প্রতিবাদের অধিকার; অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ


  • October 10, 2026
  • (0 Comments)
  • 41 Views

সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আজ দেশব্যাপী এক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ভারতের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পরম্পরাই তো অহিংস গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে রাস্তার, গণ-পরিসরের দখল নিয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। কিন্তু, স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁদের ন্যূনতম অংশগ্রহণ ছিল না, ছিলেন দখলদার শক্তির অনুগ্রহভাজন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ, অহিংস আন্দোলনের ঐতিহ্য বুঝবেন না।

 

শুভজিত সিংহ

 

The right to protest is not dependent on government approval – Amnesty International

 

গান্ধির জন্ম জয়ন্তীতে (২ অক্টোবর ২০২৬), দেশের রাজধানীর কেন্দ্রস্থিত যন্তর-মন্তরে কোনও নাগরিক জমায়েত করতে দেওয়া হল না, কয়েকদিন আগেই সে তথ্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পার্লামেন্ট ষ্ট্রীট থানায় জানানো সত্ত্বেও। সে অঞ্চলে দিল্লি প্রশাসনের তরফ থেকে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (পূর্বতন সিআরপিসি ১৪৪ ধারা) জারী করে, জমায়েত নিষিদ্ধ করতে জারী করে দেওয়া হয়েছিল। ইতিপূর্বে, ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে তৈরি রাষ্ট্রের এই স্বৈরাচারী কৌশলকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছে তরুণদের এই আন্দোলন।

 

পরদিন থেকে, নাগরিক সমাজসহ প্রায় সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল ধারাবাহিকভাবে, রাস্তায় নেমেছেন। বিরোধী সাংসদরা মিছিল করে নির্বাচন কমিশন যাবেন ঘোষণা করেছিলেন, তাও বাতিল করা হয়েছে। ১০ই অক্টোবরে (২০২৬) ছাত্র-যুবদের সদ্য গঠিত ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়িত জমায়েত নিষিদ্ধ তো করা হয়েছেই, সেই সঙ্গে ট্রেন, মেট্রো, বাস বাতিল করে, দূর পাল্লার ট্রেন মধ্যপথে রুখে দিয়ে, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড করে, হাজার, হাজার সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে, সাধারণ মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে, প্রত্যেক হোটেল, অতিথিশালা, ছাত্র হস্টেল, অন্যান্য অতিথি আবাসগৃহ তল্লাশি করে, শহরের সমস্ত রেসিডেন্সিয়াল অ্যাসোসিয়েশনকে দিয়ে রাস্তায় না বেরনোর নোটিশ করিয়ে, প্রত্যেক মহল্লায় অধিবাসীদের অতি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেরনোর নিষেধাজ্ঞা জারী করে, দিল্লির নাগরিক জীবনের উপর সীমাহীন নির্যাতন নামিয়ে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে, ৯ তারিখ রাত থেকেই, ইউনিয়ন সরকারের গৃহমন্ত্রক দিল্লিতে ইন্টারনেট স্তব্ধ করে দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, প্রতিবাদ রুদ্ধ করতে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এসবই, সরকারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ মত, সমালোচনা রুদ্ধ করতে।

 

১০ তারিখ (২০২৬) দিল্লি সাক্ষী থাকল বিরুদ্ধ মত, সমালোচনা দমনের পুলিশি দুর্গের, যা ছিল স্বাধীনোত্তরকালের এক  অভূতপূর্ব নিদর্শন। কেন্দ্রস্থল থেকেও বহুদূর পর্যন্ত শহর থাকল ঘেরাটোপে বন্দী। আটক হলেন সমস্ত দলের সব ধরণের নেতা। কিন্তু তবু, শহর দেখল অনিঃশেষ জনস্রোতের ঢেউ। সে ঢেউ রোখার সাধ্য যেমন ব্রিটিশ পুলিশের হয় নি, বর্তমান জমানার বাহিনীও ব্যর্থ হল।

 

আজই (১০ অক্টোবর ২০২৬) ভারতে বিক্ষোভ ও নির্বিচার ধরপাকড়ের বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র থামিন আল-খিতানের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলেছেন, দিল্লিতে আজ অনুষ্ঠিত ব্যাপক বিক্ষোভের আগে ও চলাকালীন সময়ে বিক্ষোভকারী, আন্দোলনের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের গণহারে আটকের খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই যেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন ও তা নিশ্চিত করা হয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত করা উচিত। খেয়ালখুশিমতো বা নির্বিচারে আটককৃত সকলকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে।

 

বিকেলে (১০ অক্টোবর) অন্যতম বিজেপি নেতা, রবিশঙ্কর প্রসাদ সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বললেন বিক্ষোভকারীরা দেশে নাকি, বৈদেশিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টি করছেন। রবিশঙ্কর বলেন “তাঁরা বার বার বলছেন আমাদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে—যা সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারার ২ নম্বর উপধারায় বিধৃত। তবে, যদি আপনি দেশের নিরাপত্তা বা ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে আপনার সেই অধিকার সীমিত বা সংকুচিত করা হবে। (বার বার কহা রহে হ্যায় সংবিধান, সংবিধান; হামে রাইট টু প্রোটেস্ট হ্যাঁয়, সংবিধান কী ধারা ১৯ কী ক্লজ ২ মে প্রাবধান হ্যায়, কী, অগর আপ দেশ কী সুরকসা, হারমোনি ইত্যাদিওঁ কা বিরোধ করতে হ্যাঁয় তো আপকো উহ্ অধিকার কো নিয়ন্ত্রিত্, সীমিত্ কিয়া জায়গা….)।” যদিও সে অভিযোগের স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দেন নি, যা কোনও দিনই তাঁরা দেন না। তাঁর বক্তব্য কী পুরোপুরি সঠিক?

 

ভারতের সংবিধানের পাতা উল্টোলেই দেখতে পাওয়া যাবে, অনুচ্ছেদ ১৯(১) (ক) এবং (খ) অনুযায়ী মতপ্রকাশের অধিকার, নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে, এ ক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ক্ষমতা আছে। সংবিধানেরই ১৯(৩) অনুচ্ছেদে, সরকারকে শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করার এক্তিয়ার দেওয়া হয়েছে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে– দেশের সার্বভৌমত্ত্ব, সুরক্ষার প্রশ্নে এবং জন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। তবে, সেই আরোপ করা বিধি-নিষেধ অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে (Reasonable restriction)।

 

কোনও জন-পরিসরে পূর্ব নির্ধারিত একটি শান্তিপূর্ণ, নিরস্ত্র, অহিংস প্রতিবাদী জমায়েতের বিরুদ্ধে কী করে জন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের সম্ভাবনার বা দেশের সার্বভৌমত্ত্ব ক্ষুন্ন হওয়ার ও সুরক্ষার আশঙ্কার অজুহাত দেওয়া যেতে পারে? জন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে প্রস্তাবিত জমায়েত বা বিক্ষোভ প্রদর্শনের উপর প্রশাসন কিছু শর্ত চাপাতে পারে, কিন্তু কখনই সর্বাত্মক বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে না। অথচ, বর্তমান জমানায় জন-শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে সরকার বিরোধী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে নিয়মিতভাবে দমন করতে, ১৬৩ ধারার মতো নিষেধাজ্ঞা-মূলক সাময়িক জরুরি ক্ষমতাকে প্রায় তামাশার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে আধিকারিক এই নির্দেশনামা জারী করলেন এই আদেশ, তিনি কী যুক্তি ব্যবহার করলেন এর পিছনে, তা চিরকালই থাকে অন্ধকারে। সরকার এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী, বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন। শুধুমাত্র নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার ইচ্ছে থাকার কারণে মানুষকে আটক করা স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের উপর, সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের উপর এক চরম আঘাত। বিধি-নিষেধ অবশ্যই আইনানুগ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; এটি কোনোভাবেই খেয়ালখুশিমতো বা বৈষম্যমূলক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে না। সে কথা ভারতের শীর্ষ আদালত বার বার বলেছে।

 

২০১৮ সালে মজদুর কিষান শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার ও অন্যান্য [2018 INSC 635] মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল, জনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই অধিকার ‘যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের’ অধীন। রায়ে কর্তৃপক্ষকে এমন নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারে, যা বিক্ষোভকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে বরং তা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং একইসাথে বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা, উভয় পক্ষেরই যাতে ন্যূনতম অসুবিধা হয়, তা নিশ্চিত করবে। রায়টি মৌলিক অধিকার ও জনশৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে কাজ করে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আদালত নির্বিচার নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে যৌক্তিক ও আনুপাতিক বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। এই রায়টি কেবল নাগরিকদের ভিন্নমত পোষণ ও প্রতিবাদের অধিকারকেই সুদৃঢ় করে না, বরং এটিও নিশ্চিত করে যে গণতন্ত্রের এই চর্চা যেন অন্য নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপনের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে। ভবিষ্যতে, এই নজিরটি কর্তৃপক্ষ ও বিচার বিভাগ উভয়কেই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে দিক-নির্দেশনা দেবে, যেখানে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও জনশৃঙ্খলা একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, জন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে স্বীকার করার পাশাপাশি মৌলিক অধিকার সুরক্ষার গুরুত্বকেও সুদৃঢ় করে এই রায়। ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে, শাসকের খেয়ালখুশিমতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ রোধ করে এবং প্রতিবাদের অধিকার ও জনশৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে, নাগরিকদের অযৌক্তিক বিধিনিষেধের ভয় ছাড়াই প্রতিবাদের অধিকার চর্চার সুযোগ করে দেয়, একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সহায়তা করে এই যুগান্তকারী রায়টি।

 

২০১৬ সালে অনিতা ঠাকুর বনাম জম্মু-কাশ্মীর সরকার [WP (Cri.) No.118/2007] মামলার রায়ে শীর্ষ আদালত ‘সমাবেশের অধিকার’-এর বিষয়টি একটি জোরালো এবং দৃঢ় মন্তব্যে বলেছিল: ‘লবণ সত্যাগ্রহ’, ‘আমরণ অনশন’ এবং ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’-র এই ভূমিতে নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মিছিল কোনোভাবেই আইনত নিষিদ্ধ বা অগ্রহণযোগ্য বিষয় নয় (no jural anathema)। এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, গণতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকা। ভারতের রাজনৈতিক জীবনের একটি লালিত ও মূল্যবান দিক হলো প্রত্যক্ষ কর্মসূচি বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে জনগণের ক্ষোভ, অভাব-অভিযোগ প্রকাশের ঐতিহ্য। সুসংগঠিত ও অহিংস প্রতিবাদী মিছিল ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার; আর বর্তমানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানের আওতায় একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।

 

গুরুতর পুলিশি অতি সক্রিয়তার ক্ষেত্রে, একদা দেশের উচ্চতম আদালত স্বতঃপ্রনোদিত মামলা করত। ২০১১ সালে রামলীলা ময়দানে, বাবা রামদেবের গণ-জমায়েতে, গভীর রাতে, পুলিশ সমাবেশকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, জমায়েতের ঘুমন্ত মানুষের উপর জলকামান প্রয়োগ করে। শীর্ষ আদালত তার স্বতঃপ্রনোদিত মামলার [2012 AIR SCW 3660] রায়ে বলে, সিআরপিসি (CrPC)-র ১৪৪ ধারার (বর্তমানে বিএনএসএস (BNSS)-এর ১৬৩ ধারা) অধীনে আদেশ জারির ক্ষেত্রে ‘বিপদ বা হুমকির আশঙ্কা’ (threat perception) বিবেচনা করে ‘বিবেচনাপ্রসূত ক্ষমতা’ (discretion) প্রয়োগ করা হয়। বিপদের আশঙ্কা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, সম্ভাব্য বিপদটি আসন্ন হতে হবে এবং লিপিবদ্ধ তথ্যাদি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নিশ্চয়তা থাকতে হবে, ক্ষমতার আত্মপক্ষ-কেন্দ্রিক (subjective) ও খেয়ালখুশিমতো (arbitrary) প্রয়োগের ফলে কখনই সেটি যাতে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে বিষয়টিতে বস্তুনিষ্ঠ বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। আদেশটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং মামলার বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের উপর ভিত্তি করে তা প্রণয়ন করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে, কাঙ্ক্ষিত বা অভিপ্রেত সন্তুষ্টির বিষয়টি লিপিবদ্ধকারী কর্মকর্তার ধারণাটি অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত, ন্যূনতম হস্তক্ষেপমূলক এবং সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে হবে (to be reasonable, least invasive and bona fide)। আরোপিত বিধিনিষেধটি যুক্তিসঙ্গত এবং একইসাথে ন্যূনতম মাত্রার হতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকের উপর অর্পিত সবচেয়ে গুরুদায়িত্বটি হলো, জনশান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার যে আশঙ্কার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, তা যেন বাস্তব হয়; নিছক কোনো সংশয়, কল্পনাপ্রসূত ধারণা বা কেবলই একটি সম্ভাব্য বিষয় না হয়।

 

বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এবং সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে জমায়েতের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ভারতের সংবিধান সভায় (২ ডিসেম্বর ১৯৪৮) তীব্র সমালোচনা করেছিলেন একাধিক সদস্য।

 

সর্দার ভোপিন্দর সিং বলেছিলেন, আমি বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নাগরিক স্বাধীনতার প্রাণস্বরূপ এবং একটি মৌলিক অধিকার বলে মনে করি। সাধারণ জনগণ এবং বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার ও বাক-স্বাধীনতার ওপর আমি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করি। এগুলোর মাধ্যমেই আমরা সরকারের কাছে আমাদের দাবি বা বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারি এবং আমাদের প্রতি হতে পারে এমন অবিচার রোধ করতে পারি। এই অধিকারগুলো অর্জনের জন্য দেশকে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং এক কঠিন লড়াইয়ের পর আমরা এগুলোর স্বীকৃতি আদায়ে সফল হয়েছি। কিন্তু এখন, যখন এগুলো কার্যকর করার সময় এসেছে, তখন সরকার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; যা একসময় অবাঞ্ছিত বলে মনে করা হতো, এখন তাকেই বাঞ্ছিত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এক হাতে যা দেওয়া হচ্ছে, অন্য হাতে তা-ই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ধারাকে অসংখ্য শর্ত ও বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ করা হচ্ছে। ….(স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরে) পরিস্থিতি পরিবর্তনের পরেও বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করা আসলে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে উপহাস করার শামিল। শুরু থেকেই আমরা বিদ্যমান আইনগুলোর বিরোধিতা করে এসেছি, কিন্তু এখন আপনারা সেগুলোই আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। এই অধিকারগুলো অর্জনের জন্য দেশকে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং এক কঠিন লড়াইয়ের পরেই আমরা এই অধিকারগুলোর স্বীকৃতি আদায়ে সফল হয়েছি।

 

শেঠ গোবিন্দদাস বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক নয়, এমন সব বিরোধী মত ও কার্যক্রমের পূর্ণ সুযোগ থাকা উচিত, কারণ যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অপরিহার্য অংশ হলো বিরোধী পক্ষ। আমার মতে, বৈধ ও শান্তিপূর্ণ বিরোধী মতকে দমন করার অর্থ হলো ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়া। … আমি একমত যে, কেবল অস্ত্রবিহীনভাবেই আমাদের এভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার থাকা উচিত। আমরা অহিংসার নীতি গ্রহণ করেছিলাম এবং তার মাধ্যমেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। … আমাদের সমবেত হওয়ার অধিকার থাকা উচিত, তবে তা হতে হবে নিরস্ত্র অবস্থায়।

 

এমন কী, আর এক সদস্য জয়পাল সিং তো বলেছিলেন, কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্র নিয়েও সমবেত হওয়া যেতে পারে, বিশেষত, অস্ত্র বহন যাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মাচারণের অঙ্গ। যেমন বহু আদিবাসী সমাজে তীর-ধনুক, লাঠি বা সড়কিসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জমায়েত হয়ে থাকে আবার, শিখ ধর্মের মানুষদের কৃপাণ বহন করা অবশ্য কর্তব্য।

 

আমরা যদি আন্তর্জাতিক আইনসমূহ, জাতিসঙ্ঘের সনদ, চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষিত করা হয়েছে এবং ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’ (UDHR)-এর ২০ নম্বর অনুচ্ছেদ, ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি’ (ICCPR)-এর ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ আওতায় একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকার ‘জন-শৃঙ্খলা’, ‘জন-নিরাপত্তা’ বা সহিংসতার সাধারণ ঝুঁকির অস্পষ্ট অজুহাতে প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করতে পারে না। যে কোনো বিধিনিষেধকে অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার কঠোর আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হয়রানি, নির্বিচারে আটক বা আহত করার পরিবর্তে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোভিড অতিমারি পর্বে, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিটি ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া ও সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার ডিজিটাল কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য (General comment No.37 (2020) on the right of peaceful assembly, Doc. CCPR/C/GC/37]।

 

কিন্তু বেদনাদায়ক বিষয় হল, প্রতিবাদকে দমন করতে, শুধু জীবনকে প্রবল হয়রানিই শুধু নয়, ব্যাপক ধরপাকড়, লাঠিপেটা, গণ-পরিবহণ বন্ধ, এমন কী ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে– এ সব কিছুই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন যা জন-জীবনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীরা সংগঠিত হওয়া, যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান এবং ঘটনার নথিবদ্ধকরণের কাজে এটি ব্যবহার করে থাকেন।

 

সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আজ দেশব্যাপী এক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ভারতের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পরম্পরাই তো অহিংস গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে রাস্তার, গণ-পরিসরের দখল নিয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। মহাত্মার আহ্বানে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে দেশের অজস্র সাধারণ মানুষ পথে নেমেছিল। কিন্তু, স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁদের ন্যূনতম অংশগ্রহণ ছিল না, ছিলেন দখলদার শক্তির অনুগ্রহভাজন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ, অহিংস আন্দোলনের ঐতিহ্য বুঝবেন না।

 

পুনায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর (২০২৬), সিটিজেন্স ফর ডেমোক্রেসির সভায়, প্রাক্তন বিচারপতি এ. পি. শাহ এক বক্তৃতায় স্বাধীনতা আন্দোলনের স্পর্ধিত চেতনার ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতির দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যা করে বলেন, আমাদের ব্যালট বা ভোটের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করা প্রয়োজন। প্রকৃত গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জনগণের নিরন্তর সজাগ দৃষ্টি। বিশেষ করে তখন এটি আরও জরুরি হয়ে পড়ে, যখন দেখা যায় আদালত, সংবাদমাধ্যম বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার মতো আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব হয়ে পড়েছে অথবা ক্ষমতার অপকর্মে সহযোগী হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজপথই হয়ে ওঠে সেই স্থান, যেখানে সাংবিধানিক চেতনার মিলন ঘটে। বিশেষ করে ভিন্নমত বা প্রতিবাদ হয়ে ওঠে সেই অক্সিজেন, যা একটি জাতিকে শ্বাস নিতে সাহায্য করে। রাজপথে নেমে আসাটা কেবল অনুগত প্রজা হওয়ার বিপরীতে এক সাহসী নাগরিক হওয়ারই প্রতীক। ঐতিহাসিক নজির।

 

Share this
Leave a Comment