শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে


  • March 21, 2024
  • (0 Comments)
  • 387 Views

বর্তমান শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান-পরিসরের জৈবিকতা যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, জীবন ও যাপনের বিকল্প রূপ সন্ধানের পারঙ্গমতা যেভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হচ্ছে, সেই বিষয়ে সমানুভবে পৌঁছে বিকল্পমুখী চর্চায় স্বনির্ধারিত ভাবে ব্রতী হওয়ার সূচনাটুকুই হয়ত আমরা আপাতত করতে পারি।

 

বিপ্লব নায়ক

মার্চ, ২০২৪

 

বর্তমান সমাজে কেন্দ্রীভূত ধাপে বিন্যস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের বেড়িতে বেঁধে শিক্ষাব্যবস্থার যে রূপ নির্মাণ করা হয়েছে, তাকে এক কথায় শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতা বলা হয়েছে। এই লেখা বর্তমান সমাজে শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার চরিত্রবৈশিষ্ট্য ও সাধারণ প্রভাব বিশ্লেষণ করে এই শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরোধিতা করেছে। প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, বিকল্প কোনো শিক্ষাব্যবস্থার রূপ এখানে নির্মাণ করতে চাওয়া হয়নি, বা ইতিহাসের সরণিতে এই শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিকতার উদ্ভব ও বিকাশকেও আলোচনার পরিধিতে আনা হয়নি। এই সীমায়িত পরিধির মধ্যে আপাতত বিচার-বিবেচনা করতে উৎসাহী পাঠকের সাহচর্য কামনা করছি।

 

১.

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা একটি প্রাক-সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই প্রাক-সিদ্ধান্ত হল এই যে একমাত্র বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঁধে-দেওয়া পথে প্রবেশ ও তা অতিক্রম করার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ শিক্ষিত হতে পারে, সামাজিক সাবালকত্ব অর্জন করতে পারে। এখান থেকে বেশ কিছু অণুসিদ্ধান্ত উঠে আসে, যেমন:

 

  • বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যা কিছু শেখা বা জানা যায়, তা ভুল, অথবা মূল্যহীন, অথবা বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্র-ধারী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা স্বীকৃত হলে তবেই ঠিক বা মূল্যবান।

 

  • বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের শান-বাঁধানো পথে প্রবেশ ও যাত্রা করেনি এমন যে কেউ অশিক্ষিত, তার অভিজ্ঞতা বা স্বজ্ঞা জ্ঞানের জন্ম দেয় না, বরং জ্ঞানের থেকে ইতর শ্রেণির এমন কিছু ধারণাসমূহের ধোঁয়াশার স্তরে থাকে যথার্থ শিক্ষিতজনেদের দ্বারা যার পঞ্জীকরণ-পরিমার্জন-শোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল জ্ঞান তৈরি হতে পারে এবং বলা বাহুল্য যে এই পঞ্জীকরণ-পরিমার্জন-শোধন প্রক্রিয়াও কেবলমাত্র বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানেই হতে পারে।

 

এই সিদ্ধান্তসমূহ জ্ঞানোৎপাদন ও শিক্ষাপ্রদানের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটির যৌক্তিকতা নির্মাণ করেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, যা চালানোর জন্য মাইনে-পোষিত শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের নিয়োগ করা হয়, এবং সমাজে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সম্মান ন্যস্ত করা হয়। আর অন্যদিকে, সমস্ত শিশুরা হচ্ছে এই উৎপাদনব্যবস্থার কাঁচামাল। সাধারণ নকশাটি হল এমন : ছয় বছরের উপর (কমতে কমতে কখনও অবশ্য তা দুই বা তিন বছরে গিয়েও দাঁড়ায়) শিশুদের কমবেশি তিরিশ-চল্লিশ জনের দলে ভাগ করে এক-একটা বিদ্যালয়-শ্রেণিকক্ষে পোরা হবে, তাদের মাথার উপর গুটিকয় শিক্ষক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে, প্রতি বছর ১২00 ঘন্টা বা তারও বেশি সময় এই শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে চার দেওয়ালের একটি কক্ষের মধ্যে আবদ্ধ থেকে শিক্ষা নামক পরিষেবাটির প্রাপক বা ভোক্তা হিসেবে শিশুগুলি শিক্ষা শুষে নেবে। শিক্ষা পরিষেবার পরিষেবা-প্রাপক ভোক্তা হিসেবে এই শিক্ষা শুষে নেওয়ার কাজে যে শিশু যত সক্ষমতা দেখাবে, বছরের পর বছর সে তত মেধাবী বলে চিহ্নিত হয়ে উচ্চতর বিদ্যালয়-শ্রেণিতে যাত্রা করবে। তুলনায় যারা ভোক্তা হিসেবে এই পরিষেবা শুষে নেওয়ায় অত দড় হবে না, তারা ক্রমশ মেধাহীন বলে চিহ্নিত হয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানোৎপাদনে অধিকারহীন অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিতদের সম্মানহীন দঙ্গলে নিক্ষিপ্ত হবে। অন্তত বছর বারো যারা বাইরে নিক্ষিপ্ত না হয়ে এই শিক্ষাকলের মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বেরোতে পারবে, তারা সমাজের উচ্চ উপার্জন দায়ী ও উচ্চ সম্মানজনক বৃত্তিগুলোর জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। আরো বেশি বছর প্রক্রিয়াজাত হলে, আরো বেশি উপার্জন ও সম্মানের সম্ভাবনা, অথবা শেষাবধি এই শিক্ষাকলেরই চালক-পরিচালক-তত্ত্বাবধায়ক স্বরূপ বুদ্ধিজীবীকুলের পরম-সম্মানজনক (ও পরম অর্থকরীও বটে) পৈতে প্রাপ্তি।

 

এহেন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে অর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিসর ছাপিয়ে বিস্তৃত করেছে, যেমন:

 

  • শিক্ষিত হওয়া মানে এখানে শিক্ষাব্যবস্থা নামক কাঠামোটির গ্রাহক হয়ে ‘শিক্ষা’ নামক নির্দিষ্ট বস্তুটির উপভোক্তা হওয়া। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় ক্রমে যেমন সমস্ত মানুষ নিজ প্রয়োজন ও ব্যবহার্য বস্তুর স্বনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও তৃপ্তিসাধন থেকে বঞ্চিত হয়ে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার গ্রাহক ও তার দ্বারা উৎপাদিত বস্তুর উপভোক্তা হতে বাধ্য হয়, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাতেও তেমনি ক্রমে সমস্ত মানুষ নিজ অভিজ্ঞতা ও স্বজ্ঞার পরিসরে জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ জ্ঞানোৎপাদনকারী কাঠামোর গ্রাহক ও উপভোক্তা হতে বাধ্য হয়।

 

  • পুঁজিবাদী উপভোক্তা সমাজে কেন্দ্রীভূত উৎপাদন-বন্টন ব্যবস্থার যোগানো পণ্যের ভোগ যত পরিমাণে বাড়ে, সমাজকেও তত ধনী বলা হয়; যে ব্যক্তি যত ভোগের পরিমাণ বাড়ায়, তাকে তত ধনী ও সম্মানীয় ধরা হয়। ঠিক তেমনই এই শিক্ষাব্যবস্থায় যে উপভোক্তা শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা সিলেবাস করে দেওয়া শিক্ষাবস্তু যত বেশি ভোগ-আয়ত্ত করতে পারবে সে তত শিক্ষিত ও জ্ঞানী ও সম্মানীয় বলে ধার্য হবে; যে সমাজে এহেন কেন্দ্রীভূত উৎপাদন-বন্টন নিঃসৃত শিক্ষাবস্তুর আধিক্য ও আধিপত্য যত বেশি হবে, সেই সমাজ তত শিক্ষিত ও জ্ঞানীর শিরোপা পাবে।

 

  • পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কেন্দ্রীভূত বৃহৎ উৎপাদন-বন্টন ব্যবস্থা যেমন ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীভূত নানা বিচিত্র ক্ষুদ্র উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বা নিজ মধ্যে আত্মসাৎ করে নিয়ে সর্বাধিপত্য বিস্তার করে চলে, এই শিক্ষাব্যবস্থাও তেমনি বহু বিচিত্র ক্ষুদ্র পরিসরে বহু বিচিত্র জ্ঞানের উন্মেষ ও চর্চার বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সর্বজনীন বলে ঘোষিত জ্ঞানের এক একশিলা মূর্তিকেই সর্বমান্য বলে স্থাপন করতে চায়।

 

এই অন্তর্বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই এই শিক্ষাব্যবস্থার কলটি যা উৎপাদন করে তা কেবল পণ্যের চেহারা ধরেই সমাজে জাহির হয়। বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈতনিক নাকি অবৈতনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ রাষ্ট্র বহন করছে না কি করছে না, সেসবকিছুর উপর তা নির্ভর করে না। শিক্ষাব্যবস্থার কলের মূল উৎপাদ দুটো : ১) জ্ঞান, এবং ২) জ্ঞানধারী শিক্ষিতজন। কীভাবে এই দুটো উৎপাদ আপন তাড়সে পণ্য হয়ে ওঠে দেখা যাক।

 

জীবনযাপন একটি ক্রিয়া। সেই ক্রিয়ার বাধ্যতায় মানুষ যখন অপরসকল বস্তু ও প্রাণের সংযোগে আসে, তখন স্বাভাবিক কৌতূহলে রূপক-লক্ষণা-কল্পনার তুলিতে সেই অপরের প্রতিরূপ রচনা করে, তার সঙ্গে নিজ যাপনক্রিয়ার সম্বন্ধকে সূত্রায়িত করে, এভাবে সে চায় তাকে নিজ ধারণায় ধরতে। এই ধারণা যখন মনুষ্যগোষ্ঠীর মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বলে ভ্রম হয়, তখন তা জ্ঞান-পদবাচ্য হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মনুষ্যগোষ্ঠীর, এমনকি বিভিন্ন ব্যক্তিমানুষেরও, যাপনের বস্তুগত পরিবেশ ও পরম্পরাগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার যেহেতু বিভিন্ন ও বিচিত্র, তাই এই মনুষ্যসৃষ্ট জ্ঞানও বিবিধ বৈচিত্র্যময়, জ্ঞানের কোনো একটি রূপকে খাঁটি সত্যের ধারক হিসেবে সর্বজনীন বলে দাবি করা যায় না। আর জ্ঞানোৎপাদন যেহেতু প্রতিটি মানুষের যাপনক্রিয়ার সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তাই জ্ঞানোৎপাদনের জন্য একমেবাদ্বিতীয়ম কোনো নিয়মবাঁধা প্রক্রিয়া বেঁধে দেওয়া যায় না। অথচ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এমনই এক নিয়মবাঁধা প্রক্রিয়া বেঁধে দিয়ে শুরু হচ্ছে। এই নিয়মবাঁধা প্রক্রিয়া বাঁধার ফল কী হয় দেখা যাক। জ্ঞানোৎপাদনের প্রক্রিয়াকে নিয়মে বাঁধতে গেলে কোনো একটি বিশেষ বস্তু-পরিবেশ ও সংস্কৃতি জাত রূপক-লক্ষণা-কল্পনাকে সত্যে পৌঁছানোর রাজপথ বলে দাবি করে সেই জ্ঞানরূপটিকেই বারংবার পুনরুৎপাদিত করে যাওয়ার নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা করতে হয়। ফলত জ্ঞানোৎপাদনের প্রক্রিয়া অপরের সঙ্গে চকিত অনিয়ন্ত্রিত সংযোগে বিস্ময়-কৌতূহল দ্বারা প্রাণিত হওয়ার জীবনশক্তি হারিয়ে দেওয়াল-ঘেরা কুঠিতে সর্দার-নির্মাতার নির্দেশ মেনে তৈরি নকশা অনুযায়ী খুঁতহীন নকলনবিশির প্রাণহীন চর্চায় রূপান্তরিত হয়। যে চর্চা প্রাণহীন, তা তো প্রাণের টানে বেঁধে রাখে না, তাই সেখানে বেঁধে রাখার জন্য শক্তপোক্ত সব দড়াদড়ির প্রয়োজন হয়। তেমনই এক দড়াদড়ি হল এই নির্দিষ্ট প্রথায় নির্মিত জ্ঞানের উপর বিশেষ মূল্য আরোপ। এই মূল্য আরোপের মধ্য দিয়ে অন্য সমস্ত জ্ঞানরূপকে অবমূল্যায়িত করে এই বিশেষ জ্ঞানরূপটিকেই অতি মূল্যবান বা একমাত্র মূল্যবান বলে হাজির করা হয়। কিন্তু কীভাবে তা করা হয়? করা হয় এই জ্ঞানরূপের ব্যবহার মূল্য হিসেবে সমাজে প্রতিপত্তিশালী ও ধনশালী করে তোলার ক্ষমতাকে নির্মাণ করে। অর্থাৎ, এই বিশেষ কুঠি মধ্যে বন্দী হয়ে বিশেষ সর্দার-নির্মাতার নির্দেশ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট রূপক-লক্ষণা-কল্পনাকেই একমাত্র ভাষা করে ছক-কাটা নকশা অনুযায়ী জ্ঞানরূপ উৎপাদন করে চললে সমাজ সম্মানের আসন পেতে দেবে, কুবের তার ধনভাণ্ডারের চাবি হাতে তুলে দেবে। এর বিনিময়ে হয়ত খোলা পরিবেশের সদাচকিত বিস্ময়-কৌতূহলের প্রাণময়তা ভুলে সংকীর্ণ পরিসরে বাঁধা পঞ্জীকরণ-প্রতিলিপিকরণ-পুনরুক্তিকরণের মধ্যেই যাপনক্রিয়াকে শীর্ণ-সংকুচিত করে ফেলতে হবে! কিন্তু কী বা উপায়— বিনিময় মূল্য বিনা ব্যবহার মূল্য মেলে কেমনে? আর এই বিনিময় মূল্য দিয়েছে যে জন সে জন জ্ঞানধারী শিক্ষিত হয়ে উঠে অধিত জ্ঞানের ব্যবহার মূল্যটিও শেষ বিন্দু অবধি নিঙড়ে নেবে না কেন? তার জীবনে যাপনে তো উন্মুক্ত পরিবেশে বিস্ময়-কৌতূহল চকিত প্রাণের আনন্দ নেই, বদ্ধ পরিসরের মধ্যে তার অসাড় প্রাণ কেবল নগদ হিসেবে কিনে-কেটে-বেচে প্রাণহীন জড়ের উপর আরো জড় সাজিয়ে সম্পদ পুঞ্জীভবনের কড়া নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে চায়। নিজ অধিত জ্ঞানকে নিলামে তুলে সে নিজেও নিলামে তোলা উপকরণ হয়ে ওঠে।

 

সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে:

 

  • কোনো একটি জ্ঞানরূপ অন্য সমস্ত জ্ঞানরূপকে নস্যাৎ করে নিজেকে সর্বজনীন বা একমেবাদ্বিতীয়ম বা শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করার জন্য নিজের উপর যে মূল্য আরোপ করে, তার মধ্য দিয়েই তা পণ্যচরিত্র অর্জন করে, এবং

 

  • সেই জ্ঞানরূপের ধারক শিক্ষিতজন বিস্ময়-কৌতূহল বিরহিত তার শুষ্ক যাপনের তাড়সে নিজ জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও নিলামে তোলে।

 

২.

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব একটি দাবির উপর ভর করে থাকে। সেই দাবি হল এই যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উৎকৃষ্টতম জ্ঞানটি তার অন্তর্গত শিক্ষকরা ধারণ করছে এবং আগত শিক্ষার্থীদের তারাই তা প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্কটি এখানে দাতা ও গ্রহীতার। শিক্ষকরা তাঁদের করায়ত্ত জ্ঞান দান করবেন এবং শিক্ষার্থীরা সেই জ্ঞান গ্রহণ করতে করতে ক্রমশ জ্ঞানে পূর্ণ বা জ্ঞানী হয়ে উঠবে। যথাযথভাবে এই জ্ঞান গ্রহণ বা শোষণ করে নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের নির্দেশনার কাছে নিজেদের সমর্পণ করতে হবে— অর্থাৎ, শিক্ষক যা বলবে তাই শিখতে হবে, যেভাবে বলবে সেভাবে শিখতে হবে, শেখা হল কী হল না সে বিষয়েও শিক্ষকের রায়ই শিরোধার্য করে চলতে হবে। এই শিক্ষকের একনায়কতন্ত্র ভুক্ত শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞান কীরূপ বস্তু হিসেবে প্রতিভাত হয় তা আরেকটু খুলেমেলে দেখা যাক।

 

শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞান হল ইতিমধ্যেই সর্বাঙ্গসম্পূর্ণতা প্রাপ্ত একটি বস্তু যা তাকে তার নিজ আয়ত্তে নিতে হবে। তার স্বীয় স্বজ্ঞা বা অন্তর্প্রবণতা যদি এই জ্ঞানের বিপরীতে দাঁড়ায়, তবে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সেই স্বজ্ঞা বা অন্তর্প্রবণতাকে দমন করে উপস্থাপিত জ্ঞানকেই আয়ত্ত করতে হবে। ফলে জ্ঞান আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে স্বজ্ঞা বা অন্তর্প্রবণতাকে নিষ্ক্রিয় রেখে যন্ত্রবৎ অনুকরণ ও পুনরাবৃত্তিকরণের মধ্য দিয়ে যত নির্বিঘ্নে উপস্থাপিত জ্ঞানটিকে আয়ত্তাধীন করা যায়, ততই শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ্যতা বাড়ে। শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের এই অবিরাম তাড়না ক্রমশ স্বজ্ঞা ও অন্তর্প্রবণতাকে গোলমেলে ও সন্দেহজনক বস্তু হিসেবে দেখতে শেখায়, শেষাবধি স্বজ্ঞা ও অন্তর্প্রবণতাকে ভোঁতা করে তুলে অনুকরণ-অনুসরণ ছাড়া আর সব কিছুতেই তাকে অক্ষম করে তোলে।

 

জ্ঞান যখন সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ, তখন জ্ঞানীর কাছে সবকিছুই বোধ্য ও সুস্পষ্ট। হতবাক বিস্ময় ও বিস্ময়াবিষ্ট অনুসন্ধান সেখানে কুলীন নয়। ফলত কুলীন জ্ঞানের অভিপ্রায় হল এমন গোছাখানেক নিয়মসূত্র নির্ধারণ করা যা সর্ব বস্তুর উৎপত্তি-বিকাশ-বিনাশ সবকিছুকেই আবশ্যিক অনিবার্যতায় বেঁধে রেখেছে। একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে পুনরাবৃত্ত চর্চার মধ্য দিয়ে সেই নিয়মাবলীর খোলা জানালাটুকু দিয়ে দৃশ্যমান জগৎটুকুকেই গোটা জগৎ বলে ধরে নেওয়ার প্রত্যয় তৈরি হয়। জ্ঞানধারীর চেতনায় বাস্তব জগৎ প্রতিস্থাপিত হয় এমন এক নিয়মে বাঁধা জগৎ দিয়ে যা ওই জ্ঞানেরই স্বকপোলকল্পিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই জ্ঞানেরই চর্চা হয়, কারণ, এই জ্ঞানের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার জন্য অতি উপযোগী। জগৎকে নির্দেশ দিয়ে চালিয়ে নিয়ে চলেছে যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানের একমাত্র বৈধ ভাণ্ডারী ও বিতরণকারী শিক্ষকের নির্দেশের অনুশাসনে আত্মসমর্পণ করা শিক্ষার্থীর কাছে কোনো দুর্যোগ নয়, বরং সুবর্ণ সুযোগ হিসেবেই প্রতিভাত হয়। তাছাড়া, শিক্ষার্থীর সামনে এক অনিশ্চয়তা-মুক্ত সাফল্যমুখী শান-বাঁধানো পথ খুলে যায়— জ্ঞান কী, কীভাবে তা আয়ত্ত করতে হবে এবং জ্ঞানীর শিরোপা জিতে নিতে হবে, তা সবই যদি শিক্ষকদের জানা হয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই পালিত হয়, তাহলে দরেকষে তা অনুসরণ করতে পারলেই তো হল। অন্যদিকে, ছক-কাটা নিয়মে জগতের স্বতঃস্ফূর্তিকে ধরা যায় না ভেবে নিয়ে কোনো অভাগা যদি জগতের সঙ্গে সংযোগের অনিঃশেষযোগ্য পথে প্রান্তরে সদা বিস্ময় নিয়ে ঘুরে ফেরে, কোনো নিশ্চয়তাই তো সেখানে নেই, আর সদা অসম্পূর্ণ তার অভিজ্ঞতাকে কী মাপেই বা মেপে জ্ঞান-পুঞ্জীভবনের সিঁড়িভাঙা স্তর বিন্যস্ত করা যায়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাই প্রাতিষ্ঠানিকতা নির্মাণের উপযোগী জ্ঞান-ধারণাকেই একমাত্র অবলম্বন করতে পারে।

 

৩.

জনপরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-অধ্যুষিত শিক্ষাব্যবস্থা কী প্রভাব বিস্তার করে সেই দিকটায় এবার দেখা যাক। আধিপত্যকারী অতিকথা হল এই যে তা জনপরিসরে শিক্ষার প্রসার ঘটায়। অর্থাৎ, যত বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যত বেশি শিক্ষিত করে তোলার কেন্দ্রীভূত উদ্যোগ, তত বেশি বেশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠবে। আর মানুষ যত শিক্ষিত হয়ে উঠবে, ততই সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো বেশি ভূমিকা নিতে পারবে, তার ব্যক্তিগত জীবনের মানও ততই উন্নত হবে। প্রায় সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়ে পর্যবসিত এই ধারণাগুলোকে বিচার করা যাক।

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উত্তরণে প্রমিতিকৃত জ্ঞান শেষণ ও পুনরুৎপাদনের পরীক্ষায় একদল শিক্ষার্থী যেমন পাশ করে, আরেক দল তেমনই ফেল করে। ফেল করা শিক্ষার্থীরা ঝরে ঝরে পড়তে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে। পাশ করে উপরে ওঠাদের মধ্যে যেমন জ্ঞানের মালিক হওয়ার গর্ব পুঞ্জীভূত হতে থাকে, তেমনই ঝরে পড়াদের মন গ্লানিতে ভরে ওঠে। সেই গ্লানি হল অযোগ্যতার গ্লানি। ঝরে পড়া জন নিজেই নিজেকে অযোগ্য বলে মেনে নেয় : জ্ঞান সৃষ্টিতে অযোগ্য, জ্ঞান ধারণে অযোগ্য, সুতরাং সমাজে যোগ্যদের সঙ্গে একই সম্মান ও অধিকার পাওয়ার অযোগ্য। এভাবে সমাজে সম্মান ও অধিকারের এক সিঁড়িভাঙা উপর-নীচ বিন্যাস স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। সেই সিঁড়িভাঙা বিন্যাসে যারা বিদ্যালয়ে ঢোকেই নি, তারা সবার তলায়, তার উপরে কোন অংশ কত শ্রেণি অবধি বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছক-কাটা পথে পাড়ি দিয়ে কী পরিমাণ শংসাপত্র অর্জন করতে পেরেছে সেই অনুযায়ী ধাপ তৈরি হয়। ফলে এই ব্যবস্থা শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথা বলে আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে বিভিন্ন মাত্রায় শিক্ষা গ্রহণ-ধারণ-সংবহনে অযোগ্যতা-অপারগতার বোধকে এমনভাবে সেঁধিয়ে দেয় যে সে নিজেই নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করতে থাকে এবং গোটা ব্যাপারটাকেই একটা অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক ব্যাপার হিসেবে দেখতে থাকে।

 

বাতিলজনেদের এই আত্ম-অবমূল্যায়ন হল শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রত্যক্ষ ফল। এই আত্ম-অবমূল্যায়নের ফলে বাতিলজনেরা ক্রমশ নিজেরাই নিজেদের শৃঙ্খলিত করতে থাকে। স্বকীয় স্বজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার বলে নিজস্ব রূপক-লক্ষণা-কল্পনার ভাষায় জগৎ ও জীবন সম্পর্কে জ্ঞান সৃষ্টি ও সংবহন আর তাদের কাজ নয় বলে পরিত্যাগ করে প্রাতিষ্ঠানিক শংসাপ্রাপ্ত জ্ঞানকেই অনুসরণ ও অনুকরণ করার হীনতায় নিজেদের বেঁধে রাখে। লালন-কবিরের মতো ‘অশিক্ষিত’-জনেদের মনন ও মেধার প্রবাহে যে ভূমিতে একদিন লোকসমাজে জ্ঞান ও শিক্ষা পরিব্যপ্ত হয়েছিল, সেই ভূমিতে আজ এই শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার বজ্র আঁটুনিতে ‘অশিক্ষিত’-জনেরা সবাই কুসংস্কার অন্ধ-সংস্কারের পালক-বাহক হিসেবে জ্ঞানচর্চায় অধিকারহীন। এভাবে সমাজমনন ক্রমশ সংকীর্ণতর কূপমন্ডুকতায় শীর্ণ হচ্ছে। সমাজজুড়ে বিবিধ বৈচিত্র্যময় রূপে অনেকান্তর জ্ঞান সৃষ্টি ও পারস্পরিক আদান-প্রদান দ্বন্দ্ব-বিচার মেলবন্ধনের জৈবিকতাটি শুকিয়ে গিয়ে গাছ থেকে কেটে নেওয়া শুকনো একখন্ড ডালের মতো প্রাতিষ্ঠানিক শংসাপ্রাপ্ত জ্ঞানের প্রস্তরীভূত হতে থাকা ধারাটি কেবল পড়ে থাকে।

 

জীবন শুকিয়ে গিয়ে মৃত্যুর ছাপ ফুটে উঠলে যেমন শকুনদের যাতায়াত বাড়ে, জৈবিকতা শুকিয়ে যাওয়া প্রস্তরীভূত হতে থাকা জ্ঞান-পরিসরে তেমনই ‘বিশেষজ্ঞ’-দের দাপট শুরু হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠদের জ্ঞান সৃষ্টি-ধারণ-সংবহনে অধিকারহীন করে তুলে মুষ্টিমেয় যে কজন প্রতিষ্ঠানের শংসাপ্রাপ্তধারীদের সেই অধিকারকে বিশেষ যোগ্যতার ভূষণে ভূষিত করা হয়, তারাই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘বিশেষজ্ঞ’ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ‘বিশেষজ্ঞ’-রাই সবকিছুর পরিকল্পনা করবে, নির্দেশ দান করবে, উচিত-অনুচিত নির্ধারণ করবে, বাকি সবাইকে তা নির্বিরোধে মেনে চলতে হবে। একটা পেরেক বানানো থেকে শুরু করে মহাকাশযান বানানো, ধান ফলানো থেকে শুরু করে জঙ্গলরক্ষা, নদীর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্ক, শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যুর ঘোষণা, পায়ের ব্যথার প্রতিষেধক থেকে মনের ব্যথার প্রতিষেধক— সর্বত্র নির্ধারিত বিশেষজ্ঞরা আছেন তাঁদের ‘বিজ্ঞান’ অভিধায় বিভূষিত তন্ত্র ও শাস্ত্র নিয়ে, তাঁদের নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপত্র মেনেই যে কোনো কিছু করতে হবে। এই বিশেষজ্ঞদের একনায়কতন্ত্র সমাজ জুড়ে নিদারুণ বৈকল্যের প্রভাব ক্রমশ আরো গভীর করে চলেছে। বিভিন্ন জনসমাজ তার জীবনাভ্যাস ও জীবনাচরণের পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিবিধ বিভিন্ন কাজ করার ও একই কাজ বিবিধ বিভিন্ন রকমে করার যে স্বাভাবিক পারঙ্গমতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বহন ও বিকশিত করে আসছিল, আজ সেসবই ‘সেকেলে’, ‘পেছিয়ে পড়া’, ‘অবৈজ্ঞানিক’ ইত্যাদি কলঙ্কে চিহ্নিত হয়ে বর্জনীয় হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিষ্ঠানের শংসাপ্রাপ্ত ‘বিশেষজ্ঞ’-দের দ্বারা নির্ধারিত কাজ ও কাজের ধরনটিই যে একমাত্র ‘আধুনিক’, ‘অগ্রসরমান’ ও ‘বৈজ্ঞানিক’। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের শংসাপ্রাপ্ত ধারাটি ব্যতিরেকে বহু বহু বছর ধরে বিভিন্ন জনসমাজের গোষ্ঠীজীবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্য সমস্ত ধারাগুলো ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়, কারণ সেইসব জনগোষ্ঠীর মানুষরা ক্রমশ ‘আধুনিক’ হয়ে ওঠার তাগিদে ও তাড়সে পরম্পরা ত্যাগ করতে থাকে। এভাবে যখন একেকটি পরম্পরা শুকিয়ে যায়, তখন জীবনযাপনের বিবিধ বিকল্প রূপগুলিও চিরতরে মুছে যায়। তা যে কী বৈকল্য ডেকে আনে তা আমরা বুঝতে পারি যখন ‘বিশেষজ্ঞ’ মহল নির্দেশিত ‘আধুনিক’ জীবন বস্তু-উৎপাদনকে অপরিমিতভাবে বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া, ভোগের সীমাকে অসীমে বাঁধা ও প্রকৃতিকে চাবুক হাতে শাসন করার পথ ধরে নির্বিচার ধ্বংসলীলায় মেতে শেষাবধি নিজেকেও ধ্বংসের মুখে দাঁড় করায়, অথচ বিকল্প কোনো জীবনরূপ আর আমাদের নাগালের মধ্যে থাকে না।

 

সুতরাং যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-অধ্যুষিত শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান ও শিক্ষাকে সমাজ জুড়ে প্রসার ঘটানোর কথা বলে নিজ যাথার্থ্য উৎপন্ন করে, তা আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছ থেকে জ্ঞান সৃষ্টি-ধারণ-সংবহনের অধিকার কেড়ে নিয়ে, জ্ঞান-পরিসরের অনেকান্ত জৈবিকতাকে ধ্বংস করে ও ‘বিশেষজ্ঞ’-দের একাধিপত্য স্থাপন করে সমাজ জুড়ে জ্ঞানের বিবিধ বিভিন্ন ধারাগুলোকে শুকিয়ে মারে; স্বর্গোদ্যানের প্রলোভন দেখিয়ে প্রাণহীন মরুভূমির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে।

 

৪.

আলোচনার শুরুতেই আমরা বলেছিলাম যে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার কোনো পূর্বনির্দিষ্ট রূপ আমরা প্রস্তাব করতে চাই না। তার কারণ এই যে ‘বিশেষজ্ঞ’-দের শকুন বলে নিজেরা আবার সেই শকুন সাজতে চাই না। তাছাড়া, শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প রূপ নির্মাণ কোনো ‘বিশেষজ্ঞ’ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ নয়, নিজ পরম্পরা-অভিজ্ঞতা-কল্পনার বলে বলীয়ান প্রতিটি জনসমাজের স্বতক্রিয়ার কাজ, সে বল হারিয়ে গিয়ে থাকলে আবার তা পুনরুদ্ধারের কাজ। সেই স্বতক্রিয়া ও হৃত বল পুনরুদ্ধারের পরিসর উন্মুক্ত করতে হলে কেন্দ্রীভূত ধাপে-বাঁধা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য ধ্বংস করতে হবে, সেজন্য হয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাল রূপটিকেই বাতিল করতে হবে। বর্তমান শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান-পরিসরের জৈবিকতা যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, জীবন ও যাপনের বিকল্প রূপ সন্ধানের পারঙ্গমতা যেভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হচ্ছে, সেই বিষয়ে সমানুভবে পৌঁছে বিকল্পমুখী চর্চায় স্বনির্ধারিত ভাবে ব্রতী হওয়ার সূচনাটুকুই হয়ত আমরা আপাতত করতে পারি।

 

লেখক একজন সামাজিক কর্মী। 

 

 

পড়ুন: প্রচলিত মার্কসবাদের মতবাদিক গড়ন ও তা বর্জন করার প্রয়োজনীয়তা

 

 

Share this
Leave a Comment