রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬ – শুরু পরিচিতি স্বনির্ধারণের নতুন লড়াই 


  • March 27, 2026
  • (0 Comments)
  • 95 Views

গত ১৬ মার্চ এই বিল খারিজের দাবিতে ও তার বিরূদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচী হিসাবে কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ এক সাংবাদিক সম্মেলন-এর আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া গেছিল এই রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার বিরোধী বিল ঠিক কীভাবে আঘাত হানতে চলেছে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের উপরে।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

ভারতের সংসদে পাশ হয়ে গেল ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬। রাষ্টপতির অনুমোদন পেলেই তা অ্যাক্ট-এ পরিণত হবে। বহু বছরের লড়াই-আন্দোলনের ফলে প্রাপ্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট-এর নালসা জাজমেন্ট-এ নিজের লিঙ্গ স্ব-নির্ধারণের যে অধিকার রূপান্তরকামী মানুষদের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার হিসাবে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছিল, তা সার্বিকভাবে খন্ডিত হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই #NoGoingBack আন্দোলন সারা দেশ জুড়েই শুরু হয়ে গিয়েছিল এই বিলের বিরূদ্ধে। সংসদে বিলটি পাশ হওয়ার পর আন্দোলন আরোও সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে। সারা দেশ জুড়ে চলছে #RejectTransBill আন্দোলন। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সাংবাদিক সম্মেলন, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস-এর সাংসদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠানো – নানা কর্মসূচী চলছে ধারাবাহিকভাবে। বিলটি যদি অ্যাক্ট-এ পরিণত হয় তাহলে নিঃসন্দেহে দেশের রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার আন্দোলনে আবারও একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

 

গত ১৬ মার্চ এই বিল খারিজের দাবিতে ও তার বিরূদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচী হিসাবে কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ এক সাংবাদিক সম্মেলন-এর আয়োজন করা হয়। সেখানে প্যানেল আলোচনার বক্তারা ও আলোচনায় উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া গেছিল এই রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার বিরোধী বিল ঠিক কীভাবে আঘাত হানতে চলেছে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের উপরে।

 

সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তাদের বক্তব্যের কিছু বিশেষ অংশ

 

সাংবাদিক সম্মেলনের অন্যতম বক্তা ছিলেন নীলাঞ্জন মজুমদার, যিনি উপস্থিত ছিলেন একজন অভিভাবক হিসাবে, তাঁর সন্তান ট্রান্স-ম্যাসকিউলিন পরিচিতির মানুষ। তাঁর কথায় উঠে এল চূড়ান্ত উদ্বেগ ও আশঙ্কা। নীলাঞ্জনের সন্তান উচ্চশিক্ষা সূত্রে ভিন রাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরত এবং ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় পত্র থাকার কারণে একটি জেন্ডার নিউট্রাল হস্টেলে থাকতে পারেন। নীলাঞ্জনের প্রশ্ন ছিল শৈশব থেকে নিজের লিঙ্গ পরিচিতির আত্মীকরণ ও তা প্রকাশ্যে আনা, ট্রান্স পরিচিতির কারণে যৌন হেনস্থা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর তাঁর সন্তান যখন আইনি স্বীকৃতির হাত ধরে অধিকারগুলি পাচ্ছেন, তখন এই বিল আইন হলে “তাঁকে কি হস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হবে?” তিনি স্পষ্ট করেই বলেন এই বিলে বলা হচ্ছে, “টূ প্রটেক্ট অনলি দোজ, হু ফেস সিভিয়ার সোশ্যাল এক্সক্লুশন ডিউ টু বায়োলজিক্যাল রিজনস, নট ফর ফল্ট অফ দেয়ার ওন” – এই কথার মধ্যে দিয়ে রূপান্তরকামীদের একটি অংশের মানুষকে ত্রুটিযুক্ত বলেই যেন দেগে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁরই কোনো একটা তথাকথিত ভুল রয়েছে ও তা ঠিক করার জন্য অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগে রূপান্তর ঘটাতে হবে। রূপান্তরকামী হিসাবে স্বীকৃতির জন্য বিষয়টি সম্পূর্ণ ‘বায়োলজ্যিকাল’ হতে হবে এবং এর মধ্যে যাঁরা ট্রান্সজেন্ডার বলে স্বীকৃতি পাবেন তাঁরা যেন প্রতিনিধিত্ব করবেন একটি হিন্দু ফ্রেমওয়ার্ক-এর, যেখানে একজন উপাস্য বা আরাধ্য দেবতা থাকার পাশাপাশি রয়েছে একটি ভারতীয় ঐতিহ্য। তিনি প্রশ্ন তোলেন এরফলে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে প্রান্তিকতম মানুষদের ক্ষেত্রে কী হবে? নন-বাইনারি, জেন্ডার ফ্লুইড, ট্রান্স নন-বাইনারি হিসাবে নিজেদের চিহ্নিত করা মানুষেরা যাঁরা বলেন তাঁরা সিস হেটেরো পেট্রিয়ার্কাল হেজিমনিক সিস্টেম-কে চ্যালেঞ্জ করছেন, তাঁদের এই বিল কতটা কোণঠাসা করে দিতে পারে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের রায় এতদিন পর্যন্ত তাঁদের ঢাল ছিল। কিন্তু এই বিল, রূপান্তরকামী মানুষদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার বদলে তা আরো বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নীলাঞ্জনের কথায় উঠে আসে ট্রান্স-ফেমিনিন মানুষদের কথাও। কারণ এখনও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় ট্রান্স-ম্যাসকিউলিন একজন মানুষকে তাঁর পুরুষ সত্তার জন্য উত্তরণ হিসাবে দেখা হলেও, ট্রান্স-ফেমিনিন মানুষকে তাঁর নারী সত্তার জন্যই, অবনমন হিসাবে দেখা হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন একজন রূপান্তরকামী নারী যিনি হিজড়া পেশায় না যাওয়া বেছে নিচ্ছেন, এই বিল-এর ফলে তিনি কোথায় যাবেন? যে ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা জন্মসূত্রে তাঁরা যে শরীরটি নিয়ে জন্মেছেন, তার পরিচিতির ভার বহন করতে না পেরে নিজের সত্তার স্বীকৃতির জন্য হরমোন থেরাপি নেন, তাঁদের কাছে একমাত্র অস্ত্র হিসাবে থাকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় পত্র, যা পাওয়ার ভিত্তি এতদিন ছিল এক ও একমাত্র লিঙ্গ পরিচিতির স্ব-নির্ধারণ। ড্রপ আউট আটকানোর জন্য স্কুলে লিঙ্গ পরিচিতি নিরপেকশ (জেন্ডার নিউট্রাল) পোশাক, লিঙ্গ পরিচিতি নিরপেক্ষ (জেন্ডার নিউট্রাল) স্বাস্থ্য পরিষেবা, লিঙ্গ পরিচিতি নিরপেক্ষ (জেন্ডার নিউট্রাল) শৌচালয় – এই পরিচয় পত্র এই মৌলিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত করার, এই দাবিগুলি জানানোর অধিকার দেয়। এই মুহূর্তে যখন এসআইআর লক্ষ লক্ষ মানুষকে বেনাগরিক করে দিচ্ছে, তখন মনে রাখা দরকার তার মধ্যে রয়েছেন অগণিত ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতির মানুষ। জন্মসূত্রের পরিবারে লিঙ্গ পরিচিতির কারণে অত্যাচার, নির্যাতনে ঘরছাড়া হওয়ায় তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকে না, থাকে শুধুমাত্র ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতি পত্র।

 

বক্তা, ট্রান্সম্যান পরিচিতির রাহুল মিত্র জানান, এই বিল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ে আসার কারণই হল ট্রান্স পরিচিতিকে নস্যাৎ করে দেওয়া। তিনি বলেন, “আজ আমি রীতা মিত্র থেকে রাহুল মিত্র হয়েছি, আজ যদি সরকার বলে তুমি ট্রান্সজেন্ডার নও আমার তো তাহলে কিছু থাকবে না, আমি তো ভোটও দিতে পারব না। আমি বলতেও পারব না আমি কী। সরকার আমাকে ঠিক করে দেবেন আমি কী। খবরে দেখলাম, নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছে কোনো বাড়ির দেওয়ালে নির্বাচনের আগে দেওয়াল লিখন করতে গেলে আগে সেই বাড়ির লোকের অনুমতি নিতে হবে, অথচ আমার দেহের উপর আমি কী লিখন মেল, ফিমেল, ট্রান্স – সেই অধিকার সরকার আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছে।“তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে ট্রান্সজেন্ডার প্রোটেকশন অ্যাক্ট কাজে লাগিয়ে তাঁরা যে সামাজিক, পারিবারিক নির্যাতনের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতেন, গোষ্ঠীর মানুষদের নির্যাতনের কবল থেকে উদ্ধার করতে পারতেন, এই বিল আইনে পরিণত হলে তা আর সম্ভব হবে না। যাঁরা এই কাজে পাশে দাঁড়াবেন তাঁদের জন্য বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ১০ বছরের হাজতবাস ও ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার কথাও বলা হচ্ছে সংশোধনী বিলে। যে মানুষেরা নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতি দিয়ে কোনোও জীবিকায় যুক্ত হয়েছেন, তাঁরা এই বিল অ্যাক্ট-এ পরিণত হলে কাজ হারানোর আশঙ্কায় চূড়ান্ত প্যানিক আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। রাহুল বলেন, “আইনে বলা আছে একবারের বেশি দু’বার জেন্ডার চেঞ্জ করা যাবে না। আমি একবার করে ফেলেছি। আবার আমায় রীতা মিত্র হতে বললে আমি কী করব? আমি কে? কোথায় যাব?”

 

প্যানেলের অপর বক্তা কৌণিশ, একজন ট্রান্সম্যান পরিচিতির মানুষ, তিনি শুরুতেই উদ্বেগের সঙ্গে জানান এই আইন সংশোধন হলে বহু ট্রান্স পরিচিতির মানুষকে আত্মহননের পথও বেছে নিতে হতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্যান্য পরিষেবা সর্বত্রই ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতি পত্রই তাঁদের যাবতীয় অধিকার রক্ষার অস্ত্র। এই সংশোধনী বিল আইন হলে সমস্ত অধিকার চলে যাওয়ায় এক বিরাট সংখ্যক রূপান্তরকামী মানুষদের জীবন-জীবিকা হারাতে হবে। প্যানেলে উপস্থিত অনুরাগ মৈত্রেয়ী বলেন, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র বারবার বায়ো-মেডিক্যাল নজরদারির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, যেকোনো নাগরিকের মতোই ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরাও নাগরিক কর দিয়ে থাকেন, অথচ আঘাত আসছে তাঁদের নাগরিক অধিকারের উপরেই। লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকে বারেবারে বিভক্ত করে দিয়ে একটি গণ আন্দোলনে পরিণত হতে না দেওয়ার নাগরিক ষড়যন্ত্রের দিকেও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্যানেলে উপস্থিত অপর বক্তা আইনজীবী ঝুমা সেন এই সংশোধনী বিল আইনে পরিণত হলে কী ধরনের সমস্যায় এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পড়তে পারে ও কেন দেশের আইনি ব্যবস্থার উপরেও বিশেষ আস্থা রাখার পরিস্থিতি এই মুহূর্তে রাষ্ট্র ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা সরকারের দৌলতে নেই সে কথা মনে করিয়ে দিয়েই বলেন আইনের পথে চলার পাশাপাশি ট্রান্সজেন্ডার গোষ্ঠীর মানুষদের দীর্ঘমেয়াদী জোটবদ্ধ আন্দোলনের পথেই যেতে হবে। এই আলোচনায় তিনি বিলটি সংসদে যাতে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পাঠানো হয়, সেই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।

 

পরবর্তী সময়ে অবশ্য দেখা যায়, কেন্দ্র সরকার আদপেই তা না করে, ১৩ মার্চ লোকসভায় তা পেশ করার পর বিরোধীদের বিরোধের মাঝেই ২৪ মার্চ লোকসভায় ও তারপর ২৫ মার্চ রাজ্যসভায় ধ্বনিভোটের মাধ্যমে সংসদের উভয় কক্ষেই বিলটি পাশ করিয়ে নেন।

 

আলোচনায় উপস্থিত রূপান্তরকামী মানুষদের সঙ্গে গ্রাউন্ডজিরো-র কথোপকথনের অংশবিশেষ

 

শীর্ষ বসু, রিসার্চ স্কলার, ক্যুইয়ার ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট (শীর্ষ নিজেকে নন-বাইনারি ট্রান্স মানুষ হিসাবে পরিচয় দেন)

 

সবচেয়ে বড় আঘাত যেটা আসতে চলেছে তা হল নালসা পিটিশন যেটা করা হয়েছিল, নালসা ভার্ডিক্ট নালিফায়েড হয়ে যেতে পারে, যদি এই প্রস্তাবিত বিল পাশ হয়ে যায়। যদি নালসা ভার্ডিক্ট নালিফায়েড হয়ে যায়, তাহলে আমাদের লিঙ্গ স্বনির্ধারণের যে অধিকার ছিল, যেটাকে বলা হয় ইংরাজিতে, ভ্লেন্টারিস্ট অ্যাকাউন্ট অফ জেন্ডার, মানে ‘দ্যাট উই ক্যান চুজ আউর জেন্ডার, উই ক্যান চুজ আওয়ার সেক্সুয়ালিটি’, সেটা কমপ্লিটলি নাল অ্যান্ড ভয়েড হয়ে যাবে। যার ফলে জেন্ডার-এর যে একটা লিবারেটরি ফাউন্ডেশন আছে, সেটাই পুরো ধ্বসে যাবে। লিঙ্গ-স্বাতন্ত্র্যের যে একটা প্রগতিশীল বয়ান আছে, সেটাই কমপ্লিটলি ধ্বসে যাবে। ফলে সমাজে যাঁরা কোতি, ধুরানি, গ্রাসরুট লেভেল-এর ট্রান্স আইডেন্টিফায়েড ইন্ডিভিজুয়ালস, তাঁদের উপর ভায়োলেন্স নেমে আসবে। এবং যখন-তখন রাস্তাঘাটে লোকে এরকমও করতে পারে, চুল কেটে দিল, গায়ে থুতু দিল, সামাজিক সম্মানহানি হবেই। যারফলে এটা বলা হচ্ছে যে, সোশ্যাল ক্রিমিনালাইজেশন হবে, সামাজিকভাবে অপরাধীকরণ করা হবে। এবং আমাদের একভাবে মানসিক বিকৃতি হিসাবে সমাজের কাছে তুলে ধরবে। যেটা ভীষণ রকমভাবে একটা রিগ্রেসিভ স্টেপ। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। ২০১৯-এ যে ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্ট হয়েছিল এবং তার আগে নালসা ভার্ডিক্ট দেওয়ায় আমরা যতটা এগিয়েছিলাম, আমরা যেন ততটাই পিছিয়ে যাচ্ছি। সেই কারণেই বলছি যে ‘নো গোয়িং ব্যাক’। আমরা পিছোব না, আমরা এগোতে চাই। এর ফলে জেন্ডার-এর বিষয়টা একটা অ্যাম্বিগুয়াস জায়গায় চলে যাবে, একটা অনির্দিষ্ট জায়গাতে চলে যাবে, স্বনির্ধারণের যে প্রেমাইসটা সেটা যদি পুরোপুরি ধ্বসে যায়, তাহলে সবচেয়ে আগে যেটা হবে, পুলিস অ্যাজ আ স্টেট, অ্যাজ অ্যান এজেন্ট অফ স্টেট অ্যাপারেটাস, সে সবার আগে এর সুবিধা নেবে এবং এদের কাছ থেকে মানি এক্সটরশন শুরু করবে। যাঁরা এই জেন্ডার ভ্যারিয়ান্ট পপুলেশন তাঁদের থেকে এবং একদম মার্জিনাল বডিস যাঁরা, সমাজে একদম মাইনটেরিয়ান বডিস যাঁরা, তাঁদের থেকে। এই স্টেপটা এখন নিতে চাওয়ার কারণ ভোট, নির্বাচন। তাছাড়াও অ্যান্টি-এস আই আর মুভমেন্ট-এর সঙ্গে বিষয়টিকে ইন্টিগ্রেট করতে হবে এই পলিটিক্সটাকে। আমরা যদি দেখি, এসআইআর-এর জন্য যতজন মানুষ বেনাগরিক হয়েছেন, যতজন মানুষ গৃহহীন হয়েছেন, ডিসপ্লেসড হয়েছেন, তাঁদের মধ্যেও অনেক ট্রান্স মানুষ আছেন, দলিত মানুষ আছেন, অনেক দলিত ট্রান্স মানুষ আছেন, মুসলিম ট্রান্স মানুষ আছেন। তাঁরা এই ধরনের রিগ্রেসিভ স্টেপ-এর জন্য সবচেয়ে বেশি অ্যাফেক্টেড হবেন। ইন্টারসেকশনালিটিটাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে চাইছে। ইন্টারসেকশনাল লেন্স থেকে যে একটা সামগ্রিক স্তরে আন্দোলন তৈরি হতে পারে, সেই সম্ভাবনাটাকে পুরোপুরি ডেমোলিশ, জিওপার্ডাইজ করে দিতে চাইছে।

 

রাহুল মিত্র, ফাউন্ডার মেম্বার ও ম্যানেজিং ট্রাস্টি – ট্রান্স-ম্যাসকুলিনিটি সংগঠন টিসার (রাহুল নিজেকে একজন ট্রান্সম্যান বলে পরিচয় দেন)

 

এটা আমরা একটা ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছি। ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়ার রাষ্ট্রের তথা বিজেপি সরকারের বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। কেননা, ২০১৪ সালে আমাদের নালসা জাজমেন্ট-এ সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে যে, সরকারকে এঁদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার জন্য কাজগুলো করতে হবে, এমপাওয়ারমেন্ট-এর। আজকে একটা পোর্টাল আছে, স্মাইল স্কিন বলে, গরিমা গৃহ আছে, এবং টিজি হেলথ কার্ড বলে একটা হেলথ কার্ড দেওয়ার কথা হচ্ছে। তো এক ধাক্কায় ওরা কমিউমিটি থেকে অনেক মানুষকে বাদ দিয়ে দিল। শুধু হিজড়া, কিন্নর, যোগাপ্পা – শুধু এঁদের ট্রান্সজেন্ডার বলছে, যেটা কি না একটা কালচার। একটা কালচার কখনো জেন্ডার আইডেন্টিটি হতে পারে না। সেটাকে এরা মিস ইউজ করছে এবং এটাকে ঢাল বানিয়ে প্রচুর ট্রান্স-ম্যাসকিউলিন মানুষ, নন-বাইনারি, জেন্ডার ফ্লুইড এবং ট্রান্স-উওম্যান যাঁরা হিজড়া পেশায় নেই, তাঁদের এক্সক্লুড করল, তারফলে সংখ্যাটা অনেক কমে গেল। এবার আজকে যাঁরা হিজড়া ঘরনার লোক, তাঁদের নিজস্ব ঘরানা আছে, ফলে তাঁরা শেল্টার হোমে যাবে না। গরিমা গৃহ বন্ধ করে দেবে এটা বলে। পড়াশোনার মধ্যে তাঁরা খুব একটা যান না। পড়াশোনা সাধারণত ট্রান্স উওম্যান যাঁরা আছেন, আমরা যাঁরা ট্রান্স ম্যান্সকিউলিন আছি তাঁরা করি, আমাদের জন্য যে স্কলারশিপগুলো আছে, সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার নিজের টাকাগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করছে। হেলথ স্কিমে আমাদের যে আয়ুষ্মান কার্ড আছে, সেটার খরচাটা বেঁচে যাবে। সরকার একটা বৃহত্তর পলিটিক্স খেলছে আমাদের কমিউনিটির সঙ্গে, টাকা বাঁচাচ্ছে, আমাদের একটা সাঙ্ঘাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এবং একটা বাইনারি তৈরি হচ্ছে। তাঁদের নিজস্ব আরএসএস ঘেঁষা একটা নারীবিরোধী, ট্রান্সবিরোধী, দলিতবিরোধী, মার্জিনিলাজাইড মানুষের বিরোধী যারা থাকে – সেই একটা মেন্টালিটি থেকে তাঁরা এই কাজটা করছে। সরকার তো একটা ধর্মীয় জায়গায় থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তো সবার প্রধানমন্ত্রী, আমার, আপনার সকলের। ফলে সে যদি একটা ধর্মকে ফলো করে এটা করে, তা হলে তা জঘন্য হবে, আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। এরফলে এক ধাক্কায় অনেকগুলো সুযোগ-সুবিধা চলে যাবে, সরকারের অনেকগুলো টাকা বেঁচে যাবে।

 

ঝুমা, বিউটি পার্লারে চাকরিরতা (ঝুমা নিজেকে ট্রান্স উওম্যান হিসাবে পরিচয় দেন)

 

আমরা হলাম একটা প্রান্তিক লিঙ্গ যৌন জনগোষ্ঠী। আন্দোলন ছাড়া আমাদের পূর্বে কোনোও কিছু হয়নি। ইংরেজদের তাড়াতে গেলেও মানুষ একত্রিত হয়ে আন্দোলন করে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম, এমনকি আমরা ইতিহাসে পড়েছি নীলবিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ – ইতিহাস বলে বিদ্রোহ-আন্দোলন ছাড়া কেউ মানুষকে এক ইঞ্চি জমি দেয়নি। এটা আমি ঠিক মেইন্সট্রিম, ট্রান্সজেন্ডার-এর ইস্যু বলে দেখছি না। এখানে একটা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মানুষকে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হয়েছে, তাই ২০২৬-এ আমাদের মতো প্রান্তিক লিঙ্গ যৌন জনগোষ্ঠীর ওপর এই আঘাত আসবে স্বাভাবিক। এটা করা হচ্ছে কোনোও রাজনৈতিক দলের নির্দেশেই, আমাদের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যারা এটা করছে, তারা সন্ত্রাস তৈরির চেষ্টা করছে। এলজিবিটিকিউআইএ+ একটা বড় আমব্রেলা, ট্রান্সজেন্ডার তার মধ্যেই আছে। ঘরে আগুন লাগলে তখন তোমার পাশের ঘরটা সেফটি হতে পারে না। গায়ে যখন আঁচ লাগে, বনে যখন দাবানল হয়, তখন কি বলবে “আমি বনের রাজা সিংহ, বাঘকে ছেড়ে বাকি সবাইকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেব,” সেটা তো না। করোনা ভাইরাস যখন এলো তখন কি বলা হয়েছিল বড়লোকদের ছেড়ে গরীবদের অ্যাটাক করবে? এরকম তো নয়। সুতরাং এরাই আমাদের মধ্যে বিভেদ, প্রাচীর তৈরি করে দিচ্ছে। যেমন – এরা হয়তো একটু আলাদা। এদের জন্য সেফটি, এদের জন্য সেফটি নয়। ঠিক যেমন – রাজায় রাজায় ঝগড়া হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। রাজার কিছু হয় না, প্রজাদেরই প্রাণ যায়। এরা সন্ত্রাসবাদী, পলিটিক্স করছে এইজন্য যে, আমাদের যে পলিসিগুলো আছে, আমাদের যে ইউনিটি, আমরা যে একত্রিতভাবে, সঙ্ঘবদ্ধভাবে থাকি, সেটাই ভেঙে দিতে চাইছে, এটাই মূল উদ্দেশ্য। আমরা এ দেশের সাধারণ নাগরিক। আমরা ভোট দিই। আমাদের তো কিছু মৌলিক অধিকার আছে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান তো মানুষের লাগে। আমাদের জন্য তো সরকারের কিছু পলিসি আছে। ১৪ নম্বর আর্টিকেল-এ আমাদের মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে, আমাদের সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট-এর জন্য আইনি ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সেগুলো একটাও কার্যকর হচ্ছে না।

 

স্যান্ডি, সামাজিক অধিকার কর্মী, (স্যান্ডি নিজেকে ট্রান্স উওম্যান বলে পরিচয় দেন)

 

এরফলে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতি হতে চলেছে। আমাদের কমিউনিটির যে নিজস্ব সত্তা রয়েছে, এত বছর ধরে আমাদের যে যুদ্ধ, সংগ্রাম সেটা আমাদের পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে চলেছে আইন্ডেন্টিটি ও লাইভলিহুড-এর উপরে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে চলেছে গে, ক্যুয়ার ও লেসবিয়ান মানুষদের উপর।

 

পারিবারিকভাবে আমাদের প্রত্যেকের সমস্যা হতে চলেছে। কারণ আমাদের যুদ্ধটা সবার প্রথম আমাদের ঘর থেকে শুরু হয়। ঘর থেকে যুদ্ধ শুরু করেই আমরা আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। আজ যদি এরকম কোনো বিল আসে, আমাদের পরিবার থেকে এমনিই তো কোনোও সাপোর্ট পাইনি, তাহলে ১%, ২% যা সাপোর্ট পাই তাও আর পাব না। তা মাইনাস জিরো জিরো হয়ে যাবে।

 

দেবরূপ দাস (দেবরূপ নিজেকে ট্রান্স ম্যান বলে পরিচয় দেন)

 

যে প্রপোজালটা এসেছে, সেটা যদি গোয়িং ব্যাক হয়, আমাদের যাঁরা ট্রান্স পার্সনস রয়েছেন, বিশেষ করে যাঁরা ট্রান্স ম্যান-রা রয়েছেন, তাঁদের জন্য এটা ভীষণ অসুবিধাজনক হবে। কারণ, এই বিলে যা বলা হয়েছে ট্রান্স ম্যান-রা এই বিলের কোটা থেকে একেবারেই বাদ পড়েছেন। যদি এই বিলটা পাশ হয়ে যায়, আমরা ট্রান্স মানুষরা এমনিতেই অনেক রকম ভাবে লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়ে থাকি, যেমন এডুকেশন বা ফাইন্যান্স, এছাড়াও অনেক কিছু, বিশেষ করে হেলথ ও মেডিক্যাল দিক। শুধু ট্রান্স ম্যান বা ট্রান্স উওম্যানদের জন্যই না, আজকে এরকম বিল যেকোনো কমিউনিটির জন্য হতে পারে। তাহলে আগামী দিনে এরকম অস্বাভাবিক ও অসুস্থকর বিল অন্য কোনোও কমিউনিটির ব্যাপারেও আসতে পারে। আমরা এই বিলটাকে বর্জন করতে চাই, যাতে সমাজে আমরা সবাই সমান এই বিষয়টি যেন বজায় থাকে।

 

ইতিমধ্যে সংসদে পাশ হয়ে গেল বিল। দেশের অগণিত মানুষের, এক বিরাট জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকট তৈরি করল রাষ্ট্র। দেশের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রের, বর্তমান সরকারের বিরোধী মনোভাবের স্বরূপ আরো একবার সামনে এল। এই বিল অ্যাক্ট-এ পরিণত হয় কি না, দেশের ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের আন্দোলন কোন পথে যায়, তা আপাতত আগামী দিনের উপরেই নির্ভর করছে।

 

 

Share this
Leave a Comment