উৎসবের মরশুমে কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে রাজ্যের হাজার হাজার আশাকর্মী মহিলারা নিজেদের প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়ার দাবি নিয়ে পথে নেমেছেন। প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা থেকে জাতীয় সড়ক অবরোধ, নানা প্রতিবাদ কর্মসূচী নিয়ে তাঁরা নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট
এই মুহূর্তে সারা পশ্চিমবঙ্গের ৭৮ হাজার আশাকর্মীর মধ্যে ৯৯% আশাকর্মী, প্রায় ৭৫ হাজার আশাকর্মী গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই ন্যায্য দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রতিবাদ আন্দোলন করছেন। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে তাঁরা স্বাস্থ্যভবন অভিযান, কলকাতার বুকে ঐতিহাসিক জমায়েত সহ বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে বারেবারে রাজ্য সরকার ও প্রশাসনকে এই বার্তাও দিয়েছেন যে, তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হলে তাঁরা কর্মবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন। তাঁদের উপরে গ্রাম ও শহরের এক বিরাট অংশের মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবা নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও সরকারি স্তরে, আশাকর্মীদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া বা কোনোও সমাধান সূত্র বের করার প্রতি কোনোও আগ্রহ দেখানো হয়নি। যার ফলশ্রতিতেই এই কর্মবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন রাজ্যের ২৯টি জেলার আশাকর্মীরা।

উৎসবের মরশুমে সারা রাজ্য যখন আনন্দে মাতোয়ারা, তখন, কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে রাজ্যের হাজার হাজার আশাকর্মী মহিলারা নিজেদের প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়ার দাবি নিয়ে পথে নেমেছেন। প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা থেকে জাতীয় সড়ক অবরোধ, নানা প্রতিবাদ কর্মসূচী নিয়ে তাঁরা নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পুরনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরের শুরুর সময়েও।
পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন-এর নেত্রী ও আশা কর্মী আন্দোলনের সর্বভারতীয় নেত্রী ইসমাত আরা খাতুন গ্রাউন্ডজিরো-কে জানালেন, “ভাতা চার মাস, পাঁচ মাস বাকি থাকে। ইন্সেন্টিভ গত দেড় বছর ধরে বাকি। কোনোও উৎসব অনুষ্ঠানের আগে টাকা দেওয়া হয় না। তারসঙ্গে রয়েছে অসম্ভব কাজের চাপ। পাশাপাশি চাপ দেওয়া হয় দাবি না করার জন্য, আন্দোলন না করার জন্য। আশাকর্মীরা কি শুধু সমাজসেবা করার জন্যই নিয়োগ হয়েছি? যাঁরা স্বাস্থ্য দপ্তরের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিষেবা দিচ্ছেন, মা-বাচ্চার স্বাস্থ্য ঠিক রাখছেন, নিরাপদ মাতৃত্ব সুনিশ্চিত করছেন, অন্যের বাচ্চার লালন-পালন করছেন, তাঁদের স্বাস্থ্য, সংসার, বেঁচে থাকার দায়িত্ব কি কোনোভাবে সরকার নেবে না?”
পরিশ্রমের নিরিখে ন্যায্য ভাতা বাড়ানো (ন্যূনতম ভাতা ১৫ হাজার টাকা করা), সমস্ত বকেয়া মেটানো, কর্মক্ষেত্রে কাজ্যের অন্যায্য চাপ, হয়রানি কমানো – এই যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলি নিয়েই চলছে আন্দোলন। স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রতিটি বিভাগে ও প্রত্যেক আধিকারিকের কাছে তাঁরা নিজেদের দাবি সম্বলিত চিঠি পাঠিয়ে তবেই এই লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন। অথচ প্রশাসনিক সূত্রে এখনোও পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনার কথা জানানো হয়নি। অন্যদিকে আশাকর্মীরা তাঁদের যে সাপ্তাহিক কাজের প্রেক্ষিতে বরাদ্দ টাকা পাওয়ার বিষয়টি থাকে সেই বিষয়টিকেও প্রত্যাখ্যান করে মানসিক দৃঢ়তা ও মর্যাদা বোধ সামনে রেখে নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইতে শামিল হয়েছেন।

“সরকার যদি মা-বাচ্চার প্রতি, আশাকর্মীদের কাজ, মা-বাচ্চাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাজকে তার মানে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। তাঁদের প্রয়োজন বোধ কাজ করছে না, তাঁদের দায়বদ্ধতা বোঝা যাচ্ছে না। আশাকর্মীরা যে গূরুত্বপূর্ণ পরিষেবাটা দেন, তা ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ হওয়ার কথা সরকারের। তাঁদের আমাদের সঙ্গে বৈঠক করা উচিৎ, কেন আমরা এই পথে গেলাম তাঁদের শোনা উচিৎ,” বললেন ইসমাত আরা খাতুন, সরকারী উদাসীনতা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে।
ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন যার অনুমোদিত হল পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন – তার নেতৃত্ব, মিশন ডিরেক্টর, হেলথ ডিরেক্টর ও হেলথ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন যাতে দু’পক্ষের উপস্থিতিতে এই বিষয়টি নিয়ে একটি আলোচনা, বৈঠক হয়। এছাড়া আগামী ৭ জানুয়ারি এ রাজ্যের গ্রামীণ ও শহর মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার আশাকর্মী স্বাস্থ্যভবনে গিয়ে সেখানে আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার দাবি জানাবেন, যাতে এই অচলাবস্থা কেটে যায় ও কোনোও মারাত্মক পরিস্থিতি উদ্ভূত হওয়ার আগেই তা সামলানো যায়। তাতেও যদি জট না কাটে, কোনোও সন্তোষজনক সমাধানসূত্র না উঠে আসে তাহলে সারা রাজ্যে জেলায় জেলায় ভাগ করে দিয়ে ‘রোটেশন’-এ এই কর্মবিরতি চলতে থাকবে বলেই জানা গেছে।

ইসমাত আরা খাতুন জানালেন বহু ক্ষেত্রেই সরকারি আধিকারিকদের কাছ থেকে তাঁদের ন্যায্য দাবির প্রতি এক ধরনের মানবিক সমর্থন তাঁদের চোখে পড়েছে, এমনকি তাঁদের ব্যাপক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কেউ কেউ জানিয়েছেন তাঁদের এই প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে। “আমরা তো জানি, এত বড় সরকার চাইলেই সবটাকে মেরে ভেঙে বরবাদ করে দিতে পারত। তা তাঁরা দিতে পারছে না, তার অন্যতম কারণ তাঁরা তো বাস্তবিকই প্রচণ্ড শোষন করছে, বঞ্চিত করছে। কোন মুখে তাঁরা তা করবেন? তাঁরা তো বহু ক্ষেত্রে বহু গণ আন্দোলনকে, বহু ন্যায্য আন্দোলনকে তাঁরা নানাভাবে দমন করেন দেখেছি। এত হাজার হাজার মহিলা কর্মী, যাঁরা মা-বাচ্চার পরিষেবা দেন, তাঁদের বিষয়গুলি আমরা মনে করছি তাঁরা নিশ্চয়ই বিবেচনা করবেন ও মানবেন। এখনোও কিসের জন্য সরকারী নীরবতা আমরা বুঝতে পারছি না! চারিদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাপকভাবে ব্যহত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাড়িতে প্রসব শুরু হয়ে গেছে। আশা ছাড়া মায়েরা হাসপাতালে যেতে চাইছে না,” জানালেন তিনি।
এই কর্মবিরতির মধ্যেও আশাকর্মীরা মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁদের নির্দেশ দেওয়া রয়েছে যদি কোনোও গর্ভবতী মায়ের প্রসব যন্ত্রণা হয় তাহলে ১০২ নম্বরে ফোন করে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে দেবেন তাঁরা, কিন্তু ইউনিফর্ম পরে তাঁদের সঙ্গে যাবেন না। এরফলে তাঁরা প্রাপ্য টাকাও পাবেন না, কিন্তু একজন গর্ভবতী মা ও সন্তানের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন। এই প্রসঙ্গে ইসমাত আরা খাতুন জানালেন, “সরকার হয়তো এই কারণেও উদাসীন যে তাঁরা দেখছেন কোনোও মা বা বাচ্চা তো মারা যাচ্ছে না। আশাকর্মীরা আন্দোলনের মধ্যেও জরুরি পরিষেবা দিচ্ছেন নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করেও। কিন্তু তাঁরা, তাঁদের পরিবার রুখা-সুখাই থাকছেন, অসহায় অবস্থা। এটাই যদি সরকারের উল্লাসের কারণ হয়, আমরা তো তা বিনা লড়াইয়ে মেনে নেব না।”

কেরালায় বাম শাসনে আশাকর্মীরা দাবি আদায়ে দীর্ঘ আন্দোলন চালাচ্ছেন। সেখানেও সরকার উদাসীন, ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। রাজনৈতিক দল যেই হোক, শাসকের চরিত্র কি তবে বদলায় না? এই প্রশ্নের উত্তরে ইসমাত আরা খাতুন জানালেন, “কেরালার আন্দোলন, সেখানে শাসক হিসাবে, একটা বামপন্থী সরকার যেভাবে নামে হলেও, জনগণের দাবি, জনগণের আন্দোলনকে এভাবে উপেক্ষা করা এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের এই লড়াইকে অসহযোগীতা করা, নানাভাবে দমন করা, এখানে একটা জিনিস খুব পরিষ্কার, শাসক দল যখন ক্ষমতায় যায়, গদিতে যায় যে কোন ব্যবস্থাকে সেবা দেওয়ার জন্য সে তৈরি। দুই রাজ্যে দু’টি দল রাজনৈতিক আদর্শে সম্পূর্ণ বিপরীত হলেও শাসক চরিত্রে সম্পূর্ণ এক। ফলে জনগ্ণের দাবি, তার গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে এদের চরিত্রের জায়গাটা এক, নাম, রাজনৈতিক পতাকার রং যতই আলাদা হোক না কেন। চরিত্রে তারা আল্টিমেট শাসক ও এই ব্যবস্থাকেই টিঁকিয়ে রাখার জন্য ও মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যই উভয়ে চারিত্রিকভাবে এক।”
এই প্রসঙ্গেই উঠে এল কেরালায় সিটু আশাকর্মীদের আন্দোলনের বিপক্ষে থাকলেও এ রাজ্যে তাঁরাই কীভাবে বেতন-ভাতা বাড়ানো, সরকারি স্বীকৃতি ইত্যাদি দাবিতে আশাকর্মীদের আন্দোলনের পক্ষে আছেন। রাজ্য ভেদে এই রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী হয়ে পড়ে।
আশাকর্মীরা মহিলা বলেই কি তাঁদের আন্দোলনের প্রতি উদাসীনতা আরো বেশি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “একজন নারীকে যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে বিচার করা হয়, মহিলা শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করছে। সমকাজে সমবেতন – এই দাবি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আট ঘন্টা কাজের অধিকার একটা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মহিলা শ্রমিককে বঞ্চিত করাকে একটা অভ্যাসে পরিণত করা হয়েছে।
যাকে বলা হয়, নতুন বছরের শপথ, তা আশাকর্মীদের এই লড়াইয়ের মাঝে কী রইল তবে?
নেত্রী জানালেন, “দুঃখজনকভাবে, নতুন বছর আশাকর্মীদের জীবনে নতুন কোনোও বার্তা এনে দিতে পারল না ক্ষমতাশীল সরকার, যাঁদের দায়িত্ব ছিল। তাই নতুন বছরে বার্তা, শপথ – নতুন বছরে নতুন উদ্যমে আমাদের দাবিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের যত দূর এরজন্য যেতে হয় আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন মানুষের মতো এগোব ও দাবি আদায় করব।“
ছবি ইসমাত আরা খাতুন-এর সামাজিক মাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত।

