উত্তরবঙ্গের ভোট ফলাফল বিশ্লেষণ : পাহাড়বাসীর কাছে তৃণমূল সমতলের দল হয়েই রয়ে গেল


  • June 23, 2024
  • (0 Comments)
  • 544 Views

এবারের লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গে বিজেপির ভোট সর্বত্র কমেছে, তবে তৃণমূল উত্তরের মাটিকে জিতে নিতে আবারও ব্যর্থ হল। তৃণমূল পাহাড়বাসীর কাছেও সমতলের দল হয়ে রয়েছে। যা তৃণমূলের ভাববার প্রয়োজন। লিখলেন রুপম দেব

 

 

এবারের লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গে বিজেপির ভোট সর্বত্র কমেছে, তবে তৃণমূল উত্তরের মাটিকে জিতে নিতে আবারও ব্যর্থ হল। কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাখা আইপ্যাক সংস্থাও উত্তরের জমি উদ্ধার করে দিতে পারেনি রাজ্যের শাসকদলকে। আর্থিক ও জাতিগত ভাবে পিছিয়ে থাকা উত্তরের অংশকে কলকাতার ভদ্রবাবুরা আজও চিনতে পারলেন না। বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য শাসকদলের মাধ্যমে বার বার প্রতিফলিত হওয়ায় তৃণমূল বার বার পিছিয়ে পড়ছে। আর এই বঞ্চনা ও দাদাগিরির সুযোগ নিয়ে বিজেপি প্রথম থেকেই উত্তরকে নিজের শক্ত ঘাটি করতে পেরেছে। তবে সাংসদ ও বিধায়কদের দম্ভ, অহংকার, নিজেরা কিছু না করে সব রাজ্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া এবং মোদি থাকতে আমাদের চিন্তা কি গোছের ভাবনা, বিজেপিকে এবার জেতার সুযোগ করে দিয়েও মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে উত্তরবঙ্গবাসী। ২০১৯ সালে, বিজেপি যথাক্রমে ৪.১৩ লক্ষ, ১.৮৪ লক্ষ এবং ২.৪৩ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, এবং আলিপুরদুয়ার আসন জিতেছিল। এবার ভোটের ব্যবধান নেমে এসেছে ১ লক্ষ ৭৮ হাজার, ৮৬ হাজার আর ৭৫ হাজার ভোটে। কারণ বিজেপির দেওয়া প্রতিশ্রুতির হিসেব চাইছে জনগণ।

 

প্রথমে আসি দার্জিলিংয়ের বিষয়ে। এই অঞ্চলের সঙ্গে সমতলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ভাল নয়। তাকে পুঁজি করে বিজেপি ও আরএসএস বহুদিন থেকেই শক্তঘাঁটি বানিয়েছে পাহাড়ে। তবে বার বার গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্ন দেখিয়ে জিতে আসা বিজেপির পক্ষে মোটেই সহজ কাজ ছিল না এবারের লোকসভা ভোট। একদিকে মোদি ‘ওয়েভ’ না থাকা এবং তার সঙ্গে উন্নয়ন, গোর্খা প্রশ্নে চুপ থাকা বিজেপির প্রতি মানুষের রাগ বেড়েই চলছিল। বিজেপির হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার হংকারের খ্রিষ্ট ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষদের ভোট আগের মত গেরুয়া শিবিরে যায় নি।পাহাড়ে আগে এমন ছবি দেখা যেত না। নেপালি উচ্চবর্ণ ভোট পেলেও বিজেপির থেকে দূরে সরেছে নেপালি ‘নিম্নবর্ণের’ মানুষেরা। যা কিছু ভারতের মতো।

 

তবে এবার জিতলেও পাহাড় আগামীদিনেও জয় বিজেপির কাছে সহজ হবে না। গোর্খাদের ১১ টি উপগোষ্ঠীর এসটিদাবি পূরণ করতে গেলে, বিজেপির মূল ভোটার, বর্তমান তপসিলি উপজাতির মানুষেরা যেমন প্রতিবাদ করতে পারে, তেমনি মোদির জনসভায় দেওয়া ভাষণ,‘গোর্খার স্বপ্ন আমার স্বপ্ন’ মানতে গেলে বাংলার দক্ষিণে বিজেপির ভীষণভাবে ধাক্কা খাওয়ার ভয় রয়েছে। তবে বাংলায় যেমন বিজেপি এখন অবধি বাংলার পার্টি হয়ে উঠতে পারে নি। তেমনি তৃণমূল পাহাড়বাসীর কাছেও সমতলের দল হয়ে রয়েছে। যা তৃণমূলের ভাববার প্রয়োজন।

 

দার্জিলিংর আঞ্চলিক দল হামরো পার্টির নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দিয়ে পোস্টার বিজেপির বিরুদ্ধে।

 

এবার আসি জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের আলোচনায়। এই জেলাগুলো বরাবর ছিল আর এসপি ও ফরোয়ার্ড ব্লকের দখলে। ২০১৪ পর থেকে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলেছে। তৃণমূল এখানে বেশীদিন দাঁত ফোটাতে পারেনি। ২০১৬ থেকেই বিজেপি এই অঞ্চলগুলো নিজেদের দখলে আনে। ২০১৯ বিজেপির দুর্দান্ত ফলাফলের পরে সাংসদদের প্রতিশ্রুতিগুলো সব হারিয়ে যেতে থাকে এবং দলের ভেতরেও শুরু হয় নানা গোষ্ঠী কোন্দল। পাঁচ বছর পর ২০২৪ লোকসভা ভোট কোচবিহার যায় তৃণমূলের দখলে আর জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার বিজেপির উপরেই আস্থা রাখে। এই দুই জেলা মূলত চা অধ্যুষিত আদিবাসী অঞ্চল। আর কোচবিহারে রাজবংশী সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ট। কোচবিহার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়াতে ইসলামফোবিয়া ভাবনা এই জেলায় বিজেপি ও আরএসএস ভালই ব্যবহার করেছে। আসামের মত কোচবিহারেও এনআরসি নিয়ে রাজবংশী সমর্থন বিজেপি পেয়েছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় CAA ও গ্রেটার কোচবিহারের প্রশ্নে। দার্জিলিংয়ের মত এখানেও বিজেপির মিথ্যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষ বিরক্ত ছিল। বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ ও গ্রেটার কোচবিহার পিপলস সংগঠনের কর্ণধার অনন্ত মহারাজের ভোটের সময় চুপ থাকা এবং সাংসদ ও প্রতিমন্ত্রী নিশীথের কাজের ব্যর্থতা কে তৃণমূল ভাল ভাবে কাজে লাগায়। আলিপুরদুয়ারে বিজেপির সাংসদ ছিলেন চা বাগান থেকে উঠে আসা আদিবাসী নেতা জন বার্লা। নিশীথ ও বার্লা দুজনেই প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন তবে সময়ের সাথে সাথে এঁদের নিজের এলাকাতেও দেখা যায় নি। চা বাগানে যেখানে শ্রমিকরা ঘর তৈরি করতে পারে না মালিকের অনুমতি ছাড়া সেখানে বার্লার চা বাগানে রাজপ্রাসাদের মত ঘর তৈরি করা শ্রমিকরা ভাল ভাবে নেয় নি। তৃণমূলের একনাগাড়ে বার্লার বিরুদ্ধে প্রচারে বিজেপি বুঝে গিয়েছিল পুরনো মুখ আবার এলে এবার আসন না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ফলত বিজেপি থেকে টিকিট পেলেন আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক মনোজ টিজ্ঞা।

 

বার্লা এই শুনে প্রকাশ্যে মনোজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করলেন। সরকারি অনুষ্ঠানে মনোজের সামনেই জানিয়ে দিলেন মনোজ কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত।বিজেপির এই সব অন্দরের ঝগড়া বিজেপি কর্মী ও সাধারণ মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলে। গুটি কয়েক সমর্থক নিয়ে দৈনিক পরিকল্পনা ছাড়াই বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ালেন মনোজ। রাজ্যসভার সাংসদ ও তৃণমূল প্রার্থী প্রকাশ চিক বরাইক সাংবাদিকদের হাসিমুখে জানিয়ে দিলেন বার্লা ৫০ শতাংশ কাজ করে দিয়েছে তবুও শেষ অব্দি প্রকাশ হারলেন ৭০ হাজার বেশী ভোটে। ভোটের পর দেখা গেল প্রকাশ চা বাগান অঞ্চলে লিড না পেলেও কিছুটা ভোট বাড়ালেন তবে শহরে পিছিয়ে রয়েছেন। যদিও দিল্লি হোক বা শিলিগুড়ি কিংবা উত্তর দক্ষিণ কলকাতা, বহু শহরে বিজেপির হিন্দুত্ব জিতলেও গ্রামে উন্নয়নের প্রশ্নই সামনের সারিতে ছিল। তবুও চা বলয় মমতার সঙ্গে এবারও রইল না। এক্ষেত্রে উত্তরে তৃণমূলের হারের কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে চা বলয়ে মমতার কাজকর্ম একটা ভাল কেস স্টাডি হতে পারে। কারণ জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং বিস্তৃত অংশ চা বাগান দিয়ে ঘেরা। মাটির গন্ধ কে না বুঝে সব কিছু উপর থেকে চাপিয়ে দিলে তা যে ভোটের ফলাফলে প্রকাশ পায় না তা চা বাগানের মানুষ দেখিয়েছে। কলকাতার নেতা ও প্রশাসনের প্রতি নতমস্তক থাকা উত্তরের তৃণমূল নেতারা চা বাগানের জন্য আলাদা কোন সুনির্দিষ্ট নীতি বানাতেই পারেনি বা সাহস পায়নি। কলকাতার নেতা মন্ত্রী ও প্রশাসন নির্ভর শাসনব্যবস্থা চা বাগানের মানুষ থেকে তাদের দূরে সরিয়েছে।

 

একদিকে তৃনমূলের বরিষ্ঠ নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেবের আক্ষেপ অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর আবেগভরা বক্তব্য।

 

মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বহুবার বলেছেন উত্তরবঙ্গের জন্য এত করেন কিন্তু ফল পাওয়া যায় না। চা বাগানেও তিনি চেষ্টা করছেন প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে চা বাগানের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটুক। আগের সরকারের চেয়ে বেশি করছেন তাতেও সন্দেহ নেই। তবে মানুষের শিক্ষা সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটলে অধিকারগুলো আরও প্রকটভাবে সামনে আসে, আর এই অধিকারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় চা বাগানের পচা গলা এক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা, যেখানে ঘরে ছাদ থেকে শুরু করে যে কোনও ব্যবসা করতে হলে চা বাগানের মালিকের অনুমতি প্রয়োজন। প্রত্যেক বাগানে ১০০০ মানুষ কর্মক্ষম হলেও কাজ করছে ৪০ শতাংশর মত। বাকিদের জন্য কাজের কোনও বিকল্প নেই। ২৫০ টাকা মুজুরিতে  মানুষ কাজ করতে না চাইলে ঘর ছাড়ার নোটিশ আসে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও। আর এই পচাগলা সিস্টেমকে না সরিয়ে শুধু রাস্তা আর আলো দিয়ে মন জয় করা যায় না। শুধু অহংকারের সুরে বলে দেওয়া সিপিএমের সময় মুজুরি ৪-৫ টাকা বাড়ত আমরা ৩৫ টাকা বাড়িয়েছি তাতেও কাজে দেয় না। নুনূতম মুজুরি আইন লাগু করার জন্য চা পরামর্শ কমিটি ২০১৫ থেকে ১৯ বার মিটিং করেছে কিন্তু সমধান হয় নি। রাজ্যের নেতাদের সঙ্গে চা বলয়ে মালিকদের অদ্ভুত আঁতাত আজো শ্রমিকরা পায় ব্রিটিশদের তৈরি করা হাজিরা। প্রান্তিক চা বাগানের মানুষেরা ভদ্রবাবুদের কাছে দাবি করলেই বলে উঠে ‘অনেক কিছুই তো দেওয়া হচ্ছে’।

 

‘সেকুলার’ বাঙালির সঙ্গে চা বাগানের আদিবাসী ও গোর্খাদের এ এক পুরনো সম্পর্ক। কলকাতা ও উত্তরের শাসকদলের নেতারা হংকার দিয়েছিলেন কয়েকশো কোটি টাকা পড়ে থাকা চা বাগানের শ্রমিকদের পিএফের টাকা মালিকদের দিতে হবে, কিন্তু কোটি কোটি টাকা বাকি থাকা গ্যাচুয়টির টাকা নিয়ে শ্রম দপ্তরের অফিসাররা এগোলেই মালিকের অঙ্গুলিহেলনে তাঁদের ট্রান্সফার হয়েছে। কারণ পিএফ কেন্দ্রের বিষয় আর গ্যাচুয়টি রাজ্যের। ২০১৯ লোকসভা ভোটে তৃণমূলের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল ব্রিটিশদের তৈরি করা হাজিরা প্রথা বন্ধ করে মিনিম্যাম ওয়েজ চালু করা যা আজো হয় নি।

 

তারপর তৃণমূলের ২০২১ বিধানসভা ভোটের আগে মমতা ঘোষণা করলেন চা সুন্দরী প্রকল্প। বাগানের কোনও এক খালি জায়গায় ছোট ছোট কিছু ঘর বানিয়ে দেওয়াই হল চা সুন্দরী। এমন দাবী শ্রমিকরা কোনদিন করছিল কিনা তা কারোর জানা নেই। ৩০০ বাগানের মধ্যে সাত আটটা বাগানে তা বানানো হল কিন্তু ৭০ শতাংশ ঘরে মানুষ গেলেন না। প্রশাসন নির্ভর উচ্চবর্গদের ভাবনায় গড়া ঘরের দরজায় পা রাখলেন না শ্রমিকেরা। বিধানসভার ভোটের প্রধান ইস্যু ফ্লপ গেল। শ্রমিকরা বললেন যেখানে থাকি সেখানকার জমির অধিকার চাই। এই কথা কলকাতায় পৌছতে বহু বছর লেগে গেলেও ২০২৩ হঠাৎ রাজ্য সরকার বললেন বাগানে পাট্টা প্রদান করা হবে। মুজুরি আইন লাগু করতে যে সরকার টালবাহানা করে চলেছে আজো যেখানে চা সুন্দরী মত ভোগাস পরিকল্পনা শ্রমিকরা দেখল। সেখানে জমির অধিকার নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই প্রশাসনের উপর নির্ভর করে কয়েকটি বাগানে জমির পাট্টা দেওয়া শুরু হল। কোন জায়গায় দেওয়া হল? এই পাট্টার কি কি সুবিধা রয়েছে? কিছুই জানানো হল না। ভারতীয় জনতা পার্টি নেমে গেল একে সাম্প্রদায়িক রঙ দিতে। বলা হল এটি রিফিউজি পাট্টা। বাগানে বাগানে প্রচার হল পুরো জমির অধিকার না দিয়ে শুধু মাত্র ৫ ডেসিমেল জমির অধিকার দেওয়া হচ্ছে কারণ রহিঙ্গাদের জায়গা দিতে চায় সরকার।

চা বাগানে শ্রমিকদের শিলিগুড়িতে মহামিছিল কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই।

 

চা বাগানের শাসকদলের নেতারা এই আইনের যুক্তিকতা বোঝাতেই পারলেন না। তবে এই পাট্টা প্রদান শ্রমিকের সঙ্গে আলোচনা করে লাগু করতে পারলে এটি একটি মাষ্টারস্ট্রোক হতে পারত শাসকদলের কাছে। আন্দোলনের চাপে পড়ে পাহাড় থেকে চা শ্রমিকদের পাট্টা প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। ডুয়ার্সে পাট্টা প্রদান হল তবে সীমাবদ্ধ থাকল বন্ধ ও কয়েকটি শাসকদল ঘনিষ্ট মালিকের বাগানের মধ্যে। শেষে চা সুন্দুরী এক্সটেনশন পার্ট নাম দিয়ে পাট্টা প্রাপকদের দু কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হল ঘর বানানোর জন্য। অর্থাৎ ঘুরপথে মেনে নেওয়া হল চা সুন্দরী প্রকল্প ভুল ছিল। যে যে বাগানে প্রথম কিস্তি পেল সেখানে তৃণমূল স্বাভাবিক ভাবেই ভাল ফল করল। কিন্তু এই পলিসির নানান জটিলতাগুলো না ভেবে চাপিয়ে দেওয়া মনোভাব শাসকদলের কাল হল। সাংবাদিকতার সূত্রে বুঝতে পেরেছি যে প্রশাসন ও নেতাদের ভাবটা এমন, যেন চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য কেউ কোনদিন কিছু করেনি, আমরা তো করছি। এবার সেই করাতে তাদের মতামতের কোন প্রয়োজন নেই।

 

চা বলয় হোক বা উত্তরের মানুষ তারা ভাল ভাবেই জানে কলকাতার নেতাদের হাতেই এখানকার উন্নয়নের চাবিকাঠি। উত্তরবঙ্গের শাসকদলে কোনও এমন এক নেতা উঠে এল না যে উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা বলবে। তাঁদের ভয় একটাই, আমার চেয়ার সরে না যায়। তাই এখানে বিল্ডিং নীল সাদা হয় কিন্তু পরিষেবা পাওয়া যায় না। ভ্রমণে দক্ষিণের মানুষ উত্তরমুখী কিন্তু ডাক্তার হোক বা সরকারি চাকুরি উত্তরবঙ্গে কাজ করা এদের না পসন্দ। শুধু শাস্তিমূলক পোস্টিং হল উত্তরবঙ্গ। শাসকের ভাবা উচিত কলকাতার বাইরেও পশ্চিমবঙ্গ আছে। কলকাতার গরম মানেই উত্তরবঙ্গে গরম থাকবে এমন নয়। তবুও এই অঞ্চলে স্কুল ছুটি হবে কলকাতায় গরম আছে বলে। তাই বার বার এই অঞ্চলে কলকাতার আধিপত্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে। বিজেপি একে ভর করে বাংলায় বিরোধী শক্তি হয়ে উঠছে।

 

উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকার ক্ষোভকে কাজে লাগালেও উত্তরের উন্নতিকে ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রের সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। উলটো ১০০ দিনের কাজ ও ঘর নির্মাণে টাকা আটকে দেওয়াতে বাংলা বঞ্চনার সাথে সাথে উত্তরের প্রান্তিক মানুষেরাও একে বঞ্চনা হিসেবেই দেখেছেন তাই বিজেপির উত্তরের নেতারা উত্তরবঙ্গ আলাদা রাজ্য চাই বলে উত্তরবঙ্গের ভোটকে আরও একত্র করতে চেয়েছিল ভোটের আগে আগে। কিন্তু দক্ষিণের বিজেপির নেতারা তা করতে দেয় নি। তবে এতে এক সমস্যাও রয়েছে কারণ উত্তরের কোনও একক পরিচিতি নেই।

 

এখানে গোর্খা, আদিবাসী, রাজবংশী প্রত্যেকের আলাদা আলদা রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবী রয়েছে। যা উত্তরবঙ্গ রাজ্য গড়লে সমস্যা মিটবে না। গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে ডুয়ার্সের এলে ডুয়ার্সের আদিবাসীদের সংখালঘু হওয়ার ভয় রয়েছে। আবার আলাদা রাজ্যেতে উত্তরের বাঙালিরা পুরোপুরি সমর্থন করবে না, বঞ্চনার অভিযোগ সত্যেও কারণ তাতে তাদের সংখ্যালঘু হওয়ার ভয়। ফলত আরএসএস ও বিজেপির এক কেন্দ্রিক হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ভাবনায় উত্তরের সমগ্র জাতির দাবি মানা যেমন সম্ভব নয়, তেমনই আগামীদিনে শাসকদল কিছু আসন বাড়াতে সক্ষম হলেও, তৃণমূল নিজের কলকাতা কেন্দ্রিক নীতি না বদলালে নানান বহুকেন্দ্রিক নতুন নতুন শক্তি গড়ে উঠতে পারে বা ভবিষতে জাতিগত লড়াইয়ের সম্মুখীন হবে উত্তরবঙ্গবাসী, বৃহৎদলের রাজনৈতিক স্বার্থে যা আজ মণিপুর প্রত্যক্ষ করছে।

 

লেখক সাংবাদিক ও সামাজিক কর্মী।  

 

Share this
Leave a Comment