গৌরি লঙ্কেশ-এর পথে হেঁটে সাংবাদিকতার সাহসের নাম শাহিন, নাফিসা 


  • September 5, 2026
  • (0 Comments)
  • 143 Views

শাহিন, নাফিসার শরীরের প্রতিটি কালসিটে মনে করিয়ে দিক গৌরি লঙ্কেশ-এর লাল রক্তর কথা। আসলে তো ভয় নয়, সাহসই সংক্রামক।    

 

সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

ম্যায় এক ভারতীয় মুসলিম মহিলা পত্রকার হু।”

“আমি একজন ভারতীয় মুসলমান মহিলা সাংবাদিক।”

“I am an Indian Muslim woman Journalist.”

 

মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ব্যাখ্যাতীত ট্রমা-য় আক্রান্ত, প্রবল শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত সাংবাদিক নাফিসা খান, যখন সাংবাদিক সম্মেলনে বসে এ কথা বলছেন তখন তাঁর গলা কাঁপছে। কিন্তু সেই সাহসী গলার স্বরটুকু এতটাই জোরালো যে তা কাঁপিয়ে দিয়েছে এই দেশের, ভারত রাষ্ট্রের মাথা থেকে পা। 

 

এর ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে, দিল্লি পুলিসের হাতে চরম নিগৃহীত হওয়ার পর, লাথি, চড় এবং লাঠির নৃশংস আঘাতে সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে তিনি যখন প্রায় সংজ্ঞাহীন, তখন বাড়ির মানুষের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছেন, তখন কেন তাঁকে মারা হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে আতঙ্কে ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখে তাকিয়ে থেকে এক নাগাড়ে আউড়ে যাচ্ছেন – ‘মুসলিম, মুসলিম, মুসলিম’।

 

কথায় বলে ভয় কেটে গেলে আর ভয় থাকে না। ফোর পিএম ইউ টিউব চ্যানেল-এর সাংবাদিক শাহিন খান আর নাফিসা খান দেখিয়ে দিয়েছেন ভয়ের মুখে, চরমতম আতঙ্কের মুখে কীভাবে সবটুকু সাহস এক করে রুখে দাঁড়াতে হয়। এবং মহিলা ও ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান হওয়ার এই আন্তঃসম্পর্ক পেশাগরভাবে সাংবাদিক পরিচিতির থেকে যে আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়, তা এরচেয়ে স্পষ্টভাবে সম্ভবত আর বোঝার কোনো উপায় নেই। সাংবাদিক পরিচিতির সঙ্গে কেন লিঙ্গ পরিচিতি, ধর্ম-জাত-বর্ণের পরিচিতি সবকিছু জুড়ে যাচ্ছে, রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের স্বাধীন, সৎ, সাহসী, বস্তুনীষ্ঠ গণমাধ্যমের টুঁটি যেভাবে টিপে ধরছে, তার রোজকার চিত্রটা সামনে আসলেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শাহিন আর নাফিসার ঘটনা  আবারও দেখিয়ে দেয় সরকার বাহাদুরের চোখে চোখ রেখে কথা বললে তার মাশুল গুনতে হয়।

 

তবে সাহসী শব্দটা শুধু বইতেই থাকে না। পুলিসি হেফাজতে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর, সেখানে প্রাথমিকভাবে হেনস্থার পর যখন ধর্মীয় পরিচয় ঘটনাচক্রে জানতে পারে কর্তব্যরত পুলিসেরা তখন সেই পরিচয় তুলেই বলা হয় তাঁদের এবার আরো বেশি নির্মমভাবে মারা হবে। জল চাইলে বলা হয় পিপাসার্ত রেখেই মেরে ফেলা হবে। টানা ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট ধরে চলে নৃশংস মার। যার চিহ্ন দগদগে হয়ে আছে শাহিন আর নাফিসার সারা গায়ে। 

 

মার খেয়ে প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় থাকার পর পরিবার, সহকর্মী, আন্দোলনকর্মীরা আসার পর, শাহিন বুম হাতে উঠে দাঁড়ান। সামনে কাওকে ফোন ধরিয়ে বলেন, “আপ রোল কিজিয়ে”। যে থানায় যে পুলিস কর্মীরা তাঁদের স্রেফ মুসলমান হওয়ার জন্য, সাংবাদিকতার আদর্শ মেনে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কিছু প্রশ্ন করতে চাওয়ার ‘অপরাধে’ বেআইনিভাবে তুলে এনে মারতে মারতে প্রায় মেরেই ফেলছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজে নিজেদের ঘটনা ও সেই সময়ের পরিস্থিতির রিপোর্টিং করেন। তুলে ধরেন সত্য, তথ্য, যা বিকৃত করার উপায় থাকবে না গোদী মিডিয়ার, যা একমাত্র প্রতিরোধ। উচ্চপদস্থ পুলিস আধিকারিককে মুখের উপর বলেন ‘অন ক্যামেরা’ – “আপনি আমাদের বাঁচাননি। আমরা কোনক্রমে বেঁচেছি।”

 

শাহিন, নাফিসার মতো সাহস, চূড়ান্ত আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে এবং যা নেমে এসেছে সরাসরি রাষ্ট্র চালিত পুলিসের মাধ্যমে, তা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার আবহেও বিরল। মনে রাখতে হবে তাঁদের পেছনে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেরও কোনোও তথাকথিত বড় ব্র্যান্ড নেই। তাঁরা একেবারেই তরুণ। কিন্তু জানেন, সাংবাদিকতার সঠিক পাঠ মেনে প্রশ্ন করার মতো কলজের জোর থাকতে হয়। সেই প্রশ্ন করার পরিণতি এমন হতে পারে। মরে গেলে তা যেমন সাংবাদিককে কীভাবে নিজের জীবন দিয়ে দাম দিতে হয়, তা সামনে নিয়ে আসে, তেমনি, শাহিন, নাফিসার মতো বেঁচে গেলে নিজেরাই প্রমাণ দিতে পারেন, কীভাবে ফ্যাসিস্ট, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রশ্ন গুঁড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু, হায়! বারেবারেই শাহিন, নাফিসারা ঋজু উঠে দাঁড়ান। 

 

দাঁড়াতেই হয়, কারণ সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের মতো হিন্দুত্ববাদী, রাষ্ট্র পোষিত গুন্ডার সাক্ষাৎকার নেয় হাসি মুখে, আন্দোলনরত ছাত্রীর বাবার মাথার খুলি ফাটিয়ে চৌচির করে দিয়েও গ্রেফতার হয় না, দিল্লি পুলিসের জুতো পরে ঘোরে, লক্ষাধিক টাকা মাস খরচের জন্য কীভাবে যেন এসে যায় – এসব কথা স্বতন্ত্রর সামনে বসে শোনে বিনা প্রতিবাদে, বিনা প্রশ্নে। এই সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই মার খেতে খেতেও, প্রাণ থাকলে হাতে বুম নিয়ে উঠে দাঁড়ান শাহিন। ভয় কাটিয়ে নাফিসা দেশ জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কানে পৌঁছায় এমন চিৎকারে বলতে পারেন – এই দেশে মুসলমান হওয়া কতটা বিপজ্জনক তিনি শুনেছিলেন, আর এবার দেখেও নিলেন, কিন্তু না তিনি নিজের পরিচয় ছাড়বেন, না সাংবাদিকতা। ধর্ম নিরপেক্ষ স্বাধীন ভারতের সংবিধান তাঁকে, তাঁদের সেই অধিকার দেয়।

 

৫ সেপ্টেম্বর গৌরি লঙ্কেশ-এর মৃত্যু দিবস। ৫ সেপ্টেম্বর এখন থেকে শাহিন আর নাফিসাকেও বারেবারে মনে করার দিন হয়ে থাক। বস্তারে, কাশ্মীরে, মণিপুরে যে মেয়েরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-আদিবাসী-মূলবাসী পরিচয় নিয়েই স্বাধীন সাংবাদিকতা করছেন তাঁদের মনে করার দিন হয়ে থাক। আজ এত বছর পর  – ‘গৌরি হম শর্মিন্দা হ্যায়/ তেরে কাতিল আভি জিন্দা হ্যায়’ এই কথার পাশাপাশি আমরা বলতে পারি “গৌরি হাম আভি ভি উম্মিদ পে খাড়ে হ্যায়/শাহিন, নাফিসা আভি জিন্দা হ্যায়’। হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র যতবার সৎ সাংবাদিকতা হত্যা করবে, করার চেষ্টা করবে, শাহিন, নাফিসার মতো কেউ ঠিকই বেঁচে উঠবেন। শাহিন, নাফিসার শরীরের প্রতিটি কালসিটে মনে করিয়ে দিক গৌরি লঙ্কেশ-এর লাল রক্তর কথা। আসলে তো ভয় নয়, সাহসই সংক্রামক।    

 

Share this
Leave a Comment