পার্ক সার্কাস ধর্ণা মঞ্চের এক মাস: এসআইআর বিরোধী গণ আন্দোলনই একমাত্র রাস্তা দাবি সাংবাদিক সম্মেলনে


  • April 4, 2026
  • (0 Comments)
  • 629 Views

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম হিসাবে গত ৪ মার্চ ২০২৬ থেকে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্ণা শুরু করেছে ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ। ৪ মার্চ একটি গণ কনভেনশন থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন এই মঞ্চের সদস্যরা। ধর্ণা মঞ্চের এক মাস পূর্ণ হওয়ায় গত ৩ এপ্রিল পার্ক সার্কাসের ধর্ণা মঞ্চ থেকেই এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে মূলত যে বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়া হয়, সেগুলি হলঃ-

 

  • ট্রাইবুনালে ভরসা না রেখে বৃহত্তর গণ আন্দোলনই এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের পথ

 

  • ১৯টি ট্রাইবুনালের কোন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর নেই, এক জন করে বিচারপতি কীভাবে কয়েক লক্ষ মানুষের শুনানি সঠিকভাবে করবেন, সে বিষয়ে কারোর কাছেই কোনো তথ্য নেই, ট্রাইবুনালের উপর আস্থা রাখা তাই আদৌ ভোটারদের পক্ষে যাবে না

 

  • নাম ডিলিটেড হয়ে যাওয়া ও বিচারাধীন থাকা ভোটারদের জোটবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সম্ভব হলে পার্ক সার্কাস ধর্ণা মঞ্চে যোগ দেওয়া, না হলে নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

 

  • বাংলার সমস্ত মানুষ রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখুন। প্রয়োজনে তার খসড়া ধর্ণা মঞ্চ থেকে ঠিক করে দেওয়া হবে। বিডিও অফিসে গিয়ে সেই চিঠি জমা করে বিডিওকে অনুরোধ করা হোক তা রাষ্ট্রপতিকে পাঠানোর জন্য

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে বারেবারেই জোর দিয়ে বলা হয়, গত লোকসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা অনুযায়ীই নির্বাচন করতে হবে, অসাংবিধানিকভাবে তৈরি হওয়া কোনোও তালিকা দিয়ে বিধানসভা নির্বাচন করা যাবে না।

 

প্রশ্ন তোলা হয় একজন ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য এক জন বিচারক মাত্র দেড় থেকে দু’মিনিট সময় দিচ্ছেন! এভাবে কি ভারতীয় সংবিধান, ভারতের গণতন্ত্রের প্রতি ন্যায় করা যায়?

 

তাছাড়াও ধর্ণা মঞ্চের উদ্যোক্তাদের থেকে জানানো হয়, যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটুকুও দেওয়া হচ্ছে না। গত মাসে তাঁরা যখন নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে ডেপুটেশন জমা দিতে গিয়ে জানতে চান বিচারাধীন ভোটারেরা পরিচয় পত্র হিসাবে যা কিছু জমা দিয়েছেন তার কোনোও নথি ভোটারদের দেওয়া হয়নি, ঠিক সেগুলিই বিচারকের কাছে জমা পড়েছে কি না তার কোনোও অনলাইন বা অফলাইন প্রমাণ নেই। কিন্তু কমিশনের তরফ থেকে নিরবতা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।

 

বারেবারেই এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, যে ১৩টি নথি দিয়ে একজন মানুষের অস্তিত্ব বিচার করা হচ্ছে, সেই ১৩টি নথি একজন মানুষের কাছে থাকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। বিশেষত সংখ্যালঘু, দলিত, মহিলা, প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের কাছে সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণেই এগুলি থাকা নানা সময়ে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় ও দেখা যাচ্ছে তাঁদের নামই বাদ পড়েছে সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র মানুষের শ্রম-স্মৃতি-ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করে তাঁর নাগরিকত্বের বিচার করতে চাইছে।

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে আবারও স্পষ্টভাবে বলা হয় এতদিন পর্যন্ত যে নির্বাচন হত, তা হত বছরে চার বার সামারি রিভিশনের ভিত্তিতে এবং কোনোবারই এসআইআর হয়নি। যদি ভোটারদের নাম এবারে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে এতদিনের সমস্ত নির্বাচনকেই খারিজ করতে হয়। এমনটাও বলা হয় যে, রাষ্ট্র নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই এসআইআর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তাই সর্বতোভাবে এই প্রকল্প, যা ইতিমধ্যেই বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তাকে বর্জন করা, বাতিল করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পন্থা থাকতে পারে না।

 

সাংবাদিক সম্মেলনে এরাজ্যের ক্ষমতাসীন ও বিজেপি ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের তরফে এ রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া ও বিচারাধীন থাকা অগণিত মানুষদের বিষয়ে এক ধরনের শীতলতা ও নীরবতা পালনের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসা হয়। রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি তাঁরা অনাস্থা প্রকাশ করে জানান, কেউই কোনো যথার্থ প্রতিবাদে শামিল হননি।

 

ধর্ণা মঞ্চের তরফ থেকে বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রতিও বার্তা দেওয়া হয় এদিন। বলা হয়, এই বুদ্ধিজীবী সমাজ, যাঁরা নিজেদের সুশীল সমাজ বলে মনে করেন, তাঁদের ভূমিকা সন্তোষজনক তো নয়ই, বরং নেতিবাচক, হতাশাজনক। বলা হয়, তাঁরা কেউই কোনো কথা বলছেন না, প্রতিবাদের মিছিলে হাঁটা তো নয়ই, একটি মোবাইল বার্তাতেও তাঁরা জানাননি যে, এই প্রক্রিয়াটি অন্যায় হচ্ছে, এর বিরোধিতা করছেন তাঁরা, এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদ দরকার।

 

ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন তিনি নির্বাচনের ১৫ দিন আগে থেকে পশ্চিমবঙ্গে থাকবেন। এই বিষয়টিকে তাঁরা কি গণ আন্দোলনের ক্ষেত্রে আতঙ্ক তৈরি করতে চাওয়ার কারণ হিসাবে দেখছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা অধ্যাপক সাইফুল্লাহ জানান, “একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর দলের জন্য নিজের এক্তিয়ারের মধ্যে থেকে কী করবেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু তিনি গণতন্ত্র বিরোধী, সাম্প্রদায়িকতায় প্রশ্রয়মূলক যে প্রচার চালাচ্ছেন আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি ও বিরূদ্ধে দাঁড়াচ্ছি।”

 

যাঁরা আন্দোলনে শামিল হয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। এসআইআর বাতিলের দাবি, একজন ভোটারের নামও বাদ গেলে ভোট করা যাবে না – এই দাবিগুলিতে তাহলে কি তাঁদেরও ভোট বয়কটের ডাক দেওয়া উচিৎ, কী মনে করেন তাঁরা? “আমরা এই বিষয়ে খুব দ্রুত আমাদের বক্তব্য রাখব। ভোট বয়কট সমাধান নয়। যে মানুষগুলিকে ট্রাইবুনালে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাঁদের বোঝানো দরকার যে ট্রাইবুনালে যাওয়া, না যাওয়া অবশ্যই তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কিন্তু এতে আদপে তাঁদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আশা খুবই কম। আমরা ১৮ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। এবং তারপরেই আমাদের চূড়ান্ত কর্মসূচী জানাব,” বললেন সাইফুল্লাহ।

 

অন্যদিকে মঞ্চের আরেক সদস্য সাঈদ উল ইসলাম বলেন, “মানুষের আন্দোলন যাতে বড় না হয়, তারজন্য রাজনৈতিকভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। বুথের পর বুথ ডিলিট হয়ে যাচ্ছে। পথে নেমে বৃহত্তর গণ আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।”

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়। এই চিঠি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের রাজ্য দপ্তরেই পাঠানো হবে।

 

 

Share this
Tags :
Leave a Comment