এক ‘দেশদ্রোহী’ ভারতীয়র ক্রিকেটীয় আখ্যান


  • November 19, 2023
  • (0 Comments)
  • 550 Views

শামিকে রোজ পরীক্ষা দিতে হবে। বিশ্বকাপ ফাইনালে আবার! সোনার কাপ হাতে উঠলেও তার পরের টুর্নামেন্টে। নামের বোঝা বিশাল দায়। এই দায়ে দোষী এক বিশেষ ধর্মের মানুষ, চেষ্টা করলেও মেজরিটির মেজরের বাইরে তারা চিরকাল। মোদি যুগে এবার জুতসই শব্দ আছে – দেশদ্রোহী। আসলে শুনতে শুনতে এক সময় সয়ে যায় মশাই। যত ইচ্ছে বলুন! লিখলেন মৌমিতা আলম।

 

 

জুন মাস। ১৯৯৯ সাল। সাইকেল চালিয়ে কোনওরকমে জোরপাকরি পৌঁছে দিনের প্রথম ও একমাত্র বাসটি ধরে বসেছি। স্কুলে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু বাড়ির চাপ! বিশ্বকাপের ম্যাচ। ভারত বনাম পাকিস্তান। ঠিক ন’টা পাঁচে গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি ছাড়া মাত্রই শুরু হল রোজকার কথোপকথন। তখন না ছিল কারও মোবাইল, না ছিল হেডফোন। তাই রোজ এই বাস জার্নিতে মূলত ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের সবরকম কথপোকথনে বাস সরগরম থাকত। বেশিরভাগ দিন আমায় কারও না-কারও কোলে বসতে হত। একটি মাত্র বাস। তাই ভিড় হত। তবে এখনও মনে পড়ে সেদিন সিটে বসার সৌভাগ্য হয়েছিল। যেহেতু বিশ্বকাপ আর হাই ভোল্টেজ ম্যাচ তাই সেদিনের কথা শুরুই হল ক্রিকেট নিয়ে। কে জিততে পারে, কে না পারে এই আলোচনার মধ্যেই রোজকার সহযাত্রী এক মাসি বলে উঠলেন, “আজ তো পাকিস্তানের সাথে খেলা! আজহার (ভারতীয় ক্রিকেট দলের তৎকালীন অধিনায়ক) ইচ্ছে করেই হারবে।” তারপর আমার দিকে মুখ ফিরে, “কি রে পুচকি, তুই তো আজ পাকিস্তানের সাপোর্টার।”

 

কথাটা শুনেই কেমন ভেবলে তাকিয়ে থাকলাম খানিকক্ষণ। শেন ওয়ার্ন বল করলে যাতে উইকেট না পরে তাই কুসংস্কার বশত দরজায় একভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আমি, বিগ বাবল খেয়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্লেয়ারদের ছবি জমানো বন্ধুর কাছ থেকে একটা ছবি পাওয়ার জন্য লোভী আমি, নিজের বাড়িতে টিভি ছিল না বলে পাশের বাড়ির কাঠের দেওয়ালের ফুটো দিয়ে ভারতের একটা জয় দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা মশার কামড় খাওয়া আমি, ভারত হারলে না খেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ঘুমানো আমিকে যেন সপাট চড় কষে বাস্তবের মাটিতে ফেলে দিয়েছিল সেই একটি মন্তব্য। বাকিটা পথ কোনওরকমে কান্না চেপে স্কুলে পৌঁছাই। রাজনীতি, ধর্ম কিছুই ততটা না বোঝা আমি সেদিন এটুকু বুঝেছিলাম আজহার আর আমি এক। আজহার পাকিস্তানকে জেতাবে আর আমি পাকিস্তানের সমর্থক! কেন! তবে কি ভারতের সমর্থক হওয়ার অধিকার আমার নেই?

 

রোজ ম্যাচের আগে অনেক দুয়া চাইতাম খোদার কাছে। আর দাতাবাবার দরগায় মানত করতাম। সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে, গাড়িতে, তারপর ভ্যানে আর তারপর সাইকেল চালিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে যখন ফিরছিলাম বারবার দুয়া চাইছিলাম। দুয়া রোজ চাইতে হতো অনেকগুলো—এক, যাতে লোডশেডিং না হয়। এমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি যে একবার লোডশেডিং হলে তখন দু’দিন এও কখনও কখনও আর আসত না। দুই, দুয়া করতাম যাতে যার বাড়িতে টিভি তারা যেন টিভি টা দেখতে দেন, তিন নম্বর দুয়া ছিল যাতে ভারত যেতে। কিন্তু সেদিন জুন মাসের সেই দিনে আরও কিছু দুয়া যোগ হল—যেন ভারত জিতে আর আজহার যেন অবশ্যই রান পায়। আর স্পেশাল মানত করেছিলাম যে ভারত জিতলে দরগায় মোমবাতি জ্বালাব আর তার সাথে পয়সাও দেব। অবসন্ন পা দুটো, আর সাইকেলের হ্যান্ডেলের হাত দুটো শক্ত হয়ে আসছিল সকালের সেই মাসির মন্তব্য মনে পড়ে। বারবার আল্লাহর নাম একশো এক বার গুনছিলাম। ভুল হচ্ছিল আবার গুনছিলাম। যেন এই লড়াই আমার আর আজহার বনাম সেই মাসির। যেন প্রমান করতেই হবে ভারত আমার টিম। আমি অন্য টিমের নই। নিজের লোয়ালিটির প্রশ্ন। জীবন মরণের প্রশ্ন। তখন অবশ্য দেশদ্রোহী শব্দটি মাথায় আসেনি। দেশদ্রোহী শব্দটি তখন এত খোলামকুচির মতন সস্তাও ছিল না।

 

সেই ম্যাচে ভারত প্রথমে ব্যাট করে। আজহার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেন। পাকিস্তান হেরে যায়। ঈশ্বর সেদিন দুটো দুয়া রেখেছিলেন। বাকিগুলো রাখেননি। ভারতের ইনিংসের পরেই লোডশেডিং হয়। আর বিদ্যুৎ আসেনি। ম্যাচের স্কোর না জানতে পেরে সারারাত উসখুস করেছিলাম। সকাল হতেই ছুটে যাই পাড়ার শেষে এক বাড়িতে। সে রেডিওতে শুনত। ভারত জিতেছে আর আজহার রান পেয়েছে শুনে চোখে জল চলে এসেছিল। কিন্তু সেদিনের সেই বাসযাত্রা পাল্টে দেয় সবকিছু। আস্তে আস্তে আমার সেই ক্রিকেট পাগল আমি যেন শিখছিলাম একটু একটু করে যে ক্রিকেট ঈশ্বর এই বহুধাবিভক্ত ভারতে সংখ্যগুরুর ঈশ্বর শুধু। আমার মতো ভক্তের সেখানে ভক্তির প্রমাণ দিতে দিতে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তারপর ৯/১১, খুব প্রিয় শিক্ষককে দাড়ি ছিল বলে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রদের ওসামা বিন লাদেন বলে ঠাট্টা তামাশা করা, মুসলিমরাই সন্ত্রাসী শোনা আমি বেঁচে নিলাম এক নিরাপদ টিমকে। যে দলকে সমর্থন করলে দেশদ্রোহী তকমা জুটবে না আর রোজ রোজ ভক্তিও প্রমাণ করতে হবে না। হয়ে গেলাম অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিমের ভক্ত। হ্যাঁ, ২০০৩ বিশ্বকাপে জোহানেসবার্গে পন্টিং যখন সেঞ্চুরি হাঁকছিলেন আর ড্যামিয়েন মার্টিন যখন একনিষ্ঠ নাবিকের নিষ্ঠায়, সমুদ্র সিগালের মতন শান্ত, শীতল নার্ভে পাড়ি দিচ্ছিলেন বিজয় ট্রফিতে শেষ চুম্বন দিবেন বলে, আমি তখন অস্ট্রেলিয়ার সমর্থক। ২০১১ বিশ্বকাপেও আমি ছিলাম শ্রীলঙ্কার সমর্থক। ভারত জিতবে বুঝে টিভি বন্ধ করে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। তারপর আইপিএল এসেছে। সবার হাতে বড় বড় মোবাইল। বল প্রতি জুয়া। এখন বেকহ্যাম আর ঈশ্বরের মাঝে দিব্যি বসে যেতে পারেন , বাসের সেই মাসিদের মতো লোকেরা। খেলা শুরু হলেই বাজারের অন্ধকার গলিতে শুরু হয় টাকার হাত বদল। বুঝেছি খেলার ঈশ্বর এখন পুঁজি।

 

কি ভাবছেন পাঠক? আমি দেশদ্রোহী তাইতো? এখন তো জুতসই শব্দ আছে আমার মতন লোকেদের জন্য। তাই পুরোনো অভ্যেস মতো যখন ভারত নিউজিল্যান্ড ম্যাচে দেখছিলাম, শামির হাত থেকে ক্যাচ ছুটতেই বুকটা কেঁপে ওঠে। ক্যাচ ছুটতে না ছুটতেই ফেসবুক এ শিক্ষকদের একটি গ্রুপে পোস্ট – এত ক্যাচ ছাড়লে জিতবে কি করে! একটু সেফ সাইড খেলছিলেন। ম্যাচ হারলে শুরু হতো নাম ধরে খোলামকুচি – দেশদ্রোহী আর প্রতিবেশী দেশে যাওয়ার সুপরামর্শ(?)

 

শামির এই গৌরবগাথা নিয়ে উল্লাসিত লোকজন কি শামিকে বাঁচাবেন গেস্টপো বাহিনী থেকে? অবশ্য এখানে নাম পাল্টে অন্য কিছু হবে নিশ্চয়। যেমন হচ্ছে আলীগড় পাল্টে হরিঘর। শামি কি পাবেন একজন ভেরিয়ান ফ্রাই? ভরসা হয় না। চমস্কি থেকে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় – সবাই বলছেন ভারতে ফ্যাসিজমের উত্থানের লক্ষণ খুব স্পষ্ট।

 

শুধু প্যালেস্টাইনের সমর্থন এ হোয়াটস আপ এ স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বলে উত্তর প্রদেশে পুলিশ খুঁজছে দুই মুসলিম স্কলারকে। অথচ সেই উত্তর প্রদেশেই বজরং দল ইজরায়েলের সমর্থনে কোনোরকম সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্ভিগ্নে মিছিল করলো। শুধু যোগীর রাজ্যই নয়, কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকেও প্যালেস্টাইনের সমর্থন এ পোস্ট দেওয়ার অপরাধে আটক করা হয় আলম নওয়াজ বলে একজন সরকারি চাকুরি জীবীকে। গাজায় ইজরায়েলি গণহত্যা সম্পর্কে কোনো লেখা পোস্ট করলেই শুরু হচ্ছে ট্রোল। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী কাশ্মীরের জামা মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে দেওয়া হচ্ছে না। মকতুব মিডিয়ার খবর অনুযায়ী দিল্লিতে মসজিদের ইমামদের নিষেধ করা হচ্ছে যেন প্যালেস্টাইনের সমর্থনে মসজিদে দুয়া করা না হয়!

 

তাই আর ভরসা হয়না। শামিকে রোজ পরীক্ষা দিতে হবে। বিশ্বকাপ ফাইনালে আবার! সোনার কাপ হাতে উঠলেও তার পরের টুর্নামেন্টে। নামের বোঝা বিশাল দায়। এই দায়ে দোষী এক বিশেষ ধর্মের মানুষ, চেষ্টা করলেও মেজরিটির মেজরের বাইরে তারা চিরকাল। মোদি যুগে এবার জুতসই শব্দ আছে – দেশদ্রোহী। আসলে শুনতে শুনতে এক সময় সয়ে যায় মশাই। যত ইচ্ছে বলুন!

 

(জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা মৌমিতা আলম এক জন কবি ও শিক্ষিকা। মতামত নিজস্ব)

 

Share this
Leave a Comment