পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু নতুন নয় — লক-আপে পিটিয়ে মারা, আত্মহত্যা, অসুস্থতার গল্প, এসব এ রাজ্য বহু দেখেছে। কিন্তু ঘোষিত, প্রকাশ্য, প্রায় উদ্যাপিত “এনকাউন্টার” — যেখানে রাষ্ট্র নিজেই গর্ব ভরে জানায় যে সে ‘বিচারের আগেই দণ্ড’ কার্যকর করেছে — এই প্রথম। এবং এইখানেই বিপদের শুরু।
টিংকু খান্না
৮ জুলাই, ২০২৬। বারুইপুর। এগারো বছরের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও খুনের মামলায় ধৃত তিন অভিযুক্তের একজন, প্রভাস মণ্ডল, “ঘটনার পুনর্নির্মাণ” চলাকালীন পুলিশের গুলিতে নিহত হলেন। পুলিশের ভাষ্য চেনা ছকে বাঁধা — অভিযুক্ত নাকি এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ “আত্মরক্ষায়” গুলি চালায়, হাসপাতালে অভিযুক্তকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এই চিত্রনাট্য আমরা আগেও পড়েছি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হায়দ্রাবাদে ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত চারজনকে ভোররাতে “ঘটনার পুনর্নির্মাণ”-এ নিয়ে গিয়ে ঠিক এই গল্প বলে মেরে ফেলা হয়েছিল — অস্ত্র ছিনতাই, পালানোর চেষ্টা, আত্মরক্ষায় গুলি। উত্তরপ্রদেশে গত ন’বছরে এই একই গল্প শোনা গেছে শতাধিক বার — এতবার, এত অবিকল একই শব্দে, যে সেখানকার আদালতেও প্রশ্ন উঠেছে: প্রতিটি অভিযুক্তই কি অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়? প্রত্যেকেই কি পায়ে গুলি খেয়ে ধরা পড়ে, নয়তো বুকে গুলি খেয়ে মরে?
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু নতুন নয় — লক-আপে পিটিয়ে মারা, আত্মহত্যা, অসুস্থতার গল্প, এসব এ রাজ্য বহু দেখেছে। কিন্তু ঘোষিত, প্রকাশ্য, প্রায় উদ্যাপিত “এনকাউন্টার” — যেখানে রাষ্ট্র নিজেই গর্ব ভরে জানায় যে সে ‘বিচারের আগেই দণ্ড’ কার্যকর করেছে — এই প্রথম। এবং এইখানেই বিপদের শুরু।
করতালির রাজনীতি
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু নয়। উদ্বেগের বিষয় সেই করতালি, যা এই মৃত্যুকে ঘিরে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় “উচিত শিক্ষা”, “এটাই ন্যায়বিচার”-এর জোয়ার। নিহতের মা পর্যন্ত দেহ নিতে অস্বীকার করেছেন — “যা করেছে, তার যোগ্য ফল পেয়েছে।” হায়দ্রাবাদে ২০১৯-এ এনকাউন্টার-এর পর পুলিশদের ফুল ছুঁড়ে, মিষ্টি বিলিয়ে, রাখি পরিয়ে বরণ করা হয়েছিল। সংসদে দাঁড়িয়ে কিছু সাংসদরা বলেছিলেন, ধর্ষকদের “পিটিয়ে মারা উচিত”।
এই জন-মনস্তত্ত্বকে বুঝতে হবে। ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো অপরাধে সমাজের ক্রোধ স্বাভাবিক, ন্যায্যও। কিন্তু সেই ক্রোধ যখন বিচারব্যবস্থার প্রতি সামগ্রিক অনাস্থায় পরিণত হয় — “কোর্টে কিছু হবে না, ওখানেই শেষ করে দেওয়া ভালো” — তখন রাষ্ট্র সেই অনাস্থাকে নিজের ক্ষমতা সম্প্রসারণের মূলধন করে তোলে। তাৎক্ষণিক ন্যায়ের (instant justice) জনপ্রিয় আকাঙ্ক্ষা আসলে রাষ্ট্রকে একটি খোলা চেক দেয়: “তুমিই অভিযোগকারী, তুমিই তদন্তকারী, তুমিই বিচারক, তুমিই জল্লাদ”।
এবং প্রশ্নটা এখানেই: আজ যে বুলেট “ধর্ষকের” জন্য বরাদ্দ, কাল সে বুলেট কার জন্য? যে রাষ্ট্র প্রমাণ করার আগেই মারতে পারে, সে ঠিক করে নেবে কে “অপরাধী”। অভিজ্ঞতা বলে, তালিকায় ক্রমশ উঠে আসে গরিব, মুসলমান, দলিত, ভিন্নমতাবলম্বী। এনকাউন্টার-এর নিশানা কখনও বিত্তবান, ক্ষমতাবান, শাসকদল-ঘনিষ্ঠ অপরাধী হয় না — এই পরিসংখ্যানগত সত্যটুকুই বলে দেয়, “তাৎক্ষণিক ন্যায়” আসলে ন্যায় নয়, শ্রেণি ও সম্প্রদায়-নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় হিংসা।
বারুইপুরের ঘটনায় আরও একটি স্তর আছে। বিরোধী সাংসদ মহুয়া মৈত্র অভিযোগ তুলেছেন, নিহত প্রভাস মণ্ডল ছিলেন মামলার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী — যিনি দেহ কোথায় আছে দেখিয়ে দিয়েছিলেন — এবং তাঁকে সরিয়ে দিয়ে আসলে অন্য অভিযুক্তদের আড়াল করা হল। অভিযোগটি প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু এইখানেই এনকাউন্টার-এর দ্বিতীয় ব্যবহারিক মূল্য: মৃত মানুষ সাক্ষ্য দেয় না। বিচার শুধু দণ্ড দেয় না, সত্য উদ্ঘাটনও করে — কারা জড়িত, কীভাবে ঘটল, কার প্রশ্রয়ে। এনকাউন্টার সেই সত্যের কবর খোঁড়ে। যে জনতা “ন্যায়” পেয়ে উল্লাস করছে, তারা হয়ত জানতেই পারবে না, মেয়েটির সঙ্গে কী হয়েছিল এবং আর কে কে দায়ী।
সংখ্যার আয়নায় এনকাউন্টার-মডেল
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার যে পথে হাঁটছে, তার আদি ও অকৃত্রিম মডেল উত্তরপ্রদেশ। সেখানকার পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যানই যথেষ্ট — কোনও মানবাধিকার সংগঠনের হিসেব নয়, খোদ ডিজিপি-র সাংবাদিক সম্মেলনে গর্ব ভরে পেশ করা তথ্য:
- ২০১৭ সালের মার্চ (যোগী আদিত্যনাথের ক্ষমতায় আসা) থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ১৬,২৮৪টি “অপারেশন” চালিয়েছে।
- এতে নিহত ২৬৬ জন, আহত প্রায় ১১,০০০ (১০, ৯৯০)।
- বছরওয়ারি নিহতের হিসেব: ২০১৮-তে ৪১, ২০১৯-এ ৩৪, ২০২০ ও ২০২১-এ ২৬ করে, ২০২২-এ ১৩, ২০২৩-এ ২৬, ২০২৪-এ ২৫, এবং ২০২৫-এ ৪৮ — আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ শেষ পাঁচ বছরে (২০২১–২০২৫) নিহত ১৩৮ জন। প্রবণতা কমছে না, বাড়ছে।
আহতের এই এগারো হাজারি সংখ্যাটির দিকে আলাদা করে তাকানো দরকার। এর অধিকাংশই পায়ে গুলি — উত্তরপ্রদেশে যার ডাকনামই হয়ে গেছে “হাফ-এনকাউন্টার”, পুলিশের নিজস্ব পরিভাষায় “অপারেশন লংড়া” (খোঁড়া করে দেওয়ার অভিযান)। পুলিশ নিজেই স্বীকার করে যে পায়ে গুলি করা একটি পরিকল্পিত কৌশল। ভেবে দেখুন, রাষ্ট্র ঘোষিতভাবে একটি বিচারবহির্ভূত শারীরিক শাস্তির প্রথা চালু করেছে — গুলি করে প্রতিবন্ধী করে দেওয়া — যার কোনও আইনি ভিত্তি নেই, কোনও আদালতের রায় নেই, এবং যা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের (জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার) প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। হাজার হাজার মানুষ — মনে রাখবেন, এরা প্রত্যেকে অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত নয় — সারা জীবনের মতো প্রতিবন্ধী।
সর্বভারতীয় চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২২ সালে রাজ্যসভায় জানিয়েছিল, পূর্ববর্তী পাঁচ বছরে দেশে পুলিশি এনকাউন্টারে নিহতের সংখ্যা ৬৫৫ — শীর্ষে ছত্তিশগড় (১৯১), তারপর উত্তরপ্রদেশ (১৭৭), অসম (৫০), ঝাড়খণ্ড (৪৯), ওড়িশা (৩৬)। অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মা ক্ষমতায় আসার পর মাসের পর মাস ধরে “পালাতে গিয়ে পায়ে গুলি”-র মহামারী দেখা গেছে।
আর জবাবদিহি? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রতিটি এনকাউন্টার-মৃত্যুর রিপোর্ট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাঠানো বাধ্যতামূলক। অথচ সংসদে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ছ’বছরে (২০১৬–২০২২) এনকাউন্টার-মৃত্যুর ঘটনায় কমিশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করেছে মাত্র একটি ক্ষেত্রে। ফৌজদারি মামলায় সাজা হয়েছে শূন্য। বিচারাধীন অভিযোগের পাহাড় জমেছে, আর কমিশন কিছু ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেই দায় সেরেছে। অর্থাৎ এনকাউন্টার কার্যত একটি ঝুঁকিহীন অপরাধ — রাষ্ট্রের একমাত্র অপরাধ, যার শাস্তির নজির নেই, আছে পদোন্নতি ও বীরত্বের মেডেল।
অথচ আইন অস্পষ্ট নয়। পিইউসিএল বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য (২০১৪) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ষোলো দফা নির্দেশিকা দিয়েছিল: প্রতিটি এনকাউন্টার-মৃত্যুতে বাধ্যতামূলক এফআইআর, স্বাধীন সংস্থার (সিআইডি বা অন্য থানার) তদন্ত, ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত, এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জড়িত পুলিশকর্মীদের কোনও বীরত্ব-পুরস্কার বা পদোন্নতি নয়। আদালত স্পষ্ট বলেছিল — এনকাউন্টারে মৃত্যু মানেই তা “সংঘর্ষে মৃত্যু” নয়; প্রতিটি ক্ষেত্রে খুনের মামলার মতোই তদন্ত হবে। বারুইপুরের ক্ষেত্রে এই প্রতিটি ধাপ অক্ষরে অক্ষরে মানা হচ্ছে কি না — স্বাধীন তদন্ত, ম্যাজিস্টেরিয়াল এনকোয়ারি, ফরেনসিক ব্যালিস্টিক রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের ভিডিওগ্রাফি — নাগরিক সমাজকে সেই প্রশ্ন লাগাতার করে যেতে হবে। রাজ্য সরকার একটি সিট গঠন করেছে বটে, কিন্তু অভিযুক্ত বাহিনীর নিজের লোক দিয়ে তদন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার পরিপন্থী।
গুন্ডা দমন আইন: একই দর্শনের অন্য মুখ
এনকাউন্টারকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর আইনি-রাজনৈতিক স্থাপত্যের অংশ, যার আরেকটি স্তম্ভ পশ্চিমবঙ্গ গুন্ডা দমন আইন। ঔপনিবেশিক জমানার এই আইন — এবং তার সাম্প্রতিক সম্প্রসারিত প্রয়োগ — ঠিক একই দর্শনে দাঁড়িয়ে: “বিচারের আগেই শাস্তি”। কে “গুন্ডা”, তা ঠিক করে পুলিশ ও প্রশাসন, আদালত নয়। অভিযোগ গঠনের আগেই জেলা থেকে বহিষ্কার, নজরবন্দি, আটক। “গুন্ডা” শব্দটির সংজ্ঞা এতই ধোঁয়াটে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, আন্দোলনকারী, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, প্রতিবাদী যুবক/যুবতি — যে কাউকে এই তকমা দেওয়া যায়।
গুন্ডা দমন আইন আর এনকাউন্টার আসলে একই ধারাবাহিকতার দুই বিন্দু। প্রথমটি বলে: “বিচারের অপেক্ষা না করে আটকে রাখো, তাড়িয়ে দাও”। দ্বিতীয়টি বলে: “বিচারের অপেক্ষা না করে মেরে ফেলো”। দুটির মধ্যে পার্থক্য মাত্রার, নীতির নয়। দুটিই বিচারবিভাগকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করে; দুটিই পুলিশকে বিচারকের আসনে বসায়; দুটিই “আইনশৃঙ্খলা”-র নামে আইনের শাসনকে হত্যা করে। এবং লক্ষণীয়, দুটিরই প্রয়োগ হয় প্রধানত প্রান্তিক মানুষের ওপর — যাদের হয়ে বলার কেউ নেই, যাদের মৃত্যুতে সংবাদমাধ্যম দু’দিনেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়।
ব্যতিক্রম যখন নিয়ম হয়ে ওঠে
ইতিহাস সাক্ষী, আইনের শাসনের অবক্ষয় কখনও একদিনে ঘটে না। ঘটে ধাপে ধাপে, প্রতিটি ধাপে জনসমর্থনের হাততালি সঙ্গে নিয়ে। প্রথমে বলা হয়, এটি “ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি” — এত জঘন্য অপরাধ যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চলে না। তারপর ব্যতিক্রমটিই ধীরে ধীরে নিয়ম হয়ে ওঠে। কার্ল স্মিট — যিনি পরে নাৎসি জমানার আইনি তাত্ত্বিক হয়েছিলেন — লিখেছিলেন, সার্বভৌম সে-ই, যে ঠিক করে কখন আইন স্থগিত থাকবে। এনকাউন্টার-রাষ্ট্র ঠিক তাই: সে প্রতিদিন ঠিক করে, কার ক্ষেত্রে সংবিধান প্রযোজ্য আর কার ক্ষেত্রে নয়। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন এর জবাবে সাবধান করেছিলেন — নিপীড়িতের অভিজ্ঞতায় “জরুরি অবস্থা”ই স্থায়ী নিয়ম।
ফ্যাসিবাদ শব্দটি আমরা প্রায়ই আলগাভাবে ব্যবহার করি। কিন্তু তার একটি নির্দিষ্ট, পরীক্ষণযোগ্য লক্ষণসমষ্টি আছে: আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি ঘোষিত অবজ্ঞা; হিংসার প্রকাশ্য উদ্যাপন ও নান্দনিকীকরণ; “জাতির শত্রু”-র বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি; এবং এই সবকিছুর জন্য গণসম্মতির সংগঠন। এনকাউন্টার এই চারটি শর্তই পূরণ করে। এটি নিছক পুলিশি বাড়াবাড়ি নয় — এটি একটি প্রদর্শনী, একটি রাজনৈতিক থিয়েটার, যেখানে রাষ্ট্র জনতাকে দেখায়: দেখো, আমি কত দ্রুত, কত নির্মম, কত “কার্যকর”। বুলডোজার যেমন, বুলেটও তেমন — শাসনের প্রতীকী ভাষা। এবং জনতা যখন সেই থিয়েটারে করতালি দেয়, তখন গ্রামশির ভাষায় বলতে হয়, সম্মতি নির্মিত হয়ে গেছে — বলপ্রয়োগের জন্য আর ক্ষমা চাইতে হয় না, বলপ্রয়োগই জনপ্রিয়তার উৎস।
আম্বেদকর সংবিধান সভার শেষ ভাষণে সাবধান করেছিলেন — ভারতে গণতন্ত্র “উপরিকাঠামো মাত্র”, তার নিচের মাটি গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক। বিচারবিভাগ সেই ভঙ্গুর উপরিকাঠামোর শেষ স্তম্ভগুলির একটি। নির্বাচন কমিশন, তদন্ত সংস্থা, সংবাদমাধ্যম — একে একে প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ক্ষয়ে যাওয়ার পর আদালতই ছিল নাগরিকের শেষ আশ্রয়। এনকাউন্টার সেই আশ্রয়টিকেই বলে: তোমাকে আর দরকার নেই। যে রাষ্ট্র বিচারককে পাশ কাটিয়ে দণ্ড দিতে শেখে, সে অচিরেই শেখে বিচারকের রায়কেও অগ্রাহ্য করতে।
শেষ কথা
এগারো বছরের মেয়েটির জন্য ন্যায়বিচার অবশ্যই চাই — পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রকাশ্য বিচার, প্রতিটি দোষীর সাজা। কিন্তু প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু সেই ন্যায় নয়; বরং তার সম্ভাবনার হত্যা। বিচার একটি প্রক্রিয়া, চমক নয়। সে ধীর, শ্রমসাধ্য, প্রায়ই হতাশাজনক — কিন্তু একমাত্র সে-ই আলাদা করতে পারে দোষী আর নির্দোষকে, একমাত্র সে-ই ক্ষমতাবানকেও কাঠগড়ায় তুলতে পারে। বিচারব্যবস্থার সংস্কার দরকার — দ্রুত নিষ্পত্তি, ভুক্তভোগী-বান্ধব প্রক্রিয়া, ফরেনসিক পরিকাঠামো। কিন্তু ভাঙা ঘড়ির চিকিৎসা ঘড়িটাকে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা নয়।
বাংলা এতদিন গর্ব করত, এ রাজ্যে এনকাউন্টার-সংস্কৃতি নেই। ৮ জুলাই সেই দাবির মৃত্যু ঘটেছে। এখন প্রশ্ন একটাই: এটি ব্যতিক্রম থাকবে, না উত্তরপ্রদেশের মতো এখানেও পরিসংখ্যানের তালিকা লম্বা হতে শুরু করবে? উত্তরটা নির্ভর করছে আমরা — নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ — করতালি দিই, না প্রশ্ন করি, তার ওপর। কারণ যেদিন প্রশ্ন করার লোক ফুরিয়ে যাবে, সেদিন বুলেটের তালিকায় পরের নামটা আমাদের কারও হতে পারে — এবং তখন আর কোনও আদালত অবশিষ্ট থাকবে না, যেখানে গিয়ে বলা যায়: “আমি নির্দোষ”।
Tinku Khanna is a social activist and member of Groundxero Collective.

