নয়ডার শ্রমিক আন্দোলন


  • July 10, 2026
  • (0 Comments)
  • 68 Views

শ্রমিকদের উপর মালিকের জুলুম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থায়ী কাজ ও তার সাথে থাকা সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধে সব আজ কেড়ে নিচ্ছে মালিকরা, গোটা দেশ জুড়েই। এই পরিস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব লড়াকু শ্রমিকদের উঠে আসতে হবে নেতৃত্ব দিতে, যেকোন উপায়ে সংগঠিত হতে হবে শ্রমিকদের।

 

সংকল্প

 

চলতি বছরের শুরুর দিকে হরিয়ানার পানিপথ, মধ্যপ্রদেশের সিঙ্গরৌলি এবং আরও বহু স্থানে শ্রমিকদের সহিংস বিক্ষোভের খবর সামনে আসে। ফেব্রুয়ারি মাসে হরিয়ানার পানিপথে ইন্ডিয়ান অয়েলের শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন, যা দ্রুত দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থিত এনটিপিসি, আদানি পাওয়ার, টাটা স্টিল, জিন্দাল স্টিল সহ বিভিন্ন কোম্পানির কারখানায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর মানেসার, গুরুগাঁও, নয়ডা, ফরিদাবাদ, পালওয়াল এবং রাজস্থানের বিভিন্ন স্থানের নানা শিল্পক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১শে ফেব্রুয়ারি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের দুজন শ্রমিক একটি শিল্প দুর্ঘটনায় মারা যান। অভিযোগ উঠেছে তাঁদের জীবন সঙ্কটে জেনেও কর্তৃপক্ষ তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে বেশ কিছুটা সময় নেয়। তৃতীয় শ্রমিকটি বেঁচে গেলেও তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। এই উদাসীনতা এবং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক ২৩শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটে সামিল হন। কাউন্টারভিউ পোর্টালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী জ্যামারগুলো রিফাইনারির গেটের বাইরে ধর্মঘট সম্পর্কিত ছবি ও তথ্য ছড়াতে বাধা দেয়। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিফাইনারিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে তারা কয়েকজন শ্রমিকের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং বিক্ষোভ চলাকালীন সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের (সিআইএসএফ) জওয়ানরা শূন্যে গুলি চালায়। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী প্রায় ২,৫০০ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে পুলিশি তদন্ত শুরু করে বলে জানা যায়। এছাড়া পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের মধ্যে দুজন শ্রমিক-অধিকার কর্মী এবং তিনজন শ্রমিক।  শ্রমিকরা সাংবাদিকদের জানান যে, তারা দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করলেও আট ঘণ্টার মজুরি পান এবং মাসে মাত্র দুই দিনের ছুটি পান। নতুন শ্রম আইনগুলো এইসব অভিযোগের সমাধান করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট-মেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রসার ঘটিয়ে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

 

এপ্রিলের ১৩ তারিখ, সোমবার সকালে হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিবাদে পথে নামেন নয়ডা শিল্পাঞ্চলে। জানা যাচ্ছে যে প্রায় ৪২,০০০-এর বেশি শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। প্রায় চারশো কারখানার শ্রমিক হরতালে সামিল হন। অচল হয়ে যায় নয়ডার সেক্টর ৬২ থেকে সেক্টর ১৬ যাওয়ার রাস্তা; ৯ নম্বর জাতীয় সড়কও অবরুদ্ধ হয়ে যায়। গৌতম বুদ্ধ নগরের পুলিশ কমিশনার লক্ষ্মী সিং জানিয়েছেন, ৮৩টি জায়গায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামলেও, এর মধ্যে মাত্র দুটি জায়গায় হিংসার ঘটনা ঘটে। সেক্টর ৬২ ও ফেজ-২-এর কারখানা এলাকাগুলির সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলে। এখানে পাথর ছোড়া, ভাংচুর ও গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার একাধিক ঘটনা দেখা যায়। এর থেকে প্রতিবাদী শ্রমিকদের মরিয়া অবস্থা অনুমান করা যায়। তাদের দাবি কী? মজুরি বৃদ্ধি, কাজের ঘণ্টা কমানো, ওভারটাইমের মজুরি দ্বিগুন করা, বোনাস, পিএফ, ইএসআই, উন্নত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, এবং কারখানায় কারখানায় যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কমিটি গঠন। কারখানাগুলির অধিকাংশ শ্রমিকই স্থায়ী নন, ঠিকা শ্রমিক। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর মজুরির টাকা প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, এদিকে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বাড়ি ভাড়া। সম্প্রতি রান্নার গ্যাসের সংকটে শ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। অনেককেই কালোবাজারে বহুগুণ বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হোটেলে খাওয়ার খরচও অনেক বেড়ে গেছে। অন্য রাজ্য থেকে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ। এই সকল কারণেই শ্রমিকরা বিক্ষোভের পথে বেছে নিতে বাধ্য হন।

 

এর আগে টানা তিন দিন ধরে নয়ডায় এই অস্থিরতা চলছিল। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন। কিন্তু সোমবার শ্রমিকদের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ওইদিন শ্রমিকদের রোষের মুখে পড়ে নয়ডা থেকে দিল্লী সমস্ত রাস্তার চলাচল রীতিমত বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক কী হয়েছিল এপ্রিলের ১৩ তারিখ? ইন্ডিয়া টুডের খবর অনুযায়ী নয়ডা সেক্টর ৬২-এর একটি মারুতি সুজুকি সার্ভিস সেন্টার, বিপুল মোটর্সের ক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা “হট্টগোল” সৃষ্টি করেন, চার থেকে পাঁচটি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, ও প্রায় ২০ থেকে ২৫টির জানলার কাচ ভেঙ্গে দেওয়া হয়। কিছু শ্রমিকরা জানান যে নয়ডা ফেজ-২-এর মাদারসন কোম্পানির শ্রমিকরা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে প্রতিবাদ চালাচ্ছিলেন। প্রতিবাদ তীব্র করলে তাদের হেনস্থার শিকার করা হয়। সোমবার বিক্ষোভ তীব্রতর হয় এবং ভাংচুর ও কোম্পানির দেওয়ালে পাথর ছোড়ার ঘটনা সামনে আসে। শ্রমিকদের নিজেদের তোলা কিছু ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে তারা বলছেন যে বিক্ষোভ সহিংস রুপ নেয় তার কারণ পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। একই ভিডিওতে দেখা যায় যে একটি পুলিশ ভ্যানকে উলটানোর চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসও নিক্ষেপ করে।

 

লক্ষ্মী নামে এক প্রতিবাদী শ্রমিক সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে বলেন, “আমি মাদারসনে কাজ করি। আমাদের খুব কম মজুরি দেওয়া হয়। আমরা শুধু মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবাদ করতেই কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং মারধর করে।” তিনি আরও বলেন, “গ্যাসের সিলিন্ডার, শাকসবজি, সবকিছুরই দাম আকাশছোঁয়া। এই অবস্থায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো অসম্ভব। আজ আমরা আমাদের ন্যায্য দাবির কথা জানাতেই আমাদের মারধর করা হয়েছে। আমার পায়ে আঘাত লেগেছে। আমরা ২০,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করছি। এই দাবি না মানা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”

 

বিবিসি-র একজন প্রতিবেদককে কারখানার শ্রমিক রবীন্দ্র কুমার বলেন, “মাত্র চার–ছয় দিন আগেই সরকার মজুরি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ওই সামান্য বাড়তি মজুরিতে কিছুই হবে না। বলুন তো, ১০–১১ হাজার টাকা মজুরি নিয়ে আমরা কীভাবে সংসার চালাব? গ্যাসের সিলিন্ডার আর শাকসবজির দাম দেখুন, ওতেই তো প্রায় সব টাকা শেষ হয়ে যায়। এই কারণেই শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন।”

 

আরেকজন নারী শ্রমিক বলেন,“আমরা খুব ভোরে ছোট ছোট সন্তানদের বাড়িতে রেখে কাজে আসি। কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেই কোম্পানি আমাদের হুমকি দেয়। ‘গেট পাস’ সংগ্রহ করে চলে যেতে বলে। অনেক সময় আমাদের বেতনও আটকে রাখা হয়। সরকার মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা করলেও কোম্পানি নানা অজুহাতে সেই বাড়তি টাকাও কমিয়ে দেয়। সরকার আসলে কতটা মজুরি বাড়িয়েছে, সে বিষয়েও আমাদের এখনো কিছু জানানো হয়নি।”

 

পুষ্পেন্দ্র কুশওয়াহা নামের এক তরুণ শ্রমিক বলেন, “সরকার ঘোষণা করেছে যে, ১লা এপ্রিল থেকে ওভারটাইমের মজুরি দ্বিগুণ করা হবে। পাশাপাশি মূল বেতনও বৃদ্ধি করা হবে। সব মিলিয়ে আমাদের মোট বেতন ২০,০০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা সেই টাকা পাচ্ছি না। কোম্পানি বলছে, সরকার যখন এই নির্দেশ কার্যকর করবে, তখন তারাও তা বাস্তবায়ন করবে। এখন আপনারাই বলুন, এমতাবস্থায় আমাদের কী করা উচিত?”

 

মধ্যবয়সী এক কারখানার শ্রমিক বলেন, “এখানে একজন ‘হেল্পার’-এর বেতন মাত্র ১১,০০০ টাকা। আজকের এই বাজারে এত সামান্য টাকায় কী-ই বা করা সম্ভব? আমরা এইমাত্র কারখানা থেকে বেরিয়ে এলাম। সব কারখানাই এখন কর্মীশূন্য হয়ে পড়ছে। যতক্ষণ না কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাজ হবে না। কোনো কাজ হবে না।”

 

একজন মহিলার হাতে একটি পোস্টারে লেখা ছিল, “আমরা শ্রমিকরা সবাই এক ও অভিন্ন। ১৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা; হেল্পারদের জন্য ১৫,০০০ টাকা।” তিনি বলেন, “আমরা তো শ্রমিক; আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদের অবশ্যই পাওয়া উচিত। একজন কারিগরের বেতন হওয়া উচিত ১৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা, আর একজন হেল্পারের বেতন হওয়া উচিত ১৫,০০০ টাকা।”

 

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

 

এই বিক্ষোভকে অজুহাত করে একের পর এক শ্রমিকদের গ্রেফতার করা হয়। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোশাল মিডিয়ায় নজরদারি বাড়ানো হয়। এই ঘটনার পর লাখনৌয়ের জনচেতনা পুস্তক কেন্দ্রের বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত তিনজন বড়িষ্ঠ শ্রমিক অধিকার কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এনাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা সাজানোর জন্য রসদ জোগাড় করতে বামপন্থী সাহিত্যের ওই বইয়ের দোকানে পুলিশ রেইড চালায়। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর খবর অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের ডিজিপি রাজীব কৃষ্ণ জানিয়েছেন যে, নয়ডায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালীন যারা সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, নয়ডা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অভিযোগে দুইজন অধিকার কর্মীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) প্রয়োগ করা হয়, লখনৌ-ভিত্তিক সাংবাদিক সত্যম বর্মা এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের স্নাতক ও নাট্যকর্মী আকৃতি চৌধুরী।

 

পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোয় তাঁদের ভূমিকা “উল্লেখযোগ্য” ছিল। কিন্তু আকৃতির পরিবার ও আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, আকৃতিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ১১ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১৩ই এপ্রিলের সহিংসতা ঘটার দুদিন আগে। তাহলে যে ঘটনা তখনও ঘটেইনি, তাতে তিনি কীভাবে উস্কানি দিতে পারেন? মানবাধিকার সংগঠন পিইউসিএল এই এনএসএ প্রয়োগকে “বেআইনি ও অসাংবিধানিক” বলে অভিহিত করেছে।

 

নয়ডার এই ঘটনার জেরে দিল্লি পুলিশও সতর্ক হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী, র‍্যাপিড রেসপন্স টিম এবং আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। গ্রেফতার হওয়া শ্রমিকদের আত্মীয় পরিজনরা দিশেহারা, কোথায় রাখা হচ্ছে তাদের, কেন তুলে নিয়ে গেল পুলিশ, জামিনের টাকা জোগাড় হবে কোথা থেকে, এসবের কোন উত্তর নেই এই মানুষগুলির কাছে।

 

আমরা দেখেছিলাম কৃষক আন্দোলনের সময়ে তাঁদের “খালিস্তানি” বলে প্রচার করেছিল মোদী সরকার ও বাজারি মিডিয়া, আজ প্রতিবাদী শ্রমিকদের পিছনে “পাকিস্তানি মদত” বা “নকশাল” জুজু দেখচ্ছে যোগী সরকার ও মিডিয়া। এদিকে “নকশাল মুক্ত ভারত” গড়ার নামে দেশের জল-জঙ্গল-জমিকে অবাধ লুটপাটের জন্যে উৎসর্গ করা হচ্ছে বড় বড় পুঁজিপতি গোষ্ঠীদের কাছে। আজ গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলা যেকোন মানুষই রাষ্ট্রের চোখে “নকশাল”। আর ভারতের “অমৃত কালে”, “সব কা সাথ, সব কা বিকাশ” ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে হিন্দি বলয়ে শ্রমিকদের এই অবস্থা। অতিরিক্ত কাজের সময় ও চাপ, অথচ ন্যূনতম মজুরি নেই, আর মালিক শ্রেণী একের পর এক সরকারি বিধি নিষেধ লঙ্ঘন করে চলেছে অথচ সরকার সরাসরি মালিকের পক্ষ নিচ্ছে। এই ছবি আমরা বাংলার জুটমিলগুলিতেও দেখতে পাই। এই পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রিত সরকার পুঁজিপতি মুনাফাখোরদেরই স্বার্থ দেখে। শ্রমিকরা ন্যাজ্য দাবিতে প্রতিবাদ করলে রাতে পুলিশ মহল্লার ঘরে হানা দিয়ে টেনে নিয়ে যায়, আর মালিকরা আইনভঙ্গ করলে কোন পদক্ষেপ নেই।

 

নয়ডার শ্রমিকদের এই আন্দোলনের জেরে সরকারি প্রসাশন সতর্ক হয়ে ওঠে। নয়ডার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মেধা রূপম জানান যে, কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর তাদের শ্রমিকদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, “প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ করা হবে। ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। প্রত্যেক শ্রমিককে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হবে। প্রতিটি কারখানায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন নারীরা। সেখানে একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা হবে। সকল শ্রমিক নিয়ম অনুযায়ী বোনাস পাবেন। ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই বোনাসের পয়সা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে।” তিনি আরও বলেন যে সকল শ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে পেস্লিপ-ও প্রদান করা হবে। জেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয় যেখানে শ্রমিকরা তাঁদের অভিযোগ নথিভুক্ত করতে পারবেন। এক সূত্র অনুযায়ী যোগী সরকারের তৈরি কমিটি গৌতম বুদ্ধ নগর ও গাজিয়াবাদ শিল্পাঞ্চলে অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ১৩,৬৯০ টাকা করতে রাজি হয়েছে। আধা দক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরি হবে ১৫,০৫৯ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের ১৬,৮৬৮ টাকা। রাজ্যের অন্যান্য পৌর নিগম এলাকায় ন্যূনতম মজুরি হবে ১৩,০০৬ টাকা ও অন্য জেলাগুলিতে ১২,৩৫৬ টাকা। তবে বলা হয়েছে যে এই মজুরি চূড়ান্ত নয়, আরও আলাপ আলোচনা চলবে। লক্ষণীয়, ন্যূনতম মজুরি বাড়লেও তা ২০,০০০ টাকার অনেক কমই রইল।

 

লড়াইয়ের চেহারা

 

এর থেকে প্রমাণ হয় যে একমাত্র লড়াইয়ের মাধ্যমেই দাবি আদায় সম্ভব। তবু এখানেই শেষ নয়, আজ বিস্তৃত আন্দোলন যাতে দানা না বাঁধে তাই কর্তৃপক্ষ এই কথা বলছে, কিন্তু এই সকল কর্তব্য বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নজর রাখতে হবে। আর এই বিষয়ে নিশ্চিত থাকা চলে যে পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার সঙ্কট যত বৃদ্ধি পাচ্ছে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারগুলির উপর আরও আঘাত আগামী দিনে নামতে চলেছে।

 

এই আন্দোলনের প্রভাব পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতেও দেখতে পাওয়া যায়; হরিয়ানার ফরিদাবাদের শ্রমিকরা মাইনে বাড়ানোর দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন, নয়ডার গৃহ পরিচারিকারাও মজুরি বাড়ানোর দাবিতে হাউজিং সোসাইটি ঘেরাও করা শুরু করেন।

 

এই আন্দোলনগুলির একটি বৈশিষ্ট্য হল মূলধারার প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলির অনুপস্থিতি। এই প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়নগুলির আমলাতান্ত্রিক নেতারা কখনও কখনও নিচু তলার কর্মীদের চাপে প্রতীকী প্রতিবাদ সংগঠিত কর‍তে বাধ্য হলেও তারা সাধারণ অর্থে অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়েও বিশেষ কোন কার্যকরী লড়াইয়ে শ্রমিকদের সমাবেশিত করছে না। এই বাস্তবতা পশ্চিমবঙ্গের চটকল মজদুর আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সত্য। ইউনিয়ন হওয়া উচিত শ্রমিকদের নিজেদের লড়াই করবার ঐক্যবদ্ধ সংগঠন, অথচ শ্রমিকদের মুখে শোনা যায় যে কারখানার ২২টা ইউনিয়নের ২২টাই দালাল। অর্থাৎ এই ইউনিয়নগুলির লড়াইয়ের ক্ষমতার উপরে শ্রমিকদের বিশেষ ভরসা নেই। কিন্তু শ্রমিকদের উপর মালিকের জুলুম তো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থায়ী কাজ ও তার সাথে থাকা সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধে সব আজ কেড়ে নিচ্ছে মালিকরা, গোটা দেশ জুড়েই। এই পরিস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব লড়াকু শ্রমিকদের উঠে আসতে হবে নেতৃত্ব দিতে, যেকোন উপায়ে সংগঠিত হতে হবে শ্রমিকদের। সংগঠিত না হলে, সাময়িক ক্ষোভের বিস্ফোরণকে দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ে পরিণত করা যাবে না এবং মালিক শ্রেণীর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র আক্রমণের মুখে খুব সহজেই ভেঙ্গে পড়বে আন্দোলন। তাই ধর্মঘট সংগঠিত করতে কারখানায় কারখানায় গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত স্ট্রাইক অ্যাকশন কমিটি গঠন করা জরুরি। শ্রমিকদের লড়াই শ্রমিকরা নিজেরাই লড়বেন।

 

তথ্যসূত্র—

 

১। “Unpaid overtime, broken promises: Indian Oil workers strike in Panipat”, Counterview, ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

 

২। “Panipat’s battle for labour rights shows why workers across India are going on strike today”, Scroll.in, ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

 

৩। অনিতা গোস্বামী, “‘We just want fair wages. Why are police beating us?’: Workers at Noida protest”, Hindustan Times, ১৩ এপ্রিল ২০২৬।

 

৪। দৃষ্টি জৈন, “Over 350 arrested a day after violence during Noida workers’ protest”, The Indian Express, ১৪ এপ্রিল ২০২৬।

 

৫। “PUCL condemns the UP Police’s invocation of National Security Act against the arrestees of the Noida wage hike struggle as illegal and unconstitutional”, People’s Union for Civil Liberties (PUCL), মে ২০২৬।

 


 

সংকল্প একজন শিক্ষার্থী ও লেখক; ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

 

 

Share this
Leave a Comment