উচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধের প্রাচীর তুলছেন ঢাকুরিয়ার বস্তির বাসিন্দারা


  • August 9, 2026
  • (0 Comments)
  • 91 Views

দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের বস্তির বাসিন্দারা মাথার ওপর ছাদ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। গত ১২ দিন ধরে উচ্ছেদ নোটিসের বিরূদ্ধে তাঁরা আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন।

 

“বিজেপি-কে ভোট দিয়েছিলাম তো আমরা সবাই। কিন্তু তারাই বুলডোজার চালাবে আমাদের ঘরে বুঝতে পারিনি।”

 

“আমাদের দেশের বাড়ি তো অনেক দূর, সেই পাথরপ্রতিমা। ওখান থেকে কাজে আসব কী করে! তাই তো এখানে ঘর করে থাকি।”

 

“আমরাই তো খেটে খাই। বেশির ভাগ বাড়ির ছেলেরা তো তেমন কাজ করে না। না খাটলে খাব কি? এখন তো টেনশনে রাতের ঘুম চলে গেছে।”

 

“বাবুর বাড়িতে বলছে, তোমরা গরীব মানুষ, কী করবে! তোমরা চলে গেলে আমাদের অসুবিধা হবে। তোমরা আসো বলে আমাদের ঘর পরিষ্কার হয়, রান্না হয় তোমাদের জন্যই তো চলে আমাদের। সরকারকে বলো তোমাদের এখানে একটা জায়গা দিতে, যাতে আমাদের বাড়িতে কাজে আসতে পারো।”

  

প্রায় ৩০০ জন মানুষ গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কায় রাত কাটাচ্ছেন। ৪৩টি পরিবার। কারোওর জন্ম বেড়ে ওঠা এখানেই, কারোর পাশের জেলাতেই বাড়ি থাকলেও কাজের জন্য এখানেই রয়ে গেছেন বছরের পর বছর। দূর থেকে কোলকাতা এসে কাজ করা সম্ভব নয় এই শ্রমজীবী মানুষদের। আর তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ শ্রমজীবীই মহিলা। দুশ্চিন্তা তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি। তাই প্রতিবাদে, প্রতিরোধে পথে নেমেছেন, অবস্থাবন করছেন তাঁরাই।

 

রত্না পড়ুয়া বলছিলেন,

“এত টেনশন, চাপের মধ্যে আছি যে কিছুই মনে থাকছে না। আমরা মেয়েরা বাবুদের বাড়ি কাজ করে এসে এখানে বসছি। আমরা আশা রাখছি ১০ তারিখ একটা সুখবর পাব। প্রশাসন তো আমাদের সঙ্গে থাকছে না। এত দিদিরা, সংগঠন আমাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন, ভালো কিছু হবে না, বলুন?”

এই চিত্র দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা বস্তির বাসিন্দাদের। গত ১২ দিন ধরে তারা রাজ্য সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত উচ্ছেদ নোটিসের বিরূদ্ধে প্রতিরোধে আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। বহু অনুরোধ ও চেষ্টা সত্ত্বেও দেখা হয়নি নগর উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, এলাকার বিধায়ক স্বপন দাশগুপ্ত কারোর সঙ্গেই। কলকাতা কর্পোরেশন-এর মেয়র পদত্যাগ করায় এই মুহূর্তে সরকারিভাবে সেখান থেকেও কোনোও সহায়তা মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে জোটবদ্ধ আন্দোলন ও বিভিন্ন শ্রমজীবী সংগঠনের মঞ্চ যোগদানের ফলেই উচ্ছেদ রোখার চেষ্টা করছেন এই বস্তির বাসিন্দারা। এর পাশাপাশি হাইকোর্টে মামলাও দায়ের করেছেন। যার রায় বেরোনো ১০ অগাস্ট।

 

 

৩৫ বছর এই বস্তিতে রয়েছেন হীরা কয়াল। আচমকা এই নোটিস পেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন,

“আমরা তো ভয় পাচ্ছি, আমরা কোথায় চলে গিয়ে কী করব! আমাদের কোনোও জায়গা নেই, ঠাঁই নেই। কোনোও সামর্থ্য নেই যে কোথাও গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকব। সেখানে ৫০০০ টাকা ভাড়া, ১০০০০ টাকা ডিপজিট। কোথা থেকে দেব? আমাদের স্বামীরা সেভাবে খাটতে পারে না। আমরা খাটতে পারলে, লোকের বাড়ি কাজ করতে পারলে খায়। আমরা ১০০০০ টাকা মাইনেই পাই হয়তো কোনো রকমে। আমাদের তুলে দিয়ে কোথায় গিয়ে থাকব? ১০ তারিখ কী রায় দেবে তাই নিয়ে খুব টেনশন হচ্ছে মাথার ভেতর। যবে থেকে নোটিস এসেছে আমাদের ঘুম নেই, খাওয়া নেই, বাড়িতে সবাই ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে এমন আশা করিনি। সবাই ভেবেছিলাম দেখা যাক এই সরকার এসে আমাদের কী হেল্প করে। কিন্তু আসামাত্রই যে এভাবে ঝাঁটা মারবে বুঝতে পারিনি।”

এই বস্তির বাসিন্দাদের সকলেই বলছেন, কেউই বুঝতে পারেননি, আচমকা এভাবে তুলে দেওয়ার খবর আসতে পারে। পাশের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে, সুন্দরবনে বসত থাকলেও, সেখান থেকে প্রতিদিন কাজে আসা তাঁদের পক্ষে সম্ভবই নয়।

 

এই বস্তিতে যাঁরা থাকেন তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ মহিলাই সংলগ্ন এলাকায় গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন এবং সেই সূত্রে পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতির সদস্য। তাঁরা যোগাযোগ করায় এই সমিতি উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। এই উচ্ছেদের বিরোধীতায় আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছেন সমিতির নেত্রী স্বপ্না ত্রিপাঠি।

 

যেভাবে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়, আন্দোলন শুরু হয়ে এগোচ্ছে তা অনেকটা এইরকম –

 

গত ২৭ জুন প্রথম ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা বস্তিতে উচ্ছেদের নোটিস পাঠানো হয়। তার আগে ঢাকুরিয়া ব্রিজের তলার দুই দিকে ৯০ ও ৯২ নম্বর ওয়ার্ডে কর্পোরেশন থেকে এনকোয়ারি, ছবি তোলা, তালিকা তৈরি করা হয়। নোটিস পাওয়র পর সদস্যরা সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আন্দোলনের পথেই হাঁটা হবে। ইতিমিধ্যে ২৭ জুনের নোটিস বস্তিতে সার্ভ করা হয় ২৯ জুন। বলা হয় ৩ জুলাইয়ের মধ্যে তাঁদের উঠে যেতে হবে।

 

এরপরেই তাঁরা দেখা করেন বোরো ৮-এর এক্সিকিউটিভ ইঞ্চিনিয়ার-এর সঙ্গে। তিনি সরাসরি জানান কলকাতা কমিশনার-এর কাছ থেকে নির্দেশ আসায় কিছুই করার নেই। কমিশনারের সঙ্গে তাঁরা দেখা করতে পারেননি। এলাকার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলার-এর সঙ্গেও তাঁদের দেখা হয়নি যেহেতু মেয়র-এর পদত্যাগের পর এই পদ্গুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। পদাধিকারী কারোওর সঙ্গে দেখা না হওয়ায় এরপরেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন কোর্টে যাওয়ার ও ১ তারিখ কোর্টে যান।

 

তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে ৩ তারিখের উচ্ছেদ আটকানো যায়। যদিও তাঁরা ১ তারিখ ডেট পাননি, ২ তারিখ লিস্টেড হলেও সেদিন তাঁদের শুনানি হয়নি। এরপরেই তাঁদের তরফে আইনজীবী পুলিস কমিশনার, কলকাতা কর্পোরেশন-এর কমিশনার, বোরো ৮-এর এক্সিকিউটিভ ইঞ্চিনিয়ার সকলকে চিঠি দিয়ে আবেদন করেন যে, যেহেতু তাঁদের বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন ফলত ৩ জুলাইয়ের উচ্ছেদ যেন স্থগিত রাখা হয়।

 

এরপর থেকেই কোর্টে মামলাটি চলছে, যেখানে বেশ কয়েক বার কলকাতা কর্পোরেশন অনুপস্থিত থাকে, তারপর উপস্থিত হয়, একবার জানায় বস্তির বাসিন্দারা যে ঠিকানা দিয়েছেন তা ঠিক নয়। এই দ্বন্দ্বের কারণে বিচারক জানান বাসিন্দাদের ছবি লোকেশন ট্র্যাকিং করে জমা দিতে হবে। তাঁরা যখন জিপিএস চালু করে ছবি তোলেন দেখা যায় ঢাকুরিয়ার রেল লাইনের দিকে লোকেশন ট্র্যাকিং-এর ছবিতে দেখা যায় কাঁকুলিয়া রোড, যখন অন্য দিক থেকে তোলা হয় দেখায় সাদার্ণ অ্যাভিনিউ। কোথাওই ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা দেখাচ্ছিল না। ফলে তা প্রমাণ করা যায়নি।

 

এরপর বিচারক জানেন আপডেটেড ভোটার কার্ড জমা দিতে। তাঁরা আপডেটেড ভোটার কার্ড রাতারাতি অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে জোগাড় করেন। সেই তালিকা, ইলেক্ট্রিক বিল, চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের নির্বাচন কমিশনের স্লিপ কোর্টে জমা করেন। তারপরেই বিচারক জানান, ব্রিজের তলায় থাকতে দেওয়া যাবে না।

 

স্বপ্না বলেন,

“আমরাও মেনে নিচ্ছি। ব্রিজের তলায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে আমরাও থাকতে চাই না। কিন্তু আমরা যাব কোথায়। এই শহরে আমাদের রুটি-রুজির স্বার্থে আমাদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক।”

ইতিমধ্যে গত ২০ জুলাই লিস্টেড না থাকলেও তাঁদের কেসটি কোর্টে তোলা হয়, কিন্তু সেদিন তা লিস্টেড না থাকায় আবেদনকারীদের আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না, ফলে পিটিশনার অনুপস্থিত বলে তা ডিসমিস করে দেওয়া হয়। ২২ তারিখ তাঁরা যখন আবার কোর্টে যান কেসটি লিস্ট আপ করার জন্য তখন জানতে পারেন, তাঁদের কেসটি অনুপস্থিতির জন্য ডিসমিস করে দেওয়া হয়েছে।

 

এবং ২৩ তারিখ এই বস্তিতে পুলিশ আসে ও জানিয়ে দেয় ২৭ তারিখের মধ্যে তাঁরা সরে না গেলে ২৮ জুলাই বুলডোজার চালানো হবে। ডিজি সিভিল-এর নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী এসে এই কথা জানিয়ে যান।

 

গৃহ পরিচারিকা সমিতির সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় অসংগঠিত ক্ষেত্র শ্রমিক সংগ্রামী মঞ্চ। সকলে মিলে আবার রিকল পিটিশন করা হয়, শুনানির তারিখ পড়ে, কিন্তু শুনানি হয় না। ২৭ তারিখও শুনানি করা সম্ভব না হয় ঐদিনই আন্দোলনকারীরা জনতার দরবারে যান, চেষ্টা করেন নগর উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের সঙ্গে দেখা করার। ডিজি সিভিল, কলকাতা কর্পোরেশন-এর কমিশনারের সচিব, লিগ্যাল সেল, নগরোন্নয়ন দপ্তরের হেল্পলাইন নম্বর – সব জায়গায় তাঁরা অনবরত যোগাযোগ চালিয়ে যান নিজেদের বাসস্থানটুকু বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয় না।

 

স্বপ্না জানালেন,

“তাহলে আমাদের এক জায়গায় বসতে হবে, একতাই শক্তি। আমরা যদি একসাথে না থাকি তাহলে আমাদের যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তাই ২৮ তারিখ থেকে আমরা ধর্ণায় বসলাম।”  

১ অগাস্ট পর্যন্ত তাঁরা পালা করে দিন-রাতের ধর্না চালান। ১ তারিখ শুনানি ছিল, যেদিন কলকাতা কর্পোরেশন অনুপস্থিত ছিল। বিচারক মৌখিক জানান ১০ তারিখের শুনানিতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে, এবং এই এলাকায় পুলিস কোনো জনবিরোধী কাজ করতে পারবেন না।

 

পুলিস তারপর থেকে এসেই ধর্না তুলে নেওয়ার কথা বলতে থাকে। আন্দোলনকারীরা জানান এই অঞ্চলের বিধায়ক ও রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলে ধর্না তুলে নেওয়া হবে।

 

“দেখুন এখানে সবাই বিজেপির সমর্থক। সবাই বিজেপিকেই ভোট দিয়েছিলাম যে আমাদের অন্তত পক্ষে রক্ষা করবে, আমাদের ভয়টা দূর হয়ে যাবে, ভরসা আমাদের ইন হবে। কিন্তু দেখা গেল ভরসা আমাদের আউট হল, ভয়টা ইন হয়ে গেল। মন্ত্রীর সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও দেখা পাওয়া যায়নি। পুলিস দায়িত্ব নিয়েছিল দু’দিনের মধ্যে বিধায়কের সঙ্গে দেখা করাবে, তা করায়নি। আমরা সরকারের আইন মানি। আমরা চাই সরকারও আইন মানুক। আমরা কোনোও হিংসাত্মক কিছু করছি না, শান্তিপূর্ণ অবস্থান চালাচ্ছি,” স্পষ্ট বক্তব্য স্বপ্নার।

আন্দোলনকারীদের সকলকেই রুটি-রুজির জন্য প্রতিদিন কাজে বেরোতে হচ্ছে। তাছাড়া গৃহ পরিচারিকা সমিতির সদস্যদের পুলিস এমন কথাও বলেছে যে তাঁরা বহিরাগত। ফলে পরিস্থিতির চাপেই তাঁরা সারা দিন-রাতের ধর্নার পরিবর্তে দুপুর দু’টো-আড়াইটে থেকে সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটা পর্যন্ত অবস্থান চালাচ্ছেন। যাতে যোগ দিচ্ছেন উচ্ছেদের বিরূদ্ধে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি মানুষেরা, অধিকার সংগঠন। চলছে উচ্ছেদের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে নাগরিক অধিকার বিষয়ে সচেতনতার প্রসার, আলাপ-আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর মধ্যে দিয়েই প্রতিরোধের ভাষ্য তৈরি করছেন খেটে খাওয়া মানুষগুলি, যার সিংহভাগ মহিলা। আন্দোলনকারীরা পুলিস, কলকাতা কর্পোরেশনকে বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তারা আইন ভেঙে যেকোনো সময় উচ্ছেদ শুরু করে দেবে না, তাই ১০ তারিখ শুনানির আগে পর্যন্ত তাঁরা অবস্থান, ধর্না চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১০ তারিখের দিকে নজর রেখেই তাঁরা বলছেন তাঁরা পুনর্বাসনের লড়াই চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন।

 

বছর ৩৩-এর তাপসী পারুই, জন্মেছেন এই বস্তিতেই, বিয়ের পর চলে গেছেন উত্তর প্রদেশ। গত মাসে এসেছিলেন স্বামী, ছেলেকে নিয়ে ছেলের স্কুলের ছুটিতে, বয়স্ক বাবা-মায়ের কাছে। এই পরস্থিতিতে ছেলের স্কুলের পড়াশোনার ক্ষতি হলেও মা-বাবাকে ছেড়ে ফেরত না যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তাপসী ও তাঁর স্বামী। তাঁর বাবা কোনোও কাজ করেন না, মা গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। “১০ তারিখ কোর্ট যদি পক্ষে রায় দেয়, তাহলে খুশি মনে ফেরত যেতে পারব, না হলে তো মা-বাবাকে এখানে রেখে চলে যাওয়ার প্রশ্নই নেই, ছেলের পড়াশোনার ক্ষতি হলেও।” এই রাজ্যে নতুন সরকারের আসাকে কীভাবে দেখছেন তিনি?

“দেখুন আমরা চেয়েছিলাম সরকারের পরিবর্তন করতে, সরকার তো আমাদেরই পরিবর্তন করে দিল। আমরা চেয়েছিলেম, আমাদের যেটা অধিকার সেটা দিক। আমরা কেন এখানে থাকতে চাইব? সরকারের সঙ্গে আমরাও চলতে চাই। সরকারকে ভাবতে হবে, আগে জনগণ তারপর আইন। আপনি যদি আগে আইন চালু করেন, তাহলে জনগণ তো দেখবে। জনগণই থাকল না তো আইনটা কীসের জন্য? সরকারের তো অনেক টাকা, সেখান থেকে আমাদের সাহায্য করতে পারেন না?” প্রশ্ন তাপসীর।

 

 

বাসিন্দাদের বক্তব্য একটা দীর্ঘ সময় এই এলাকার কোনোও উন্নতি হয়নি। গত কয়েক বছরে কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং তাই তাঁদের দাবি মতো পুনর্বাসন কোনো উন্নত জায়গাতেই দিতে হবে, যেখানে কাজের সুবিধা রয়েছে। ১০ তারিখের রায় নিয়ে তাপসীর অনুরোধ,

“জানি উল্টোদিকে বড়লোকেরা রয়েছেন। কিন্তু জজ সাহেব যেন আমাদের গরীবের কথা ভাবেন। আমাদের তো মৌলিক অধিকার রয়েছে, জন্মগত অধিকার। আমাদের তো টাকা নেই, সরকার আজ পর্যন্ত খোঁজও নেয়নি আমরা কী করে খাচ্ছি। কেউ হয়তো কাগজ কুড়িয়ে খাচ্ছে, কেউ ভিক্ষা করেও খায় এমনকি। তাতেও আমরা খুশি থাকি। সরকারের কাছে কোনোও অভিযোগ করিনি। তাহলে সরকারকেও আমাদের কথা শুনতে তো হবে।”

 

পম্পা শীলের বয়স ৩২। ৪০ বছর ধরে তাঁর পরিবার এই বস্তির বাসিন্দা। বাবা কোনোও কাজ করতেন না, মা ছিলেন গৃহ পরিচারিকা। বিয়েও হয়েছে এখানকারই মানুষের সঙ্গে, পেশায় যিনি ইলেক্ট্রিশিয়ান। পম্পা গৃহবধূ। কখনোও ভাবেননি এরকম নোটিস সরকার দেবে। বাড়িতে সন্তানদের পরীক্ষা চলছে। ঘরে-বাইরের টেনশন-এ বিধ্বস্ত অবস্থা।

“আমরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রেল লাইনের পাশে, ব্রিজের তলায় কেন থাকি? আমরাও চাই ভালো জায়গায় থাকতে। ছোট থেকেই তো কষ্ট করে আসছি। সবারই বয়স বাড়লে একটু আরাম লাগে। সরকার আমাদের মাথার উপর একটা ব্যবস্থা করে দিলেই আমরা উঠে যাব। এমন জায়গায় যেন পুনর্বাসন দেয় যেখানে কাজের সুবিধা থাকে, বাচ্চাদের স্কুল থাকে, ওরা বড় হচ্ছে যাতে ফ্রি-লি নিরাপদে রাস্তাঘাটে বেরোতে পারে সেরকম জায়গা হয়। এরকম যেন না হয় যে, দূরে কোথাও একটা ফেলে দিল ডাক্তারখানা, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, গাড়ি চলাচলের রাস্তা কোথাও কিছু নেই। শুনছি, যেসব জায়গা অচল, সরকার সেখানেই পুনর্বাসন দিচ্ছে। আমরা আগের সরকারকে খুব দুর্নীতি করতে দেখে, এই সরকারকে ভোট দিয়ে আনলাম, ভাবলাম এই সরকার আমাদের উন্নতি করবে, বাচ্চাদের উন্নতি করবে। কিন্তু এখন তো আপশোষ হচ্ছে,” একনাগাড়ে বলে গেলেন পম্পা।

 

ত্রিপুরা ঘাটা, ৬০ বছর বয়সে এখনোও এক বাড়িতে রান্না করার কাজ করে রোজগার করেন। এই বস্তিতে তাঁর হিসেবে প্রায় ৫০-৬০ বছরের বাস।

“আমাদের বাড়ির ছেলেরা তো আর চাকরি-বাকরি করে না। নিজেদের বৌ-বাচ্চাই সামলায় কোনো রকমে। যতদিন পারব নিজে রোজগার করে খেতে হবে। আমাদের এইটুকু এলাকার মধ্যে থেকে, কাজ করে জীবন চলে। দূরে পাঠিয়ে দিলে আমরা কী করে থাকব? কাজ করব কীভাবে? সরকারকে তো কাজের ব্যবস্থা, বাসস্থান দিতে হবে। জীবনে তো কোনোদিন এত আর্মি, পুলিস দেখিনি, তাই খুব ভয় করছিল। কিন্তু এখন যখন এত মানুষ আসছেন, তখন ভরসা পাচ্ছি যে, নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে।”

 

নিজেদের গ্রাসাচ্ছাদন জোগাড় করার জন্য এই আন্দোলনকারীদের যখন প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, তখন নতুন করে মাথার ওপর ছাদ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে তাঁরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কীভাবে সামলাচ্ছেন তাঁরা? “বেশিরভাগ এখানে ডোমেস্টিক ওয়ার্কার। কাজ না করলে তো পেট চলবে না। কাজও যাবে, ছাদও যাবে। আমাদের দেখতে হচ্ছে যাতে সব সময় ৩০, ৪০, ৫০ জন মানুষ বসে থাকেন। লড়াইটা ছাড়া যাবে না। তাই আমাদের এখন সকাল, দুপুর, বিকেলে পালা ভাগ করে টিম করে থাকতে হচ্ছে। কারণ অনেকে কাজ হারিয়েছেন অলরেডি। যার যখন সময় হচ্ছে তখন আসুক, তাহলেই লড়াইটা তাঁদের হবে। এখানে সবাই অসংগঠিত শ্রমিক, খাটলে সংসার চলে। এটা ডি এ-র আন্দোলন নয় যে, সরকার তাঁদের মাসে একটা মাইনে দেবে, তাই তাঁদের পেটের জ্বালা থাকবে না,” জানালেন স্বপ্না।

 

 

যে মূল দাবিগুলি উচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীরা তুলে ধরেছেন, তা হল –

 

  • বর্ষাকালে উচ্ছেদ করা যাবে না।

 

  • স্কুল পড়ুয়াদের পরীক্ষা শুরু হয়েছে ১ অগাস্ট থেকে। এই সময় উচ্ছেদের নোটিস দিয়ে মানুষের উপর, বাচ্চাদের উপর মানসিক অত্যাচার চালানো হচ্ছে। সমস্ত উচ্চ পদস্থ আধিকারিকদের জানানো হয়েছে এই সময়ে যেন উচ্ছেদ করা না হয়।

 

  • পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ চলবে না। এবং পুনর্বাসন দিতে হবে এই শহরের মধ্যে রোজগারের জন্য, বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর জন্য এবং যাতে একসঙ্গে সকলে থাকতে পারেন।

 

  • বুলডোজারের হুমকি দেখানো চলবে না। আতঙ্কে যেন দিন কাটাতে না হয়, যেন শান্তিতে বাঁচতে পারেন সকলে, তার ব্যবস্থা করুক সরকার।

 

  • এক তরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। মানুষ ভোট দিয়েছে, মানুষের সরকার তৈরি হয়েছে। সরকারকে মানুষের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।

 

উপরের দাবিগুলির কথা বলতে বলতেই স্বপ্না বলছিলেন, “এটাই তো গণতন্ত্রের নিয়ম, বলুন। কিন্তু আমরা দেখি, সব সময় উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমরা বলছি, তা চলবে না। নীচের কথা শুনতে হবে। উপরের কথা আসবে। মধ্যবর্তী একটা জায়গায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা পুনর্বাসন ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।”

 


লেখক একজন স্বাধীন সাংবাদিক এবং এবং গ্রাউন্ডজিরো সম্পাদকীয় দলের সদস্য।


Share this
Leave a Comment