ইসরো: গণ পদত্যাগ ও বেসরকারিকরণের অজানা গল্প


  • July 18, 2026
  • (0 Comments)
  • 17406 Views

ইসরো থেকে বিজ্ঞানীদের পাইকারি হারে পদত্যাগ ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণের অনিবার্য পরিণতি।

 

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

স্বাধীন ভারতে যে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মদক্ষতা,পরিকল্পনা ও সাফল্যের কারণে সারা পৃথিবীর সম্ভ্রম আদায় করেছিল তাদের মধ্যে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ইসরো) অগ্রগন্য।একের পর এক সফল মহাকাশ অভিযান, মহাকাশ বিজ্ঞানের উপযোগিতা সাধারণ মানুষকে প্রদান করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যৌথ প্রজেক্টে সাফল্যের সঙ্গে অংশগ্রহণ অবশ্যই আমাদের গর্বিত করে। কিন্তু গত কয়েকদিনে অন্য কারণে ইসরো সংবাদের শিরোনামে। মোদ্দা কথাটা হল ইসরোতে কর্মরত একশ জন সিনিয়র বিজ্ঞানী তাদের পাওনা-গন্ডা বুঝে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। এদের মধ্যে বোশিরভাগই ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন গগণযান, চন্দ্রযান-৪, মিশন-ভেনাস, মঙ্গলযান- প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং একথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এদের অকস্মাৎ পদত্যাগ অবশ্যই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির সঠিক সময়ে শেষ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। পরিস্থিতি সামলাতে ইসরো তার বিভিন্ন কেন্দ্রের ডাইরেক্টরদের এক সরকারি নির্দেশনামা জারি করে বলেছে যে এবার থেকে বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ বা অকাল অবসরের আবেদনের ফয়সালা স্টেশন ডিরেক্টররা করতে পারবেন না, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ডিপার্টমেন্ট অব স্পেস। সরকার এই সংক্রান্ত নিয়ম কানুনকে কঠোর করে বিজ্ঞানীদের আরো কিছুদিনের জন্য ইসরোতে থাকতে বাধ্য করতে চাইছেন।

 

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে ইসরো থেকে একসাথে এত বিজ্ঞানীর চলে যাওয়া নিয়ে যারা বিস্মিত বোধ করছেন বা চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন, তারা নিশ্চিত ভাবে ভাবের ঘরে চুরি করছেন। ওয়াকিবহাল মাত্র ই জানেন যে এর আগে (২০১২-২৪) সালের মধ্যে ৭০০ জন বিজ্ঞানী ইসরো ত্যাগ করেছেন। এই দলে দলে পদত্যাগের কারণ বুঝতে রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন হয় না। সোজা বাংলায় এই সমস্ত বিজ্ঞানীরা দেশের মধ্যে মহাকাশ নিয়ে কাজ করে এমন বহু বেসরকারি কোম্পানি ও স্টার্ট আপের থেকে ভালো মাইনের প্যাকেজ অফার পেয়েছেন এবং চাকরির বাজারের প্রচলিত নিয়ম মেনে তারা এইসব প্রাইভেট কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন। ইসরোর বিজ্ঞানীরা কোন নতুন উদাহরণ স্থাপন করেন নি। এর আগে টেলিকম সেক্টরের যখন মুক্ত বাজারের সঙ্গে সংযুক্তি হয় তখন দলে দলে বিএসএনএল থেকে দক্ষ কর্মীরা এয়ারটেল, রিলায়েন্স, ভোডাফোন, এয়ারসেল ও টাটাতে যোগদান করে। তাই আজকের ইসরোর সংকটকে সরকার নির্ধারিত বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার আলোকে বিচার করতে হবে।

 

নব্বই এর দশকে আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, বিশ্বব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্ক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নী সংস্থাগুলির অভিভাবকত্বে এবং “উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-ভুবনায়ন” এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ভারতে যে কাঠামোগত আর্থিক সংস্কার চালু হয় তাতে প্রথম ভাগে স্ট্র্যাটেজিক কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রকে সংস্কার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয় যার মধ্যে অন্যতম ছিল মহাকাশ গবেষণা। কিন্তু ২০১৪ সালের পর ভারতে “আচ্ছে দিন” এর জয়যাত্রা শুরু হলে সমস্ত ক্ষেত্রকেই মুক্ত করে বিশ্ববাজারের সাথে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। মনে রাখতে হবে যে কোভিডকালে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে যে ২০ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষিত হয় তাতে খুব পরিষ্কার ভাবে মহাকাশক্ষেত্রে বেসরকারি ক্ষেত্রের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২৪ জুন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই বিষয়ে রূপরেখা ঠিক করা হয়। এই মিটিং এ মহাকাশ মন্ত্রকের অধীন “ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল স্পেস প্রোমোশন অ্যান্ড অথোরাইজেশন সেন্টার (IN-SPACe)” বলে এক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় যার ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল “Provide a level playing field for private companies to use Indian space infrastructure hand-hold, promote and guide the private industries in space activities through encouraging policies and a friendly regulatory environment”। একই সঙ্গে একথাও উল্লেখ করা দরকার যে এর আগে ২০১৯ সালের ৬ মার্চ নিউ স্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড (NSIL) নামে এক পিএসইউ তৈরি হয় যারা ইসরোর গবেষণা, স্যাটেলাইট লঞ্চিং, রকেট লঞ্চার যৌথ উদ্যোগে তৈরি, এবং ইসরোর যাবতীয় কাজকর্মের বানিজ্যিক বিষয়টা দেখভাল করবে। এই সিদ্ধান্তকে যথারীতি দেশের বানিজ্যিক প্রেস সাদর অভ্যর্থনা করে এবং ইসরোর বেসরকারিকরণের সম্ভাবনা নিয়ে হাজারো গল্প বাজারে আসতে শুরু করে।

 

এখানে বেসরকারিকরণের বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের আবার ইসরোর ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতে হবে।প্রথম থেকেই ইসরোর ভাবনা ছিল সে এক রিসার্চ ও ডেভলপমেন্ট সংস্থা কাজ করবে এবং নতুন প্রযুক্তি, মহাকাশ অভিযান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি তার কাজের মূল ক্ষেত্র হবে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে এক সাপ্লাই চেন তৈরি করবে। এটা এক পরিচিত মডেল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাও এই ভাবে কাজ করে। আর গত কয়েক বছরে ইসরোর কাজের চাপও বেড়েছে, গড়পড়তা বছরে ইসরো থেকে দশটা স্যাটেলাইট লঞ্চ করা হয়। তথ্য বলছে নাসা যেমন চারশটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছে, ইসরো তেমন দেড়শর বেশি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছে। ইসরোর বহু আলোচিত চন্দ্রযান-২ (যার ব্যর্থতা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল) অনেক প্রাইভেট কোম্পানি যুক্ত হয়েছিল যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলঅ্যান্ডটি, গোদরেজ, লক্ষী মেশিন টুলস, আইনক্স টেকনোলজিস, কর্নাটক হাইব্রিড মাইক্রো ডিভাইসেস ইত্যাদি। এছাড়া ইসরো আরও কিছু কোম্পানিকে কাজ আউটসোর্সিং করছে যার মধ্যে রয়েছে আলফা ডিজাইন টেকনোলজিস, সরকারি পিএসইউ ভারত ইলেকট্রনিকস লিমিটেড এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেম। এনএসআইএল এখন ইসরোর ব্যবসার দিকটা দেখছে এবং এই যে বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিগুলো (যাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা স্টার্ট আপ) তাদের যেমন কাজ এসেছে তেমনি সেই কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ছে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ।

 

ইসরোর ইতিহাস আমাদের এটাও দেখায় যে অন্য দেশের মহাকাশ সংস্থাগুলোর থেকে ইসরোর একটা মূলগত পার্থক্য রয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া যেমন মহাকাশ গবেষণা ও অভিযানকে তাদের জাতীয় ভাবমূর্তি, ঠান্ডাযুদ্ধ কালীন আধিপত্যের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, ইসরো কখনো সেইপথে হাঁটে নি। আমরা জনকল্যাণের জন্য রিমোট সেন্সিং,আবহাওয়া, শিক্ষামূলক স্যাটেলাইট, মৎস্যজীবিদের নিরাপত্তা ও অবশ্যই সামরিক কৌশলের উন্নতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলাম।কিন্তু আজ ইসরোর কাজ এগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। টেলিভিশন, ব্রডব্যান্ড, মহাকাশ বিজ্ঞান, ন্যাভিগেশন এক নতুন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও মুনাফার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। চাহিদা চালিত মডেল সেই কাজগুলোকে করতে চাইবে যেগুলো বিক্রির বাজার আছে।

 

দুর্ভাগ্য জনক হলেও একথা সত্যি যে অন্যান্য ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের সময় যেমন সরকারি সম্পত্তি ও পরিকাঠামো জলের দরে বিক্রি হয়েছে, ইসরোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।ইসরোর আর্থিক বিষয়টা দেখভাল করার জন্য তৈরি করা সংস্থা নিউ স্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড, ইসরোর প্রযুক্তি বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে হস্তান্তর করেছে। এর মধ্যে আছে স্যাটেলাইট, রকেট, কেমিক্যালস, অ্যাডভান্সড মেটেরিয়াল। এখনো পর্যন্ত একশটি প্রযুক্তি হস্তান্তরিত হয়েছে যার মধ্যে ৭০ টি ১০ লাখ টাকার কমে, বেশ কিছু ৫ লাখ টাকার কমে হস্তান্তরিত হয়েছে। এমনকি ৬০০ টাকাতেও প্রযুক্তি বিক্রি হচ্ছে। গোটা বিষয়টা পর্যালোচনা করে পার্লামেন্টের বিশেষ কমিটি মন্তব্য করেছে: “It has been observed that technologies are often transferred to private players at undervalued rates,allowing these partners to earn significant profits while the originating institutes are receive only a marginal share of the value created”।

 

আজ ইসরো থেকে বিজ্ঞানীদের পাইকারি হারে পদত্যাগ ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণের অনিবার্য পরিণতি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নামে টেলিকমে যেমন ট্রাই এর মত রেগুলেটর তৈরি হয় যাদের কাজ ছিল বেসরকারি সংস্থাগুলির স্বার্থ রক্ষা করা তেমনি মহাকাশ গবেষণায় ইন-স্পেসের জন্ম বেসরকারি ক্ষেত্রকে ইসরোর পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মুনাফার রাস্তা খুলে দেওয়া। এই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আজ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকের প্রয়োজন। তারা নিজেরা গবেষণা ও প্রশিক্ষণে পুঁজি বিনিয়োগ করবে না তাই তারা বেটার প্যাকেজ নিয়ে হাজির ইসরোর কর্মী বাহিনীর কাছে। এই পদত্যাগ তাই রোগ নয়, রোগের লক্ষ্মণ মাত্র।

 



লেখক শিক্ষক এবং নাগরিক অধিকার কর্মী।


Share this
Leave a Comment