে আমরা দিল্লিতে যা দেখছি, সেখানে বাস, ট্রেন থেকেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে আসছে যারা তাদের আটক করা হল। এবং যখন দিল্লিতেও আটক করা হচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে পুরুষ পুলিসরা মহিলাদের আটক করছে, অনেক ম্যানহ্যান্ডলিং হচ্ছে। রাস্তায় লোহার স্পাইক ফেলে রাখা হয়েছে, যাতে কোনো গাড়ি না ঢুকতে পারে। এইটা একটা সরকারের প্রস্তুতি। কাদের বিরূদ্ধে? ছাত্রছাত্রীদের! আমরা তো লেখাপড়া করি। আমরা তো দেশের সো কলড ভবিষ্যৎ। তাহলে আমাদের এত ভয় কেন? আমরা গত এক দেড় মাসে দেখেছি পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর কলেজে একটা গুন্ডা বাহিনী, মব ঢোকানো হচ্ছে, তারা ভাঙচুর করছে। খুব সরলভাবে বোঝা যায় তারা কেন শিক্ষার বিরূদ্ধে, কারণ, আমরা ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষিত যখন হই, তখন প্রশ্ন করতে শিখি। নানা অস্বস্তিদায়ক প্রশ্ন। তাদের প্রশ্ন পছন্দ নয় আদপেই।

বোঝা দরকার বিজেপি বা আর-এস-এস-এর কাছে মহিলার সংজ্ঞাটা কী। তারা তো আসলে মনুস্মৃতিকে ফলো করে। সেখানে, একজন মহিলা রাস্তায় বেরিয়ে এইভাবে প্রতিবাদ করছে, নিজেদের অধিকারের কথা জোর স্বরে বলছে, স্বাভাবিক সেটা রাষ্ট্রের পছন্দ হবে না। তারা সেই প্রতিবাদী মহিলা সবরকমভাবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। তাতে যদি তাঁদের টেনে-হিঁচড়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে হয়, তাই করবে তারা।

 

গত তিন দিন ধরে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যে ধরনের ট্রিট্মেন্ট-এর ভিশ্যুয়াল দেখছি, যেন আতঙ্কবাদীদের সঙ্গে করা হয় তেমন কিছু, যেন অপরাধীদের রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা যারা শিক্ষিত হচ্ছি, আমাদেরই অ্যাটাকের মুখে পড়তে হচ্ছে কারণ আমরা কিছু বেসিক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি। যে – এই সরকারের বৈধতা কোথায়? যদি লক্ষ, লক্ষ, কোটি, কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এমন একটি প্রসেস-এর থ্রু দিয়ে যে প্রসেসে সেই বডিরই লোকেদের তিন জনের মধ্যে দু’জনের সম্মতি ছিল না নানা কিছুতে, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে, আসলে গোটাটাই অবৈধ হচ্ছে। এবং সরকার যদি নিজের বৈধতা নিয়ে এতটাই কনফিডেন্ট থাকত তাহলে তো সে এত মেশিনারি নামিয়ে এত কিছু করত না। তাহলে বুঝতে হবে – দ্য ফিয়ার ইজ ভেরি রিয়্যাল।”

 

 

Share this
Leave a Comment