মহিলা সংরক্ষণ: একটি অসমাপ্ত লড়াই (প্রথম পর্ব)


  • May 16, 2026
  • (0 Comments)
  • 27 Views

টিংকু খান্না

‘Towards Equality’ থেকে ২০১০-এর অচলাবস্থা পর্যন্ত

১. গণপরিষদ থেকে পঞ্চায়েত পর্যন্ত

১৯৪৬-এর ডিসেম্বরে গণপরিষদের অধিবেশন যখন শুরু হল, মঞ্চের সামনে প্রথম সারিতে আসীন একমাত্র মহিলা ছিলেন সরোজিনী নাইডু। প্রায় তিনশো সদস্যের সেই পরিষদে সংবিধান রচনায় অংশ নিয়েছিলেন মোট পনেরো জন মহিলা। সেই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল — মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ নয়, বরং সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া সাম্যের প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে মহিলাদের ক্রম- ক্ষমতায়ন। তার ভিত্তি ছিল এই বিশ্বাস যে সাম্যের এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিই মেয়েদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতিতে রূপান্তরিত হবে। হয়নি।

সেই বিশ্বাস ভেঙে গিয়েছিল ১৯৭১ সালে ফুলরেণু গুহের নেতৃত্বে গঠিত Committee on the Status of Women in India-র রিপোর্টে। ১৯৭৪-এ প্রকাশিত তাঁদের রিপোর্ট ‘Towards Equality’-তে নথিভুক্ত হয়েছিল ক্রমহ্রাসমান লিঙ্গানুপাত, গড় আয়ু ও মৃত্যুহারে বৈষম্য, এবং সাক্ষরতা, শিক্ষা ও জীবিকার ক্ষেত্রে মহিলাদের  প্রবেশাধিকারের ক্রমাগত সঙ্কোচন। রিপোর্টের সিদ্ধান্ত ছিল — “বৃহত্তম সংখ্যালঘু” হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মহিলাদের প্রভাব প্রান্তিক; এবং তাঁদের সুপারিশ ছিল রাজনৈতিক দলগুলি প্রার্থী মনোনয়নে কোটা স্থির করুক, পাশাপাশি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে পৌরসভা ও পঞ্চায়েতে আসন সংরক্ষণ করা হোক। এর পরবর্তীকালে নারী সংরক্ষণ নিয়ে যত বিতর্ক হয়েছে, প্রতিটির মূলসূত্র এই রিপোর্ট। ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকের নারী আন্দোলনের নানান ধারা —  রাজনৈতিক দলগত, স্বাধীন, পণপ্রথা-বিরোধী, ধর্ষণ-বিরোধী, সমাজতান্ত্রিক, দলিত-নারীবাদী, মুসলিম মহিলাদের আন্দোলন — সকলেই মেয়েদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিকে নারীবাদী দাবিতে পরিণত করতে পেরেছিল এই রিপোর্টের জোরেই।

প্রথম আইনি প্রতিক্রিয়া এসেছিল নীচ থেকে। পি. ভি. নরসিমা রাও সরকারের আমলে ১৯৯২ সালে পাশ হয়ে ১৯৯৩ থেকে কার্যকর হওয়া সংবিধানের ৭৩ ও ৭৪ নম্বর সংশোধনী, পঞ্চায়েত ও পৌর সংস্থায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করে। যা পরে প্রথম বিহার পঞ্চাশ শতাংশে নিয়ে যায়, এবং তার পর মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা, ওড়িশা, রাজস্থান, ত্রিপুরা, উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ড সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে। এই মুহূর্তে ভারতের স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় প্রায় ১৫ লক্ষ মহিলা নির্বাচিত পদে আসীন — পৃথিবীর কোনও দেশেই এর চেয়ে বড় সংখ্যক নির্বাচিত মহিলা নেই। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের একাধিক গবেষণা — বিশেষত এস্থার ডুফলো ও রাঘবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গ ও রাজস্থানে করা কাজ দেখিয়েছে, কীভাবে মহিলা প্রধানদের উপস্থিতি পঞ্চায়েত সমিতির বরাদ্দ খরচে পানীয় জল, স্বাস্থ্যবিধি, শিশু-পরিচর্যা ও পারিবারিক হিংসার মামলা নথিভুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েতের এই সাফল্য একদিকে যেমন সংরক্ষণকে এক নারীবাদী যুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক প্রমাণে কাজে লেগেছিল, অন্যদিকে তেমনই সংসদীয় বিলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি জোরালো যুক্তি হয়ে উঠেছিল, ভিত্তিস্তরে যখন মেয়েরা এত সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে, তাহলে শীর্ষে কেন নয়?

২. যে আন্দোলন এই দাবির জন্ম দিয়েছিল

সংরক্ষণের দাবি সংসদে এসেছিল সংসদের ভিতর থেকে নয়। এসেছিল রাস্তা থেকে, মেয়েদের শেলটার থেকে, থানা থেকে, পঞ্চায়েত থেকে, আদালত-কক্ষ থেকে, এবং জাতিবাদ-বিরোধী মঞ্চ থেকে — প্রায় পাঁচ দশকের নারীবাদী আন্দলনের ঘাম রক্তের লড়াই থেকে।

জরুরি অবস্থা-উত্তর স্বাধীন নারী আন্দোলন ছিল তার প্রথম সুস্পষ্ট অধ্যায়। পুলিশ-হেফাজতে মথুরার ধর্ষণ মামলা, যা পরবর্তী কালে ধর্ষণ–বিরোধী আইনের রূপ নেয়, তৎকালীন বম্বের Forum Against Rape (পরবর্তীকালে Forum Against Oppression of Women) এবং দিল্লির Saheli এই স্বাধীন নারী আন্দোলনের বিশিষ্ট অর্জন। চারজন আইনের অধ্যাপক — উপেন্দ্র বক্সী, লতিকা সরকার, রঘুনাথ কেলকর ও বসুধা ধাগমওয়ার — প্রধান বিচারপতিকে যে খোলা চিঠি লিখেছিলেন, তা একটিমাত্র রায়কে এক জাতীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত করে এবং জন্ম দেয় ১৯৮৩-র Criminal Law (Amendment) Act-এর। স্ত্রী সংঘর্ষ, মানুষী (১৯৭৮ থেকে মধু কিশ্বর ও রুথ বনিতার যৌথ ভাবে সম্পাদিত পত্রিকা), স্ত্রী মুক্তি সংগঠনা, Joint Women’s Programme, National Federation of Indian Women (NFIW, ১৯৫৪-তে স্থাপিত CPI-র মহিলা সংগঠন) এবং সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি (AIDWA, ১৯৮১-তে স্থাপিত CPI-M-এর মহিলা সংগঠন) — আশির দশকের পণ-বিরোধী আন্দোলন, শাহ বানো কেস (১৯৮৫–৮৬), রূপ কানোয়ার-সতীদাহ বিরোধী আন্দোলন (১৯৮৭) ও ভানওয়ারী দেবী মামলার (রাজস্থান, ১৯৯২) ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।  ভানওয়ারী দেবী, যিনি ছিলেন এক নিম্নবর্ণের ‘সাথিন’ এবং যাঁকে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার চেষ্টার “শাস্তি” হিসেবে উচ্চবর্ণের পুরুষদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল —  তাঁর মামলার প্রতিক্রিয়া পরবর্তীকালে রূপ নেয় বিশাখা নির্দেশিকা (১৯৯৭) এবং POSH আইনে (২০১৩)।

আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এক স্পষ্ট দাবির রূপ পায়। রাজীব গান্ধী সরকারের আমলে বীণা মজুমদার ও লতিকা সরকারের পরামর্শে রচিত National Perspective Plan for Women (১৯৮৮–২০০০) সুপারিশ করেছিল সব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ থাকুক । AIDWA, National Federation of Indian Women (NFIW, ১৯৫৪-তে স্থাপিত CPI-র মহিলা সংগঠন), Joint Women’s Programme এবং অসংখ্য স্বাধীন সংগঠন নব্বইয়ের দশক জুড়ে দাবিপত্র প্রকাশ করে গেছে — ৭৩ ও ৭৪তম সংশোধনীকে উচ্চতর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করা হোক। কিন্তু ১৯৯০ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটলো যার ফলে জাতপাত- কণ্টকিত ভারতীয় প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘নারী’ ধারণাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় এবং সংরক্ষণ-বিতর্ক সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

৩. নারীঃ একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক বর্গ 

১৯৯০-এর অগস্টে ভি. পি. সিং সরকার যখন মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে — কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে OBC সংরক্ষণ চালু করে — তখনই উচ্চবর্ণের ছাত্রদের পক্ষ থেকে এক তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ-সংগঠন গড়ে ওঠে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যত্র মণ্ডল-বিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নেতৃত্বে ছিলেন উচ্চবর্ণের মহিলারাই।

মণ্ডলের পরেই দলিত-বহুজন নারীবাদী স্বর তীব্রভাবে শোনা যেতে লাগলো। সুসী থারু ও তেজস্বিনী নিরঞ্জনার প্রবন্ধ ‘Problems for a Contemporary Theory of Gender’ (Social Scientist, ১৯৯৪; পরে Subaltern Studies IX-এ পুনঃমুদ্রিত) যুক্তি দেয় — এ যাবত নারী আন্দোলন উচ্চ বর্ণের নেতৃত্বাধীন ছিল। ফলে, নারীবাদী ‘বিষয়’ বা ‘subject’ টি গড়ে  উঠেছিল এক অচিহ্নিত হিন্দু-উচ্চবর্ণ নারী – অবয়বকে কেন্দ্র করে এবং মণ্ডল-বিরোধী আন্দোলন সেই বাস্তবকে অবশেষে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। শর্মিলা রেগের Writing Caste/Writing Gender (Zubaan, ২০০৬) এই যুক্তিকেই আরও বিস্তৃত করে দলিত নারীবাদী দৃষ্টিকোণকে চিহ্নিত করে এক স্বতন্ত্র জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান হিসেবে — নারীবাদের সঙ্গে কোনও সংযোজন হিসেবে নয়, বরং তার ভিত্তিরই সমালোচনা হিসেবে। উমা চক্রবর্তীর Gendering Caste: Through a Feminist Lens (Stree, ২০০৩) এই কাঠামোকে সংহত করে।

শুধু অ্যাকাডেমিক প্রবন্ধেই এই বিতর্ক সীমায়িত থাকল না। রুথ মনোরমা ১৯৯৫-তে National Federation of Dalit Women প্রতিষ্ঠা করে দলিত নারীবাদী বক্তব্য তুলে ধরলেন বেইজিং সম্মেলনে এবং রাষ্ট্রসংঘে। National Campaign on Dalit Human Rights-এর অধীনে ২০০৬-এ গঠিত All India Dalit Mahila Adhikar Manch (AIDMAM) দেশের নানা রাজ্যে দলিত মহিলাদের সংগঠিত করে এবং বর্ণ-ভিত্তিক যৌন হিংসার যে খতিয়ান লিপিবদ্ধ করে তা পরবর্তীকালের আইনি ও নীতিগত সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। জাকিয়া সোমন ও নুরজাহান সাফিয়া নিয়াজের প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন (২০০৭) এই যুক্তি কাঠামোকেই মুসলিম মহিলাদের পরিসরে লাগু করে। হরিয়ানায় মনীষা মশালের Swabhiman Society, AIDMAM-এ আশা কওতাল-এর নেতৃত্ব, এবং সাম্প্রতিক Dalit Women Fight যৌথভাবে এই প্রশ্নকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই সংগঠনগুলি একত্রে যে অবস্থান গড়ে তুলেছিল, তা ছিল এই : ‘নারী’-সংরক্ষণ যদি ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণ- ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বৈষম্যকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত না করে, তবে তা কার্যত উচ্চবর্ণের নারীদেরই সংরক্ষণে পরিণত হবে, কারণ উচ্চবর্ণের নারীদের কাছে ইতিমধ্যেই যে রাজনৈতিক পুঁজি জমা আছে, সংরক্ষণ স্রেফ তাকে সংরক্ষিত আসনে রূপান্তরিত করবে।

৪. সেই বিল, ১৯৯৬– ২০১০

এইচ. ডি. দেবেগৌড়ার যুক্তফ্রন্ট সরকারের আইন প্রতিমন্ত্রী রমাকান্ত ডি. খালাপ ১৯৯৬-এর ১২ সেপ্টেম্বর ১১তম লোকসভায় Constitution (৮১তম সংশোধন) বিল হিসেবে নারী সংরক্ষণ বিল উত্থাপন করেন। এর লক্ষ্য ছিল লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা। বিলটি পাঠানো হয় CPI-র প্রবীণ সাংসদ গীতা মুখার্জির নেতৃত্বে গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটিতে।

মুখার্জি কমিটির সুপারিশগুলি ভিত্তি-প্রস্তরের মতো। তাদের সুপারিশ ছিল — “not less than one-third” শব্দবন্ধকে বদলে “as nearly as may be, one-third” করা হোক; সংরক্ষণ সম্প্রসারিত হোক রাজ্যসভা ও বিধান পরিষদেও; এবং যে সুপারিশটি পরবর্তী প্রতিটি সংস্করণকে আকার দিয়েছে — যেখানেই OBC সংরক্ষণ সাংবিধানিক ভাবে কার্যকর, সেখানেই OBC মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু ১১তম লোকসভা ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলটি বাতিল হয়ে যায়।

বাজপেয়ী সরকারের আমলে ১৯৯৮-এ, পুনরায় ১৯৯৯-এ এবং ২০০৩-এ দু’বার বিলটি পুনঃউত্থাপিত হয়। প্রতিবারই বিলটি দুই ধরণের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে — OBC-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক দলগুলির (SP, RJD, JD-U) প্রকাশ্য বিরোধিতা; এবং মূলধারার দলগুলির (কংগ্রেস, বিজেপি) চাপা অনিচ্ছা — তারা না তো এক-তৃতীয়াংশ নিরাপদ আসন ছেড়ে দিতে রাজি, না মুখার্জি কমিটির OBC-অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ মেনে নিতে রাজি। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮-এর মধ্যে বিলটি প্রায় নয়বার সংসদে উত্থাপিত হয়েছিল।

২০০৪-এ মনমোহন সিং-নেতৃত্বাধীন UPA তাদের Common Minimum Programme-এ বিলটিকে অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০৮-এ বারবার-বাতিল হওয়ার সমস্যাটি এড়াতে বিলটি Constitution (১০৮ তম সংশোধন) বিল হিসেবে উত্থাপিত হয় রাজ্যসভায় — যেহেতু রাজ্যসভা স্থায়ী কক্ষ, এটি ভেঙে যায় না। ২০১০-এর ৯ মার্চ, এক বিশৃঙ্খল দিনের শেষে — যেদিন এসপি ও আরজেডি-র সাংসদরা কাগজপত্র ছিঁড়েছেন, রাজ্যসভার ওয়েল-এ ঢুকে পড়েছেন — রাজ্যসভা ১৮৬–১ ভোটে বিলটি পাশ করে; কংগ্রেস, বিজেপি, বাম, DMK, AIADMK, NCP-সহ প্রায় সবাই পক্ষে ভোট দেয়।স্বীকার করতে বাধা নেই, বিজেপির সুষমা স্বারাজ এ বিষয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা নেন।  

লোকসভায় বিলটি কখনও ভোটাভুটিতেই পৌঁছায়নি। সংখ্যা ছিল। কংগ্রেসের ছিল ২০৬ আসন; UPA-র শরিকদের নিয়ে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াত প্রায় ২৬২; বিজেপির ১১৬ ও বামেদের ২৪ আসন প্রকাশ্যেই সমর্থনের প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা। এসপি, বিএসপি ও আরজেডি-কে পুরোপুরি বাদ দিলেও লোকসভায় সংরক্ষণপন্থী ভোট সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৬৪-র সীমা পেরিয়ে যেত। সংখ্যার দিক থেকে কোনও বাধা ছিল না। তৎকালীন কংগ্রেস সাংসদ মল্লিকার্জুন খাড়গে আনুষ্ঠানিক ভাবে দাবি করেছিলেন, বিলটি ভোটে আনা হোক। কংগ্রেস নেতৃত্ব হিসাব কষেছিল — বিল পাশ হলে SP ও BSP বাইরে থেকে দেওয়া সমর্থন তুলে নেবে, এবং ২০১৪-র আগে OBC ও মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে — তাই তারা বিলটিকে ঝুলিয়ে রাখাই বেছে নেয়। ২০১৪-তে ১৫তম লোকসভা ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলটি বাতিল হয়ে যায়। প্রত্যাহার করা হয়নি। স্রেফ মরে যেতে দেওয়া হয়েছিল।

৫. প্রশ্নটিকে নতুন করে পড়া 

এই বিলের সাতাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল-পাঠটি  হল — OBC এবং দলিত-বহুজন সমালোচনার সারবত্তাকে গ্রাহ্য না করে শরদ যাদব ও মুলায়ম সিং যাদবের নারী বিদ্বেষী দুটি মন্তব্যকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। ১৯৯৭-তে শরদ যাদব সংসদে “পরকটি মহিলায়েঁ” (চুল-ছাঁটা মহিলা)-দের প্রবেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন; ২০১০-এ মুলায়ম সিং বলেছিলেন বিলটি পাশ হলে সংসদ এমন মহিলায় ভরে যাবে যাদের দেখে “শিস ও টিটকিরি” দিতে ইচ্ছা হয়। এই বক্তব্যগুলি ছিল চূড়ান্ত নারীবিদ্বেষী এবং দু’দশক ধরে নারী সংরক্ষণের দাবিকে সেটি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু OBC ও মুসলিম মহিলাদের অন্তর্ভুক্তির মূল দাবীটি লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলেছেন দলিত-বহুজন ও মুসলিম নারীবাদীরা —  এসপি বা আরজেডি-র পিতৃপ্রভুরা নয়।

গীতা মুখার্জির সভাপতিত্বে ১৯৯৬-এর মুখার্জি কমিটি OBC মহিলাদের অন্তর্ভুক্তিকে গ্রহণ করেছিল এক আইনি নীতি হিসেবে — মুলায়ম সিং-এর দাবি কমিটিতে ঢুকে পড়েছিল বলে নয়, বরং নিজস্ব যুক্তিতেই, এক নারীবাদী সংসদীয় সুপারিশ হিসেবে। রুথ মনোরমা ১৯৯৫-এর বেইজিং সম্মেলনে এবং তার পরের কয়েক দশকে অবিচলভাবে যুক্তি দিয়েছেন —  কোনও গুরুতর নারী সংরক্ষণ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হওয়া উচিত সবচেয়ে নিপীড়িতের অবস্থান থেকেই,  দলিত মহিলা, যিনি একইসঙ্গে জাতি, লিঙ্গ ও শ্রেণির হিংসার শিকার। SC, ST, OBC ও মুসলিম মহিলাদের জন্য উপ-সংরক্ষণ না থাকলে সংরক্ষণ কেবল নারী আন্দোলনের ভিতরকার শ্রেণিবিন্যাসকেই পুনরুৎপাদন করে যাবে। 

মায়াবতীর বিএসপি একই দাবি তুলেছিল বহুজন ঐক্যের ভাষায়, নারীবিদ্বেষী টিটকিরি ছাড়াই। ফুলন দেবী — ডাকাত থেকে মির্জাপুরের সাংসদ, ২০০১-এ গুপ্তহত্যা পর্যন্ত যিনি দু’বার সংসদে গেছেন — দলিত ও OBC মহিলাদের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রকাশ্যে সংসদে কথা বলেছেন; তাঁর সংসদে উপস্থিতিই ছিল কে সাংসদ হতে পারেন আর কে পারেন না — সেই পিতৃতান্ত্রিক উচ্চবর্ণসুলভ কল্পনার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত সাক্ষ্য । বিজেপির ভিতরে এক OB নেত্রী উমা ভারতীও একই দাবি তুলেছিলেন, যা তাঁর দলের উচ্চস্তরীয় নেতৃত্ব শুনতে চায়নি। ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন ২০০৭ থেকে দৃঢ় ভাবে বলে আসছে — মুসলিম বা OBC সংরক্ষণ না থাকা অবস্থায় মুসলিম মহিলাদের বাদ দিয়ে যে সংরক্ষণ, সেটি আসলে ভারতীয় নারীকে সাংবিধানিক ভাবে হিন্দু হিসেবে কল্পনা করে। ২০২৩-এর আইনের বিরুদ্ধে AIMIM-এর দুটি ভিন্নমত-ভোট এই পুরোনো যুক্তিরই সংসদীয় প্রতিধ্বনি, কোনও বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক ভঙ্গিমা নয়।

সুতরাং সবসময়েই কমপক্ষে তিনটি স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল, যেগুলিকে নিয়মিত গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। দলিত-বহুজন-মুসলিম নারীবাদী অবস্থান — মনোরমা, রেগে, BMMA, AIDMAM, মনিষা মশাল — যাঁরা সংরক্ষণের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু এই দাবি রেখেছিলেন যে গোড়া থেকেই  সংরক্ষণকে আন্তঃছেদী (intersectional) হতে হবে। OBC পিতৃতান্ত্রিক অবস্থান — মুলায়ম, শরদ যাদব, কিছু মুহূর্তে লালু — যাঁরা এই যুক্তিকে ব্যবহার করেছেন বিলটিকে সামগ্রিকভাবে আটকানোর হাতিয়ার হিসেবে। এবং মূলধারার দলগুলির পরিহার — কংগ্রেস ও বিজেপি — যারা এই পিতৃপ্রভুদের কুৎসিত বক্তব্যকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে, যাতে মুখার্জি কমিটির সুপারিশ বা তার পেছনের নারীবাদী চিন্তার সঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে মুখোমুখি না হতে হয়।

৬. বাম, জাতপাতের প্রশ্ন ও বিকল্প পথ

এই গোটা সময়জুড়ে নারী আন্দোলনের ভেতরে সংরক্ষণের প্রশ্নে সংসদীয় কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিল বামপন্থী সংগঠনগুলির। AIDWA (CPI-M, প্রতিষ্ঠা ১৯৮১), NFIW (CPI, ১৯৫৪), AIPWA (CPI-ML, ১৯৯৪), এবং রাজ্য স্তরের সংগঠনগুলি — যেমন জনবাদী মহিলা সমিতি — আশির দশক ও তার পর শ্রমজীবী ও গ্রামীণ মহিলাদের সংগঠিত করার সাংগঠনিক ভার বহন করেছে। নারী সংরক্ষণ আন্দোলনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংসদীয় শরিক ছিল এরাই। পাশাপাশি, মণ্ডল-উত্তর যে দলিত-নারীবাদী সমালোচনা তীব্র রূপ নিয়েছিল, তার সঙ্গে আন্দোলনের যে অংশটির সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুখোমুখি সংঘাত হয়েছে, সেটিও এই বামপন্থী ধারারই।

বাম মহিলা সংগঠনগুলি শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি করেছে, যেটি কংগ্রেস-ঘেঁষা বা বিজেপি-ঘেঁষা নারীবাদীরা কখনওই করেননি — তারা OBC উপ-সংরক্ষণের দাবিকে আত্মস্থ করেছে এবং অবিচল ভাবে দাবি জানিয়ে গেছে। ১৯৯৬-এর যৌথ সংসদীয় কমিটি, যেটি OBC অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেছিল, তার সভানেত্রী গীতা মুখার্জি ছিলেন CPI-র পাঁশকুড়ার সাংসদ। বৃন্দা কারাট — ১৯৯৩ থেকে AIDWA-র সাধারণ সম্পাদক, ২০০৫–২০১২ পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য — সংসদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে সংরক্ষণ ও উপ-সংরক্ষণ — দু’টোরই পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। সুভাষিনী আলী, বৃন্দা গ্রোভার (বাম-নারীবাদের সঙ্গে যুক্ত এক আন্দোলন-আইনজীবী হিসেবে), এবং বর্তমানে মরিয়ম ধাওলের নেতৃত্বে AIDWA — সকলেই এই অবস্থানকে ধরে রেখেছেন। অ্যানি রাজা ও অরুণা রায়ের নেতৃত্বে NFI একই অবস্থান বজায় রেখেছে। AIPWA — যেহেতু CPI-ML-এর শিকড় বিহার ও ঝাড়খণ্ডে, তাই আরও তীক্ষ্ণ — সবচেয়ে স্পষ্ট কণ্ঠস্বর ছিল এদেরই; কবিতা কৃষ্ণন দল ছেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর মঞ্চ থেকে বারবার বলেছেন, OBC উপ-সংরক্ষণ অ-সমঝোতাযোগ্য। ২০২৩–২০২৬ পর্বে AIDWA, NFIW, AIPWA — তিনটি সংগঠনই সেই ষাটটি সংগঠনের যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে, যেটিতে OBC ও মুসলিম মহিলাদের অন্তর্ভুক্তি এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ থেকে সংরক্ষণের বিচ্ছিন্নতা — এই দু’টি দাবি তোলা হয়েছে।

এটি ইতিহাসের একটি দিক। আর একটি দিকও আছে।

আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত প্রধান বাম ধারা নারী-নিপীড়নের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, সেখানে শ্রেণিকেই ধরা হয়েছিল ভারতীয় সমাজের নির্ণায়ক দ্বন্দ্ব হিসেবে। জাতিকে স্বীকার করা হত, কিন্তু তত্ত্বে তাকে রাখা হত সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-সম্পর্কের এক বৈশিষ্ট্য হিসেবে — যা শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। AIDWA-র প্রাথমিক প্রকাশনাগুলি জাতিকে গুরুত্ব দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রে রাখেনি; সংগঠনটি যে শ্রমজীবী ও গ্রামীণ মহিলার চারপাশে সংগঠিত হত, তিনি বহুক্ষেত্রেই ছিলেন দলিত ও আদিবাসী — কিন্তু বিশ্লেষণের ভিতরে সেই বাস্তবতাকে চিহ্নিত করা হত না। নব্বই ও দু’হাজারের দশকে EPW-সহ নানা পত্রিকায় যে বিতর্কগুলি হয়েছে, সেখানে বাম-নারীবাদী প্রতিক্রিয়া অনেক সময়ই হয়ে উঠেছে আত্মরক্ষামূলক —  শ্রেণি-বিশ্লেষণের অখণ্ডতা বাঁচানো, এই যুক্তি দেওয়া যে দলিত-নারীবাদী সমালোচনা সেই আন্দোলনকে টুকরো করে দিতে পারে যার শক্তি বর্ণ-নিরপেক্ষ সংহতিতে, এবং কখনও কখনও এমন ইঙ্গিতও যে জাতি-ভিত্তিক সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে দক্ষিণপন্থার পক্ষে সুবিধাজনক। রেগের Writing Caste/Writing Gender এবং অনুপমা রাওয়ের The Caste Question (২০০৯) এই আত্মরক্ষাকে সরাসরি চিহ্নিত করেছে।

২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বাম মহিলা সংগঠনগুলি OBC উপ-সংরক্ষণের দাবিকে সংসদীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং NFDW, AIDMAM এবং দলিত নারীবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মূলধারার তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বে। খৈরলাঞ্জি (২০০৬), দলিত মহিলাদের শ্রম-পরিস্থিতি এবং হাথরাস (২০২০)-উত্তর কাজে AIDWA-র যে অংশগ্রহণ, তা প্রকৃত সাংগঠনিক রূপান্তরেরই প্রতিফলন। ১৯৯৫-এর তুলনায় আজকের AIDWA-র নেতৃত্ব অনেক বেশি বিস্তৃত। যেটি দলিত নারীবাদীরা এখনও মনে করিয়ে দিয়ে চলেছেন, তা হল — বৃহত্তর বামপন্থী নেতৃত্বের জাতিগত গঠন — পলিটব্যুরো, কেন্দ্রীয় কমিটি, দলীয় পত্রিকার সম্পাদকীয় বোর্ড — সেই একই উচ্চবর্ণের হেজিমনি বয়ে চলেছে আজও।

১৯৯৯-এ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন: RPA সংশোধন করে প্রতিটি দলের ক্ষেত্রে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মহিলা প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা হোক। কোনও দল — এমনকি যারা সংরক্ষণের পক্ষে প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেছে — এই পথে কখনও এক পা-ও বাড়ায়নি, যদিও এটিই ছিল সাংবিধানিকভাবে তাৎক্ষণিক ফলপ্রসূতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনা পূর্ণ পথ। কেবলমাত্র ওড়িশার বিজু জনতা দল এবং পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মনোনয়নে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করেছে স্বেচ্ছায় — দু’টি ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল, কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া।

সুতরাং সংরক্ষণ-বিতর্ক কখনওই ‘সংরক্ষণের পক্ষে বনাম বিপক্ষে’ — এই দ্বিমেরু বিতর্ক ছিল না, যেমনটা সংবাদ-শিরোনাম দেখাত। এ ছিল একাধিক নারীবাদী অবস্থান, একাধিক বর্ণ-অবস্থান, একাধিক যুক্তরাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং একাধিক রণকৌশলগত অবস্থানের ভিতরে বিতর্ক — এবং মূলধারার দলগুলি এই অবস্থানগুলির মধ্যে দরকষাকষির কাজটি করতে অস্বীকার করেছে বলেই গোটা প্রক্রিয়াটি ২০১০-এ এসে দাঁড়াতে পেরেছে এই বাস্তবতায়: বিল তখনও পাশ হল না; মুখার্জি কমিটির ১৯৯৬-এর সুপারিশ তখনও লাঞ্ছিত রইল।

পরের পর্বে আমরা ২০২৩ এর এনডিএ সরকার দ্বারা পাশ করা ডিলিমিটেশনের শর্ত – সাপেক্ষ “নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম” এবং পরবর্তীকালে পাশ হওয়া আইনটিকে নাকচ করার যে রাজনীতি সেইটি নিয়ে আলোচনা করবো। 


Tinku Khanna is a social activist and member of Groundxero Collective.

Share this
Leave a Comment