এখনও সেতু উঁচিয়ে ছুটছে তিস্তা, কালিম্পঙের লোয়ার ড্যামও বিপর্যস্ত


  • November 5, 2023
  • (0 Comments)
  • 491 Views

দেখতে দেখতে তিস্তা মহাবিপর্যয়ের এক মাস পার হল। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে এই প্রচণ্ড ধ্বংসলীলার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির হিসেব করে উঠতে পারেনি দুই রাজ্যের সরকার। এখনও ভিড় ত্রাণশিবিরে, পথঘাট থেকে, ঘরবাড়ি, ভগ্ন, বিপর্যস্ত বাঁধ থেকে মাটি-বালি-পাথরের স্তুপ সরানোর কাজ চলছে। প্রায় এক মাসের মাথায় বেড়ানোর উদ্দেশ্যে কালিম্পং গিয়েছিলেন সন্দীপ দাস। তাঁর কলমে হ্রদভাঙা বন্যায় অন্যতম বিপর্যস্ত এ রাজ্যের কালিম্পং জেলায় তিস্তার ত্রাসদর্শন।

 

গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ক’দিনের ছুটিতে কালিম্পং জেলার চারখোল বেড়াতে এসে হঠাৎই ইচ্ছে হল একবার দার্জিলিঙের লামাহাটার দিকটা ঘুরে এলে কেমন হয়!

 

অতএব, পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অতিথিআবাসেই সকালের জলখাবারে গরম কফি-সহ বেশ কয়েকটা নুন-মরিচ ছড়ানো মচমচে বাটারটোস্ট আর জোড়া ডিমসিদ্ধ পেটে চালান করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গাড়ি অবশ্য আগের রাত্রেই বলা ছিল। যাই হোক…

 

সুবিধের কারণে গাড়িচালক সাতাশমাইল হয়ে যাবার পথটাকেই যাত্রাপথ হিসেবে বেছে নিলেন। হু হু করে দিব্যি ছুটে চলেছে গাড়ি, সবুজে ঘেরা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে, পাশে গভীরখাত রেখে কখনও চড়াই আবার কখনও উৎরাই।  সুউচ্চ বৃক্ষরাজির পাশাপাশি মাঝেমাঝেই দূরে কাছে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা শীর্ণ ঝর্নাধারা আর স্থানীয় কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমে ফলানো বিভিন্ন শস্যফসলের ‘ধাপচাষ’…গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে থেকে থেকেই চলছে কাঞ্চনজঙ্ঘার লুকোচুরি…বেশ ফুরফুরে মন…অকস্মাৎ…

 

সামনেই তিস্তা…কিন্তু এ কী…!

 

প্রায় ইঞ্চি ছয়েক উঁচু হয়ে লোহার ব্রিজের উপর দিয়েই বয়ে যাচ্ছে নদীর জলস্রোত। তার উপর দিয়েই চলেছে গাড়ির চাকা। নিচের নদীখাতটা কাঠবালিপাথরে প্রায় ভরাট। নদীর দু’পাশে ১৫-২০ ফুট বালির স্তর উঁচু হয়ে জেগে। ধংস হয়েছে দু’পাড়ের প্রায় সমউচ্চতার বনভূমিও।

এক মাসের মাথায়ও সেতুর উপর দিয়ে বইছে তিস্তা। চিত্র : সন্দীপ দাস

মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠল মাত্রই তিন সপ্তাহ আগে সংবাদমাধ্যমে দেখা প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপের কথা। উত্তর সিকিমের হিমবাহ হ্রদ লোনক-ভাঙা বন্যার কথা। একের পর এক নির্মম ধংসলীলার চিত্র। নিমেষেই হৃদয় বিহ্বল।

 

একটু এগিয়ে ‘তিস্তা লোয়ার ড্যামে’ পৌঁছে দেখি তখনও ব্যারেজের উপরের রাস্তায় এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেদিনের তুমুল জলস্রোতে ভেসে আসা বড় বড় কাঠের গুঁড়ি বাঁশ-পাথর-নুড়ি। ড্যামের জলে স্তুপ হয়ে কয়েকটি দ্বীপের মতো জেগে আছে সেদিনের প্রবল দুর্যোগে জড়ো হওয়া বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়িগুলো বালিপাথরকে সঙ্গী করে। ব্যারেজের লকগেটগুলোও রুদ্ধ হয়ে আছে নুড়িকাঠপাথরের পাশাপাশি নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও আসবাবের ভাঙা টুকরোতে। বিভাগীয় কর্মীদের যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ক্রেন ও পে-লোডার দিয়ে দ্রুত সেগুলো পরিষ্কারের কাজ চলছে অবিরত। ছবি তোলা নিষেধ তাই সংযত হতেই হল। হঠাৎ তারই মধ্যে চোখে পড়ল— ভেসে আসা আবর্জনায় উঁকি দিচ্ছে শিশুদের পোশাক ও খেলনাপুতুলও…বিমর্ষ হলাম…আজীবন যে শিশুর পরিণতির কথা হয়ত অজানাই থেকে যাবে।

মাটি-পাথরের স্তুপের নীচ থেকে সদ্য খুঁড়ে আনা তিস্তা লোয়ার ড্যামের প্রবেশ পথ। চিত্র : সন্দীপ দাস

ব্যারেজ পেরিয়ে নিচের দিকে নামতেই আবারও এক বিস্ময়। নিচের দিককার ভবন ও দপ্তরগুলি জলের তোড়ে কিছু নিশ্চিহ্ন। কিছু তখনও আসবাব যন্ত্রপাতিসহ  বালিমাটিতে ডুবে আছে। প্রবেশপথে লাগানো গেটটি প্রায় সম্পূর্ণ চাপা পড়েছিল, মাটি কেটে তা বের করা হয়েছে। দূরে নদীখাতে ভেসে আসা বালিমাটি সরানোর কাজ চলছে জরুরি ভিত্তিতে দিনরাত। পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে এখানেও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা যথেষ্ট সক্রিয়।

 

প্রলয়ের ব্যাপ্তি ছিল ঠিক কতটা তা টের পেলাম খানিক পর তিস্তা বাজারের কাছাকাছি জাতীয় সড়কে এসে। এখানে ওখানে ধস নামার চিহ্ন দগদগে ঘা হয়ে পাহাড়ের গায়ে ফুটে আছে। এনএইচ১০-এর উপর তখনও কোথাও কোথাও ৭-১০ফুট বালি ডাঁই হয়ে আছে। সেসব পাশ কাটিয়ে ‘সিঙ্গল লেন’ দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে ধীর গতিতে ধুলো মাখতে মাখতে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। মাঝেমাঝেই তাই থমকে যাওয়া। আচমকা…

 

তিস্তা বাজারের কাছে আসতেই চক্ষু একেবারে চড়কগাছ। নদীসংলগ্ন দোকানপাট বাড়ি সব ধুয়ে মুছে সাফ। ক’দিন আগেও যে এখানে কিছু ছিল কে বলবে সে কথা!


দু’একটি জায়গায় কংক্রিটের পিলার ও বিম দেখে মালুম হয় হ্যাঁ কিছু একটা ছিল বটে। আসবাব-সহ সমস্তকিছুই গত চৌঠা অক্টোবর তারিখের হ্রদভাঙা স্রোতে বিলীন। কংক্রিটের ঢালাইছাদ পর্যন্ত ভেসে গিয়েছে বহু দূর। বহু সাধারণ মানুষের প্রাণহানির, নিখোঁজ হওয়ার দুঃসংবাদ তো আগেই জেনেছি।

 

বাজারেরই অন্যপাশে রাস্তার উপর পেটভর্তি মাটিবালি নিয়ে জীবন্তলাশ হয়ে তখনও দাঁড়িয়ে আছে তুবড়ে-মুচড়ে যাওয়া কয়েকটি ছোটগাড়ি। তাদের বনেট ও মাথার ছাদের ওপর দেড়-দু’ফুট বালির আস্তরণ নিয়ে। যেন সেদিনের ভয়াবহতার সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে। পাশেই সৌভাগ্যক্রমে এযাত্রায় টিকে যাওয়া বাড়ি ও দোকানগুলির দেওয়ালে দেওয়ালে জানালা-দরজার ওপর তখনও জ্বলজ্বল করছে তিস্তার জল মাখা কাদামাটির আলপনা দাগ।

 

তবে হ্যাঁ, এত বড় একটা বিপর্যয়ের পর যৌথভাবে যে দ্রুততায় ও দক্ষতায় সমগ্র পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে আমাদের এনএইচআইএ এবং পিডব্লিউডি কর্তৃপক্ষ সেজন্য তাদের অবশ্যই কুর্নিশ প্রাপ্য। এত বিশাল ও ভয়াবহ একটা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তো আর চাড্ডিখানি কথা নয়!

 

ফিরে আসার পরও তাই থেকে যায় ভাবালুতার রেশ। আপাতস্বস্তির পাশাপাশি অন্তরে সুপ্তবিরাজ করে একটা ত্রাস, একটা শঙ্কা। এ যাত্রায় নাহয় সামাল দেওয়া গেল, কিন্তু কী লেখা আছে আগামীর পাতায়? আচ্ছা প্রকৃতিকে বুঝতে আমাদের আরেকটু সংযত হওয়া কি খুবই বোকামি হবে?

 

প্রশ্নটা তোলা থাক…চরৈবেতি…

 

(লেখক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া বিভাগের কারিগরি বিভাগের শিক্ষাকর্মী।) 

 

Share this
Leave a Comment