৯ অক্টোবর, শুক্রবার, কলকাতার এসআরএফটিআই-এ এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা। তারা জানান হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতিদের প্রতিষ্ঠান ও পড়ুয়াদের উপর হামলার দায় উপাচার্যকে নিতে হবে এবং অবিলম্বে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন
“আমরা ক্লান্ত, মানসিক চাপের মধ্যেও আছি আর চাপটা আসলে কর্তৃপক্ষের উপরে নয়, আমাদের উপরেই আছে আমাদের কোর্সটা ভালোভাবে সময়ের মধ্যে শেষ করার, আমরা সেটাই করতে চাইছি। কিন্তু ভবিষ্যতে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আমাদের জানতে হবে তা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কারণ আমরা এরজন্য কর্তৃপক্ষকেই দায়ি করব,” বলছিলেন এসআরএফটিআই-এর ছাত্র ইউনিয়ন-এর সভাপতি ব্লসম। হঠাৎ করে এই প্রতিষ্ঠানটিই কেন নিশানায়? ব্লসম-এর বক্তব্য, ২৯ সেপ্টেম্বর-এর ঘটনা না ঘটলেও কোনো না কোনো সময় এই আঘাত আসতই। “এটা ফিল্ম ইন্সটিটিউট। এখানে মুক্তচিন্তা চলে, আমরা ফিল্মমেকার্স। কখনো না কখনো এমন সিনেমা এখানে তৈরি হতই, দেখানো হতই, যা এদের অস্বস্তিতে ফেলত। ২৭ তারিখ না হয়েও অন্য যেকোনো সময়েই তা হতে পারত। আর এটা এমন একটা প্যাটার্ন, যার পুনরাবৃত্তি সারা দেশ জুড়ে হয়ে চলেছে,” বললেন তিনি।
“আমরা এবার চাই এস আরএফটিআই-এর চেয়ার পার্সন সুরেশ গোপী আমাদের সঙ্গে কথা বলুন। এই প্রতিষ্ঠানের এগজিকিউটিভ কাউন্সিল, গর্ভনিং কাউন্সিল, সোসাইটি আছে। আমরা চাইছি তাঁরা সকলে এই বিষয়ে নিজেদের মতামত দিন ও এক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা নিন। উপাচার্য আমাদের সঙ্গে কোনো রকম কথা বলতে চাইছেন না। আমরা দেখা করার সব রকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। উনি গত ৮ অক্টোবর আমাদের সঙ্গে কথা বলার শেষ সময় দিয়েও আর দেখা করেননি,” বক্তব্য এসআরএফটি আই-এর ছাত্র ইউনিয়ন-এর।
৯ অক্টোবর, শুক্রবার, কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট (এসআরএফটিআই)-এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তায়, মূল ফটকের সামনে খোলা আকাশের নীচে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন এসআরএফটিআই-এর ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা। বক্তব্য রাখেন ব্লসম, শুভম, সুদীপ, অনামিকা, পূরবী। তাঁদের মধ্যে অনামিকা গত ৪ অক্টোবর হিন্দু জাগরণ মঞ্চের এসআরএফটিআই-তে মিছিল করে এসে হিংসাত্মক আক্রমণে আহত হয়ে মাথায় চোট পান। একই সঙ্গে কেরালার এক ছাত্রও সেদিন হাতে চোট পান। তিনি নিজের বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা করাতে চান জানালে কর্তৃপক্ষ জানায় তিনি কলকাতায় থেকে চিকিৎসা করালেই তাঁর চিকিৎসার খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করবে নতুবা নয়।
এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে ইউনিয়ন-এর ছাত্ররা জানান, উপাচার্যর কাছে ৪ তারিখের ঘটনার পর তাঁরা যে দাবিগুলি রেখেছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল পড়ুয়াদের উপর ২৭ সেপ্টেম্বর মূল অডিটোরিয়ামে আরএসএস সমর্থিত অখিল ভারত গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উস্কানিমূলক বক্তব্য ও এই প্রতিষ্ঠানে নীতি বর্হিভূতভাবে রাজনৈতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানের বিরূদ্ধে পড়ুয়াদের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে তারপর থেকে বিজেপি- আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতিদের প্রতিষ্ঠান ও পড়ুয়াদের উপর হামলার দায় উপাচার্যকে নিতে হবে এবং অবিলম্বে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। কারণ ৪ অক্টোবরের মিছিলের আগাম খবর থাকায় পড়ুয়ারা উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে এমনকি মন্ত্রককে আগাম জানালেও তাঁরা কোনোও ব্যবস্থা নেননি। উপরন্তু পড়ুয়াদের শান্ত থাকতে বলা হয় ও সেই নির্দেশ মানার পরেও এক নাগাড়ে হিংসার শিকার হন তাঁরা।
৪ তারিখ উপাচার্যকে ঘেরাও করেন পড়ুয়ারা। পেশ করেন দাবিপত্র। যেখানে অন্য বেশ কিছু দাবির সঙ্গে ছিল উপাচার্যের ক্ষমা চাওয়ার কথাও। কিন্তু ৪ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত একবারও উপাচার্য পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেননি। মেনে নেননি তাঁদের দাবি মতো এফআইআর ও তারপরে চার্জশিট দাখিল করা, সাংবাদিক সম্মেলন করার কথাও। বরং এরপর তিনি পড়ুয়াদের বিরূদ্ধেই শো-কজ নোটিস জারি করেন। এমন অনেক পড়ুয়া যাঁরা সেদিন ঘেরাওতে উপস্থিত ছিলেন না, কলকাতার বাইরে ছিলেন তাঁদের কাছেও শো-কজ নোটিস যায়।
সাংবাদিক সম্মেলনে পড়ুয়ারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
- ৪ অক্টোবরের ঘেরাওয়ের সময় থেকে যা আগে কখনোও হয়নি, এসআরএফটিআই-এর এক বড় সংখ্যক কর্মী ছাত্রছাত্রীদের বিরূদ্ধে চলে গিয়ে ঘেরাও তুলে নেওয়া, শারীরিকভাবে জোর-জবরদস্তি করা, এমনকি বহু ভাষাভাষী পড়ুয়াদের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাই বলতে হবে এমন কথাও বলতে শোনা যায় তাঁদের, যা আগে কখনোই হয়নি।
- উপাচার্য শুধুই ধর্মঘট ও ক্লাস বয়কট তুলে নিয়ে ক্লাস চালু করে দিয়ে সকললে স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে এমনটি দেখাতে চাইছেন এবং তারজন্য ক্রমাগত পড়ুয়াদের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা না করে।
- পড়ুয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই, প্রতিষ্ঠানের বাইরে কাছাকাছি অঞ্চলে যে ছাত্রছাত্রীরা থাকেন, তাঁদের জন্য যে বিশেষ শাটল পরিষেবা চালু করা হয়েছিল, তা বন্ধ করে দেন এবং যুক্তি দেওয়া হয় যে পরিস্থিতি শান্ত ও নিরাপদ তাই এই পরিষেবার আর প্রয়োজন নেই।
- যাদের থাকার ব্যবস্থা নেই তাদের অবিলম্বে হোস্টেল, বা গেস্ট হাউজ বা ক্যাম্পাস-এর ভেতরে নিরাপত্তার খাতিরে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
- খুবই সাদামাটা ও দায় এড়ানো একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয় ও এফআইআর নয়, সংশ্লিষ্ট থানায় নেহাতই একটি সাধারণ অভিযোগ দায়ের করা হয়।
পড়ুয়াদের তরফে এদিন বারেবারেই বলা হয় যে, ক্লাস বয়কট করা বা ক্লাস কও৩রতে না পারায় তাঁদেরই সমস্যা, অসুবিধা সবচেয়ে বেশি। এটা শুধু সিলেবাস শেষ করার বিষয় নয়। শিল্পী হিসাবে, চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তাঁদের কাজটি ও এক্ষেত্রে তাঁদের পাঠ্যক্রমটি শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পড়ুয়াদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উপাচার্য একেবারেই ভাবিত নন ও পড়ুয়াদের সঙ্গে কোনো রকম আলাপ-আলোচনায় না যেতে চাওয়ায় এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার কোনো উপায় তাঁরাও দেখছেন না। এখন একমাত্র আশা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ।
কারা সেই কর্মীরা যাঁরা পড়ুয়াদের বিরূদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন? একে কি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গৈরিকীকরণ বলা যায় তবে? ব্লসম বলছেন, “কর্মী বলতে আমরা কয়েক জনের কথাই বলব। আমরা আশা করব হয়তো এই প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মীই পড়ুয়াদের সমর্থনেই আছেন। আর আমরা অফিসে বসা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কর্মীদের কথাই বলছি না, যাঁরা পড়ুয়াদের বিরূদ্ধে গেছেন। তাঁরা একটা বড় সংখ্যক মানুষ। যখন অত বড় একটা দল আমাদের বিরূদ্ধে দাঁড়াচ্ছে আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। উপাচার্য তাঁদের আমাদের বিরূদ্ধে উসকেছেন। আমাদের ইক্যুইপমেন্ট দাদারাও আছেন কেউ কেউ। আমরা আসলে ঠিক জানি না। হয়তো তাঁরা আদর্শগতভাবে বা নানা কারণেই পড়ুয়াদের বিরোধী ছিলেন, এখন যখন উপাচার্য আমাদের বিরূদ্ধে যেতে বলছেন, তাঁরা একটা ম্ঞ্চ পাচ্ছেন, তখন সেটাই করছেন। এটা গৈরিকীকরণ আমরা হয়তো বলব না, তবে ব্যবহারের প্যাটার্নের দিক থেকে মিল তো অবশ্যই আছে।”
“কাঁটাতার লাগিয়ে দিয়ে আর পুলিস পাহারা বসিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কয়েদখানায় পরিণত করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া যায় না। আমাদের পড়ুয়ারা ক্লাস বা শ্যুট শুরু করতে নিরাপদ বোধ করছে না। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তো সিনেমা তৈরি করানো যায় না।”
“এটি একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রে ও রাজ্যে আলাদা সরকার থেকেছে এমনটাই হয়েছে বহুবার কিন্তু ডাবল ইঞ্জিন সরকার এ রাজ্যে আসার পর থেকে এখানে যা ঘটল, ঘটছে তা ন্যক্কারজনক।”
“এখানকার স্টুডেন্টদের সিনেমা দেশ ও আর্ন্তজাতিক স্তরের সমস্ত বড় চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত হয়। তাঁরা দেশের সম্মান বৃদ্ধি করে। অথচ তাঁদের নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু করা হচ্ছে না।”
“আজ সারা দেশ জুড়ে যা চলছে, কর্তৃপক্ষের, ক্ষুমতায় যাঁরা থাকছে তাঁদের বিরূদ্ধে কথা বলতে গেলেই কন্ঠরোধ করা হচ্ছে, এখানেও তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। আমরা হয়তো এই মুহূর্তে যন্তর-মন্তর যেতে পারছি না, কিন্তু আমরা নিজেদের যন্তর-মন্তর প্রয়োজনে তৈরি করে নেব।”
উপাচার্যের প্রতি স্পষ্ট অভিযোগ, পড়ুয়াদের নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ ও নিজেদের অবস্থান থেকে অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠে দ্রুত শিক্ষাক্রমে ও সিনেমা তৈরিতে ফিরে যাওয়ার প্রেক্ষিতে এহেন বয়ানই উঠে আসে এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে।

