‘লিমিটেড ড্যামেজ’: কাশ্মীরের গভীর ক্ষত ফের উন্মুক্ত করল বলিউড টিজার


  • July 3, 2026
  • (0 Comments)
  • 109 Views

চৌহান  ছবির টিজার বিতর্কের তাৎপর্য কেবল একটি সংলাপ বা একটি ছবিকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আরও বৃহত: ভারতের মূলধারার জনপ্রিয় সংস্কৃতি কি ক্রমশ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোয় পরিণত হচ্ছে?

 

সংকল্প

 

মাত্র আড়াই মিনিটের একটি প্রচারমূলক ভিডিওই বলিউডকে সাম্প্রতিক বছরগুলির অন্যতম তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

 

২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রকাশিত হয় ১৪৪ সেকেন্ডের চৌহান ছবির টিজার। নীরজ যাদব পরিচালিত এই ছবিটি প্রযোজনা করেছে আনন্দ এল. রাইয়ের কালার ইয়েলো প্রোডাকশনস ও জিও স্টুডিওস; প্রযোজকদের মধ্যে রয়েছেন জ্যোতি দেশপাণ্ডে ও হিমানশু শর্মা। কাহিনির পটভূমি পুলওয়ামা, আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অজয় দেবগন অভিনয় করেছেন এক সেনা অফিসারের ভূমিকায়, যিনি কাশ্মীরে কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণ-প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা ১ অক্টোবর ২০২৭-এ।

 

টিজারে দেবগনের কণ্ঠে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিভিন্ন হাতিয়ারের একের পর এক উল্লেখ করা হয়, কিন্তু প্রতিটিকেই শেষ পর্যন্ত অপ্রতুল বলে খারিজ করা হয়। বলা হয়, টিয়ার গ্যাস আর কার্যকর নয়, কারণ সাধারণ মানুষ সহজেই মাস্ক জোগাড় করে নিতে পারে; জলকামানের প্রভাব সাময়িক; আর পেলেট বন্দুক নাকি “লিমিটেড ড্যামেজ”। এরপর টিজার দাবি করে, গত ৭৫ বছরের সংঘাতে কাশ্মীরে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ সেনা, ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, তবুও পাথর ছোড়া বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলার কোনও “সমাধান” খুঁজে পায়নি রাষ্ট্র। টিজারের বক্তব্য সেই তথাকথিত “সমাধান” হলেন দেবগনের চরিত্র, অর্থাৎ চৌহান।

 

টিজারের শেষ সংলাপটি আরও সরাসরিভাবে সাম্প্রদায়িক। সেখানে “পাঠানদের” উদ্দেশে ঘোষণা করা হয় “চৌহান আসছে।” এই সংলাপকে অনেকেই কাশ্মীরি মুসলমানদের একটি অভিন্ন, শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করার সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে, “চৌহান” বনাম পাঠান — এই বিন্যাসকে অনেকে শাহরুখ খানের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র পাঠান-এর প্রতিও একটি পরোক্ষ কটাক্ষ হিসেবে দেখছেন। তবে একটি রাজপুত বংশপরিচয়কে ব্যবহার করে গোটা কাশ্মীরি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এক অবিভক্ত শত্রু-পরিচয়ে পরিণত করার এই প্রচেষ্টা রাষ্ট্রপুষ্ট হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বহুল পরিচিত কৌশলের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ।

 

‘সীমিত ক্ষতি’ আসলে দেখতে কেমন

 

কাশ্মীরে পেলেট বন্দুককে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি তথাকথিত “অপ্রাণঘাতী” (নন-লিদাল) মব-নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১০ সালের আগস্টে জম্মু ও কাশ্মীরে এর প্রবর্তন ঘটে, যখন তৎকালীন ওমর আবদুল্লাহ সরকার সেই বছরের পুলিশ গুলিতে শতাধিক সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি এড়াতে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প উপায় চেয়ে কেন্দ্রের কাছে আবেদন করে। সেই প্রেক্ষাপটেই জীবন্ত গুলির পরিবর্তে আনা হয় পেলেট-নিক্ষেপকারী পাম্প-অ্যাকশন শটগান।

 

কিন্তু এই অস্ত্রের কার্যপদ্ধতিই তার তথাকথিত “নিরাপত্তা”র দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। একটি মাত্র কার্টিজ থেকে একসঙ্গে প্রায় ৩৬০ থেকে ৬০০টি ধাতব বল ছিটকে বেরিয়ে আসে, যা গুলির করার পর সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদ কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। এ কথা স্বয়ং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের এক প্রাক্তন আইজি-ও স্বীকার করেছেন। আহতদের চিকিৎসা করা বহু চিকিৎসক আবার শরীরে ঢুকে থাকা সমস্ত পেলেট বের করার প্রচেষ্টা এড়িয়ে চলেন, কারণ সেগুলি অপসারণ করতে গিয়ে আরও গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। ফলে বহু মানুষ আজও শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে আটকে থাকা পেলেট নিয়ে বেঁচে আছেন।

 

পেলেট বন্দুকের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের নথি ছড়িয়ে রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়কালের হাসপাতাল রেকর্ড, বিধানসভা ও সংসদে পেশ করা সরকারি তথ্য, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং চিকিৎসা-বিষয়ক গবেষণাপত্রে। ২০১০ সালে এই অস্ত্র ব্যবহারের প্রথম চার মাসের মধ্যেই এসকেআইএমএস হাসপাতালের একটি গবেষণায় অন্তত ৬ জনের মৃত্যু এবং ১৯৮ জনের আহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। আহতদের মধ্যে অন্তত ৫ জন দৃষ্টিশক্তি হারান। আক্রান্তদের বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে।

 

২০১৬ সালের জুলাই মাসে বুরহান ওয়ানির হত্যার পর যে গণবিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের ঢেউ শুরু হয়, সেই সময় পেলেট বন্দুকের ব্যবহার অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছে যায়। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৬ সালেই ১,৭২৬টি পেলেট-আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বিধানসভায় জানান যে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মোট ৬,২২১ জন পেলেটের আঘাতে আহত হন। তাদের মধ্যে ৭২৮ জনের চোখে আঘাত লাগে এবং অন্তত ৫৪ জন স্থায়ী বা আংশিক দৃষ্টিহানির শিকার হন। একই সময়ে সিআরপিএফ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টকে জানায় যে মাত্র ৩২ দিনের অস্থিরতার সময় তারা প্রায় ১৩ লক্ষ পেলেট নিক্ষেপ করেছিল।

 

২০২২ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অপথ্যালমোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭৭৭ জন পেলেট-আহত রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি দেখায় যে প্রতি পাঁচজনে চারজনেরও বেশি ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার পর সর্বোচ্চ যে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, তা কেবল আঙুল গুনে চিনতে পারার মতো (“counting fingers” vision); অনেক ক্ষেত্রে তারও কম। গবেষণাপত্রটি আরও উল্লেখ করে যে এই সময়ে কাশ্মীরে নথিভুক্ত গুরুতর চোখের আঘাতের সংখ্যা ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের সমগ্র ইরাক যুদ্ধজুড়ে নথিভুক্ত গুরুতর চোখের আঘাতের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

 

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পেলেট-সংক্রান্ত আহতের সংখ্যা ছিল ৪,৫৯২। এর মধ্যে ১,৪৫৯টি ছিল চোখে আঘাতের ঘটনা এবং অন্তত ১৩৯ জন স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যান। অন্যদিকে, পোলিস প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২,৯৪২ জন আহত এবং ১৮ জন নিহত হন।

 

২০১৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এসএমএইচএস হাসপাতালের তথ্য দেখায় যে ২০১৬ সালের গণ-অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে ১,২৫৩ জন রোগীর মোট ১,৩১৪টি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন দশম শ্রেণির ছাত্র মাইসার মির, যিনি মাত্র তেরো মাসের মধ্যে ওই হাসপাতালের নথিভুক্ত ৭৫তম ব্যক্তি হন যার দুই চোখই পেলেটের আঘাতে বিদ্ধ হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে নথিভুক্ত আহতদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ছিল ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছিলেন ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী।

 

পেলেট বন্দুকের প্রভাব কেবল শারীরিক নয়, গভীর মানসিক ক্ষতও রেখে গেছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৮০ জন পেলেট-আহতকে নিয়ে পরিচালিত একটি মনোরোগ-সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা যায়, তাদের ৮৫ শতাংশ কোনও না কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ৭৯ শতাংশের ক্ষেত্রে গুরুতর বিষণ্নতার (Major Depressive Disorder) লক্ষণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এবং প্যানিক ডিসঅর্ডারের হারও ছিল অত্যন্ত উচ্চ। ২০২৫ সালে ট্রমাটোলজি পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা, যেখানে ১০ জন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী জটিল মানসিক ট্রমা, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাঘাত এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর ফলে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো পরিণতির কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও বারবার সতর্কতা জারি করেছে। এমনকি উদারনৈতিক মানবাধিকার কাঠামোর সীমিত মানদণ্ডের বিচারেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই অস্ত্রকে ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য মানবাধিকারবিরোধী বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন একে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্রগুলির অন্যতম বলে বর্ণনা করেছে। ২০২১ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শিশুদের বিরুদ্ধে পেলেট ব্যবহারের অবসান ঘটানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান এবং এই অস্ত্রের কারণে নিহত ও পঙ্গুত্ববরণ করা শিশুদের বিষয়ে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করেন।

 

২০১৬ সালে দ্য গার্জিয়ান-এ লেখক ও সাংবাদিক মির্জা ওয়াহিদ লিখেছিলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম ঘটনা যেখানে একটি রাষ্ট্র ধারাবাহিক পদ্ধতিতে নিজেরই অসামরিক নাগরিকদের অন্ধ করে দিচ্ছে। পরবর্তী সময়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও কার্যত একই মূল্যায়নের প্রতিধ্বনি করেছে। ফলে চৌহান টিজারের একটি সংলাপে পেলেট বন্দুকের প্রভাবকে কেবল “সীমিত ক্ষতি” বলে উল্লেখ করা বহু কাশ্মীরির কাছে কেবল অসংবেদনশীলতা নয়, বরং এক দশকের নথিভুক্ত তীব্র যন্ত্রণা ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ইতিহাসকে অস্বীকার করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা বলেই প্রতিভাত হয়েছে।

 

পরিসংখ্যানের আড়ালের মানুষগুলো

 

টিজারের বিতর্কিত সংলাপটি সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত হানে সেই মানুষগুলোর স্মৃতিকে, যাদের মুখ, চোখ এবং জীবন গত এক দশক ধরে কাশ্মীরে রাষ্ট্রের পেলেট-নীতির জীবন্ত সাক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এনাদের মধ্যে কিছু নাম কাশ্মীরের গণস্মৃতিতে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে।

 

  • ইনশা মুশতাক লোন, তখন মাত্র ১৪ বছর বয়স। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শোপিয়ানে নিজের বাড়ির জানালা থেকে একটি বিক্ষোভ দেখছিলেন। সেই সময় শতাধিক পেলেট তার মুখে এসে আঘাত করে। ভেঙে যায় তিনটি দাঁত, আর তিনি চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। তবুও তিনি হার মানেননি; ২০২৩ সালে দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

 

  • তামানা আশরাফ, বয়স মাত্র ৯ বছর। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে গান্দেরবালে নিজের জানালার ধারে বসে থাকার সময় তার চোখে পেলেট লাগে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তার মাকে মারধর করেছিলেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

 

  • ফারজান শেখ, ১৬ বছর বয়সী। ২০১৭ সালের মার্চে শ্রীনগরে একটি জানাজার মিছিলে পুলিশের গুলিতে তিনি বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মাত্র পাঁচ মাস পরে, নিজের বাড়ির বাইরে বেরোতেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিআরপিএফ গাড়ি থেকে ছোড়া দ্বিতীয় দফার পেলেট তার ডান চোখটিও অন্ধ করে দেয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন।

 

  • হিবা নিসার (কিছু প্রতিবেদনে হিবা জান), তখন বয়স মাত্র ১৮ মাস। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে শোপিয়ানে মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় তাদের বাড়ির জাল-দরজা ভেদ করে ছুটে আসা পেলেট তার চোখে আঘাত করে। এই শিশুর রক্তাক্ত মুখের সেই ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কাশ্মীরে পেলেট-সন্ত্রাসের এক প্রতীক হয়ে ওঠে।

 

  • আসিফ আহমদ শেখ, অনন্তনাগের দশ বছরের এক পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তিনি এক আলোকচিত্রকারকে বলেছিলেন, শুধু আবার কার্টুন দেখতে পারা আর বই পড়তে পারাই এখন তার জীবনের স্বপ্ন।

 

  • মোহাম্মদ আশরাফ, ১,২০০-রও বেশি ভুক্তভোগীকে নিয়ে গড়ে ওঠা পেলেট ভিকটিমস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট-এর প্রধান। তিনি এক চোখে অন্ধ এবং আজও তার শরীরে ৬০০-রও বেশি পেলেট রয়ে গেছে।

 

২০১৬ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ বিবরণ আরও বহু বিভীষিকার কথা তুলে ধরে। যেমন, শ্রীনগরের উপকণ্ঠে উদ্ধার হওয়া এক ১১ বছরের বালকের পেলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহ; খুব কাছ থেকে প্রায় ৩০০টি পেলেট ছুড়ে হত্যা করা ২১ বছরের এক ব্যাংক প্রহরী; এবং দক্ষিণ কাশ্মীরে একই সপ্তাহে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী চার কিশোরীর মুখ লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা।

 

শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালের চিকিৎসকেরা, যাঁদের মধ্যে অতিথি চক্ষু-শল্যচিকিৎসক এস. নটরাজন-ও ছিলেন, বারবার বলেছেন যে ২০১৬-র সেই মাসগুলিতে তাঁদের দিন-রাত এক করে অস্ত্রোপচার চালাতে হয়েছে। তাঁদের অপরেশন থিয়েটারে আসত “ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী”, যাদের চোখের সামান্যতম দৃষ্টিশক্তিও যদি বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চলত।

 

সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ

 

টিজারের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি ছিল রাষ্ট্রের দমনযন্ত্রকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও পেলেট বন্দুক, প্রতিটি অস্ত্রের উল্লেখ করা হয়েছে শুধু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যে এগুলি নাকি যথেষ্ট “কঠোর” নয়। অর্থাৎ, হাজার হাজার মানুষকে আহত ও অন্ধ করে দেওয়া অস্ত্রগুলিকেও অপর্যাপ্ত বলে দেখিয়ে আরও নির্মম রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে যুক্তি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এই কারণেই কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন অংশ থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

 

ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র ইমরান নবী দার ছবিটিকে “আবর্জনা” বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন যে এতে এমন উপাদান রয়েছে যা ঘৃণা ও সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে। তাঁর মতে, অন্ধ হয়ে যাওয়া শিশু ও তাদের পরিবারের ট্র্যাজেডিকে উপহাস করা কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারের অংশ। অন্য এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ছবিটির প্রচার-কৌশল নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী যোসেফ গোয়েবলস-কেও লজ্জায় ফেলতে পারে।

 

মানবাধিকারকর্মী ওয়াজাহাত ফারুক ভাট বলিউডকে আহ্বান জানান, বন্দুকের নলের উপর দাঁড় করিয়ে তথাকথিত “আলফা-মেল” নায়ক তৈরির রাজনীতি থেকে সরে আসতে। লেখক ও সাংবাদিক মির্জা ওয়াহিদ, যিনি ২০১৬ সালে দ্য গার্জিয়ান-এ পেলেটে অন্ধ হয়ে যাওয়া কাশ্মীরিদের নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন লিখেছিলেন, বলেন এই টিজার আসলে অন্ধ হয়ে যাওয়া কিশোর-কিশোরীদের যন্ত্রণাকেই উপহাস করছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে “ঘৃণার সিনেমার যুগে” আদৌ কি দীর্ঘ অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার কোনও শ্রোতা অবশিষ্ট আছে?

 

বিতর্ক শুধু কাশ্মীর বা মানবাধিকার মহলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষত্রিয় পরিষদ নামে একটি রাজপুত সংগঠন ছবির নাম ‘চৌহান’ নিয়েই আপত্তি জানায়। সংগঠনের বক্তব্য, একটি রাজপুত বংশপরিচয়কে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় এবং রাজপুত ইতিহাসের প্রতিও অসম্মানজনক। তারা আরও উল্লেখ করে, মধ্যযুগে বহু রাজপুত রাজ্য ও আফগান শাসকদের মধ্যে জোট ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল; ফলে টিজার যে সরলীকৃত “রাজপুত বনাম পাঠান” বিভাজন নির্মাণ করছে, তা ইতিহাসের সঙ্গেও অসঙ্গত।

 

জিও স্টুডিওস এই ছবির অন্যতম প্রযোজক হওয়ায় এবং জম্মু-কাশ্মীরে রিলায়েন্স জিওর বিপুল গ্রাহকভিত্তি থাকায়, বহু মানুষ জিও পরিষেবা বয়কটের আহ্বান জানান সমাজমাধ্যমে। আইনজীবী আশিস গোয়েল এই প্রসঙ্গে নাৎসি জার্মানির চলচ্চিত্র নির্মাতা লেনি রিফেনস্টাল-এর নামও উল্লেখ করেন। সাংবাদিক বিজয়তা সিং স্মরণ করিয়ে দেন যে কাশ্মীরিরা জাতিগতভাবে পাঠান নন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে বিজেপি-সমর্থিত জোট সরকারের আমলেই তরুণ পাথর-নিক্ষেপকারীদের জন্য অ্যামনেস্টি প্রকল্প চালু করা হয়েছিল।

 

তবে সমস্ত প্রতিক্রিয়াই সমালোচনামূলক ছিল না। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে টিজারটিকে স্বাগত জানান। বহু দক্ষিণপন্থী অ্যাকাউন্টও ছবিটির প্রশংসা করে দাবি করে, অতীতে রাষ্ট্র যে “অতিরিক্ত সংযম” দেখিয়েছিল, এই ছবি নাকি তারই প্রয়োজনীয় সংশোধন।

 

সমালোচকদের একাংশ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিকও তুলে ধরেছেন। ২০১০ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ-র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কনফারেন্স–নেতৃত্বাধীন সরকারই প্রথম কেন্দ্রের কাছে পেলেট শটগানকে “প্রাণঘাতী নয়” এমন ভিড় নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে সরবরাহ করার আবেদন জানিয়েছিল। আজ সেই একই দলের বর্তমান নেতৃত্বই চৌহান টিজারের অন্যতম তীব্র সমালোচক। এই বৈপরীত্য কাশ্মীরে রাষ্ট্রীয় দমননীতির ইতিহাসে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকাকেও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

 

বৃহত্তর মতাদর্শিক পরিসর

 

এই সূত্রে মনে করিয়ে দিই যে টিউনিসিয়ার পরিচালক কাওথার বেন হানিয়া নির্মিত দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব ছবিটির ভারতীয় পরিবেশক ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬ মার্চ মুক্তির লক্ষ্যে ছবিটি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন-এর কাছে জমা দিলে সিবিএফসির এক সদস্য তাঁকে বলেছিলেন, ছবিটি মুক্তি পেলে “ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক ভেঙে পড়বে”, এবং সেই কারণেই ছবিটিকে শংসাপত্র দেওয়া হয়নি। একই সময়ে, অভিযোগ ওঠে যে ছবিটিকে আইএফএফআই গোয়া এবং বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-সহ একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ছবিটি ২০২৪ সালের গোড়ার দিকে গাজায় একটি গাড়ির ভেতরে নিহত পাঁচ বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব-এর সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। যদিও কয়েক সপ্তাহের বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত সিবিএফসি নিজেদের অবস্থান বদলায়, কিন্তু ভারত সরকারের এই আচরণ আলোচ্য বিতর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। টিজারের শুরুতেই পাথর নিক্ষেপকারী তরুনদের দেখে প্রথমেই গাজার উপর ইজরায়েলি জুলুমের প্রতিরোধের দৃশ্য মনে পড়ে যায়। এই সাদৃশ্যকে নিছক কাকতালীয় বলা যায় না। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্র রাষ্ট্রগুলি যে ভাষায় দখল, সামরিকীকরণ এবং নিপীড়িত জাতিসত্তার বিরুদ্ধে সহিংসতাকে বৈধতা দেয়, চৌহান টিজারের রাজনৈতিক কল্পনাও সেই বৃহত্তর মতাদর্শিক পরিসরের মধ্যেই অবস্থিত বলে মনে হয়।

 

এই কারণেই চৌহানকে বিচ্ছিন্ন একটি চলচ্চিত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। গত এক দশকে বিশেষত বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রবাদ, সামরিক জাতীয়তাবাদ, মুসলিমবিদ্বেষ, হাইপার-মাসকিউলিনিটি এবং রাষ্ট্রের দমননীতিকে বীরত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বলিউডে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক (২০১৯), দ্য কাশ্মীর ফাইলস (২০২২), দ্য কেরালা স্টোরি (২০২৩), বাস্তার: দ্য নকশাল স্টোরি (২০২৪), এবং দ্য বেঙ্গল ফাইলস (২০২৫)এর মতো বহুল আলোচিত প্রোপাগান্ডা-মূলক চলচ্চিত্রগুলির প্রতিটিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। সরকারের দ্বিচারিতা দেখুন, দ্য কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্য সরকার কর-মুক্ত ঘোষণা করে বিনামূল্যে টিকিট বিতরণ ও বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় বলিউডের একটি বড় অংশ স্বেচ্ছায় বা বাজারের চাপে শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক বয়ানের পুনরুৎপাদক হয়ে উঠছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে চৌহান বিতর্কের তাৎপর্য কেবল একটি সংলাপ বা একটি ছবিকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আরও বৃহত: ভারতের মূলধারার জনপ্রিয় সংস্কৃতি কি ক্রমশ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোয় পরিণত হচ্ছে, যেখানে সিনেমা শিল্পসমালোচনার ক্ষেত্র নয়, বরং রাষ্ট্র, কর্পোরেট পুঁজি ও সংখ্যাগুরুবাদী মতাদর্শের প্রচারের হাতিয়ার? যদি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়, তবে চৌহান কোনও ব্যতিক্রম নয়; বরং গত এক দশকের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রবণতারই সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশগুলির একটি।

 

তথ্যসূত্র:

 

১। কাদরি ইনজামাম ও হাজ়িক কাদরি, “In Kashmir, ‘Non-Lethal’ Weapons Cause Lethal Damage”, The Caravan, ১২ জুলাই ২০১৬।

 

২। কানদিলা কুদ্দুস, “A New Bollywood Hero Walks into the Space Where Kashmir’s Pellet Victims Used to Be”, Maktoob Media, ১ জুলাই ২০২৬।

 

৩। ইন্দ্রদীপ ভট্টাচার্য, “In Dismissing Pellet Injuries as ‘Limited Damage’, ‘Chauhaan’ Loses Sight of Kashmir’s Grim, Brutal Reality”, Alt News, ১ জুলাই ২০২৬।

 

৪। মুজাফ্‌ফর রায়না, “Devgn Film Teaser Blind to Kashmir Misery, Sparks Outrage over Pellet Gun References”, The Telegraph, ২৮ জুন ২০২৬।

 

৫। মির্জা ওয়াহিদ, “India’s Crackdown in Kashmir: Is This the World’s First Mass Blinding?”, The Guardian, ৮ নভেম্বর ২০১৬।

 

৬। “UN Chief Asks India to End Use of Pellet Guns on Kashmir Children”,  Al Jazeera, ৩০ জুন ২০২১।

 


সংকল্প একজন শিক্ষার্থী ও লেখক; ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

 

 

 

Related homepage: https://soundforgepro.com/sound-forge-pro-review-2026/

Share this
Comments are closed