যাদবপুর: রাজনীতির প্রতীক, প্রতীকের রাজনীতি


  • September 17, 2026
  • (0 Comments)
  • 81 Views

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েকে গঠন করেছে তার প্রতিরোধের ইতিহাস যেখানে তার রাজনীতি থেকে শিক্ষানীতিকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।

 

সোহিনী সাহা 

 

“ওরা যত বেশি পড়ে

তত বেশি জানে

তত কম মানে।”

 

“হীরক রাজার দেশে” (১৯৮০) সিনেমাটির এই লাইন গুলো তুলে ধরেছিল শিক্ষা এবং রাজনীতির এক ওতপ্রোত সম্পর্ক। এক স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েই মুক্ত হতে পেরেছিল শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আজকের সময় দাঁড়িয়ে কোনো ফ্যাসিস্ট কিংবা স্বৈরাচারী শক্তির কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেওয়ার কিংবা শিক্ষার প্রসারের বিরোধ করার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। উল্টো শিক্ষার ভিত্তি পাল্টে দিয়ে শিক্ষাকেন্দ্রকে ধরে রেখেও শিক্ষার পতন ঘটানোও সম্ভব হয়ে। তাই আজ কোনো শিক্ষাকেন্দ্রকে বন্ধ না করেও সেই শিক্ষাকেন্দ্রতে ঢুকে পড়ে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। শিক্ষায় বাধা নিষেধ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বাজারমুখীকরণের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার ভিত্তিকে পরিবর্তিত করা সম্ভব হয়। ‘হীরক রাজার দেশে’ যেরকম এক প্রতীকী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে তুলে ধরেছিল এবং তার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছিল রাজনীতি ও শিক্ষার এই নিবিড় সম্পর্ককেও, আমরা তারই এক ভিন্ন রূপ দেখি আজ। কিন্তু এই সিনেমা যতটা গুরুত্ব পেয়েছিল বাঙালির কাছে, ততটা এই সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারিনি বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গিকে। তাই শিক্ষা এবং রাজনীতিকে একে অপরের বিরোধী হিসেবেই তুলে ধরে চলেছে এই সমাজ।

 

কিন্তু শিক্ষা থেকে রাজনীতিকে আলাদা রাখাও এক ধরনের রাজনীতি। প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক লড়াইকে মুছে ফেলাও এক ধরনের রাজনীতি। এই “রাজনীতি” পরিচিতি পায় না “রাজনীতি” হিসেবে। এরকম রাজনীতির বিরোধিতাই তৈরি করেছিল যাদবপুরের মতন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি ঔপনিবেশিক শাসন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চিরকালীন এই রাজনীতি-শিক্ষার বিরোধের বিরোধিতা করে এসেছে। যাদবপুরের প্রতিরোধের ইতিহাস এবং তার সাম্প্রতিক রাজনীতি তাঁর শিক্ষাব্যবস্থারই এক প্রতীক।

 

এই লেখার মধ্যে দিয়ে আমি এই সম্পর্ককে তুলে ধরবার চেষ্টা করব। আমি দেখানোর চেষ্টা করব ২০২৬-এর অগাস্ট মাসে যাদবপুরে ঘটে থাকা দক্ষিণপন্থী আক্রমণকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্তের “প্রতীকের রাজনীতি” কিভাবে ক্রমশই যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসকে আলাদা করে ফেলে তার শিক্ষার “ঐতিহ্য” থেকে। এর বিরোধিতা করে আমি দেখানোর চেষ্টা করব যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে একটি রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে তার ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে। যাদবপুরের দেওয়াল লিখনের মধ্যে দিয়ে আমি তাই তুলে ধরব এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং রাজনীতির এক ওতপ্রোত সম্পর্ক যেটি এখন এক সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে চলছে।

 

ইতিমধ্যেই আমরা জানি ১৯-২০ (আগস্ট) তারিখে ঘটে যাওয়া যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এবিভিপি, এনএসএফ এর আক্রমণের কথা। সেটি সীমিত থাকে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে, বহিরাগতদের নিয়ে এসে রাতভর একধরনের তাণ্ডব চলে এক শিক্ষাঙ্গনে। এই আক্রমণকে ক্রমশ বাম রাজনীতি ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সংঘর্ষ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, এটি যে “যাদবপুর”-এর মতন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আঘাত ও আক্রমণ, সেটি চিত্রিত হয়ে যায় সবচেয়ে প্রবলভাবে। এই চিত্রিত হওয়ার ফলে এই দক্ষিণপন্থী আক্রমণকে নিন্দনীয় চোখে দেখে যাদবপুরের পক্ষে যায় মূলস্রোতের গণমাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষ। আমার ধারণা এই যাদবপুরের “পক্ষ” নিয়েও যাদবপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসকে তার শিক্ষার ইতিহাস থেকে এক প্রকার আলাদা করে তোলে এই ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে। যাদবপুরে আক্রমণের যে প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে, এবার তার একটা ভিন্ন রূপ দেখা গেছে। প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে মূল জায়গা করে নিয়েছিল তা হলো মুলস্রোতের গণমাধ্যম থেকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমালচনা। সাধারণত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে সমালোচনা থাকে, তার থেকে বেরিয়ে যাদবপুরের পক্ষে গেছিল মূলস্রোত। এইবার তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি সেই অর্থে। বরং এই আক্রমণকে ভাঙচুর এবং অন্যায়াচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা বা চিত্রিত করা সম্ভব হয়েছিল।

 

কিন্তু এই ঘটনার ঘটে যাওয়া রাতের আক্রমণ থেকে পরের দিনের ঘটে যাওয়া ৪ নম্বর গেটের আক্রমণ মানুষের মনে সব চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এই ঘটনা নতুন নয়, ৪ নম্বর গেটকে কেন্দ্র করে আগেও আমরা ২০১৯ সালে আক্রমণ দেখে ছিলাম। গেট ভেঙে ঢোকা যেমন একটা “প্রতীকী” প্রবেশ, একটা ভেদ করা, সেটা আরও গুরুত্ব পায় যখন সেই গেটকে কেন্দ্র করে যাদবপুরের মতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতিও জড়িত থাকে। ৪ নম্বর গেট যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতি তথা ছাত্র আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই গেটে আঘাত আবার এই ছাত্র রাজনীতির উপরেও আঘাত। কিন্তু গেটের এবং ছাত্র রাজনীতির থেকেও যেটি গুরুত্ব পায়, সেটি একটা প্রতীক। যাদবপুরের ঐতিহ্য ও ইতিহাস একই ভাবে একটা বাস্তব মূর্তির প্রতীকে পরিণত করা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে নন্দলাল বসুর হাতে। এই প্রতীক একটা প্রদীপ এবং তাকে ঘিরে তিনটি শিখা। এই প্রতীক যাদবপুরের জ্ঞানের প্রতি অন্বেষণকে প্রতীকী রূপে তুলে ধরে।

 

যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। সেটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে তুলে ধরে একটা প্রতীকী আকার দিয়ে। প্রতীকের ওপর আঘাত তাই একভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আঘাত। কিন্তু আমরা ভুলে যাই একটা প্রতীক তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এবং মানুষদেরকে কেন্দ্র করে, প্রতীকের কোনো নিজস্বতা থাকে না। কিন্তু একবার গঠন হয়ে গেলে প্রতীক খুব সহজেই একটা নিজস্বতা পেয়ে যেতে থাকে। যার ফলস্বরূপ আমরা তার গড়ে উঠার ইতিহাস ভুলে যাই। তার ওপর আঘাত বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, যে বাঙালি অনেক ক্ষেত্রেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমালোচনা করে থাকে নির্দ্বিধায়। এই আঘাত যখন সামনে আসে, দুটো ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। যাদবপুরের নম্বর গেটের প্রতীক ভেঙে যাওয়া এবং তার সঙ্গে একজন আক্রমণকারীর ওই প্রতীকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে গেট ৪ ভেদ করার চেষ্টা করা। যথাযথ এই দুই ছবিকে ঘিরে সমালোচনা এবং যাদবপুরের ঐতিহ্যের অপমান হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ যেন শিক্ষার ওপর আঘাত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আঘাত। কিন্তু আগের রাতে হয়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ওপর আঘাত কি এই এক প্রভাব ফেলতে পেরেছিল? আনন্দবাজার পত্রিকা তাঁর জনপ্রিয় লেখায় এই প্রতীকের ওপর আঘাতকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যেখানে একজন শিল্পাচার্যের শিল্প এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের “ঐতিহ্য”-র ওপর আঘাতকেই চিত্রিত করা হয়। আগের দিন রাতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর ঘটা হিংসার ঘটনা প্রথম পাতায় জায়গা করে নিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে আলাদা হয়ে যায় এই ছাত্রছাত্রীরা এবং তার জায়গায় প্রতীকী প্রদীপ ও শিখা করে নেয় এক স্থান।

 

আগের রাতের ভাঙচুর কিংবা কথার মধ্যে দিয়ে হিংসার আক্রমণ (verbal abuse) একটা ভয়াবহ দিক তুলে ধরে। কিন্তু সেটি আমাদের ততটা ভাবায়নি। “যাদবপুরে এসবই হয়ে” এটাই প্রচলিত ভাবে মানুষ গ্রহণ করে নিয়েছেন। নিয়মিতভাবে মূলস্রোতের গণমাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে দিয়ে যাদবপুরের ছাত্র-রাজনীতি বিরোধী একটা ধারণা তৈরি করা হয়েছে। “যাদবপুরে ক্লাস হয় না” থেকে “নেশার আসর” বলে প্রচলিত এই ধারণাগুলো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রোধ করার একটা পরিকল্পনা হিসাবে সবসময়ই থেকেছে। ছাত্রীছাত্রীদের প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদকে এক প্রকারের বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিত্রিত করে, তাঁদের লড়াইকে (রাজনীতি) বিশ্ববিদ্যালয়ে (শিক্ষা) থেকে আলাদা করে তুলেছে ক্রমশই। যারফলে যাদবপুরকে কেন্দ্র করে হওয়া আক্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই মূলস্রোত থেকে শুধু সমালোচনাই নিয়ে আসে, সংবেদনশীলতা নয়।

 

কিন্তু সেদিন একটু আলাদা হলো। প্রতীক ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। এই প্রতীককে কেন্দ্র করেই শুরু হলো এক ধরনের প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যাদবপুরের প্রতীকের কিংবা ঐতিহ্যকে আক্রমণ করা হয়েছে মনে করে অনেকেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তোলে। আমার ধারণা সবার এই কণ্ঠস্বর বদলের একটা দিক হয়তো এটাই। যাঁরা সাধারণত যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের কেন্দ্র করে একভাবে একটা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে থাকে, তারাও যাদবপুরের পক্ষে গেল এই “ঐতিহ্য”-র উপর আঘাতের ফলে।

 

কিন্তু প্রতীক কি? একটি প্রতীক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে মূর্ত করে, একটা আকার দেয়। সেই আকার কিংবা প্রতীক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তাই আসি এই ইতিহাসে এবার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চিরকালীন একটি ছাত্র রাজনীতির প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে যার সঙ্গে তার বুদ্ধিজীবি শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপেক্ষিতে। তাই তার ইতিহাস জড়িয়ে আছে সেই সময়কার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজনীতির বিরূদ্ধের সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। এই প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার শিক্ষার মধ্যে দিয়েই। শিক্ষাই গড়ে তুলেছিল সেই সময় একটা প্রতিরোধের ভাষ্য, শিক্ষাই ছিল প্রতিরোধ, শিক্ষাই ছিল রাজনীতি। কিন্তু এই বিরোধিতা সীমিত থাকেনি শুধু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। স্বাধীনতার পরেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিরোধের ও প্রতিবাদের ইতিহাস ধরে রেখেই এগিয়েছে প্রতিপদে তার প্রতিষ্ঠান বিরোধী রাজনীতি ও চিন্তা নিয়ে। তাই এমারজেন্সি থেকে হোক কলরব, বিভিন্ন সময় তার প্রতিরোধের ছাপ রেখে গেছে। তাই যাদবপুরের শিক্ষাব্যবস্থা চিরদিনই তার প্রতিরোধের একটা প্রতীক। একজন প্রাক্তনী হিসেবে আমি যাদবপুরের শিক্ষার প্রথাকে কখনোই আলাদা দেখিনা তার ছাত্র রাজনীতির থেকে। যাদবপুর তাই শিক্ষা এবং রাজনীতির এই ঐক্য তুলে ধরে একটা চিরকালীন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। শিক্ষার থেকে পাওয়া জ্ঞান দিয়েই রাজনৈতিক প্রশ্ন গড়ে তোলা হয়েছে, আবার রাজনীতির থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রছাত্রীরা যেমন ক্লাসরুমে নাগরিকত্বের ইতিহাস নিয়ে পড়ছে, বাইরে সেই নাগরিকত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে আন্দোলন। ক্লাসরুমের ভেতর এবং বাইরে তাই জড়িয়ে উঠছিল একটা নিবিড় সম্পর্কে। এই সম্পর্কই তুলে ধরেছে যাদবপুরের শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু ক্রমশই এই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত জ্ঞান চর্চা এবং রাজনীতিকে আলাদা করে দেখেছে সমাজ।

 

যে প্রতীকী আকারকে আজ আমরা খুব সহজেই একটা প্রতীক কিংবা ঐতিহ্য হিসেবে দেখছি, সেটা গঠন হয়েছিল যাদবপুরের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী রাজনীতি এবং স্বাধীন, বৈচিত্র্যপূর্ণ, সাম্য, অন্তর্ভুক্তিগত ও প্রতিবাদী শিক্ষার মধ্যে দিয়ে। তাই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতি এবং শিক্ষা বা পড়াশোনা, বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী, বিপ্লবী সবকিছুর মধ্যে একটা সংযোগ থেকে তৈরি হয় এই প্রতীক এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু আজ এই ইতিহাস এবং এই মানুষদের থেকে ঊর্ধ্বে উঠে গেছে এই প্রতীক। তাই এই প্রতীক ভেঙে যাওয়া সবাইকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এতদিনের মিডিয়া হয়রানি, প্রোপাগান্ডা, পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা, ফান্ডিং-এর অভাব, ইত্যাদি যেভাবে এই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আস্তে আস্তে একটা ধীর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেটা নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তখন কি এইগুলোকে ঐতিহ্য কিংবা প্রতীকের আঘাত হিসেবে কেউ দেখেছিল? যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের ওপর ওঠা বিভিন্ন সময় হিংসাপূর্ণ ব্যবহার বা সেই রাতের আক্রমণে উঠে আসা প্রতিহিংসা কি যাদবপুরের প্রতীকের ওপর আঘাত ছিল না?

 

যাঁরা প্রতিনিয়ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি, তার শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, ও ছাত্র ছাত্রীদের  প্রতি একটা মন্দ মনোভাব রাখে, তাঁরাও খুব সহজে নিজেদেরকে সেইদিনকার আক্রমণ ও ভাঙচুর থেকে আলাদা করে নিতে সক্ষম হয়ে। এর কারণ এখানে চলে আসে একটা “শ্রেণীর” বিবরণ। ভাঙচুর ‘মধ্যবিত্ত’ বাঙালির ধরন নয়। তাই যেকোনো ভিড়ের হিংসা ও আক্রমণ হয়ে ওঠে একটা “নিম্ন”শ্রেনী ভিত্তিক ব্যবহার, যেখান থেকে মধ্যবিত্ত তার কথার হিংসা কিংবা প্রতীকী হিংসাকে আলাদা করে নেয়। তাই প্রতিষ্ঠানিক হিংসা যেমন SIR এর মধ্যে দিয়ে বর্জন, পুশব্যাক নীতি, কিংবা পরিকাঠামোগত হিংসা, যেমন ফান্ডিং-এর অভাব, শিক্ষার পরিকাঠামোর অভাব ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবাদ উঠতে দেখা যায় না, এই মূলস্রোতের গণমাধ্যম কিংবা মধ্যবিত্ত বাঙালির থেকে। উল্টে প্রতীকের ওপর আঘাতকে শিক্ষাপ্রথার ওপর ছাত্র রাজনীতির ফলে ঘটা আঘাত হিসেবে চিত্রিত করা হয়ে অনেক ক্ষেত্রে। আর এখানেই যাদবপুরের রাজনীতিকে তার শিক্ষা বা পড়াশোনার ইতিহাস থেকে আলাদা এবং একে ওপরের বিরোধী করে দেওয়া হয়। এই বিরোধিতাকে বজায় রেখেই এক অংশ বাঙালি মধ্যবিত্ত যাদবপুরের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে বসে এবং অন্যদিকে তার রাজনীতিকে “বিশৃঙ্খলা” হিসেবে চিত্রিত করে। তারা ভুলে যায় যে যাদবপুর চিরকালই অন্যায়ের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তার এই রাজনীতির মধ্যে দিয়েই। যে রাজনীতি আবার গড়ে উঠেছে তার শিক্ষার মধ্যে দিয়ে।

 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালও একই কথা বলে। ছাত্র-ছাত্রীরা যখন ৪ নম্বর গেট দিয়ে প্রথম ঢোকে, চারি পাশে গ্রাফিত্তি ও দেওয়াল লিখন তাঁদের কাছে তুলে ধরে সমাজে ঘটে থাকা সাম্প্রতিক ঘটনা, নির্যাতন থেকে অবিচারের একটা ছবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা থেকে দেওচা পাঁচামির মানুষের লড়াইয়ের কথা, বিশ্বে ঘটে থাকা সাম্প্রতিক হিংসার বিবরণ থেকে দেশে ঘটে থাকা একজন পরিযায়ী শ্রমিকের ওপর হিংসা কিংবা মণিপুরে চলতে থাকা হিংসার বিরূদ্ধে তোলা কণ্ঠস্বর। এইভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখন দিয়ে এক সচেতন ক্যাম্পাস তৈরি হয়ে সমাজ এবং সামাজিক কর্তব্য থেকে। এই দেওয়াল লিখন শুধু সীমাবদ্ধ থাকে না সাম্প্রতিক সময়ে, তুলে ধরে ঐতিহাসিক মুহূর্ত কিংবা মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের গ্রাফিত্তি এবং তার মধ্যে দিয়ে বাংলার দুর্ভিক্ষের ইতিহাস। যে চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে বাংলা ভুলে গেছে, তাঁকেই যাদবপুরের দেওয়াল মনে রেখেছে। তাঁকে মনে রাখার মধ্যে দিয়ে মনে রাখা হয় বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং সেই সময় তাঁর প্রতিবাদের শিল্পকে। চিত্তপ্রসাদ দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে এক প্রকার প্রতিবাদী ভাষা দিয়েছিলেন সেই সময়, নথিভুক্ত করেছিলেন দুর্ভিক্ষকে। তাই এইসময় চিত্তপ্রসাদের গ্রাফিত্তি মুছে ফেলা এক প্রকারের মানুষ বিরোধী রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

সেরকম ভাবেই যাদবপুরের দেওয়াল মনে রেখেছে ফিলিস্তিনের মানুষের লড়াই থেকে আজকের সময় দাঁড়িয়ে দেউচা পাঁচামির মানুষের লড়াই। সেরকম ভাবেই বিভিন্ন সময় কালের রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে দিয়ে প্রতিরোধের ভাষাকে লিপিবদ্ধ করেছে এবং বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনকে মনে রেখেছে এই দেওয়াল লিখনের মধ্যে দিয়ে। কার্ল মার্ক্স, রবীন্দ্রনাথ থেকে আম্বেদকরের লেখা যেমন জায়গা করে নিয়েছে এই দেওয়ালে, অন্য দিকে আন্দোলন থেকে উঠে আসা স্লোগান “আজাদী” কিংবা  সাম্প্রতিক কালে সিএএ বিরোধী আন্দোলনে উঠে আসা আমির আজিজের স্লোগান “সব ইয়াদ রাখখা যায়েগা” জায়গা করে নিয়েছে এই দেওয়ালগুলোতে। এই দেওয়াল লিখন তাই ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতির বিরূদ্ধে একটা প্রতিরোধ। তাই আজ যখন এই দেওয়াল লিখনকে মুছে ফেলার এক প্রকল্প চলছে ক্রমাগত, এই দেওয়াল লিখনের রাজনীতি আরও বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 

উল্টো দিকে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ছাত্র রাজনীতি না থাকা ক্যাম্পাসগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরা হয় একটা “সুন্দর” ক্যাম্পাস হিসেবে। এই ক্যাম্পাসের দেওয়ালে থাকে না কিছু লেখা, কিন্তু থাকে বড় বড় বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং, ইভেন্ট হোর্ডিং এবং তার সঙ্গে থাকা বিজ্ঞাপন। অনেক ক্ষেত্রে এই বিজ্ঞাপন থেকেই ওঠে ফান্ডিং এবং এই “ইভেন্ট” তৈরি করে শিক্ষার সঙ্গে কর্পোরেটের সংযোগের মধ্যে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বেসরকারিকরণ। এই বেসরকারিকরণের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা হতে থাকে ক্রমশই বাজারমুখী এবং তাই ক্রমশই সরে আসে মানুষের ইতিহাস থেকে, হতে থাকে মানুষ বিরোধী। এই রাষ্ট্র থেকে কর্পোরেটের ব্যানার কিংবা হোর্ডিং নীতি, ক্রমশই জায়গা করে নেয় এইসব বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজগুলোতে। এই দুই প্রকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্পেস তাই দুই প্রকারের রাজনীতিকে তুলে ধরে। একদিকে থাকে মানুষের লড়াইয়ের, শ্রমের, প্রতিরোধের ভাষা, অপরটি তুলে ধরে একটা রাষ্ট্র-কর্পোরেট সংযোগের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার বাজারিকরণ। যাদবপুরের ক্যাম্পাস এবং তার এই দেওয়াল লিখনের সংস্কৃতি তাই হতে থাকে এই ধরনের নিওলিবেরাল কর্পোরেট সংস্কৃতিভিত্তিক বাজারমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধী। কারণ যাদবপুরের এই ক্যাম্পাস সংস্কৃতি শিক্ষার ভিত্তিকে ধরে রাখে একটা আয়নার মতন, মনে করিয়ে দেয় শিক্ষার ভিত্তি আসলে মানুষ এবং মানুষের লড়াইকে কেন্দ্র করে। যাদবপুরের দেওয়ালের এই প্রতিরোধ তুলে ধরে প্রযুক্তি এবং উন্নয়নের প্রতীকী এবং বাস্তবিক হিংসাকে, মানুষের উচ্ছেদ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনকে। যাদবপুরের দেওয়াল তাই আর বাকি পাঁচ তারা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের মতন বাহ্যিক সৌন্দর্য তুলে ধরে না। বরঞ্চ এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভেতরকার ভয়াবহ অসাম্য ও বেসরকারিকরণের প্রতীকী হিংসার একটা বাস্তব ছবিও তুলে ধরে। তাই যাদবপুরের দেওয়াল মনে রাখে রোহিত ভেমুলাকে, তুলে ধরে এখনকার সময়ে ঘটে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বরকে। এর মধ্যে দিয়ে যাদবপুরের দেওয়াল লিখন মনে করিয়ে দেয় নব-উদারবাদী প্রযুক্তিগত শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যর্থতাকে। এই দেওয়াল তাই প্রতিরোধ গড়ে তোলে শিক্ষার বেসরকারিকরণের বিরূদ্ধে এবং তাকে ঘিরে শিক্ষার পতনের বিরূদ্ধে। তাই যাদবপুর হয়ে ওঠে যেকোনো ফ্যাসিস্ট কিংবা স্বৈরাচারী শক্তির পথের কাঁটা। তাই যাদবপুরের ওপর আঘাত, তার রাজনীতি এবং তার দেওয়াল লিখনের সংস্কৃতির ওপর আঘাত, তার এই বিপ্লবী চিন্তাধারা এবং প্রতিরোধের সংস্কৃতির ওপর আঘাত।

 

আমরা যখন ঐতিহ্য এবং প্রতীকের রাজনীতিতে মত্ত হয়ে যাই, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস থেকে আলাদা হয়ে পড়ি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েকে গঠন করেছে তার প্রতিরোধের ইতিহাস যেখানে তার রাজনীতি থেকে শিক্ষানীতিকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তাই এই শিক্ষা ও রাজনীতির ঐক্যকে বাদ দিয়ে যাদবপুরের প্রতীককে ভাবা সম্ভব নয়।

 


সোহিনী সাহা একজন শিক্ষাবিদ। এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

 

 

Share this
Leave a Comment