স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল সার্কেল-এর ত্রিবার্ষিক দ্বিতীয় সম্মেলনে দাবি উঠল ঠিকা প্রথা বাতিল করে সমস্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণের।
সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের সংগঠন – স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল সার্কেল-এর ত্রিবার্ষিক দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল কলকাতার মহাজাতি সদনে ১২ অগাস্ট, ২০২৬। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলার প্রায় ১০০০ এসবিআই-এর চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী, যাঁরা এই অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য। ২০২৩ সালের ২৯ মে এই সংগঠনের পথ চলা শুরু। গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে রাজ্য জুড়ে এসবিআই-এর চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ ও অন্যান্য দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন, পাশাপাশি বিভিন্ন রিজিয়ন ও জেলাস্তরের কর্মচারীদের নিজেদের অধিকার, আইনি প্রক্রিয়া ও দাবি আদায়ের আন্দোলন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কাজও চলেছে সমান ভাবে। এবং আগামীতেও এই পথেই চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই শেষ হয় দ্বিতীয় সম্মেলন। স্লোগান ওঠে – “ঠিকা প্রথা বন্ধ্য করো”, “কোম্পানি হটাও/শ্রমিক বাঁচাও”।
এই সম্মেলনের শুরুতেই সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে যে মূল দাবিগুলি তুলে ধরা হয় –
১) ঠিকা প্রথা বিশ্রি রোগ স্থায়ী নিয়োগ চালু হোক
২) সমস্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণ করতে হবে
৩) অক্টোবর ২০১৭ থেকে চালু এসবিআই-এর এ, বি ও সি জোন বন্ধ করে সমস্ত চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের এ জোন-এর বেতন দিতে হবে
৪) চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের দিয়ে সব ধরনের কাজ করানো ও অতিরিক্ত সময়ে আটকানো চলবে না।

সম্মেলনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্যরা উপস্থিত হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন
এদিনের সম্মেলনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্যরা উপস্থিত হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। ছিলেন কলকাতার বিভিন্ন রিজিয়ন, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, হুগলি, বাঁকুড়ার সদস্যরা। তাঁদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে যে বিষয়গুলি বারেবারে উঠে আসে সেগুলি হল –
- ১৮ থেকে ৬০ বছর নারী, পুরুষ চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হন। ম্যানেজার-এর চাপ, নিজেদের চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তাঁদের নির্দিষ্ট কাজের বাইরে প্রচুর কাজ করতে হয়। এই মানসিক চাপ যাতে আর না থাকে সেই নিয়ে ইউনিয়নকে কাজ করতে হবে।
- চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের লকারের চাবিতে হাত দেওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু ব্যাঙ্কের স্থায়ী কর্মী, আধিকারিকেরা অনেক সময়েই তাঁদের এই কাজে বাধ্য করেন।
- ইউনিয়নকে কাজ করতে হবে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের বোনাস কী হবে, এবিসি জোন-এর ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে সে বিষয়গুলি নিয়ে।
- এমন কর্মচারীরাও বক্তব্য রাখেন যাঁরা সাময়িকভাবে কাজ হারিয়েছেন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ বা আধিকারিকদের সঙ্গে মতান্তরের কারণে। অথচ যাঁরা ভরসা রাখছেন ইউনিয়ন-এর অবস্থানের জন্য, ভরসা রাখছেন আবার কাজ ফিরে পাওয়ার। “ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সঙ্গে ঝামেলায় আমাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন আছে বলে সাহস আর বিশ্বাস আছে যে, কাজ আবার ফিরে পাবই,” বললেন এক তরুণ চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী।
- এসবিআই কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজমেন্ট-এর দ্বিচারিতা নিয়ে মুখ খোলেন প্রায় সকলেই। এক ধরনের ভয় চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের মধ্যে এই বিষয়ে কাজ করে যেত। ব্যাঙ্ক চৌহদ্দির মধ্যে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বা হাউসকিপিং-এর কাজ যা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট তার বাইরে যাবতীয় কাজ করানো হয় তাঁদের দিয়ে। বক্তব্যে উঠে আসে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিন দশক, চার দশক ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার হিসাবে কাজ করেছেন যাঁরা, তাঁদের স্থায়ী না করার জন্য চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের রূপান্তরিত করা হয়। সমস্যা দেখা দেয়, যখন তাঁদের দিয়ে নির্দিষ্ট কাজের অতিরিক্ত করিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ব্যাঙ্কের কর্মী’ বলা হয় আর অন্যদিকে চুক্তি-কর্মীরা যখনই নিজেদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার কথা জানান, তখনই বলে দেওয়া হয়, এগুলি অন্যায়, কারণ তাঁরা আদপে ব্যাঙ্কের কর্মীই নন। বাইরের কোম্পানির দ্বারা তাঁদের নিয়োগ হয়েছে। ফলত এই শোষনে, ম্যানেজমেন্ট-এর বিরূদ্ধে লড়াইকে একভাবে পুঁজিবাদের বিরূদ্ধে লড়াই বলেই দেখছেন ইউনিয়ন-এর সদস্যরা।
- কর্মচারীরা জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কোম্পানির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই এই রিক্রুটিং কোম্পানিগুলি কর্মচারীদের প্রাপ্য মাইনের টাকা নিয়ে বঞ্চনা করছে। একটি সুনির্দিষ্ট কোম্পানি যেমন নিয়োগ হওয়া কর্মচারীদের চার মাসের টাকা আত্মসাৎ করে চলে যায়। কোম্পানি পিএফ, ইএসআই কিছুই দেয় না, তারা কোনো রকম তহবিল হস্তান্তর করে না, এমনকি কর্মচারীদের অবসরের পরেও নয়। যা কিছু কর্মচারীদের নিজেদেরই করতে হয়। তাই শুধু ইউনিয়ন নেতৃত্ব নয়, তার সদস্যদেরও নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার ভাবনাটি গুরত্ব পায় এই আলোচনায়।
- এই চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের কোনোও টাইম টেবিল থাকে না। থাকে না ছুটির নির্দিষ্ট সময়। অথচ চুক্তিভিত্তিক হওয়াতে অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইম-এরও কোনো প্রশ্ন ওঠে না। অন্যদিকে সিজিএম, ডিজিএম-রা যখন ব্যাঙ্ক পরিদর্শনে আসেন, তখন প্রথমেই এই চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের হাউজকিপিং-এ খুঁত ধরা হয়। এক কর্মী বলেন, “এতটাই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, বিকেল ৫টার পর আর মাথা-শরীর কাজ করে না। আমাদের সময়ে ছুটি দিতে হবে। ওভারটাইম দিতে হবে। ফ্রিতে কেন খাটব? না আমাদের সংগঠন না কোনো কর্মী – কেউ শোষন বরদাস্ত করবে না। হাম মনুষ্য হ্যায়, মেশিন থোড়িই না হ্যায়!”
- পশ্চিম বর্ধমান জেলার এক সদস্য যেমন জানান, গত মে-জুন মাসে, দু’মাস কাজ করার পরেও কোম্পানি টাকা আটকে রেখেছিল। অ্যাসোসিয়েনশন দায়িত্ব নেওয়ার পর টাকা ফেরত পাওয়া যায়। তিনি যোগ করেন, “অন্যায়ভাবে কেন টাকা আটকানো হবে? স্থায়ীকরণের লড়াইয়ের পাশাপাশি সংগঠনকে শক্তিশালী করার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই শ্রমিক স্বার্থ রক্ষিত হবে।“
চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক প্রথার জন্য ব্যাঙ্কের স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ব্যাঙ্ককর্মীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সারা দেশে ধর্মঘট হয়। অধিবেশনে প্রশ্ন ওঠে এই ধর্মঘট যাঁরা করলেন সেই স্থায়ী কর্মীরাই অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নেন ও প্রতিবাদ করলে শুনতে হয় – “আপনারা কি মাইনে পান না?”-র মতো অপমানজনক কথা, তাহলে তাঁরা নিজেদের দাবিতে উপভোক্তা পরিষেবা ব্যহত করে যখন ধর্মঘট করছেন তখন একই প্রশ্ন স্থায়ী কর্মীদেরও কেন করা যাবে না? চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা সি ক্যাটাগরিতে কাজ করে, ৮ ঘন্টা ডিউটির শেষে পান ১৩০০০-১৪০০০ টাকা বেতন। বহু ক্ষেত্রেই সামাজিক লজ্জায় ব্যাঙ্কে চাকরির কথা বলতেও পারেন না, ঋণ-কর্জে জড়িয়ে পড়েন, বাকি রয়ে যায় দেনা। অন্যদিকে রয়েছে নিয়োগকারী কোম্পানিগুলির অসততা। উপযুক্ত পরিমাণ টাকা খরচ না করে, নিম্নমানের পোশাক দেওয়া হয় এই কর্মচারীদের, যা পরে বেশিদিন কাজ করতে পারেন না তাঁরা, শারীরিক অস্বস্তি তৈরি হয়। “সেই পোশাক না পরলেই অফিসারদের প্রশ্ন শুরু হয়ে যায় – পোশাক কই? আই ডি কই? এগুলো সব ঠিকঠাক পরলে নিয়ম মেনে শুধু আমাদের নির্দিষ্ট কাজই করব। চলবে তো?” সাফ প্রশ্ন এক কর্মচারীর।
অ্যাসোসিয়েশন-এর অন্যতম উপদেষ্টা নির্মল পোদ্দার যেমন মনে করেন, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের অধিকার বাঁচানোর জন্য ইউনিয়ন ছাড়া কেউ নেই। কারণ এসবিআই ম্যানেজমেন্ট কর্মী-বিরোধী মনোভাবের। অন্যদিকে স্থায়ী ব্যাঙ্ক-কর্মীরা যে ধর্মঘট করছেন সেখানে তাঁরা ন্যায্য পিএফ বা গ্র্যাচুইটির দাবি নয়, করছেন ব্যাঙ্কের লভ্যাংশের দাবি! যা তাঁদের আসলে ম্যানেজমেন্ট-এর অংশ করে তুলছে। তাঁরা পাঁচ দিনের সপ্তাহ চাইছেন, অথচ নিজেদের অস্থায়ী সহকর্মীদের স্থায়ীকরণের দাবি তুলছেন না। অথচ ধর্মঘটের যে ছবি তাতে ঝাণ্ডা হাতে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে। কারণ এইসব সময়ে ডাক ওঠে – ব্যাঙ্কের সব কর্মচারী এক হও। স্থায়ী কর্মীরা বাই-পার্টি আলোচনায় যদিও বা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের দাবি রাখে, কিন্তু দাবি-দাওয়া সইসাবুদের সময় সেই দাবিগুলি আর থাকে না,” স্পষ্ট জানালেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন-এর অন্যতম উপদেষ্টা নির্মল পোদ্দার
তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলি, বিশেষত চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের ইউনিয়নগুলি অত্যন্ত ব্যবসায়িক মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতৃত্বে থাকতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের। একাধিপত্য চালাতে দেখা যায় চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের দু’টি বা তিনটি ইউনিয়নকেই। অধিবেশনে শোনা যায় এমনটাও যে রাজ্যে সরকার বদলের পরেই চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ইউনিয়ন খোলার আগ্রহ তৈরি হয়েছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আখের গোছাতে। সেই কারণেই এসবিআই কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর কার্যপদ্ধতিতে শুধু নিয়োগ নয়, তা স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন রাখা, যে জেলাগুলিতে এখনোও ইউনিয়ন নেই, সেখানে সংগঠন গড়ে তোলা, বোনাস-গ্র্যাচুইটি-পিএফ নিয়ে লাগাতার কাজ করে চলা এবং সদস্যদের মধ্যে আইনি সচেতনতা তৈরি করার উপর জোর দেওয়া হয়। সম্প্রতি দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা তালিকায় যুক্ত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ওড়িশা জেলাতেও অ্যাসোসিয়েশন-এর কাজ শুরু হবে।
অপর উপদেষ্টা নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দেন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে সামগ্রিকভাবে সিস্টেম-এর বিরূদ্ধে, যে সিস্টেম-এ এক দলের মুনাফা বাড়তে থাকে ও অপর পক্ষকে ঠকিয়ে সেই মুনাফা আত্মসাৎ করা হতে থাকে। বিপুল পুঁজির পাহাড় জমতে থাকে ও শ্রমিক শ্রেণীর শ্রম লুট হয়ে চলে।

অ্যাসোসিয়েশন-এর অন্যতম উপদেষ্টা নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়
উল্লেখ করা যেতে পারে এসবিআই ম্যানেজমেন্ট ও এসবিআই কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর মধ্যে শুরু হয়েছে আইনি লড়াই। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা গণ ডেপুটেশন দেওয়ার কথা জানালে ম্যানেজমেন্ট তাতে রাজি না হয়ে বরং কলকাতা হাইকোর্টে যান। তাঁরা ভয় পায়, চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীরা সকলে চলে আসলে ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখার দৈনন্দিন কাজই বন্ধ হয়ে যেতে পারে! শেষ পর্যন্ত ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে কর্মচারীরা প্রতিনিধিত্বমূলক ডেপুটেশন দেন ও দাবিপত্র পেশ করেন। গত ১০ অগাস্ট কিছু রয়ে যাওয়া ইস্যু নিয়ে পুনরায় বৈঠকও হয়। এই প্রথম্বারের জন্য চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের সঙ্গে ম্যানেজমেন্ট-এর এক টেবিলে বসে দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত বৈঠক হয়। যেখানে উঠে আসে বদলি বা বসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কীভাবে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের ‘কোর এরিয়া’র বাইরে কাজ করানো হয়।
এই মামলার সূত্র ধরেই উপস্থিত ছিলেন এই মামলার দুই আইনজীবী শামিম আহমেদ ও তাপস মাইতি। শামিম আহমেদ যেমন বলেন চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক কথাটি লেখা মানেই সাংবিধান অবমাননা। চুক্তিভিত্তিক লেখা মানেই শ্রমিকের শ্রমের অবমূল্যায়ন করা। তাঁরা কাজের মূল্য পান না, স্বল্প শ্রমমূল্য দেওয়া মানে সামগ্রিকভাবে শ্রমের মূল্য কমিয়ে দেওয়া। একই অফিসে কাজ করেও স্থায়ী-অস্থায়ী বিভেদের ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়, যা ভারতের সংবিধানের আর্টিকেল ১৪ বিরোধী। তিনি মনে করিয়ে দেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সবই খর্ব করছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এমতাবস্থ্যয় সংবিধানকেই ‘লিভিং’ ডকুমেন্ট হিসাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আইন হবে এমন যা দুর্বলের পক্ষে থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকি বিচারব্যবস্থার মধ্যেও চলে এসেছে। কিন্তু আইনজীবী আহমেদ জোর দিয়ে বলেন আইনি ও রাস্তার লড়াই দুই পথেই বন্ধক শ্রম বন্ধ করার আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

আইনজীবী শামিম আহমেদ
আইনজীবী মাইতিও একই স্বরে জানান চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা সংবিধান স্বীকৃত নয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চেই বলা হয়েছে সংবিধানের ভিত্তিমূলক গঠন ভাঙা যাবে না, সেভাবে কোনো আইন তৈরি করা যাবে না। অন্যদিকে পুঁজিবাদ আইনি কারসাজিতে শ্রমিকদের শোষন করে চলেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে সরকারী ব্যবস্থাপনায় ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ চলবে না। অথচ এসবিআই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হওয়া স্বত্ত্বেও সেখানে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ চলছে। সংবিধানের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। এসবিআই এক্ষেত্রে যুক্তি দেবে তারা সরাসরি নয় নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ করছে। এর মানে, কাজগুলি অত্যাবশ্যক, জরুরি কাজ। তাহলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী স্থায়ী নিয়োগ করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিকেরা এই চুক্তি মেনেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন যা এক প্রকার বাধ্যতামূলক শ্রম। এই বিষয়গুলি জানা-বোঝার জন্যই আইনি সচেতনতা প্রয়োজন।

আইনজীবী তাপস মাইতি
এদিনের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে অ্যাসোসিয়েশন-এর নতুন কার্যনির্বাহী ও উপদেষ্টা কমিটি ঘোষণা করা হয়। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত হন অমিত মজুমদার।
অধিবেশনে আওয়াজ ওঠে, দিল্লির যন্তর-মন্ত্ররে ছাত্র-যুবদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের মতোই নিজেদের দাবি আদায়ে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরাও রাজধানীর বুকে যন্তর-মন্তরে এমন আন্দোলন করা হবে। কোনো রকম অসম্মানজনক, বেআইনি পথে নয়, আইনি ও গণতান্ত্রিক পথেই এসবিআই কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ ও অন্যান্য দাবি আদায়ের লড়াই সামনা-সামনি হবে।

