বারুইপুর: সংকটের নিশানা


  • July 25, 2026
  • (0 Comments)
  • 23 Views

পশ্চিমবঙ্গের ধর্ষণবিরোধী রাজনীতি আজ গভীর পশ্চাদপসরণের মুখোমুখি। গভীর পশ্চাদ্পসরণের মুখোমুখি এই রাজ্যের মেয়েদের সার্বিক অবস্থা, সুরক্ষার প্রশ্ন।

 

নন্দিনী ধর

 

১৪ই মে, ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গের নব্-নির্বাচিত বিজেপি সরকারের নেত্রী তথা উপ-মুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সামাজিক গণমাধ্যমে ঘোষণা করলেন যে, “মেয়েরা যখন ইচ্ছা রাস্তায় বেরোবে। যতক্ষণ খুশি ঘুরবে। যেমন ইচ্ছে পোশাক পরবে। তাদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের।” বোধহয় কোথাও একটা এমন একটি ঘোষণা রাজ্য সরকারকে করতেই হতো। ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে কলকাতার আর.জি.কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসক “অভয়া”-র কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণ ও মৃত্যু পরবর্তী রাজ্যব্যপী “রাত দখল” আন্দোলন, বহুলাংশেই যার উপর নির্ভর করে নিজেদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করা ও নির্বাচন জেতা সরকারকে বোধহয় সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করতে গিয়ে এই কথাটা না বললে চলতো না। বিশেষত, “রাত দখল” আন্দোলন যে যে মাত্রায় সর্বজনীন ক্ষেত্রে মেয়েদের সুরক্ষার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছিল, এবং এনেছিল একজাতীয় নয়া-উদারনৈতিক নারীবাদে বিশ্বাসী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মেয়েদের সুরক্ষার বয়ানের ভিত্তিতে, সেখানে এই জাতীয় কিছু ঘোষণা করার ভেতরে চমক থাকলেও, অবাক হওয়ার উপাদান বিশেষ কিছু নেই। কাজেই, পোশাকের স্বাধীনতার সঙ্গে অগ্নিমিত্রা পালের নারী সুরক্ষার বিষয়টির যোগস্থাপন বা প্রায় “রাইট টু লয়টার”- এর ভাষায় তাঁর কথা বলা, এসবের ভেতরেই ছিল ওই মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত নয়া – উদারনৈতিক মেয়েদের একভাবে সন্তুষ্টির রাজনীতি।

 

কিন্তু বাস্তব যেটা এই রাজ্যে প্রতিভাত হলো, তার চরিত্রটা একটু অন্যরকম। দেখা গেলো, দু-মাসে রাজ্যে ধর্ষণের সংখ্যা মোটামুটি আট। বা, হয়তো তারও বেশি। এর ভেতরে আছে খোদ কলকাতার বুকে বেহালায় কিশোরীকে ধর্ষণের মতন ঘটনাও। কিন্তু, প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকারের কোনো হেলদোল নেই। নীরব মোটামুটিভাবে বাংলার সুশীল সমাজও। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যে সমাজের বুকে অব্যবহিত পূর্বেই এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুতে ঘটেছিলো এতবড়ো আন্দোলন, সেই সমাজে কি একচুলও এগোয়নি নারী সুরক্ষা ও নারী অধিকারের মতন প্রশ্নগুলি? “রাত দখল” আন্দোলন কি একেবারেই ব্যর্থ তবে সমাজ জুড়ে কোনো উন্নত ধরনের লিঙ্গ চেতনা ও ধর্ষণবিরোধী চেতনা গড়ে তুলতে? বাস্তব তাই বলে।

 

তারই সঙ্গে এই প্রশ্নও খুব জোরালো হয়ে ওঠে যে ঠিক কতটা তীব্রতায় “রাত দখল” আসলে হয়ে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতাদখলের মঞ্চ? এবং, ঠিক কোন মাত্রায় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা প্রগতিশীল বামপন্থী অংশটির রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব, সংঘ পরিবার ও বিজেপির রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক মূর্খামি, একধরনের চূড়ান্ত ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা এবং আন্দোলনটির রাজনৈতিক পদ্ধতি ও স্থাপত্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপিকে জায়গা করে দিয়েছে? এই প্রশ্ন আরও বেশি করে ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায় “অভয়া”-র মা রত্না দেবনাথ বিজেপির টিকিটে পানিহাটি থেকে নির্বাচনে লড়ছেন ও জিতেছেন।

 

কিন্তু, যেটা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি-সংঘ পরিবার পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে নিজের সামাজিক-রাজনৈতিক তথা সংসদীয় প্রাসঙ্গিকতা গড়ে তুলেছে ধর্ষণ ও যৌন হিংসার বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে। এবং মূলগতভাবে, সেই জায়গাটি তাদের করে দিয়েছে এই রাজ্যের বৃহদাংশের প্রগতিশীল বামপন্থীরা।  একভাবে দেখতে গেলে বিষয়টি হাস্যকর। যে বিজেপি বিলকিস বানোর ধর্ষকদের গলায় মালা পরিয়ে মঞ্চে তুলে প্রকাশ্যে সম্বর্ধনা জানায়, যে বিজেপি আসিফার ধর্ষকের সমর্থনে জাতীয় পতাকা সহ মিছিল করে, হাথরাসের ধর্ষিতার শরীর জ্বালিয়ে দেয়, ঘটায় উন্নাও, বা যে বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ ব্রিজ ভূষণ সিং যার বিরুদ্ধে আছে একাধিক মহিলা কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থার রেকর্ড, তারা যখন হঠাৎ করে “এগিয়ে থাকা” পশ্চিমবঙ্গে হয়ে ওঠে “নারী সুরক্ষা” র ধ্বজাধারী, এবং হিন্দু মধ্যবিত্ত বাঙালি সেই মর্মে তাদের ব্যাপক রাজনৈতিক সম্মতি দান করে, তখন ভাবতেই হয় কি বিপুল কূপমন্ডুকতা আক্রান্ত আজকের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ।

 

একইসঙ্গে, বারুইপুরের নাবালিকার মৃত্যু ও ধর্ষণের পর একথা আবারো প্রমাণিত হয়, ধর্ষণ ও ধর্ষিতাদের ভেতরেও আছে একধরনের ক্রমাধিকারতন্ত্র। সব ধর্ষণ সমানভাবে আমাদের আন্দোলিত করে না। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার শহরতলির নিম্নবিত্ত মুসলিম একাদশ বর্ষীয়া মেয়েটির ধর্ষণ ও মৃত্যু তাই আমাদের ততটা আন্দোলিত করে না যতটা করে উঠতি মধ্যবিত্ত, হিন্দু জুনিয়র ডাক্তারের ধর্ষণ ও মৃত্যু। না, আমরা মুসলিম নিম্নবিত্ত মেয়েটির মুখে আমাদের নিজেদের “ঘরের মেয়ে”দের মুখ দেখতে পাই না। এবং, এই যে পাই না, এর ভেতরে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই। এমনটিই ঘটেছে পৃথিবীতে প্রায় সর্বত্র, বিভিন্ন সময়ে। ক্ষেত্রবিশেষে যদিও বদলে গেছে বিশেষ পরিচিতি এককগুলি। কিন্তু, এই কথাগুলো যখন বলার চেষ্টা করা হয়েছিল “অভয়া” আন্দোলন ও “রাত দখল” আন্দোলন চলাকালীন, তখন সাধারণভাবে আন্দোলনকারীদের ভেতর পরিলক্ষিত হয়েছিল একধরনের বিপুল ঔদ্ধত্য, যা মোটামুটিভাবে সমাজ মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের রূপ নেয়। সেইসময়ে এই কথাগুলো বলা মানেই ছিল “চটিচাটা” বলে প্রতিপন্ন হওয়া।

 

একভাবে হয়তো এই আক্রমণও স্বাভাবিক। কারণ, “রাত দখল” চলাকালীন বাঙালি সমাজ মোটামুটি পরিবর্তিত হয়েছিল একধরনের সার্বিক যুথবদ্ধ হিস্টিরিয়া গ্রস্ত সমাজে। যে যুথবদ্ধ অস্থিরতার সামনে, যুক্তিবুদ্ধির বড়ো একটা প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিন্তু, যেটা আশঙ্কার বিষয়, তা হলো, এই ধরনের আক্রমণ ও ঔদ্ধত্য শুধু তাবড় মধ্যবিত্তের কাছ থেকে নয়, দেখা গিয়েছিলো প্রগতিশীল অংশটির ভেতরেও, মায় রাজনৈতিক বাম নেতৃত্বের ভেতরেও। বহু ক্ষেত্রেই, এই আন্তর্জালিক গালিগালাজ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের বাতাবরণটিকে নেতৃত্ব দেন তাঁরা, নিজেরা নামান হাস্যকর সমস্ত তত্ত্ব।

 

একটা সময় ছিল যখন বামপন্থীদের সম্পর্কে অনেকেরই সমালোচনার জায়গা ছিল যে বামপন্থীরা শ্রেণী ব্যতীত কিছুই বোঝেন না। নারীবাদীরাও অনেকেই ছিলেন সেই সমালোচকদের দলে। সেই সমালোচনার ভেতর কিছু সত্যতা আছে বৈকি। যান্ত্রিক শ্রেণীভিত্তিক শ্রেণী বিশ্লেষণ একভাবে পৃথিবীব্যাপী বামপন্থী রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্বকে নিঃসন্দেহে পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, “রাত দখল”-এর সময়ে বাংলার বাম, অতি বামদের মূল অংশগুলিকে দেখে মনে হলো, তাঁরা মোটামুটি শ্রেণী বিশ্লেষণ ব্যাপারটিকে শিকেয় তুলে দিয়েছেন। আর এক সময়কার “বুর্জোয়া নারীবাদী” বলে পরিচিত আমরা কিছু লোক শ্রেণী বিশ্লেষণ জনসমক্ষে এনে বামপন্থী-কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের বিরাগভাজন হচ্ছি।

 

কাজেই, বারুইপুরের ঘটনাটির পর সমাজে প্রায় কোনো দৃশ্যগত আলোড়ন-অনুরণন দেখা গেলো না। দু-একটা জমায়েত হলো বটে, কিন্তু সেগুলোর প্রকৃতি মূলগতভাবেই  আনুষ্ঠানিক। ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট, যা কিনা তৈরী হয়েছিল “অভয়া”-র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, এবং যাঁরা কিনা অতীব জোরের সঙ্গে পথে নেমেছিলেন ২০২৪ সালে, তাঁরাও সামাজিক গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি এবং সেখানে “অভয়া”র ঘটনার সাথে বারুইপুরের ঘটনার মিলের কথা বলে ছেদ টানলেন। কোনো ধরনের রাস্তায় নামার প্রক্রিয়া দেখা গেলো না সেখানেও। যদিও, ওই বিবৃতিটির ওপর নির্ভর করে আবার জোরালো করা যেত এই রাজ্যের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন। “অভয়া” র বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আদালত থেকে সিবিআই-এর নিষ্ক্রিয়তার কথা প্রচার করা যেতে পারতো, আবার গড়ে তোলা যেতে পারতো জনমত ও জোরালো আন্দোলন। কিন্তু, এসব কিছুই হলো না। যে কয়েক’টি টুকটাক সমাবেশ হলো, সেখানে কোনোও ধরনের ব্যাপক অংশগ্রহণের ছবি দেখা গেলো না। আর আনুষ্ঠানিক দু-একটি “রাত দখল” হলো বটে, কিন্তু ২০২৪-এর সারারাতের দৃশ্যমানতার বদলে, এবারের “রাত দখল” গুলি নিতান্তই ম্রিয়মান – ৭টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত। তথাকথিত “সুরক্ষিত” ক্ষেত্রে – যাদবপুর ৮ বি তে।

 

একভাবে দেখলে, এটাই স্বাভাবিক। ২০২৪ সালের মতন, এইবার “রাত দখল”-এর পেছনে ছিল না পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে চলেনি সারারাত মেট্রো। উবের-সহ যে কর্পোরেট রাইড সার্ভিস আন্তর্জালিক অ্যাপগুলি, তারা সারারাত ধরে ট্যাক্সি চালায়নি। কাজেই, এইবারের “রাত দখল” কে আগের বারের মাত্রায় সার্থক করতে গেলে সংগঠকদের সংগঠিত হতে হতো অনেক বেশি করে, ঝুঁকি নিতে হতোও অনেক বেশি।

 

অর্থাৎ, একটি বড়ো রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে পশ্চিমবাংলায়। সেই পালাবদলের সঙ্গে এই রাজ্যের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে যদি গড়ে উঠতে হতো পরিপক্কভাবে, তাহলে তার জন্য যা যা লাগে, তার কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক জমিই প্রস্তুত নেই এই মুহূর্তে। উপরন্তু, বিজেপি-সংঘ পরিবারের পরোক্ষ ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যক্ষ সহায়তায় পরিপুষ্ট “রাত দখল” আন্দোলনের কাছে সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিপরীতে হেঁটে কোনো পথ উদ্ভবের প্রত্যাশাও হাস্যকর।  অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের যে অংশটি সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের সংকীর্ণ পরিকল্পনার অংশ না হয়েও, আন্দোলনে প্রকৃত অর্থেই ধর্ষণবিরোধী মানসিকতা থেকে সৎভাবেই “রাত দখল” গুলিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা আজ হতাশ।

 

এর ভেতরে আছেন হাজার হাজার মধ্যবিত্ত মেয়েরা। তাঁরা  ছাত্রী, তাঁরা ছোট চাকুরে, তাঁরা শিক্ষিকা বা ছোট ব্যবসায়ী।  তাঁরা  হতাশ কারণ একের পর এক “রাত দখল”-এর অনুষ্ঠান বাদ আন্দোলন তাঁদের কোনো পরিকল্পনা দেখাতে পারে নি। তাঁরা হতাশ, কারণ তাঁরা দেখেছেন এই আন্দোলনকে মূলধন করে কেরিয়ার গড়েছে একাংশের নেত্রীরা, ফুটেজ খেয়েছেন বা খাওয়ার প্রচেষ্টা নিয়েছেন ছোটবড় সেলিব্রিটিরা। এবং, এই অংশটির ভেতরে, একটি অংশ একইসঙ্গে হতাশ ও ক্ষুব্ধ, কারণ তাঁরা খুব কাছের থেকে দেখেছেন কেমনভাবে আন্দোলনটিকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি-সংঘ পরিবার  এবং সেই কাজে লাগানোকে প্রতিহত করার মতন কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল না আন্দোলনের বাম-প্রগতিশীল  নেতৃত্বের কাছে।

 

সদিচ্ছাও ছিল কি? বোধহয় না। কারণ, গোটা বিষয়টির জটিলতাকে বুঝতে গেলে রাষ্ট্র, ফ্যাসিবাদ, শ্রেণী, লিঙ্গ রাজনীতি, যৌনতা ও যৌন হিংসার রাজনীতির ভেতরকার আন্তঃসম্পর্ককে যে গভীরভাবে বুঝতে হয়, সেই জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক আন্দোলনগুলির নেই। নেই বাম দলগুলির ভেতরেও। অতএব, যা হওয়ার তাই হয়েছে।

 

খুব স্পষ্ট করে বলতে গেলে, “রাত দখল” আন্দোলনটি পশ্চিমবঙ্গের বুকে একধরনের বি-সংহতিকরণের (de-mobilisation) কাজ করেছে সাধারণ মধ্যবিত্ত মেয়েদের ভেতরে, যাঁরা একভাবে ছিলেন এই আন্দোলনের মূল স্তম্ভ। যাঁরা অনেকেই এই আন্দোলনের সময়েই প্রথমবারের জন্য মিছিলে হেঁটেছিলেন, প্রথমবারের মতন স্লোগানে গলা মিলিয়েছিলেন। এবং “রাত দখল” থেকে তাঁরা যে শিক্ষাটি অবশেষে গ্রহণ করেছেন, তা হলো, আন্দোলন করে কিছু হয় না। পথে নেমে কিছু হয় না।

 

ব্যক্তিগত কথোপকথন থেকে জানি, এঁদের ভেতর একটি অংশ বারুইপুরের ঘটনা নিয়ে তাড়িত। কিন্তু, তারপরে পথ কি, তাঁরা জানেন না। “রাত দখল”-এর ওপর তাঁদের আর ভরসা নেই। এবং, খুব পরিষ্কার করে বললে, “রাত দখল” আন্দোলনের পরিচিত মুখ যে নেতৃবৃন্দ, তাঁদের কাছে এই মুহূর্তে তেমন কোনো অনুষ্ঠান বা দিশাও নেই। কতগুলো আনুষ্ঠানিক কথা বলেই তাঁরা সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কতগুলো আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম নিয়ে তাঁরা নিজেদের দায় মিটিয়েছেন। এবং, যে যে মাত্রায় ২০২৪ থেকে শুরু করে এখন অবধি, তাঁরা “রাত দখল” বিষয়ক কোনো ধরনের সমালোচনা শুনতে চাননি, মানুষের সামনে নিজেদের খামতির কথা স্বীকার করতে চাননি, সৎভাবে আত্ম-সমালোচনা করে পথ খুঁজতে চাননি, সেই সেই মাত্রায় এছাড়া আর তাঁদের বড়ো একটা কিছু করার নেইও। কাজেই, তাঁদের ভেতর অনেকেই এখনো “রাত দখল”-এর মহিমায় আত্মতুষ্টি লাভ করছেন, প্রচার করে চলেছেন।

 

কিন্ত বারুইপুরের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠলো আরো কতগুলো বিষয়। শহুরে বাবু-বিবিদের অপেক্ষা না করে, এলাকার মানুষ মেয়েটিকে খুঁজতে শুরু করলেন, পুলিশের কাছে গেলেন। পুলিশ সহায়তা করলো না, তাঁরা মেয়েটির মৃতদেহ উদ্ধার করলেন। চিহ্নিত করলেন সম্ভাব্য অপরাধীদের, পুলিশের হেফাজতে পাঠালেন তাদের। এলাকার উঠতি বিজেপি নেতা পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্ত করলো অভিযুক্তদের। এলাকার মানুষ প্রতিবাদ জানালেন, গণপিটুনিতে মৃত্যু হলো এক অভিযুক্তের।

 

এবং, এত কিছু ঘটার পরেই খবর এলো কলকাতা শহরে। লক্ষণীয়, বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকা – যে এলাকার মেয়ে ছিল নাবালিকাটি সেখানকার মানুষ কিন্ত কোনো সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করেননি। হিন্দু-মুসলমান একযোগে, এক সুরে প্রতিবাদ করেছেন। বারবার বলেছেন এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণের কথা। সেসব ছড়িয়ে আছে সামাজিক গণমাধ্যমের বহু ছোট ছোট চ্যানেল ও সাংবাদিকদের ফুটেজে।

 

সম্ভাবনা ছিল এর ভেতর থেকেই উঠে আসবে একধরনের অন্য ধরনের ধর্ষণবিরোধী রাজনীতি, প্রান্তিক মানুষের ধর্ষণবিরোধী রাজনীতি।

 

কিন্ত ঘটনার জল গড়ালো অন্য দিকে। বারুইপুর হয়ে উঠলো রাষ্ট্রীয় দৃশ্যমানতার ফ্যাসিবাদী রণক্ষেত্র। ধর্ষণ বিষয়টি ক্রমাগত পিছু হটতে শুরু করলো সেখান থেকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যে বিবৃতি দিলেন সেখানে আমদানী করলেন সাম্প্রদায়িক অ্যাখানের। যদিও এখনো পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে স্থানীয় আন্দোলনকারীরা রেললাইন উপড়েছিলেন, কিংবা সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করেছিলেন। খোদ মুখ্যমন্ত্রী গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্তকে দিলেন “ক্লিন চিট” – কোনো বিচার বা তদন্ত ছাড়াই। একবারও তাঁর বক্তব্যে উঠে এলো না পুলিশের গাফিলতির কথা, পুলিশি হেফাজত থেকে অভিযুক্তদের স্থানীয় বিজেপি নেতার ছাড়িয়ে আনার কথা। গণপিটুনির সামাজিক পরিমণ্ডল বা গণপিটুনির ঘটনাকে সামান্যতম সমর্থন না জানিয়েও বারুইপুরের ক্ষেত্রে একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে পুলিশি উদাসীনতা স্থানীয় সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিয়েছিলো গণপিটুনির ভেতর দিয়ে কোনো এক ধরনের বিচার পাওয়ার দিকে। কিন্তু, এই সব জটিলতার কোনোটার ভেতরেই ঢুকলেন না মুখ্যমন্ত্রী।

 

উপুর্যুপরি, তাঁর দলের বাকিরা – পঞ্চায়েত ও গ্ৰামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে পানিহাটির বিধায়ক “অভয়া”-র মা রত্না দেবনাথ – একের পর এক চমকে যাওয়ার মতন মন্তব্য করলেন। সেখানে একদিকে যেমন উঠে এলো চরম মুসলিমবিরোধী, সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদনির্ভর পিতৃতন্ত্রের নিদর্শন, যার সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনো মিল নেই, তেমনি উঠে এলো একধরনের গভীর অপরিকরণের ওপর দাঁড়িয়ে ধর্ষণের ক্রমাধিকারতন্ত্র গড়ার নীলছক। বিশেষত, রত্না দেবনাথের মন্তব্য যে তাঁর মেয়ের ঘটনার সঙ্গে বারুইপুরের ঘটনাটির রয়ে গেছে একটি মূলগত পার্থক্য, যে তাঁর মেয়ে ছিল একটি “সুরক্ষিত” জায়গায়, অন্যদিকে বারুইপুরের শিশুটি “রাস্তায় ছিল না কোথায় ছিল” তা তিনি জানেন না, শক্তপোক্ত করলো এই রাজ্যের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের ভিতরকার ফাটলগুলিকে।

 

আসলে, একভাবে কোথাও একটা রত্না দেবনাথ ব্যক্ত করেছেন “রাত দখল” আন্দোলনের ভিতরকার রাজনৈতিক অবচেতনকে। ব্যক্ত করেছেন অর্বাচীনের মতন – কারণ রাজনীতির ভাষা তাঁর আয়ত্তে নেই, আয়ত্তে নেই জটিল সামাজিক তত্ত্বের পেছনে নিজের খর্বতাকে লুকোনোর কৌশল। এবং, একভাবে সেটাই ফ্যাসিবাদ। সেটাই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সমাজের সমস্ত দ্বন্দ্বকে উলঙ্গ করে নিকৃষ্টতম রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার নামই ফ্যাসিবাদ। এবং, সেই ফ্যাসিবাদী থিয়েটারটিই অনুষ্ঠিত হলো বারুইপুরের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে। এবং সম্পূর্ণ পরিপক্কতা লাভ করলো অভিযুক্ত প্রভাস মন্ডলের এনকাউন্টার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে। অর্থাৎ, তিন মাস পূর্ণ হবার আগেই, পশ্চিমবঙ্গে আমরা দেখলাম “ইউপি মডেল অফ জাস্টিস”-এর পূর্ণ প্রকাশ।

 

যাঁরা একভাবে এই গোটা বিষয়গুলিকে যান্ত্রিক, সরলরৈখিক ভাবনাচিন্তার বাইরে দেখতে চান, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে তাঁদের আশঙ্কা ছিল যে বারুইপুরের স্থানীয় মানুষের ওপর আসতে চলেছে  চূড়ান্ত নিপীড়ন। সেই আশঙ্কা সত্যি করে গ্রেফতার হলেন স্থানীয় সিপিএম কর্মী লায়েক  আলী। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লায়েক ছিলেন পশ্চিম বারুইপুরের বামফ্রন্ট প্রার্থী। লায়েকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি গণপিটুনি ও হিংসায় মদত জুগিয়েছেন। স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গিয়ে গ্রেফতার করলো লায়েককে। আবারো, মঞ্চস্থ হলো একধরনের রাজনৈতিক থিয়েটার, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় থিয়েটার। এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত লায়েক কারাগারে – তাঁর জামিনের আপিল খারিজ হয়েছে। বারুইপুরে ধরপাকড় এখনো চলছে।

 

প্রসঙ্গত, এনকাউন্টার, গ্রেফতার ইত্যাদির ভেতর দিয়ে আমরা ভুলে গিয়েছি ধর্ষণের কথা। ভুলে গেছি বাচ্চা মেয়েটির কথা। অন্যদিকে, সামাজিক অভিজ্ঞতা বলে, এই রাজ্যের মেয়েরা ভয় পেতে শুরু করেছেন। ভয় পাচ্ছেন তাঁদের পরিবারের মানুষেরা। অনেকেই চেষ্টা করছেন সন্ধ্যার ভেতর বাড়ি ফিরে যেতে – তাতে যদি কাজকর্ম, পড়াশোনার ক্ষতি হয়, তো হোক। পাশাপাশি, রেল স্টেশনগুলোতে ব্যাপক হারে হকার উচ্ছেদের ফলে, সন্ধ্যার পর থেকে তুলনামূলকভাবে শুনশান স্টেশন চত্বর বহু মেয়েদের ভেতরে তৈরী করেছে নিরাপত্তাহীনতা। আর, যে অগ্নিমিত্রা পাল মেয়েদের স্বাধীনভাবে “ঘুরে বেড়ানোর” কথা, পোশাকের স্বাধীনতা ইত্যাদি বলেছিলেন, তিনিই এখন উল্টো সুর গাইতে শুরু করছেন। এই বিষয়ে সাম্প্রতিকতম বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “ধর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, বিদেশে গিয়ে দেখুন। সেখানেও ধর্ষণ হচ্ছে। “যাঁরা বিজেপির ধর্ষণ রাজনীতি ভারতবর্ষের অন্যত্র এতদিন ধরে সচেতনভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁদের কাছে এই ধরনের মন্তব্য নতুন নয়। বরং, দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে রত্না দেবনাথ হয়ে অগ্নিমিত্রা পালের এই মন্তব্যই বিজেপির লিঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, যে ভদ্রতা, সততা ও নয়া-উদারনৈতিকতার মুখোশ পরে এই রাজ্যের “পরিবর্তন”-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, এবং পেয়েছিলো হিন্দু মধ্যবিত্ত বাঙালির ব্যপক সমর্থন ও অনুমোদন, সেই মুখোশ এখন খুলে পড়েছে।

 

কিন্তু, এই বহুল প্রচারিত বক্তব্যের পাশাপাশি যেটা আমাদের আলোচনার ভিতর থেকে হারিয়ে গেছে, তা হলো, অগ্নিমিত্রা দাবি করেছেনযে “বিচার” হয়ে গেছে – অর্থাৎ, “এনকাউন্টার” শব্দটিকে ব্যবহার না করে, এনকাউন্টার বিষয়টিকে “বিচার” বলে মহিমান্বিত করার একটি সরকারি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও পশ্চিমবঙ্গের বুকে বৈধতা পেতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, আবারো, সেই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শন। এবং, সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতিতে যেমন হারিয়ে গেছে মৃতা -ধর্ষিতা শিশুটির কথা, তেমনি হারিয়ে গেছে বারুইপুরের স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মন্ডলের কথাও – যার ধমকানিতেই পুলিশ ছেড়ে দিয়েছিলো অভিযুক্তদের প্রাথমিকভাবে।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ধর্ষণবিরোধী রাজনীতি আজ গভীর পশ্চাদপসরণের মুখোমুখি। গভীর পশ্চাদ্পসরণের মুখোমুখি এই রাজ্যের মেয়েদের সার্বিক অবস্থা, সুরক্ষার প্রশ্ন। আর যাঁরা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, এবারের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য তৃণমূলকে পরাজিত করা, তারপর বিজেপির সঙ্গে আমরা লড়ে নেব? তাঁরা নীরব। নিজেদের দলীয় কর্মী গ্রেফতার হওয়ার পরেও নীরব। কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েই তাঁরা দায়িত্ব সেরেছেন।

 

নীরব আমরা বাকিরাও। প্রায় গোটা সমাজ। এই নীরবতার পরে কি আছে আমরা জানি না। কিন্তু, যা বুঝতে খুব কষ্ট হয় না, তা হলো, বাংলার ধর্ষণবিরোধী রাজনীতি আজ গভীর সংকটের মুখে। সংকটের মুখে মানবাধিকার। সংকটের মুখে মেয়েদের প্রাত্যহিক জীবন। এবং, এটুকুতেই শেষ, এমন কথা আমরা বলতে পারছি না। বরং, বিপরীতটিই বোধহয় সত্য।

 


 

লেখিকা একজন শিক্ষিকা।

 

Share this
Leave a Comment