উচ্ছেদ প্রতিরোধে আইনি ও রাস্তার লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে বস্তিবাসীদের কনভেনশন কলকাতায়


  • August 24, 2026
  • (0 Comments)
  • 225 Views

কনভেনশন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধা ছিল শ্লোগানের যে সুরে – “এই লড়াই জিতবে কে/ বস্তিবাসী আবার কে!”

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

“পুঁজিপতিদের কোলে/সরকার বাহাদুর দোলে”

“বুলডোজারের সরকার/আর নেই দরকার”

“জাত-ধর্ম বাদ দে/ভুখা পেটে ভাত দে”

“কেউ খাবে আর কেউ খাবে না/তা হবে না তা হবে না”

 

এক বার নয়, বারবার এই শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠছিল ছোট্ট ঘরটি। ২০০-র বেশি মহিলা জমায়েত হয়েছিলেন গত ২২ অগাস্ট দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ার কমিউনিটি হল-এ ‘মাথার ছাদের কনভেনশন’-এ। পুরুষেরাও ছিলেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন মহিলারা। অধিকাংশই ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা রোডের বাসিন্দা। ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচে বস্তি এলাকার বাসিন্দা। আর তাই তাঁদের কাছে পৌঁছেছে উচ্ছেদের নোটিস। টানা ২১ দিন অবস্থান বিক্ষোভ, প্রবল বৃষ্টির মাঝে হাঁটু জল ভেঙে এলাকার মধ্যে চারটি বড় মিছিল সংগঠিত করার পাশাপাশি এই ঠিকানার বস্তির বাসিন্দারা আইনি পথেও হেঁটেছেন এবং সেই নাছোড় লড়াইয়ের জন্যই এখনোও পর্যন্ত আইনিভাবে আটকাতে পেরেছেন এই উচ্ছেদ।

 

গত জুন-জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া এই উচ্ছেদ প্রতিরোধ নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা, লড়াইয়ের অভিমুখ ঠিক করা, ইত্যাদি নিয়েই ছিল এদিনের বাসস্থানের অধিকার ও উচ্ছেদ প্রতিরোধ কনভেনশন। আয়োজনে ছিলেন বাসস্থান-উচ্ছেদ প্রতিরোধে শামিল ঢাকুরিয়া, পঞ্চানন তলা সহ শহরের বস্তিবাসীরা ও অসংগঠিত ক্ষেত্র শ্রমিক সংগ্রামী মঞ্চ। দীর্ঘ প্রায় দু’মাস ধরে যে আন্দোলন চলছে, তাতে এই বস্তির বাসিন্দাদের ঐক্যবদ্ধ করে, প্রতিরোধ করতে ও আইনি পথে যেতে অন্যতমভাবে সহায়তা করেছে পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি, কারণ এই এলাকার বৃহৎ সংখ্যক মহিলাই গৃহ পরিচারিকার কাজ করেই জীবন-জীবিকা চালান, সংসার প্রতিপালন করেন, এদিনের কনভেনশন-এ শুধু ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা রোড-ই নয়, উপস্থিত ছিলেন ব্রেসব্রিজ, নিমতলা ও পার্ক সার্কাস এলাকার রেল লাইনেন ধারের বা ফ্লাইওভার-এর নীচে বস্তিতে বসবাসকারী মানুষেরাও উপস্থিত ছিলেন, যাঁরাও পেয়েছেন উচ্ছেদের নোটিস।

 

এই এলাকাগুলি থেকে আসা মহিলারা যখন নিজেদের বক্তব্য রাখছিলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল ক্রোধ ও প্রতিরোধের প্রকাশ। লড়াই ছাড়া এক ইঞ্চি জমি যে তাঁরা ছাড়তে নারাজ তা বারেবারেই উঠে আসছিল তাঁদের বক্তব্যে। একটি বিষয়ে জোর দিচ্ছিলেন উপস্থিত সকলেই – এইভাবে ব্রিজের তলায় ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হাজারো অসুবিধা সামলে তাঁরাও থাকতে চান না। তাঁরাও উঠে যেতে রাজি। কিন্তু এক ও একমাত্র শর্ত সরকারি পুনর্বাসন। আগে পুনর্বাসন তারপর উচ্ছেদ – এই তাঁদের দাবি। কারণ একবার উচ্ছেদ হয়ে গেলে পুনর্বাসন হয় পাওয়া যায় না, নয়তো সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেক দূরে, যেখানে জীবিকার জন্য যাতায়াত, বাচ্চাদের পড়াশোনার অসুবিধা তেমন জায়গায় পুনর্বাসন দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। বর্তমান ঠিকানা থেকে সরিয়ে দিলে বা যদি তাঁদের পার্শ্ববর্তী জেলায় থাকা বাড়িতে চলে যেতে হয়, তাহলে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা খরচ করে শহরের কেন্দ্রে কাজ করতে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনিশ্চিত হয়ে পড়বে রোজগার।

 

বস্তিতে থাকেন যে মহিলারা তাঁরা একটা কথাই বারেবারে বলছিলেন নিজেদের মৌলিক অধিকারের কথা,

 

“আমরাও কেউ এখানে থাকতে চাই না। আমাদের ঘর দিক সরকার আমরা উঠে যাব। আমাদের বাচ্চারা বলছে আমরা স্কুলে যেতে পারব কি? আমরা সরকারকে জিজ্ঞেস করছি আপনারা কি আমাদের বাচ্চাদের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিতে পারবেন? সরকার বলছে আমরা সরকারি জমিতে বসবাস করি। আমরাও সরকারকে পালটা প্রশ্ন করব, “এতো গরিব মানুষ হচ্ছে কেন? তাঁদের নিজেদের ঘর নেই কেন? তাঁদের কোনোও কাজ নেই কেন? তাঁরা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই কেন করছে? আমরা তো ভিক্ষা বা কারোর দয়া চাই না। আমরা চাই আমাদের অধিকার। আমরা এত কম টাকা রোজগার করি, যে, বাড়িভাড়া দিয়েও আমাদের পেটে আর খাবার জোটে না। সরকার যদি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারে, তবে সে কীসের সরকার?”

 

এদিন উপস্থিত বিভিন্ন বস্তি এলাকার অধিকাংশ মানুষই যে কথাটি বারেবারেই বলছিলেন, তা হল গত সরকারের নানাবিধ দুর্নীতি ইত্যাদির কারণে পরিবর্তন আনতে তাঁরা নির্বাচনে ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু নতুন সরকারের একশ দিনের মধ্যেই তাঁরা বুঝতে পারছেন এই সরকার দরিদ্র মানুষদের বিরোধী, ‘সরকার পরিবর্তন করতে গিয়ে, আমাদেরই পরিবর্তন করে দিচ্ছে’। সরকার হিসাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের ভোট পেয়েছেন বলেই সরকার গঠন করতে পেরেছেন, সুতরাং তাঁদের দায়িত্ব এই নাগরিকদের মাথার উপর ছাদ ও জীবিকা সুনিশ্চিত করা। তাঁরা বলছেন –

 

“আমরা তো দেশের নাগরিক, আমরা তো ভোট দিই। সরকার যদি বলে আমরা অবৈধ, তাহলে আমরাও সরকারকে বলব – সরকার আমাদের ভোটে জিতে আপনি নির্বাচিত আপনিও তাহলে অবৈধ।”

 

এদিনের কনভেনশন-এ শুধু বস্তিবাসী মানুষেরা নন, উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সংগঠনের মানুষেরাও। প্রত্যেকেই এই প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে, সামাজিকভাবে তার পাশে থাকার, আইনি লড়াইতে প্রয়োজনে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে সব ছাপিয়ে বারেবারে যা উঠে আসে তা হল, এই বস্তিবাসী মানুষদের, বিশেষত মহিলাদের, যাঁরাই মুখ্যত এই পরিবারগুলির রুটি-রুজির দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের প্রবল আত্মবিশ্বাস, জেদ ও প্রাণশক্তি। বক্তব্যের মাঝেমাঝেই এই শ্রমজীবী মহিলারা শ্লোগানের জোরালো আওয়াজ “আমরা সবাই কী চাই/মাথার উপর ছাদ চাই” আর উদাত্ত কণ্ঠের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আর সরকারের তীব্র সমালোচনার গানে মুখরিত করে তুলছিলেন কনভেনশন। বলছিলেন,

 

“আমাদের কোর্টে কেস চলছে। তবুও আমরা এক। আমরা পেছাবো না, আমরা ভাঙব না, আমরা ভয় পাব না। আমরা সরকারকে বলছি আমরা একা নই, আমরা সবাই একসঙ্গে রয়েছি। আমাদের শক্তি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা একসাথে লড়ব।”

 

হাতে হাতে কাজ, পেটে পেটে ভাত, মাথার উপর ছাদ – এই দাবি নিয়েই কনভেনশন-এর বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়। কারণ থাকার জায়গার সঙ্গেই এই প্রতিটি বিষয় সম্পর্কযুক্ত। শ্রমজীবী মহিলারা দৃঢ় কন্ঠে জানান, তাঁদের উচ্ছেদের জন্য সরকার যে এতটা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, অথচ তাঁরা ভুলে যাচ্ছে যে তাঁদের জন্যই সরকার চলছে। শহর থাকছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। “আর কলকাতা পরিষ্কার করার কথা হচ্ছে গরীব মানুষদের বিরূদ্ধে। কারণ আমরা যদি বাসা বাড়িতে কাজ না করতাম…আমরা গরীব মানুষ, আমরা সব জায়গায় সব কাজটুকু করি দেখে সরকার টিঁকে আছে, কলকাতা শহরটা টিঁকে আছে। পরিচারিকার কাজ করে গরীব মানুষ, জুতো সারায় গরীব মানুষ। আমাদের মাথায় ছাদের ব্যবস্থা করে দিলে আমরা নিজেরাই চলে যাব।” বস্তিতে জল, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, রোদ-বৃষ্টি-শীতে বসবাসের সমস্যা সব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা জীবন-জীবিকা বাঁচাতেই এমনভাবে থাকতে বাধ্য হন। সরকার তাঁদের সুস্থ ও সুরক্ষিতভাবে, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পুনর্বাসন দিলে তাঁরা বস্তি ছেড়ে দেবেন বলে জানান।

 

৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা রোড-এর বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ আটকাতে হাইকোর্টে যে মামলা দায়ের হয়েছে তা লড়ছেন আইনজীবী দীপ্তাংশু কর। তিনি জানান, গত তৃণমূল সরকারও বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করতে এগোলেও, নব নির্বাচিত বিজেপি সরকারের ভূমিকা অনেক বেশি আগ্রাসী। ব্রেসব্রিজ রেল স্টেশন, নিমতলা শ্মশান সংলগ্ন চক্ররেলের ধারের বস্তি উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়। উচ্ছেদ আটকাতে মামলা করা হলে, হাইকোর্টের রায়ে তা ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটকানো সম্ভব হয়েছে। রেল-এর জমিতে যাঁরা বসবাস করেন বা হকারি করেন, তাঁদের উচ্ছেদের বিরূদ্ধে প্রায় প্রতিটি মামলাতেই হাইকোর্ট স্টে অর্ডার দিয়েছে, অর্থাৎ সুরক্ষা দিয়েছে। যা প্রমাণ করে বর্তমান সরকারের উচ্ছেদের যে পন্থা তা আইনিভাবে সঠিক নয়। ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের উচ্ছেদের মামলা আলাদা এই কারণে যে এই উচ্ছেদের নোটিস এসেছে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন থেকে। দু’টি ধারা উল্লেখ করে, এই একই ধরনের নোটিস অন্যত্রও দেওয়া হয়েছে। দীপ্তাংশু নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই নোটিসে স্বাক্ষর করার ‘অথরিটি’ যাঁর তিনি না করে, উল্লেখ করা হচ্ছে – ‘হায়ার অথরিটি’ থেকে ইস্যু করা হচ্ছে। এই মর্মে এই নোটিসগুলির বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ হাইকোর্টে আছে। নোটিসগুলির আইনি বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট স্টে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানান,

 

“সরকারের জমি, আপনাদের মালিকানা নেই। অথচ আপনারা সেখানে বহু বছর ধরে বসবাস করছেন। সরকার, কেএমসি, পুলিস আপনাদের বলছে উঠে যেতে। প্রশ্ন হল এটা আইনিভাবে ঠিক কি না। আপনারা জানেন, সরকার কোনো কিছু বললেই তা যে ঠিক হবে এমনটা কিন্তু নয়। তাও বেআইনি হতে পারে। এক্ষেত্রে ৭ বা ১৪ দিনের নোটিসে যে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে তা বেআইনি, সেই কারণেই এধরনের সব মামলাতে স্টে পাওয়া গেছে।”

 

আইনজীবী ধর জানান, ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে যে সমস্যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় তা হল, তাঁদের রেশন কার্ড, আধার কার্ড – সরকারের দেওয়া সব পরিচয় পত্রে ঠিকানা ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা রোড হলেও, এবং তাঁরা আদালতে সই করে নিজেদের ঠিকানা তা বললেও কেএমসি-এর আইনজীবী দাবি করেছেন, এই ঠিকানাটি ব্রিজের নীচে নয়, বরং তার থেকে অনেকটা দূরে। এক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব। ব্রিজের নীচের বাসিন্দারা নিজেরাই বলেছেন জমির মালিকানা তাঁদের নয়, তাঁরা জমি দখল করে থাকতেও চান না। কিন্তু আগে পুনর্বাসন দিয়ে তারপর উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এবং তা সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়তেও উল্লিখিত। সংবিধানে বিস্তারিত না থাকলেও তার বিশ্লেষণে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট পরবর্তীতে বলেছে ছাদের অধিকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ। কারণ আমাদের দেশ কল্যাণকর রাষ্ট্র। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের কল্যাণকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া, মৌলিক অধিকার হরণ করে কোনোও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। তা বেআইনি, সংবিধান বিরোধী ও প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে আদালতে মামলা করার। তাছাড়া ছাদের অধিকারের লড়াই মাঠে-ময়দানে করাও মৌলিক অধিকার। পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করে উচ্ছেদ করে তা দিলে, এমনকি আদালতের পক্ষেও তাঁদের আশ্রয়, মাথার উপর ছাদ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্ছেদের আগে, তা আটকানোর জন্য আইনি প্রক্রিয়া তাই শক্তিশালীভাবে চালানো হচ্ছে। এমতাবস্থায় হাইকোর্ট এখনো পর্যন্ত খুব স্পষ্টভাবে বলেনি উচ্ছেদ থামাতে হবে বা তাঁদের উচ্ছেদ করা যাবে না। এই মামলাটি হাইকোর্ট সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। তার সাপেক্ষে পুলিস, কেএমসি ও অন্যান্য সরকারি দপ্তর, তারা যেন ঐ এলাকায় কোনো ধরনের উচ্ছেদ কর্মসূচী না নেয় – হাইকোর্টের রায়ের এটাই মূল নির্যাস। এবং আইনি লড়াই ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কর্মসূচী যতদিন চলবে তা করতে পারবে না।

 

মামলাটি ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে জানতে চাওয়ায়, তিনি বলেন,

 

“জজ মৌখিকভাবে বলেছিলেন একটি ইন্সপেকশন করে রিপোর্ট জমা দেওয়া হোক। সমস্যা হল অর্ডারে তা রেকর্ড করা নেই। ওরা এসে বলতে পারে অর্ডারে তা ছিল না, তবে অতটা সাহস হয়তো পাবে না। যেহেতু রেকর্ড করা নেই তাই হয়তো আরোও সময় নিচ্ছে। সময় নেওয়া হলেও এখন উচ্ছেদ সম্ভব নয়। ওঁরা রিপোর্ট দেবেন, তার এগেইন্সটে আমরা একটা এক্সেপশন জমা করব, সেই প্রসেস চলবে। তবে মামলা যতদিন চলবে ততদিন উচ্ছেদ হবে না। কারণ কোর্টের সামনে কেএমসি-র যিনি উকিল ছিলেন তিনি হলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল। তাঁর পদমর্যাদা ও কথার গুরুত্ব আছে। ওঁরা যদি কোর্টের প্রসিডিংস-এর পরেও উচ্ছেদ করে, তাঁরও ফেস লস হবে। ওঁরা সেটা করবেন না। বছরের পর বছর এই মামলাটি না চললেও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।”

 

এদিনের কনভেনশন-এ একটি প্রস্তাবনা প্রকাশ করা হয়। সেখানে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি হলঃ-

 

আমরা কারা?

 

আমরা হলাম কলকাতা শহরের সেই খেটেখাওয়া শ্রেণীর মানুষ, যাদের জন্য সরকারের নগর-উন্নয়ন পরিকল্পনায় কোনো স্থান নেই। আমরাই আবাসনগুলিতে নির্মাণকর্মী, পরিচারিকা, নিরাপত্তাকর্মী, দোকানে-বাজারে সহকারী, মুটেমজুর, সাফাইকর্মী, গাড়ির ড্রাইভার, আমারাই পথে পথে ঘুরে বেড়ানো ফেরিওয়ালা – আমরা ছড়িয়ে আছি শহর জুড়ে, অথচ আমাদের জন বাসস্থানের কোনোও ব্যবস্থা নেই। আমরা তাই থাকতে বাধ্য হই বসবাসের অযোগ্য, চরম অস্বাস্থ্যকরো বিপদসঙ্কুল বিপরীত পরিবেশে, যেমন রেললাইনের ধারে, উড়ালপুলের নীচে, হাইড্রেনের পাশে। আমরাই আছি ঢাকুরিয়াতে, ব্রেসব্রিজে, নিমতলায়, পাটুলিতে ও অন্যত্র।

 

আমরা কী করি?

 

আমরা এই শহর ও সমাজের চালিকা শক্তি। আমরা যেসব কাজ করি তা বৃহত্তর অর্থে শহরকে ও সমাজ-জীবনকে পরিষ্কার রাখতে, গতিশীল রাখতে, সুস্থ রাখতে ও সর্বোপরি নাগরিক পরিষেবা প্রদানে সহায়তা করে। আমরা প্রকৃত অর্থে গ্রুপ ডি কর্মীদের পর্যায়ের কাজ করি।

 

আমরা কী চাই?

 

চাই বাসস্থান, চাই বাঁচার জন্য জীবিকা। চাই বাসস্থানের অধিকার। চাই সরকারি গ্রুপ ডি পর্যায়ে কাজের স্বীকৃতি, সুযোগ-সুবিধা। চাই সরকার আমাদের পাশে থাকুক, আমাদের অধিকার রক্ষা করুক।

 

নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের দাবি –

 

১। কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্পের ব্যবস্থা না করে কোনো মানুষকে বাসস্থান ও রুটি-রুজি থেকে আইনের দোহাই দিয়ে উচ্ছেদ করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে

 

২। প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সরকারি কর্মীদের মতো সরকারি পে-কমিশন নির্ধারিত হারে মজুরি/বেতনে সারা বছর কাজের বা রোজগারের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে

 

৩। প্রত্যেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে

 

৪। প্রত্যেক পরিবারের জন্য মর্যাদা নিয়ে বাঁচার মতো মানবিক বাসস্থানের ব্যবস্থার গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে।

 

“আমরা চাই ‘হাতে হাতে কাজ, সব পেটে ভাত (খাদ্য), মাথার উপর ছাদ’ নিশ্চিত করা হোক। রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে এই কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা আশা করব তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে রাজধর্ম পালন করবেন।”

 

এদিনের কনভেনশন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধা ছিল শ্লোগানের যে সুরে – “এই লড়াই জিতবে কে/বস্তিবাসী আবার কে!”

 

 

 

Share this
Leave a Comment