যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়-রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই পশ্চিমবাংলার ব্যাপক মানুষের লড়াই হয়ে ওঠে না। থেকে যায় মুষ্টিমেয় কিছু বিশিষ্ট জনের লড়াই। বড়োজোর কিছু পার্টি ক্যাডারদের লড়াই।
সন্দীপা বর্মণ
১.
গত ১৮ই আগস্ট রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের আক্রমণ প্রসঙ্গে ব্যারাকপুরের বিজেপি বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী এবিপি আনন্দর ক্যামেরার সামনে সরাসরি ঘোষণা করলেন যে কেউ “দেশবিরোধী” ছাত্রদের বাংলা ধোলাই দিলে উনি পুরস্কৃত করবেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষণা করলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং তার সাথে সাথে “টুকরে টুকরে গ্যাং”, “জেহাদি”, “কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদী” র যে বাতাবরণ, সেখানে “মুখ সেলাই” করার দায়িত্ব তাঁদের। অবশ্য, এর আগেই, যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় আহ্বান করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে “তান্ডব”-এর। দিলীপ ঘোষ হুমকি দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর “সার্জিকাল স্ট্রাইক” করার। এর অব্যবহিত পরেই এলো মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণা যে ড্রোন তাক করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নজরদারি রাখা হবে। এই ড্রোনে নজরদারি দিয়েই নাকি নেশামুক্ত হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। অবশ্য সাথে সাথে শ্রী অধিকারী যুদ্ধঘোষণা করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দেওয়াল লিখনের বিরুদ্ধেও। সেইসব “নিষিদ্ধ” দেওয়াল-লিখনের তালিকায় আছে, “ফ্রী ফ্রী প্যালেস্টাইন,” আছে “আজাদ কাশ্মীর।”
এই সবকটি বয়ানের ভেতরেই একটা মিল আছে। তা হলো, কোনো গণতান্ত্রিক নিয়মাবলী মেনে এইসব কথা উচ্চারিত হয়নি। এই মন্ত্রী-বিধায়কদের কোনো বয়ানের ভেতরেই কোনো রাজনৈতিক বিনিময় গড়ে তোলার কোনো আহ্বান বা প্রচেষ্টা নেই। প্রচেষ্টা নেই গণতান্ত্রিক উপায়ে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীবৃন্দ বা ছাত্র সংগঠনগুলির সাথে কোনো কথোপকথন গড়ে তোলার। যদিও, জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেই দায়িত্বই ছিল এঁদের সবার। এই নির্লজ্জ গুন্ডামির ভাষা এই রাজ্য সম্ভবত সাম্প্রতিক সময়ে কখনো দেখেনি। যদিও, মোটামুটি পাঁচ দশকে — কি বামফ্রন্ট কি তৃণমূল জমানায় — শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটেছে একের পর এক অনাচার, সংকোচন, গণতন্ত্রহরণ, রাষ্ট্রীয়-দলীয় নির্দেশে হিংসা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে, সেখানকার কিছু বিশেষত্ব মেনে, বিষয়টি ছিল আরেকটুই জটিল। হ্যাঁ, একথা অনস্বীকার্য যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নেমেছে একের পর এক দলীয়-রাষ্ট্রীয় আক্রমণ। আক্রমণ হয়েছে বামফ্রন্ট জমানায়, আক্রমণ নেমেছে তৃণমূল জমানায়। সেইসমস্ত ক্ষেত্রে, আক্রমণ কখনো প্রকাশ্য, উদযাপিত, রাষ্ট্রীয় বৈধতাপ্রাপ্ত কর্মসূচির চেহারা নেয়নি।
সেদিক থেকে বিজেপির এই অবস্থান অনন্য। এবং, এই অবস্থানকে কোনো একজন নেতা বা মন্ত্রীর “বিচ্যুতি” বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই যে অনন্যতা, সেই অনন্যতাই বিজেপিকে করে তোলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির থেকে আলাদা। এবং, একথা ভাবলে ভুল হবে যে বিজেপির মন্ত্রী-বিধায়করা এই কথাগুলি বলেছেন তাঁদের ভিতরকার শিক্ষাদীক্ষা, ভদ্রবিত্তজনিত মার্জিত রুচির অভাব থেকে। বরং এই যে তথাকথিত “অমার্জিত”, মারমুখী বয়ানের স্ফুরণ, তাকে দেখতে হবে বিজেপির সচেতন রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবেই। এক্ষেত্রে, বিজেপির স্বাতন্ত্র্য গণতন্ত্রের নিয়ম লঙ্ঘনে নয়, বরং লাগাতার সেই লঙ্ঘন উদযাপনে।
এবং, সেই সচেতন রাজনীতির নামই ফ্যাসিবাদ। এবং, এই যে পর্যায়ক্রমে বিজেপি নেতানেত্রীদের মারমূখী বয়ান, তার ভিতর দিয়ে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করা হয়েছে একজাতীয় ফ্যাসিবাদী দৃশ্যমানতার। বা, ইংরেজিতে বললে, ফ্যাসিস্ট স্পেকটাকেলের। ক্রমান্বয়ে বিধায়ক-মন্ত্রীদের এই জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বহির্ভূত বিবৃতি, সমাজের বুকে ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে বৈধতা দেয়, ফ্যাসিস্ট রাজনীতির স্বপক্ষে সম্মতি গড়ে তোলে। কাজেই, এই সব মারমূখী বিবৃতির আছে একধরনের গভীর মতাদর্শগত কার্যকারিতা।
স্পষ্ট করে বললে, এটাই বিজেপির রাজনৈতিক প্রকল্প। এবং নির্বাচনপরবর্তী বাংলায় সেই প্রকল্পতেই তাঁরা হাত দিয়েছেন অতন্ত্য সক্রিয়ভাবে। অবশ্য সাথে সাথে একথাও সত্য যে পশ্চিমবাংলায় প্রথমবারের মতন ক্ষমতায় আসা গৈরিক বাহিনীর কাছে গোটা রাজনৈতিক বয়ানটি ঠিক করায়ত্ত নেই। তাই একদিকে যেমন শর্বরী মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর আগ্রাসী বক্তব্য, অন্যদিকে শমীক ভট্টাচার্য বা স্বপন দাশগুপ্তের তুলনামূলকভাবে ম্রিয়মাণ বয়ান, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই একভাবে জনসমক্ষে মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা হাতে নেয়। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শ্রী ভট্টাচার্য তো অস্বীকারই করে ফেললেন বিজেপির সাথে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা এবিভিপি- র কোনো আন্তঃসম্পর্কের কথা। রাসবিহারীর বিধায়ক শ্রী দাশগুপ্ত যে স্বরে কথা বললেন, তাতে ঠিক বোধগম্য হলো না যে তিনি কার কথা বলছেন, কারাই বা এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়, কারাই বা বিপক্ষে। সাধারণভাবে হাসির উদ্রেক ঘটালেও হতে পারে এই সবই বৃহত্তর রাজনৈতিক নীলছকের পরিকল্পনা।
কিন্তু এর পরেও যেটা লক্ষ্যণীয়, তা হলো, শ্রী ভট্টাচার্য কয়েকটি কথা বললেন, যা নিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে খিল্লির পরিবেশে তেমন আলোচনা হলো না। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের ভেতরে কোনো (ছাত্র) রাজনীতি থাকবে না। দুই, “টুকরে টুকরে গ্যাং” কে “টুকরো টুকরো” করে ফেলতে বর্তমান রাজ্য সরকার বড়ো একটা দ্বিধা করবে না। এবং, এভাবেই যোগসূত্র তৈরি হলো, বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের মারমুখী অবস্থান ও পরিশীলিত ভদ্রজনোচিত অবস্থানের ভেতরে।
প্রসঙ্গত, বাংলা ভাষা ও রাজনীতিতে খুব সম্প্রতি একটি শব্দ জায়গা পেয়েছে। শব্দটি হলো “রাষ্ট্রবাদ।” হিন্দিতে যে শব্দটিকে বহুক্ষেত্রে “জাতীয়তাবাদ” শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদিও এই শব্দদুটির ভিতরকার জটিল অন্তর্দ্বন্দ্ব এই প্রতিবেদনের স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়, আজকের সময়ে সেই আলোচনা জরুরি। জরুরি এই কথা মনে রাখা যে “জাতীয়তাবাদ” শব্দটির ভেতরে সম্ভাবনা নিহিত আছে “জাতি” বিষয়টিকে জটিলভাবে ব্যাখ্যা করার, প্রয়োজনে সেই ব্যাখ্যাকে পরিবর্তিত করার। “জাতি” এবং “রাষ্ট্র” সেখানে সমার্থক নয়। কিন্তু “রাষ্ট্রবাদ” শব্দটির ভেতরে তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। “রাষ্ট্র” ব্যতীত সেখানে অন্যধারার জীবন, জাতি, সংস্কৃতিরও কোনো অস্তিত্ব নেই। সেই পরিপ্রেক্ষিতে, “রাষ্ট্রবাদ” শব্দটি মূলগতভাবে একটি ফ্যাসিস্ট রাজনীতির ধারকবাহক, যেখানে রাষ্ট্র সবসময়েই হাজির। হাজির তার গণতান্ত্রিক, কল্যাণকারী রূপে নয়, হাজির সর্বতোভাবে তার নিপীড়নকারী মুখ নিয়ে। কাজেই, “রাষ্ট্রবাদ” শব্দটির বারংবার ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বাংলায় একভাবে জমি তৈরি হচ্ছে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির, যার ফল সুদূরপ্রসারী। এই রাষ্ট্রবাদের হাত ধরেই বুঝতে হবে শুভেন্দু অধিকারীর ড্রোন ব্যবহারের আস্ফালন। খেয়াল করুন, এই ড্রোন ব্যবহারের কথার ভিতর দিয়ে — তা সাধারণভাবে যতই হাস্যকর হোক না কেন — বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে একরকমের তীব্র সামরিকীকরণ কথাই বলেছেন শ্রী অধিকারী। যে সামরিকীকরণ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অঙ্গাঙ্গি অংশ। এবং, যার স্বাদ পশ্চিমবঙ্গবাসী নির্বাচন প্রাক্কালেই পেতে শুরু করেছেন।
সাথে সাথে যেটা পরিলক্ষণীয় তা হলো, বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির হাত ধরে এলো একধরনের আগ্রাসী বিষাক্ত পৌরুষের রাজনীতি। যাদবপুরের ক্ষেত্রেও সেই বিষাক্ত পৌরুষের বিষয়টি অক্ষত রইল। বরং তৈরি হলো পুরুষতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী রাজনীতির একটি নতুন অক্ষ। এই লিঙ্গ মতাদর্শের দিকটি অনুধাবন না করতে পারলে যাদবপুরকে কেন্দ্র করে যে ফ্যাসিবাদী দৃশ্যমানতা বা স্পেকটাকেলের সৃষ্টি, তার গোটা অর্থটি পুরোপুরি স্পষ্ট হবে না।
২.
বাম রাজনৈতিক প্রচার সাধারণভাবে দাঁড়িয়ে থাকে একটি পদ্ধতির ওপর — রাষ্ট্র সহ সমাজের যে মূল মূল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, তাদের হিংসার রাজনীতিকে আরও আরো বেশি করে ‘সাধারণ জনগণ’-এর কাছে উন্মোচন করায়। প্রথাগতভাবে, অধিকার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসরও দাঁড়িয়েছে এই হিংসা উন্মোচনের নীতির ওপরেই। বলা যেতে পারে, একধরনের ট্রমা রাজনীতি, ভিক্টিমহুডের রাজনীতিই বাম-উদারনৈতিক রূপায়ণের মূল স্তম্ভ। পাতি বাংলায় বললে, নির্যাতিত ও নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার রাজনীতি। যে রাজনীতির অপর আর একটি দিকই হয়তো প্রতিরোধের রূপায়ণ। তো, এই নির্যাতন রূপায়ণের চর্চা ও পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়েই ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি যত্নসহকারে জোগাড় করেছেন মুসলিম, দলিত সহ সংখ্যালঘুদের উপর হিংসা ও নিপীড়নের সাক্ষ্য, সেগুলিকে নথিবদ্ধ করেছেন বিভিন্ন উপায়ে, মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। ঠিক যেমনভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া আক্রমণের পরের দিন থেকেই সামাজিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে গৈরিকবাহিনীর আক্রমণের বিশদ খতিয়ান, বারবার আলোচনা করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের নন্দলাল বসু কৃত প্রতীক ভাঙার বিবরণ।
কিন্তু, যে পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় শক্তি সরাসরি নিপীড়ন ও হিংসার রাজনীতিকেই বৈধতা দেয়, এবং বৈধতা দেয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ভেতর দিয়েই, সেখানে এই রূপায়ণ পদ্ধতি কেন্দ্রীয় রণকৌশল হিসেবে যথেষ্ট নয়। এখানে লড়াইটি স্পষ্ট আকারেই দুটি মতাদর্শের লড়াই। যে যে মাত্রায় ফ্যাসিবাদ তার রাজনৈতিক চিন্তাকে স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে ব্যক্ত করে, সমাজের একটি ব্যাপক অংশের মানুষকে সংগঠিত করে নিজেদের মতাদর্শের স্বপক্ষে, সেখানে এই নির্যাতনের দিনলিপি লেখার রাজনীতি সাধারণ মানুষের কাছে কোনো বাড়তি মাত্রা যোগ করে না। কারণ, ফ্যাসিবাদী যে সামাজিক-রাজনৈতিক শিক্ষণপ্রক্রিয়া, তা মানুষকে চালিত করে নির্যাতনের ভেতর পুলক, আনন্দ, ক্ষমতায়ন খুঁজে পেতে। চালিত করে নির্যাতনের স্বপক্ষে জয়গান গাইতে। বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠীকে — তা হতে পারে মুসলমান, দলিত কিংবা বামপন্থী — চিহ্নিত করে তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে, সেই আক্রমণ করা ও প্রত্যক্ষ্য করার ভেতরে একধরনের পর্নোগ্রাফি পড়ার আনন্দ বা দেখার উত্তেজনা পেতে। যদিও, এইজাতীয় রূপায়ণ পদ্ধতির ভিতর দিয়ে ভুক্তভোগীর স্বীকৃতির যে প্রশ্ন আছে, নির্যাতনের স্মৃতি ধরে রাখার যে প্রশ্ন আছে, তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এবং, সেই কাজগুলি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চালিয়ে যাওয়াটাই বাঞ্চনীয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলি যদি তাদের মতাদর্শগত আখ্যান মানুষের সামনে খুব জোরালোভাবে হাজির না করে, শুধুই চিরাচরিত নির্যাতনের রূপায়ণের ভেতর দিয়ে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি রোখা সম্ভব নয়। এও মনে রাখতে হবে যে ফ্যাসিবাদ মানুষের সামনে রাখে, রেখেছে একটি বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনা। অর্থাৎ, এই কল্পনার পেছনে আছে একটি তাত্ত্বিক শ্রম, কল্পনাকে সমাজে স্থান দেওয়ার প্রচেষ্টায় আছে শৈল্পিক শ্রম ও তাত্ত্বিক শ্রম দুটোই। বুঝতে হবে যে “হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি” একটি ফ্যাসিবাদী তাত্ত্বিক শ্রমের ক্ষেত্র। এই যে সমাজমাধ্যম জুড়ে হাজার হাজার গৈরিকায়িত রূপায়ণ, আই.টি.সেল ইত্যাদি, তার সবটাই ফ্যাসিবাদী শক্তির মিলিত তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক শ্রমের ফসল।
এই প্রসঙ্গে তাই বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য এই বিষয়টি যে একধরনের ভদ্রজনোচিত মুখোশের আড়ালে কথা বললেও, সেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির হাত ধরেই, শ্রী ভট্টাচার্যের ঘোষণা যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন হবে রাজনীতি মুক্ত। যদিও একথা সত্য যে এর পাশাপাশি আছে শ্রী অধিকারীর ঘোষণাও যে পশ্চিমবঙ্গের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে করতে হবে আশু ইউনিয়ন নির্বাচন এবং সেইসব নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই রাজ্যের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়বে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের পতাকা, তৎসত্ত্বেও, একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে এই সমস্ত বক্তব্যের ভিতরেই আছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রকে ঢেলে সাজানোর কল্পনা। যে কল্পনা সমাজের বুকে বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনকে ঘিরে যে মূলস্রোতীয় ভাবনা, তার থেকে খুব বেশি দূরে নয়। উদারনৈতিক চিন্তাধারার একটি অংশ সর্বসময়েই শিক্ষাক্ষেত্রকে দেখেছে মূলত পঠনপাঠন, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে। যে জ্ঞানচর্চার সাথে থাকবে না রাজনীতির কোনো সম্পর্ক। সেই মতামতের স্কন্ধে দাঁড়িয়ে নয়া – উদারনীতিবাদ শিক্ষাক্ষেত্রকে দেখেছে মূলত একটি অর্থনৈতিক-ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবে, যেখানে ছাত্ররা মূলগতভাবে ভবিষত্যের শ্রমশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির প্রশিক্ষক মাত্র। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই NEP জাতীয় প্রকল্পে বারংবার জোর দেওয়া হয়েছে শিক্ষার অর্থকরী দিকের ওপর, এবং সেই অর্থকরী দিকটিকেই করে তোলা হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল নীতিনির্ধারণের জায়গা।
একভাবে এই দুই ধারার চিন্তাই সমাজের বুকে লালিত হয়েছে — লালিত হয়েছে এই কারণে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই দেশ তথা এই রাজ্যে ছাত্র রাজনীতি বহুদিনই রাজনৈতিক দলগুলির পেশী-আস্ফালনের জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে ব্যাপক ছাত্রছাত্রীরা ছাত্র-রাজনীতিকে নিজেদের অধিকারের ক্ষেত্র বলে দেখতে পায় না। ছাত্র ইউনিয়ন ব্যাপারটিকে নিজের অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান বলে তারা ভাবতে শেখেনি, এবং কেউ তাদের শেখায়ওনি। রাজনৈতিক দলগুলো সেই শিক্ষার ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়নি। কারণ, নিলে বদলাতে হতো নিজেদের মূলগত চরিত্র। উপরন্তু, এটাই সত্য যে তাবড় সাধারণ ছাত্রছাত্রী যে বাম জমানায় (বা তার পরে বা আগে) ব্রিগেডের মিছিলে হেঁটেছে, সেটা কোনো মতাদর্শগত কারণে নয়। নিজের পিঠ বাঁচানোর কারণে, স্বার্থরক্ষার কারণে।
অন্যদিকে, একথা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই যে গত পঞ্চাশ বা তারও বেশি সময় ধরে, ছাত্র ইউনিয়ন ব্যাপক ছাত্রছাত্রীদের কাছে অবদমন ও গণতন্ত্রহরণের প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান থাকলো কি না থাকলো, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। উপরন্তু, সাধারণভাবে এই দেশের মধ্যবিত্ত রাজনীতি-বিমুখ। যে অংশটিই প্রকৃতপক্ষে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী হিসেবে উপস্থিত হয়।
এক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে ফ্যাসিবাদ গড়ে ওঠে সমাজের ভিতরকার অনগ্রসর ভাবনাচিন্তাকে মূলধন করেই, সেই সব ভাবনাচিন্তাকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দান করেই। কাজেই, এক্ষেত্রে কি শ্রী ভট্টাচার্যের বক্তব্য কি শ্রী অধিকারীর বক্তব্য, সমাজের মধ্যবিত্তের একটি বড়ো অংশকে আন্দোলিত করবে না, উত্তেজিত করবে না, বিরূপ করবে না। বরং, তারা শ্রী ভট্টাচার্যের উদ্বাহু হয়ে আমন্ত্রণ জানাবে, তাই ব্যাপক ছাত্রছাত্রীদের একটি বড়ো অংশের কোনো বিরোধিতা নেই। তারা রাজনীতিমুক্ত কলেজ ক্যাম্পাসই চায়। এবং, বেসরকারি কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে বহুদিন ধরেই রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের প্রচলন ঘটে গেছে। ছাত্রছাত্রী ও ব্যাপক সংখ্যক অভিভাবক সেই বাস্তবতাতে নিরাপদ বোধ করেছেন, আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ছাত্র-রাজনীতিবিহীন ক্যাম্পাস বেসরকারি শিক্ষাঙ্গনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে মধ্যবিত্তের কাছে। এই বাস্তবতার কথা ভট্টাচার্যসহ বিজেপির নেতাদের অজানা নয়। তাঁরা একথা জেনেই মাঠে নেমেছেন, আঁটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন।
অন্যদিকে, শ্রী অধিকারীর বক্তব্যকে তারা মেনে নেবে ভবিতব্য বলে। এবং, এই দুই ক্ষেত্রেই, নিহিত আছে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মূল্যবোধের সামাজিক ক্ষয়ের চিত্র। যে ক্ষয়কে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেয়, গুন্ডামির আস্ফালন বা নিরন্তর দৃশ্যমানতার ভেতর দিয়ে পুনরায় বলবৎ করে।
এবং, পশ্চিমবঙ্গে সেই জমি তৈরি হতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই।
৩.
মোটামুটি এক দশক ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় কোনো ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচন নেই, অথবা অনিয়মিত। তার আগেও যে গুটিকয়েক “এলিট” কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে খুব গণতান্ত্রিক নিয়মে ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচন হয়েছে, এমনটা নয়। এবং, সেই চিত্র মোটামুটি কংগ্রেস আমল থেকেই। যার বিশেষ কোনো রদবদল বাম আমলেও ঘটে নি। কাজেই, আবারো বলি, একটা বৃহৎ অংশের ছাত্রছাত্রীদের সাথে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সম্পর্ক এই রাজ্যে ছিল ঐতিহাসিকভাবে বিযুক্তির।
আজ বাংলার একটি ব্যাপক অংশের ছাত্রসমাজের কাছে “অধিকার” বিষয়টি জীবনের মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় নয় অধিকাংশ কর্ম বা সামাজিক জীবনেও। বরং, একথাই সত্যি যে “গণতান্ত্রিক অধিকার”-এর ধারণা আজ ক্ষয় হতে হতে প্রায় উধাও বাংলার জনজীবন থেকে। ট্রেড ইউনিয়ন সহ যে যে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের সমস্ত সীমাবদ্ধতা সহ এই গণতান্ত্রিক অধিকারের বোধকে সমাজে একভাবে প্রতিষ্ঠা করতো, প্রয় উধাও তারাও। এই পশ্চাদসরণের কারণ বিবিধ। এবং সেই আলোচনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। কিন্তু, একথা অনস্বীকার্য যে এই পশ্চাদসরণের সাথে সাথে আজ বাংলার ব্যাপক ছাত্রসমাজের কাছে বামপন্থী চিন্তাভাবনা হাজির নেই, বামপন্থী ছাত্র সংগঠন তাদের কাছে জীবন্ত বাস্তব নয়। যে অংশটি বিজেপি-আর.এস.এস.-এর সাম্প্রদায়িক-হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে অনুপ্রেরণা পায়নি, তারা জীবনযুদ্ধের দৌড়ে আশ্রয় পেতে চেয়েছে নয়া-উদারনৈতিকতার দেখানো স্বপ্নে, পুঁজির দেখানো স্বপ্নে। সেখানে বারবার বিফল হলেও, বামপন্থা তার কাছে কোনো অর্থবহ চিন্তাসূত্র হিসেবে হাজির হয়নি।
অবশ্য, একথা অনস্বীকার্য যে এই উপরোক্ত চিত্রটি ঠিক যাদবপুরের চিত্র নয়। বা প্রেসিডেন্সির ও চিত্র নয়। দুর্বলভাবে হলেও, এই দুইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো টিকে আছে বিভিন্ন ধরনের বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় দেওয়াল-লিখনে, হঠাৎ ফেটে পড়া বিক্ষোভে অথবা সামাজিক গণমাধ্যমের বিতর্কে। বামপন্থার ছিঁটেফোঁটা হয়তো টিকে আছে শ্রেণীকক্ষের পঠনপাঠনেও — বিভিন্নভাবে। এবং এই গুলোকেই আমরা সাধারণভাবে বলে থাকি “মুক্তচিন্তা”র পরিবেশ।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই যে যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি নিভুনিভুভাবে বামপন্থার টিকে থাকা, তা কি আসলে একভাবে মধ্যবিত্তের শিক্ষাভিমানের প্রশ্নই নয়? প্রশ্নই নয় কি শিক্ষাক্ষেত্রে আভিজাত্যের? যে শিক্ষাভিমান কিংবা আভিজাত্যের প্রশ্নের ভিত্তিভূমি আসলে অসম বন্টন? শিক্ষাক্ষেত্রে অসম বন্টন, সমাজে অসম বন্টন?
একভাবে বলতে গেলে, যাদবপুর-প্রেসিডেন্সি সাবেক উদারনৈতিকতার পীঠস্থান। যদিও, এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের সেই যাত্রাপথে পার্থক্য আছে। প্রেসিডেন্সি-র স্থাপন যদি হয়ে থাকে একজাতীয় ঔপনিবেশিক উদারনৈতিকতার হাত ধরে, যাদবপুর তবে শিক্ষাক্ষেত্রে উপনিবেশবিরোধী উদারবাদীতার প্রতিভূ। এবং, সেই সাবেক উদারনৈতিকতার নিয়ম মেনেই, এইসব প্রতিষ্ঠানগুলির ভেতরে বাম ও অতি-বামেদের একধরনের জায়গা মিলেছে। আসলে, বামপন্থা এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে বহুসময়েই ঠিক যতটা না হাজির থেকেছে রাজনৈতিক বামপন্থা হিসেবে, তার থেকে অনেক বেশি হাজির থেকেছে একটি সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে। সেই সাংস্কৃতিক উপস্থিতির প্রকৃতি মূলগতভাবে বিরোধী স্বরের, একধরনের মধ্যবিত্ত তারুণ্য জনিত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার। সেই কারণেই সম্ভবত, বামফ্রন্টের জমানার দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরে এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিকল্প বাম বা অতি-বাম ছাত্র সংগঠনগুলি এক ধরনের জায়গা পেয়েছে।
সাথে সাথে, একথাও সত্যি যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতপক্ষে এই রাজ্যে পেশাদারি আভিজাত্যের শ্রেণীনির্মাণের যে প্রক্রিয়া, তার আঁতুরঘর। সেখানে ছাত্রদের তারুণ্যের ঝোঁকে অল্প কয়েক বছরের ওই বিরূদ্ধ স্বর চর্চা সমাজের স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ রদবদল ঘটায় না। এবং, একথা খুব স্পষ্ট হয় এই দুটো প্রতিষ্ঠনের ছাত্রছাত্রীদের ছাত্রজীবন পরবর্তী অস্তিত্ব দেখলেই। না, এইসব ক্যাম্পাসে বাম, বেসরকারি বাম বা অতিবাম রাজনীতি করা ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রজীবন পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকেনা, টিকে থাকেনি। টিকে থাকেনি সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে। টিকে থাকেনি এমনকি প্রতিষ্ঠানবিরোধী বাম চিন্তাচর্চা বা বৌদ্ধিক চর্চার জগতেও। এবং, শ্রেণীর রাজনীতির নিরিখে অভিজাত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেখলে অনুধাবন করা খুব কঠিন নয় যে এটাই স্বাভাবিক, এটাই সামাজিক ঘাতপ্রতিঘাতের নিয়মে অবশ্যম্ভাবী। এবং, এই পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাও মনে রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় যে যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সিতেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই এই বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাইরে থেকেছেন। তার কারণটি ঠিক কি, তার বিশ্লেষণ কখনোই বাম ছাত্র আন্দোলনের ভেতর তেমনভাবে করা হয় নি।
কিন্তু, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই জটিলতাগুলির ভেতরে প্রবেশ না করে কোনো সঙ্ঘপরিবার বিরোধী, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতি গড়ে তোলা সম্ভবপর নয়।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই আভিজাত্যবোধের সাথে সাথে প্রায় সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ছিল অন্য একধরনের পার্শ্ববর্তী মানুষজনের সাথে সম্পর্ক। যেমন ধরা যাক, যাদবপুর অঞ্চলের সাধারণ উদ্বাস্তু পরিবারগুলি প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একভাবে একাত্ম বোধ করেছেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে কোথাও একটা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল উদ্বাস্তু পাড়ার দরিদ্র ছেলেমেয়েদের বেড়ে ওঠার জায়গা, বিশ্বের সাথে পরিচিত হওয়ার জায়গা, রাজনৈতিক হওয়ার জায়গা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জায়গাও। তার ছাপ বিভিন্নভাবে এসে পড়েছে শ্রেণীকক্ষের পঠনপাঠনেও। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আজ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই গড়ে তুলতে গেলে প্রয়োজন সেই ইতিহাসটিকে রক্ষা করা, তার থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা। মেধার আভিজাত্য নয়, বরং প্রশ্নটি এখানে যাদবপুর সংলগ্ন যে লোকালয়গুলি — বিশেষত যে প্রান্তিক লোকালয়গুলি — তার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক অনুদান, নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ। প্রয়োজন এখানে এই কথা বারবার তুলে ধরার যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বামপন্থী ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে সংগঠিত হতো একাধিক প্রান্তিক শিশুদের বিদ্যালয়। মেধাতন্ত্রের পরিবর্তে এই বাস্তব ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিক্ষাক্ষেত্রের লড়াইয়ের — বা, আরও সীমিত অর্থে বললে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচানোর লড়াইয়ে — অনেক বড়ো হাতিয়ার।
৪.
এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবাংলায় ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আবার অন্য এক দিক থেকে বিষয়টি অতীব সরল।
ফ্যাসিবাদ উদারনৈতিকতা বা, এমনকি নয়া-উদারনৈতিকতার যে সাংস্কৃতিক নিয়মাবলী, সেসব নিয়ে বিচলিত নয়। “বিরোধী স্বর” বা “মুক্তচিন্তা” বলে কোনো ধারণার তার কাছে কোনো অস্তিত্ব নেই। সামান্যতম সমালোচনাও সে মেনে নেয় না। ক্ষেত্রবিশেষে, যদি সেই সমালোচনা আসে তার “বন্ধুশক্তি”-র কাছ থেকেও। পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রতিক সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকার ওপর নেমে আসা আক্রমণ সেই অসহিষ্ণুতারই পরিচয়। এবং, ফ্যাসিবাদ দাঁড়ায় মূলগতভাবে উদারনৈতিকতা বা নয়া-উদারনৈতিকতার দ্বন্দ্বসমূহের ওপর ভর করে। এসবকটি বিষয়ই সত্য ভারতবর্ষে বিজেপি-র মতন ফ্যাসিবাদী শক্তির উঠানের ক্ষেত্রে। তার সাথে সাথে এই রাজ্যে যোগ হয়েছে আর একটি বিষয় — বামপন্থার ভিতরকার দ্বন্দ্বসমূহ। বাকি গোটা দেশের তুলনায় তাই পশ্চিমবঙ্গের লড়াইটা অনেক অনেক বেশি জটিল। বাকি জায়গার মতন এখানে বামপন্থা মানুষের কাছে অতো সহজে বিজেপি-বিরোধী অস্ত্র হয়ে উঠবে না।
তো, যাই হোক, ভারতবর্ষে বিজেপি-আর.এস.এস.-এর ক্ষেত্রে অবশ্য আছে আরও একটি বড়ো মতাদর্শগত প্রকল্প। তার নাম শিক্ষার গৈরিকীকরণ, সংস্কৃতির গৈরিকীকরণ। এবং, যাদবপুরের মতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে যে মাত্রায় টিমটিম করে হলেও বাম ছাত্রছাত্রীসমাজ টিকে আছে, টিমটিম করে হলেও টিকে আছে অধ্যাপকদের ভেতরে একটি ছোট বামপন্থী শিবির, সেখানে গৈরিকীকরণকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর স্থান দিতে গেলে তাকে যাদবপুরের যে মূলগতভাবে উদারনৈতিক পরিবেশ — হোক না তা প্রধানত সাধারণ ছাত্রসমাজ থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন, হোক না তা মূলত নিজস্ব জাত্যাভিমানে ঢলঢল — তাকে ধ্বংস করতে হবে। ধ্বংস করতে হবে আইনি ও আইন-বহির্ভূত, এই দুই আগ্রাসনের পথেই। এটাই তার আশু লক্ষ্য। অতএব, নন্দলাল বসু কৃত বহির্দ্বারের প্রতীকচিহ্নটি ভাঙতে হয়, দেওয়াল থেকে মুছে দিতে হয় যাবতীয় দেওয়াল লিখন, মুছে দিতে হয় চিত্তপ্রসাদের ছবি। ছিঁড়তে হয় লাল পতাকা। কারণ, লাল পতাকার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে পৃথিবীজুড়ে ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার ইতিহাস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সংঘটিত হয় জাতীয়তাবাদ বিষয়ক সেমিনার। বাছাই করা শিক্ষক-অধ্যাপকদের বিরূদ্ধে হুঙ্কার ছাড়েন রাহুল সিংহ। এবং, পৃথিবীর ফ্যাসিবাদ ও দক্ষিণপন্থীদের ইতিহাসে এই পদ্ধতি গুলি খুব যে বিরল তাও নয়। বিশেষ বিশেষ সময়ে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, “কনসারভেটিভ” ছাত্র সংগঠনগুলি উদারনৈতিক-প্রগতিশীল-বাম-নারীবাদী প্রভৃতি অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে এমনি হুঙ্কার ছেড়েছে, তাঁদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে।
আবারো বলি, এই যে তার মারমূখী আগ্রাসন, এটাই ফ্যাসিবাদের রীতি, তার রাজনীতি। এখানে অবাক হবার মতন বড়ো একটা কিছু নেই।
কিন্তু, এর বিপরীতে, বাম রাজনীতি ঠিক কি হবে? ঘটনার নিন্দা? অবশ্যই। সেই নিন্দা করবার জন্যই মিটিং, মিছিল, সমাবেশ, পথসভা। আইনি পথে প্রতিরোধ? অবশ্যই। প্রয়োজনে নিজেকে শারীরিকভাবে ফেলে দেওয়া ফ্যাসিবাদী শক্তির মুখে, পুলিশের লাঠির মুখে? অবশ্যই। কিন্তু, তারপর?
আসলে, আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সংকট এই “তারপর”-এ এসেই। মানে, একটু তলিয়ে ভাবলে যেটা দেখা যাবে যে আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হামলাকে যে যে নিরিখে দেখা হচ্ছে, তা আসলে মূলগতভাবে উদারনৈতিকতার মাপকাঠি। “বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার আকর” — এই যে আপ্তবাক্য আমরা প্রায় প্রত্যেকে গত কয়েকদিন ধরে আউড়েছি, তা সাবেক উদারনৈতিকতার কথা। এবং, “মুক্তচিন্তার পীঠস্থান” হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়, এই বোধটিও মূলগতভাবে উদারনৈতিকতার কল্পনা প্রসূত, যার সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে উদারনৈতিকতার শ্রেণী রাজনীতি।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বামপন্থী কল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয় কি ও কেমন হবে তার চেহারা? যে শ্রেণী ও পুঁজির প্রশ্ন নিয়ে বামপন্থা মূলত হাজির হয়েছিল পৃথিবীতে ঐতিহাসিকভাবে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিভাবে কল্পনা করা হবে বিশ্ববিদ্যালয়কে? ঠিক কি ধরনের শ্রমক্ষেত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়? বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অন্যান্য শ্রমক্ষেত্রের আন্তঃসম্পর্ক ঠিক কি? এবং, শ্রমক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়, এই আলোচনায় প্রবেশ করলে ঠিক কিভাবে বদলে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরোধিতা? শ্রমক্ষেত্র ও পুঁজি — এই দুই প্রশ্ন দিয়ে দেখলে ঠিক কিভাবে বোঝা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গৈরিকীকরণের প্রক্রিয়াটি? এই দুইটি বিষয়কে মাথায় রাখলে ঠিক কেমন হবে সেই গৈরিকীকরণ বিরোধিতার লড়াই?
ঠিক কেমন হবে গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই যদি আজকের বামপন্থী ছাত্র-শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী-অধ্যাপকরা লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলেন আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগের দাবিতে, এবং ক্রমাগত জঙ্গি রূপ দান করেন সেই লড়াইকে? ঠিক কেমন হবে গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই যদি একইভাবে লড়াই গড়ে তোলা হয় চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের বিপক্ষে? আরও আরও বেশি করে প্রথম প্রজন্মের দলিত ও আদিবাসী ছাত্রদের শিক্ষাঙ্গনে আনার স্বপক্ষে? এই সমস্ত বিষয়গুলিই আজ শিক্ষাক্ষেত্রে জ্বলন্ত ইস্যু। কিন্তু সেসব নিয়ে কোনো লড়াই বহুদিন যাবৎ নেই। কখনো কখনো হাহুতাশ করা হয় এসব নিয়ে অবশ্য, কিন্তু ক্রমশ সেই হাহুতাশও আর থাকছে না। এসবকে বাদ দিয়ে একটা ভাঙাচোরা শিক্ষাব্যবস্থাতেই আমরা ঘোরতর ভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।
৫.
আবারো বলি, এই প্রশ্নগুলি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের — তা তাঁরা সরকারি বাম হন, বা বিপ্লবী বাম — কোনো চিন্তাভাবনা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক কি ও কেন, একভাবে তাঁরা লেজুড়বৃত্তি করে চলেছেন উদারনৈতিক চিন্তাভাবনার, উদারনীতির। এবং, আজকের বাম ছাত্র আন্দোলনও তাই মূলগতভাবে রক্ষাশীল ও রক্ষণশীল। একদিকে, সে আন্দোলন সীমিত ফ্যাসিবাদী বিজেপি-সংঘপরিবারের আক্রমণের বিরূদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে। অন্যদিকে তার সবচাইতে বড়ো স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় উদারনীতিবাদের ফলে যে ছিঁটেফোঁটা কল্যাণকর ফললাভ হয়েছিল, তাকে রক্ষা করায়। তার নেই কোনো নিজস্ব কল্পনা, তাই তার নেই কোনো নিজস্ব আজেন্ডা।
একথা অনস্বীকার্য যে পশ্চিমবাংলায় মানুষ বিজেপি-সংঘ পরিবারের আগ্রাসনের বিরূদ্ধে একেবারে নীরব নয়। নীরব নন বামেরাও পুরোপুরি। কিন্তু, একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে সেই প্রতিবাদ-রাজনীতিরও আজ দিকনির্দেশ ও আজেন্ডা নির্ধারণ করে বিজেপি-সঙ্ঘপরিবার। যার চূড়ান্ত উদাহরণ বোধহয় দেখা যাচ্ছে বিজেপির সাথে বামেদের প্রতিযোগিতামূলক জাতীয়তাবাদের পারফরম্যান্সে। সেই প্রতিযোগিতামূলক জাতীয়তাবাদের ফলে, বাম ঐক্যের সমাবেশে হিন্দি ভাষায় গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত, কোনো এক নিউস চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্রনেতা উঠেপড়ে প্রমাণ করতে লেগে পড়েন যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্দে মাতরম গাওয়া হয়। “জাতীয়তাবাদ” বিষয়ে বামেদের রাজনৈতিক বক্তব্যটি ঠিক কি, এবং কি হওয়া উচিত, সেই অতন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে ঘিরে কোনো মতামত বা বিতর্ক মানুষের কাছে পৌঁছনোর বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টাও নেওয়া হয় না।
এই চিন্তার দারিদ্রের মুখে দাঁড়িয়ে আজকের সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বুকে কোনো ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভবপর নয়। এবং গড়ে উঠছেও না। আর, এই ফাঁকতালে হারিয়ে গেছে মূল মূল প্রশ্নগুলি। যে ভাবে গত কয়েক বছর ধরে যাদবপুর তথা রাজ্যের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নেই কোনো লাগাতার ছাত্র আন্দোলন। শিক্ষক-অধ্যাপক-শিক্ষাকর্মী-ছাত্র মিলিত আন্দোলনের কথা তো দূর অস্ত। অন্যদিকে, শিক্ষার গেরুয়াকরণের বিরুদ্ধে কেমনভাবে গড়ে উঠবে কোনো ধারাবাহিক ছাত্র আন্দোলন, নেই তার কোনো নীল নকশাও সামনে।
তাই, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড়ো অংশের বাম মনোভাবাপন্ন ছাত্রছাত্রীদের বয়ান হয়, “যাদবপুরের গেট পেরোতে গেলে পরীক্ষা দিতে হয়, নম্বর পেতে হয়। গেটের মাথায় উঠে এই বিশ্ববিদ্যায়লয়ের সীমা পেরোনো যায় না।” এই যে বয়ান, যা বিপুলভাবে ছড়িয়েছিলো সামাজিক গণমাধ্যমেও, মিম হয়ে, স্লোগান-পোস্টার হয়ে, তার ভেতরকার যে স্পষ্ট মেধাতন্ত্র, শ্রেণীশ্লাঘা ও জাতপাতবোধ, তা নিয়ে কারুর খুব একটা মাথাব্যথা লক্ষ করা যায় না।
এবং, অবশ্যম্ভাবীভাবে একধরনের আভিজাত্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে চলতে থাকে যাদবপুরের বাম ছাত্র আন্দোলন, যাদবপুরকে ঘিরে যে সংহতি আন্দোলন। ঠিক একইভাবে উপরোক্ত বাম ছাত্রনেতা শ্রী অধিকারীর বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে উচ্চারণ করেন “সেন্টার ফর এক্সেলেন্স”, “এমিনেন্স” এই শব্দগুলি। অর্থাৎ, যাঁদের করার কথা ছিল, “এক্সেলেন্স”, “এমিনেন্স” এই শব্দগুলির মতাদর্শগত বা রাজনৈতিক কাটাছেঁড়া, তাঁরা গা ভাসান ওই শব্দগুলির মোহে।
কাজেই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই পশ্চিমবাংলার ব্যাপক মানুষের লড়াই হয়ে ওঠে না। থেকে যায় মুষ্টিমেয় কিছু বিশিষ্ট জনের লড়াই। বড়োজোর কিছু পার্টি ক্যাডারদের লড়াই। কিন্তু পার্টি পরিকাঠামোগুলিকে ব্যবহার করেই কি কল্পনা করা যেত আর একটু অন্যভাবে? যেমন ধরা যাক, বাম ঐক্যের যে বৃহৎ দলগুলি, তাঁরা কি ১৮ই আগস্টের রাত থেকে শুরু করে ধারাবাহিক ভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেপিঠে সংগঠিত করতে পারতেন না তাঁদের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলির শ্রমিক কর্মীদের? তাঁরা কি পারতেন না শ্রী শুভেন্দু অধিকারীর উলঙ্গপ্রায় সন্ন্যাসীদের নিয়ে মিছিলের পাল্টা শ্রমিকদের মিছিল ডাকতে? কেমনভাবে বদলে যেত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভূগোল যদি আজ “যাদবপুরের পাশে শ্রমিকরা” শিরোনামে পথে নামতো বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলি? কিন্তু, সেই আত্মবিশ্বাস কি আজকের বাংলার বামেদের আছে? অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার ওপর শ্রমিকদের একটা-দুটো মিছিল বা জমায়েত সংগঠিত করতে পারলেও, তাঁদের পক্ষে কি এমনতরো রাজনৈতিক জমায়েত করা সম্ভব? নিজেদের গণসংগঠনগুলির ভেতরে সেই স্তরের রাজনৈতিকীকরণের দায়িত্বে কি তাঁরা নিয়েছেন? গৈরিকীকরণের ছোঁয়া কি তাঁদের শ্রমিক সংগঠনগুলির ভেতরেও নেই?
আজ এই কঠিন প্রশ্নগুলির সামনে বাংলার রাজনীতি। সেই রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে বাদ দিয়ে শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আক্রমণ বিষয়টিকে আলাদা করে দেখলে এখানে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সম্ভব নয়।
লেখক একজন সমাজকর্মী। এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

