কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি মেয়েদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন


  • March 16, 2026
  • (0 Comments)
  • 103 Views

আজকের যে দক্ষিনপন্থার বিশ্বব্যাপী উত্থান ও পরিপক্কতা প্রাপ্তির সার্বিক বাতাবরণ, সেখানে দাড়িয়ে বিগত সময়ের সীমিত উপরিভাগের লিঙ্গ সাম্য অর্জন, তাও আজ হৃতপ্রায়। কর্মক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসছে ক্রূর পিতৃতন্ত্র, নির্লজ্জ মৌখিক পুরুষতান্ত্রিকতার চিহ্ন। এবং, বাস্তবতা এটাই যে নাম-কে-ওয়াস্তে আই.সি.সি অকেজো আই.সি.সি-র যুগে মহিলা কর্মচারীদের সামনে কর্মক্ষেত্রে সেইসব ক্রূর পিতৃতন্ত্রের পুনরুত্থানকে প্রতিহত করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেই। নেই মহিলা শ্রমিক-কর্মচারীদের নিজস্ব কোনো সংগঠন।

 

নন্দিনী ধর

 

তখন আমি চাকরি করি উত্তর ভারতের একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমিকদের সাথে টুকটাক বন্ধুত্ব। শ্রেণী, বর্ণ, জাতপাতের বেড়া অটুট রেখে একজন মধ্যবিত্ত অধ্যাপকের যেমন বন্ধুত্ব হয় আর কি, একই প্রতিষ্ঠানের অধস্তন কর্মচারীদের সাথে। সেইমতো সময়ে জানতে পারি, এই চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ভেতর যে মহিলারা, তাঁদের ভেতর একটি বড়ো অংশ মূলগতভাবে পরিযায়ী শ্রমিক। উপরন্তু, তাঁদের ভিতর একটি বড়ো অংশ একসময়ে চাকরি করতেন গার্মেন্টসে – শ্রমিক হিসেবে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর তাঁরা কাজ করেন মূলত রান্নাঘরে, কাফেটেরিয়াগুলিতে, মেয়েদের হোস্টেলে। অর্থাৎ, সাধারণত যাকে বলা হয়, “কেয়ার ওয়ার্ক” তাতেই। যে ধরনের কাজগুলির গায়ে লেগে থাকে গার্হস্থ্যতার গন্ধ। যে ধরনের কাজগুলি সংরক্ষিত থাকে মেয়েদের জন্য – ঘরে এবং বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে মজুরি কম, উন্নতিরও তেমন সুযোগ নেই।

 

তাহলে কেন তাঁরা বেছে নিলেন এই কাজ?

 

“গার্মেন্টস মে বহত ছেড়-ছাড়, দিদি। ইহা পর কম সে কম ওহ নেহি হ্যায়।”

 

২০১৫-১৬ সালে গার্মেন্ট লেবার ইউনিয়ন ও মুন্নাদে নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার করা একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বেঙ্গালুরুতে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কর্মরত মহিলা শ্রমিকদের ১৪% কখনো না কখনো কর্মক্ষেত্রে ধর্ষিত হয়েছেন বা অনুমতিহীন যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। ৭৫% মহিলা শ্রমিক বলেন, তাঁদের কারখানায় কোনো আই.সি.সি-র অস্তিত্ব নেই।

 

কাজেই, এই বয়ানটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি মহিলার নয়। আমার ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেও, একের পর এক শ্রমজীবী মহিলার সাথে কথোপকথনে প্রায় একই বয়ান পেয়েছি আমি। তার সারাংশ করলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এইরকম – যৌন হয়রানির হাত থেকে নিস্তার পেতে মেয়েরা বেছে নিতে পারে তুলনায় কম মজুরির চাকরিও। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিষয়টি এক মহিলা শ্রমিকের জীবনে নির্মিত হয় একটু অন্যভাবে – যৌন নিরাপত্তা বিষয়টিকে কেন্দ্রে রেখে।

 

কিন্তু, একথা ভাবলে ভুল হবে যে যৌন নিরাপত্তা শুধুমাত্র শ্রমজীবী মেয়েদের সমস্যা। যেমন ধরা যাক, স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত আমার বহু ছাত্রীদের কথা। না, তাঁদের অনেকেরই  প্রায় কোনোদিন সাহিত্যে বা সমাজতত্ত্বে বা ইতিহাসে এম.এ পড়তে আসার কোনো ইচ্ছা ছিল না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে তারা, আজকের সময়ের নিয়ম মেনে পড়েছে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি ডিগ্রি কিনতে তাদের পরিবারের কত টাকা লাগে, সে সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। চেয়েছিল, স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পরে কোনো একটি চাকরি। মিলেওছিল চাকরি – ছোট কর্পোরেটের অফিসে, নিচুতলার কর্মী হিসেবে।

 

“কিন্তু, টিকতে পারলাম না, ম্যাম।”

 

কোথাও বা ম্যানেজার যৌন নির্যাতক। নিয়মিত। কোথাও বা ম্যানেজার সংবেদনশীল হলেও, খোদ মালিকই সমস্যা। অতএব, শ্রেণীকক্ষে আবার। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবার আর একটি (অপ্রয়োজনীয়) ডিগ্রি।

 

“তারপর?”

“জানি না ম্যাম।”

 

না, আজকের সময়ের পুঁজিবাদের এই চূড়ান্ত সংকটের সময়ে কেবলমাত্র নারী-কর্মচারী বা শ্রমিকরাই কর্মক্ষেত্রজনিত নিরাপত্তাহীনতার শিকার নন। কিন্তু, অনস্বীকার্যভাবে, নারী শ্রমিকদের সামনে রয়েছে একটি বাড়তি অন্তরায় – যৌন নিরাপত্তাহীনতার বাড়তি বোঝা।

 

যৌন নির্যাতন, তাই, অবশ্যম্ভাবীভাবে, নারী শ্রমিককর্মচারীদের জীবনে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যৌন হয়রানি তাই নারী শ্রমিকদের জীবনে, একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক একক। যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর নিরাপদ উপার্জনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের পথ রুখে দাঁড়ায়। বর্তমান সংকটাকীর্ণ অর্থনীতির ভেতরেও, যেটুকু শ্রেণী উত্থানের পথ খোলা থাকে উৎপাদনক্ষেত্রে আসা একটি মেয়ের কাছে, লাগাতার যৌন হয়রানির বাস্তবতা সেটুকুও প্রায় সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেয়।

 

প্রসঙ্গত, গত ২০২৪-র আগস্ট মাস থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কাঁপিয়ে দেয় যে আর.জি.কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যু – যা “অভয়া আন্দোলন” বলে সাধারণত পরিচিত হয়েছে – তাও ছিল কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও এক নারী কর্মচারীর নিরাপত্তাহীনতার চরমতম রূপ। কিন্তু, সেই আন্দোলনের যে তুমুলতম জোয়ার, সেখানেও সুসংহতভাবে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপটিকে কোনোভাবেই আলোচনার বিষয়বস্তু করে তোলা যায় নি। যদিও প্রায় সর্বধরণের বাম শক্তিগুলিই উপস্থিত ছিল আন্দোলনটির ভিতরে। কোনো কোনো বিরল ক্ষেত্রে, আই.সি.সি প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়েছে বটে, কিন্তু সেই দাবি রয়ে গেছে আনুষ্ঠানিকতার স্তরেই। বস্তুত, আজকের যে সংগঠিত কর্মক্ষেত্র, সেখানে আইনি সুপারিশ মেনে, প্রায় সব সংস্থাতেই আই.সি.সি বা সমগোত্রীয় কোনো কমিটি আছে। কিন্তু, আছে নাম কেওয়াস্তেই। যেমন, বেরিয়ে আসে উপরোক্ত সমীক্ষাতে। আছে কেবল খাতায়-কলমে – এমনভাবে যার অস্তিত্ব সেই বিশেষ প্ৰতিষ্ঠানের মেয়েদের কাছেও অজানা।

 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, সেইসব আই.সি.সি.-র সদস্যপদ অধিকার করে থাকে মালিকপক্ষের পেটোয়া (মহিলা) কর্মচারীরা। ফলত, অধস্তন কর্মচারীদের করা যৌন হয়রানির বিচার সেখানে মিললে মিলতেও পারে, কিন্তু ক্ষমতাশীল উর্দ্ধতন কর্মচারী বা মালিকের হাতে নিগৃহীত হলে, সেখানে বিচার পাওয়ার কোনো প্রশ্নই থাকে না। কাজেই, অধিকাংশ মহিলা শ্রমিক-কর্মচারীরাই সেখানে অভিযোগ দায়ের করে নিজের সময় নষ্ট করেন না। তাঁরা যৌন হয়রানির খোঁজেন ব্যক্তিগত সমাধান। সম্ভব হলে, বদলানোর চেষ্টা করেন কর্মস্থল। সেটা নিতান্তই সম্ভব না হলে, চেষ্টা করেন নিগ্রহকারী পুরুষটির ছায়া বাঁচিয়ে চলতে।

 

অন্যদিকে, এই যে নাম-কে-ওয়াস্তে আই.সি.সি, তারও কোনো অস্তিত্ব থাকে না অসংগঠিত ক্ষেত্রে। অতএব, একটি মহিলা কর্মচারীর কাছে যৌন হয়রানি হাজির হয় শ্রেণী-শোষণেরই একটি লিঙ্গায়িত-যৌনায়িত রূপ হয়ে।

 

প্রসঙ্গত, আজকের যে মধ্যবিত্ত কর্মক্ষেত্র – কর্পোরেট অফিস, মিডিয়া, শিক্ষাক্ষেত্র, আইন – সেখানে উৎপাদন-মধ্যস্থ লিঙ্গ সম্পর্ক অনেক অনেক জটিল। একদিকে বহু দশকের নারী আন্দোলনের ফলে সেসব জায়গায় তৈরি হয়েছে একজাতীয় লিঙ্গ ভারসাম্য, লিঙ্গ বৈচিত্র ও ক্ষমতায়ন নিয়ে উপরিভাগজাত কথাবার্তা। একজাতীয় নয়া-উদারনৈতিক নারীবাদও সেই উপরিভাগজাত লিঙ্গরাজনীতি ও নারী-ক্ষমতায়নের বয়ানের পেছনে কার্যকরী। অন্যদিকে, সেই উপরিভাগের নিতান্তই পল্লবগ্রাহী চর্চার বাইরে টিকে থেকেছে প্রাত্যহিক পিতৃতন্ত্র। যৌন হয়রানি তার একটি উপসর্গ মাত্র।

 

অবশ্য, আজকের যে দক্ষিনপন্থার বিশ্বব্যাপী উত্থান ও পরিপক্কতা প্রাপ্তির সার্বিক বাতাবরণ, সেখানে দাড়িয়ে বিগত সময়ের সীমিত এই উপরিভাগের লিঙ্গ সাম্য অর্জন, তাও আজ হৃতপ্রায়। কর্মক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসছে ক্রূর পিতৃতন্ত্র, নির্লজ্জ মৌখিক পুরুষতান্ত্রিকতার চিহ্ন। এবং, বাস্তবতা এটাই যে নাম-কে-ওয়াস্তে আই.সি.সি অকেজো আই.সি.সি-র যুগে মহিলা কর্মচারীদের সামনে কর্মক্ষেত্রে সেইসব ক্রূর পিতৃতন্ত্রের পুনরুত্থানকে প্রতিহত করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেই। নেই মহিলা শ্রমিক-কর্মচারীদের নিজস্ব কোনো সংগঠন। নেই প্রতিষ্ঠানগুলির সামনে যৌথভাবে ন্যূনতম দাবি পেশ করার মতন কোনো সার্বিক বাতাবরণ।

 

কাজেই, আজকের সময়ের নারী আন্দোলনের কাছে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষম আই.সি.সি গড়ে তোলা। যেখানে গেলে মহিলা কর্মচারী-শ্রমিকরা সংবেদনশীলতা ও সুবিচার দুই-ই পেতে পারেন। কিন্তু, কে লড়বে এই লড়াই? কিভাবে লড়া হবে এই লড়াই? একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে “রাত দখল” জাতীয় দৃশ্যমোহনী, সাংগঠনিক ভিত্তিহীন, মূলত জমায়েতমূলক পদ্ধতির দ্বারা এই লড়াই লড়া যাবে না। যদিও জমায়েত হতে পারে এই লড়াইয়ের একটি অন্যতম অঙ্গ।

 

বরং, এই লড়াইয়ে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক, তৃণমূলস্তরীয় সংগঠন। অনেকটা যেমন প্রয়োজন ‘হয় যে কোনো কর্মক্ষেত্রে ইউনিয়ন গড়তে গেলে। কাজেই, এখানে বহু ক্ষেত্রেই যে যে সাবেকি পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কর্মক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে দাবিভিত্তিক সংগঠনগুলি গড়ে উঠেছে, সেই সব পদ্ধতির পুনরুদ্ধার ছাড়া কোনো গতি নেই।

 

আসলে, একটি শক্তপোক্ত শ্রমিক ইউনিয়ন ব্যতীত কর্মক্ষেত্রে আজ আর আই.সি.সি প্রতিষ্ঠার লড়াইটি মহিলা শ্রমিক-কর্মচারীদের পক্ষে লড়া সম্ভব নয়। কারণ, সঠিক অর্থেই আজকের নয়া-উদারনৈতিক কর্মক্ষেত্রে এই লড়াইটি লড়তে যাওয়া মানে, নিজের চাকরি খোয়ানো। এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের যৌন হয়রানির কথা প্রকাশ্যে আনলেও জীবিকা নির্বাহের উপায় হারাতে হতে পারে। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রের অভ্যন্তরে যে থাকে শ্রমিক-কর্মচারীদের নিজস্ব আলাপচারিতার জগৎ, সেখানে এই বিষয়টি সুবিদিত এবং মোটামুটিভাবে স্বীকৃত। নিঃসন্দেহে, কোথাও যেন এই নিরবতার বাতাবরণ হয়ে ওঠে আজকের বিশ্বজোড়া ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের পুনরুত্থানের সাথে সম্পর্কিত। যেখানে প্রতিবাদ তো দূরস্থান, সত্যকথনই বহু সময়ে হয়ে ওঠে নিজেকে “অপরাধী” প্রতিপন্ন করার সবচাইতে সুগম পথ।

 

কিন্তু, সাথে সাথে যেটা আজ মনে রাখা প্রয়োজন যে আমাদের বেঁচে থাকার সময়টি ঠিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বর্ণযুগ নয়। গত কয়েক দশক ধরেই ইউনিয়ন বিষয়টি একটি বড়ো অংশের শ্রমিকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। বহু শ্বেতকলার শ্রমিকের কাছে, শুধু শ্রমিক ইউনিয়নের গ্রহণযোগ্যতা নেই, তা-ই নয়, অধিকাংশ সময়ে তিনি নিজেকে “শ্রমিক” বলেই মনে করেন না। বরং, তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অন্য কোনো পরিচয় – তা হতে পারে “বুদ্ধিজীবী”, হতে পারে “প্রশাসক”, হতে পারে অন্য কিছুও বা। এক্ষেত্রে অবশ্যই নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে তাঁর শ্রেণীচরিত্র। তার ওপর, মূলস্রোতের যে সামাজিক-রাজনৈতিক যন্ত্রসমূহ, সেখানে চলতে থাকে ইউনিয়ন-বিরোধী লাগাতার প্রচার। কখনো প্রতক্ষ্যভাবে, কখনো পরোক্ষভাবে। গার্হস্থ্য শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিতে জানুয়ারী ২০২৬- এ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত-র ইউনিয়নবিরোধী বক্তব্য সেই মতাদর্শগত প্রচারেরই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

 

অন্যদিকে, গত কয়েক দশকে এই চিত্রের বিপরীতে, জোরদার লড়াই তো দূরের কথা, প্রচার বা তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও বাম বা প্রগতিশীল শক্তিগুলি কোনো বিকল্প চিত্র গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি, নীল কলার শ্রমিকদের ভেতরেও, আজ রয়েছে একধরনের ছন্নছাড়া বোধ। আর, এদেশে সদ্য লাগু হওয়া শ্রম কোড যে কোনো কর্মক্ষেত্রেই সংগঠিত হওয়াটাকে মূলগতভাবে করে তুলেছে অতীব কঠিন। যদিও, এদেশে, প্রকৃতপক্ষে, কয়েক দশক জুড়েই বকলমে চালু হয়ে আছে শ্রম কোড। বিশেষত বেসরকারি ক্ষেত্রে।

 

অতএব, আবারো বলি, এই ভয়াবহ পরিবেশ মহিলা শ্রমিক-কর্মচারীরা মূলগতভাবে মেনে নেন, মানিয়ে নেন। ব্যক্তিগত সমাধান খুঁজে নেন। সহ্য করতে না পারলে অগত্যা শ্রমজগৎ, উৎপাদনের জগৎ থেকে সরে দাঁড়ান। যদিও, এই গল্পগুলি রয়ে যায় আমাদের দৃশ্যগোচরতার বাইরে। মূলস্রোতের মিডিয়ার কোনো আগ্রহ নেই এই গল্পগুলিকে সামনে আনার। থাকার কথাও নয়।

 

প্রতিবাদ – তা ব্যক্তিগত হোক, অথবা সংঘবদ্ধ – হয়নি যে এমন নয়। বিভিন্ন সময়ে মহিলা শ্রমিকরা কারখানার ভিতরকার যৌন নির্যাতনের বাস্তবতাকে জনসমক্ষে এনেছেন। বহু ক্ষেত্রে, লড়াই যখন হচ্ছে মাইনে বাড়ার দাবিতে কিংবা পিএফ-এর দাবিতে, তাঁরা তখনো সোচ্চার হয়েছেন যৌন নির্যাতন বিষয়ে। কারণ, তাঁদের কাছে মাইনে বাড়ার দাবির মতনই গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে যৌন সম্মানের লড়াই ও দাবি। কিন্তু, সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সাধারণীকৃত আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, সেগুলি নিতান্তই ব্যতিক্রম।

 

ঐতিহাসিকভাবে, এটাই বাস্তব যে ভারতবর্ষের ট্রেড ইউনিয়ন লড়াইগুলির অভ্যন্তরে যৌন নির্যাতনকে উৎপাদনব্যবস্থার সাথে নিযুক্ত করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী লড়াই গড়ে ওঠেনি। অতীতে, কোনো কোনো মহিলা শ্রমিকদের কর্মস্থলে যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক শ্রমিক ক্ষোভের স্ফুরণ ঘটেছে বটে। ক্ষোভের স্ফুরণ ঘটেছে শ্রমিক মহল্লার মেয়েদের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও। কিন্তু, তার অধিকাংশই মূলগতভাবে গড়ে উঠেছে পুরুষ শ্রমিকের “ইজ্জত কা সওয়াল” সেন্টিমেন্টের ওপর ভর করে। কাজেই, সেই লড়াইয়ের মূলগত যে রাজনৈতিক চরিত্র – বিশেষত লিঙ্গ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে – তার সাথে মূলস্রোতের জাতীয়বাদী রাজনীতির বড়ো একটা ফারাক নেই।

 

এবং, তার সাথে অবশ্যই যোগ হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলির ভেতরকার প্রগাঢ় পুরুষ প্রাধান্য, প্রগাঢ় পিতৃতান্ত্রিকতা।একথা বলতে বাঁধা নেই যে যৌন নির্যাতন কিভাবে শুধু একজন মহিলা শ্রমিক -কর্মচারীর ব্যক্তিগত সম্মানের ওপর আঘাত হানে তাই নয়, হয়ে ওঠে তাঁর অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর আঘাত, এই বিষয়ে অধিকাংশ পুরুষ শ্রমিক নেতৃত্বের কোনো ধারণাই নেই। তাঁরা তাঁদের অভ্যন্তরীণ পুরুষতান্ত্রিকতার জেরেই কোনোদিন বিষয়টিকে গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করেননি। কাজেই, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়টিকে একটি শ্রমিক আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়, অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখতে হলে, শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ভেতরেও পিতৃতন্ত্রবিরোধী লড়াইটি জোরদার করতে হবে।

 

বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে বলি, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার প্রাদুর্ভাব ও তদজনিত আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা সামনে এনে দেয় ভারতবর্ষের বাম-শ্রমিক আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের যুগপৎ ব্যর্থতাকে। সেই বিষয়ে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন। এই প্রতিবেদনের ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব নয়। উপরন্তু, ভারতবর্ষ ও বাকি পৃথিবীর রাজনৈতিক বাস্তবতা এই বিষয়গুলি নিয়ে কোনো আশু সমাধান বা লড়াইয়ের আশা জাগায় না। অন্যদিকে, আবার এও সত্য যে খুব ধীরগতিতে হলেও শ্রমিকশ্রেণীর ভিতরে পৃথিবীজুড়ে দেখা যাচ্ছে নাড়াচাড়া। ভারতবর্ষের পানিপত, প্যালেস্টাইন তথা গাজায় ইজরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইতালির ডক শ্রমিকদের লড়াই, আমেরিকায় আমাজনের শ্রমিকদের লড়াই কিংবা ভারতবর্ষে আইটি-র শ্বেত কলার কর্মচারীদের কর্মবিরতি বা ইউনিয়ন গড়ার প্রক্রিয়া, স্বল্প হলেও আশার আলো জাগায়। আশা রাখি, সেই সব লড়াইয়ের ভেতর থেকেই আরও সজোরে উঠে আসবে যৌন হেনস্থার প্রশ্নটি। আসবে নারী শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই। উঠে আসবে “এপস্টিন শ্রেণী”-র বিরোধিতার মধ্য দিয়ে, আসবে আরও আরও মেয়েদের সাহস সঞ্চয় ও সশব্দ চিৎকারের ভেতর দিয়ে।

 


 

লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গ্রাউন্ডক্সেরো কালেকটিভের সদস্য।

Share this
Leave a Comment