বাহানাগা-বিপর্যয় ফের বেআবরু করে দিল পরিযায়ী শ্রমিক সঙ্কট 


  • June 5, 2023
  • (0 Comments)
  • 941 Views

আজও তাঁরা ‘লেবার ট্রেন’-এর যাত্রী হয়েই রইলেন। অতিমারির পর শুধু নাম বদল হয়ে  ‘পরিযায়ী এক্সপ্রেস’ হয়েছে। সরকারও পরিযায়ী সুরক্ষা মেপে চলেছে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে। আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, নির্মাণ শ্রমিক বিষয়ক আইন, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা আইনগুলির কথা আর উঠছে না। আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছে না শ্রম দপ্তর কিংবা তার অধীনে তৈরি শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ। ক্ষতিপূরণ তো মালিকরাও দেয়। চেপে ধরতে পারলে পাঁচ লক্ষ টাকার ঢের বেশি দেয়। দেয় শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বলে নয়, শ্রমিক সুরক্ষাহীনতার বেআইনি কারবার ঢাকতে, মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে শ্রমিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য। একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কেন সেই মালিকদের মতোই শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারবে? প্রশ্ন তুললেন দেবাশিস আইচ

 

 

নিরাপত্তা নেই পরিযায়ী শ্রমিকের। আসা-যাওয়ার পথে, কাজের জায়গায় যেন ওঁত পেতে থাকে দুর্ঘটনা। কখনও আকাশছোঁয়া বাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে, কখনও বা পাতাল খুঁড়তে মাটি চাপা পড়ে—দুর্ঘটনা ঘটে, ঘটেই চলে। বনবন করে ঘুরতে থাকা যন্ত্রে হাত-পা কাটা পড়া, বয়লার ফেটে পুড়ে ছাই হওয়া, সেপটিক ট্যাঙ্ক বা নিকাশিনালায় বিষবাস্পে মরে যাওয়া— যেন তাঁদের কাজের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তো তেমনই মনে করি। কী যেন বলে—অক্যুপেশনাল হ্যাজার্ড। পাথর খাদান, পাথরভাঙা কল, কোয়ার্টজ পাথর গুঁড়ো করার ‘র‍্যামিং মাস’ কারখানায় কাজে যাওয়া শ্রমিকের তো সিলিকোসিসে মৃত্যু অবধারিত। তবু খাদান চলে, পাথর গুঁড়ো হয়, এক দল দমবন্ধ হয়ে মরবার জন্য গাঁয়ে ফিরে যায়—মরে যাওয়াটাই এখানে কাজের শর্ত যেন—শূন্যস্থান ভরে যায় আর এক দলে।

 

নিরাপত্তার কথা উঠছে এখন। ওঠে, এমন প্রতিটি ঘটনা, দুর্ঘটনা, বিপর্যয়ের সময়ই ওঠে। এখন কথা উঠেছে রেলপথে নিরাপত্তার ‘ভারত কা কবচ’ নিয়ে। এ পথে না কি সেই ‘দুর্ঘটনারোধী কবচকুণ্ডল’-এর নিরাপত্তা ছিল না। থাকলে, আদা থেকে জাহাজ, সব ব্যাপারীরাই বলছেন—এমনটা ঘটত না। তো কী এই রক্ষাকবচ? কবেই বা তার উৎপত্তি? ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখা গেল, বিজেপি মন্ত্রিসভায়, বর্তমানে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, সেই ২০১১-১২ সালে রেল দপ্তর দুর্ঘটনারোধী ‘ট্রেন কলিসন অ্যাভয়ডেন্স সিস্টেম’ বা টিসিএএস চালু করার উদ্যোগ নেয়। তা কার্যকর হয়েছিল কি না এমনটা পরিষ্কার নয়। হলে কোথায় হয়েছিল সে বিষয়ে তথ্য মেলে না। বর্তমানে ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্যে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যাশনাল অটোমেটিক ট্রেন প্রোটেকশন (এটিপি)। ব্র্যান্ড নেম ‘কবচ’। রেলের বিজ্ঞাপনে ‘বিশ্বগুরু’র আবক্ষ ছবি, আর তার বাহুর উপর লটকানো পুরাণ কথার আঙ্গিকে এক কবচ (নাকি ঢাল) তার উপর গোট গোট করে লেখা রয়েছে ‘ভারত কা কবচ’। নামে- ধামে হিঁদুয়ানি না থাকলে আবার এ সরকারের গা জ্বলে। এ সবই বিজ্ঞাপনী কারিকুরি।

 

জানা গিয়েছে আরও, ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত এই সব কবচ-টবচ দিয়ে রেলপথে কোনও সুরক্ষার বন্দোবস্তই হয়নি। এর পর এখনও পর্যন্ত ৬৮,০৪৩ কিমি. ভারতীয় রেলপথের মাত্র ১,৪৪৫ কিমি এই কবচের আওতায়। অর্থাৎ, মোট রেলপথের মাত্র ২ শতাংশ। কলকাতা-চেন্নাই রুটও কবচ-রক্ষিত নয়। ভারতীয় রেলপথে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার হালটি কেমন, তা বুঝতে উৎসাহীরা একবার কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর ‘ডিরেইলমেন্টস ইন ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ’ শীর্ষক ২০২২ সালের রিপোর্টটিতে চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে পারেন। ইতিমধ্যেই যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা হল (এক) রেলের ৩৯টি জোনেই মানবসম্পদে বিপুল ঘাটতি; (২) ১৪,৭৫,৬২৩টি গ্রুপ-সি পোস্টের মধ্যে ৩,১১,৪৮৩টি পোস্ট খালি পড়ে আছে। এই গ্রুপ-সি কর্মীদের মধ্যে অন্যতম ট্র্যাকসম্যান, পয়েন্টসম্যান, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কাস, সিগনাল ও টেলিকম অ্যাসিস্ট্যান্টসদের এবং তাঁদের, সুরক্ষা কর্মীদের ১.৪৪ লক্ষ পদ খালি। মানে, ট্রেন ছুটবে যে ট্র্যাকের উপর দিয়ে; যে পয়েন্টস, যে সিগন্যাল পার করতে করতে—তার দেখাশোনা করার কর্মীরই অভাব আছে। বলা হচ্ছে, মেন লাইনে সবুজ সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও ১৭-এ পয়েন্টে লুপ লাইনে ঢুকে গিয়েছে করমণ্ডল এক্সপ্রেস। তার মানে নিজে নিজে তো ঢোকেনি ওই পয়েন্টে লুপ লাইন খোলা ছিল নিশ্চয়ই। আর তাই যদি হয়, তবে পেট ভর্তি মানুষ, মাল নিয়ে ঘণ্টায় ১২০-৩০ কিমি গতিতে ছুটে চলা একটা এক্সপ্রেস ট্রেনকে বাঁচাবে কোন অ্যান্টি কলিশন ডিভাইস? আর ক্রমে ক্রমে কর্মী কমিয়ে, ঠিকাদারদের হাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে—এমন এক ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে তোলা হল।

 

এই অপরাধতুল্য গাফিলতির ঘটনা ফের সামনে নিয়ে এল পরিযায়ী শ্রমিকদের বিপন্নতার কাহিনি। রাজ্য থেকে রাজ্যে রোজগারের আশায় ছুটে যাওয়া এবং বেঘোরে মৃত্যুর কাহিনি। সাধারণ ভাবে এ জাতীয় সংঘর্ষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন ট্রেনের সামনের দিকে থাকা কামরায় থাকা যাত্রীরা। এই ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় করমণ্ডলের ১৫টি কামরা হয় ছিটকে পড়েছে বা উল্টে গেছে কিংবা একটি আরেকটি উপর উঠে গিয়েছে। প্রথমটি ছিল এসএলআর বা সিটিং কাম লাগেজ, দ্বিতীয়টি ও তৃতীয়টি অসংরক্ষিত জিএস বা জেনারেল সিটিং। এর পর পর পর পাঁচটি স্লিপার ক্লাস এস ওয়ান থেকে ফাইভ। তার পর শুরু হয়েছে এসি কোচ বি ওয়ান, বি টু প্রভৃতি। কারা সাধারণত যাতায়ত করেন অসংরক্ষিত সাধারণ কামরায়? কাঠের চেয়ারে-বেঞ্চে হাজার কিমি পাড়ি দেন? একটি জিএস-এ থাকে ৭২টি আসন। কত মানুষ নিয়ে যাত্রা করে এই কামরা? ধারণক্ষমতার অন্তত ৩০০% বেশি যাত্রীও উঠে পড়েন এই কামরাগুলোতে। গাড়ি যখন একের পর এক স্টেশনে দাঁড়াতে থাকে স্লিপার কোচও ধারণক্ষমতার দেড়-দু’গুণ বেশি যাত্রীতে ভরে ওঠে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই সাধারণ ও প্রথম দিকের স্লিপার ক্লাসগুলো।

 

রবিবার রাত ৯টা পর্যন্ত মৃতদের তালিকায় রয়েছেন এ রাজ্যের ৮৬ জন। সংশোধিত মোট মৃতের সংখ্যা ২৭৫। আগে বলা হয়েছিল ২৮৮। আহত হাজারেরও বেশি। ওডিশার হাফ ডজন হাসপাতালে, এ রাজ্যের শালবনি ও মেদিনীপুর হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে অনেক মানুষের। তার মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন বেশ কিছু যাত্রী। এখনও অনেকে নিখোঁজ। দেহ শনাক্ত করা যায়নি শতাধিক মৃতের। এমনও বহু পরিবার রয়েছেন যাঁদের পক্ষে ওডিশার হাসপাতাল,মর্গ ঢুঁড়ে আত্মীয়দের তল্লাশি করাই সম্ভব নয়। এই মর্মে সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই পোস্ট চোখে পড়ছে।

 

হতাহত শুধু করমণ্ডলের যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তালিকায় রয়েছেন হাওড়াগামী যশবন্তপুর ট্রেনের যাত্রীরাও। এই ট্রেনটির শেষ দুই কামরা যশবন্তপুরের ছিটকে পড়া কামরার ধাক্কায় লাইনচ্যূত হয়। ট্রেনের পিছন দিকের কামরাও তো জিএস বা অসংরক্ষিত জেনারেল সিটিং। মানে সেই গরিবগুরবোর ডিব্বা। তামিলনাড়ুতে ধান রুইতে গিয়েছিলেন হুগলির পোলবার গোটু গ্রামের নয় জন মহিলা। তাঁদের তিন জন ফুলমণি টুডু, মুকুলি টুডু ও লক্ষ্মী মুর্মু যশবন্তপুর-হাওড়া হামসফর এক্সপ্রেসে বাড়ি ফিরছিলেন। আহত অবস্থায় তাঁদের বালেশ্বরের এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা চা বাগানের বছর তিরিশের যুবক সাগর খেড়িয়া ফিরছিলেন বেঙ্গালুরু থেকে। তিনি সেখানে একটি হোটেলে কাজ করতেন। বীরভূমের দুবরাজপুরের পলাশবন গ্রামের ছ’জন গিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুতে ফুলের কাজ করতে। যশবন্তপুর এক্সপ্রেসে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হন পাঁচ জন। দলের অন্যতম রীতা বাগদি (৪০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। মারা গিয়েছেন হাওড়ার জড়ি কারিগর শেখ মুন্না। তিনিও যশবন্তপুরের যাত্রী।

 

উত্তর থেকে দক্ষিণ—প্রায় সমস্ত জেলারই কেউ না কেউ আছেন হতাহতের তালিকায়। শনিবার রাত পর্যন্ত যে ৩১ জন মৃতের তালিকা দিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন তার মধ্যে ১৯ জনই ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকার মানুষ। বাসন্তীর একই পরিবারের তিন ভাই এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের আর দুই জন ধান রুইতে যাচ্ছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশে। মৃত্যু হয়েছে পাঁচ জনেরই। ধান রোয়া, রাজমিস্ত্রির কাজ, কাঠের কাজ, জরি ও সোনার কাজ, ফুলের কাজ, ফল প্যাকিংয়ের কাজ, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী, হতাহতের তালিকায় রয়েছেন এমনই আরও বহু পেশার মানুষ। খবর পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল অতিমারি ও লকডাউনের দিনগুলোর কথা। তবে আজ আর কেউ প্রশ্ন তোলে না, “এরা কারা? কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে?” সে অজ্ঞতা দূর করেছে লকডাউন। এখন ওই প্রশ্নকর্তারা জানেন, এঁরা মাইগ্রেন্ট লেবার, ভিন্ রাজ্যে যাচ্ছেন কাজের খোঁজে বা কাজ করতে, আর যাচ্ছেন কেননা এ রাজ্যে তাঁদের করার মতো যথেষ্ট কাজ নেই, নেই পোষাবার মতো মজুরি। আজ সংবাদমাধ্যম সহজেই চিহ্নিত করতে পারেন এই শ্রমিকদের। হেডিঙে ‘পরিযায়ী এক্সপ্রেস’ শব্দবন্ধ ধরিয়ে দেয় রাজ্যের শ্রমজীবীর হাল। আর কোনটাই বা পরিযায়ী এক্সপ্রেস নয়। মুম্বাই, দিল্লি, আহমেদাবাদগামী এক্সপ্রেস, দক্ষিণের রাজ্যগামী সমস্ত ট্রেনই এ রাজ্য, বিহার, ওডিশা, ঝাড়খণ্ডের ‘পরিযায়ী এক্সপ্রেস’। এক জায়গায় পড়ছিলাম এক শ্রমিকের আক্ষেপের কথা—“আমাদেরই জীবন বাজি রাখতে হবে।”

 

জীবন বাজি রাখাই বটে। তাওতো মানুষগুলোর পরিচয় জানা গেল, যদিও এখনও অশনাক্ত বহু, নিখোঁজও। মৃত, আহত অধিকাংশই এই রাজ্যের। কিন্তু, লকডাউনে বাড়ি ফেরার পথে  কতজনের মৃত্যু হয়েছিল তার হিসেবই দেয়নি কেন্দ্র। ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী ঘরে ফেরার পথে পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে লোকসভায় জানিয়েছিলেন, “এমন কোনও তথ্য রাখা হয়নি।” তবে, ১৯ সেপ্টেম্বর  রাজ্যসভায় তৎকালীন রেলমন্ত্রী জানান, ১ মে থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, শ্রমিক স্পেশালে বাড়ি ফেরার পথে ৯৭ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। করোনা সংক্রমণ থেকে হৃদরোগ, ফুসফুস থেকে লিভার সংক্রমণ-সহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের মৃত্যু হয় বলে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সেভলাইফ ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩১ মে এই করোনাকালীন দু’মাসে দেশে চোদ্দোশোর বেশি পথ দুর্ঘটনায় ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে ১৯৮ জন পরিযায়ী শ্রমিক।

 

অতিমারির সময়ে কিংবা তার পরেও পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন-জীবিকা, তাঁদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা, মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ১৯৭৯ সালের আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, শ্রম আইন, রেশন কার্ড, পরিচয় পত্র-সহ নানা বিষয়েই ঝুড়ি ঝুড়ি কথা হয়েছে, লেখা হয়েছে। সরকারি তরফে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে কিছুই ঘটে ওঠেনি। ঘটিয়ে তোলা হয়নি। পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কত তারই প্রকৃত হিসেব নেই কোনও সরকারের কাছেই। নয়া শ্রম আইন কেন্দ্রীয় সরকার এখনও বলবৎ করে উঠতে না পারলেও, অন্তত ১৮টি রাজ্য অতিমারির সুযোগ নিয়ে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে নয়া শ্রম আইনের নানা বিধি চালু করে দিয়েছিল। যেমন, আট ঘণ্টার বদলে ১২ ঘণ্টার কাজ; কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সরকারি নজরদারির ব্যবস্থাটুকু তুলে দেওয়া; ঠিকাদারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রভৃতি। এমন সব শ্রমিক বিরোধী বিধির কুপ্রভাব ঠিকা শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিকদের উপরই বেশি পড়ে এবং পড়ছেও।

 

এর প্রভাবে শ্রমিকরা কতটা বিপদে পড়ছে, কী বিপদে পড়ছে তা শুধু জানা যায় ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার খবরে। যেমন, চলতি বছরের প্রথম দিনেই পেলিংয়ে স্কাইওয়াক নির্মাণ করতে গিয়ে এ রাজ্যের পাঁচ জন যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আবার এক চিলতে বদ্ধ ঘরে স্ত্রী-শিশু ও অন্যান্যদের সঙ্গে বাস করতে বাধ্য হন এ রাজ্যের শ্রমিক। ধোঁয়ায় দমবদ্ধ হয়ে মারাও যান। এ বছরই ৩১ মার্চ ভোরে এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল উত্তর পূর্ব দিল্লির শাস্ত্রী পার্ক এলাকায়। রমজানের সেহরি সেরে ফের ঘুমিয়ে পড়েছিলেন চার যুবক, এক যুবতী ও তাঁর একটি তিন বছরের শিশু। রান্নার উনুনের ধোঁয়ায় ছ’জনেরই মৃত্যু হয়। ওই যুবতী এই ঘটনায় মৃত এক যুবকের স্ত্রী। বোঝাই যায় কী অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে বসবাস করতে হয়। চলতি বছরের ৩১ মার্চ অবধি, এই তিন মাসে এ রাজ্যের ১৮ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ এক জন। এবং এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ২২ মাসে এ রাজ্যের ৫৬ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

 

ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড)-এর এক সাম্প্রতিক রিপোর্টের পর্যালোচনা অনুযায়ী, জাতীয় গড়ের থেকে যে রাজ্যগুলির মাথাপিছু আয় কম, সেগুলিকে ‘আন্ডার ডেভলপড’ বা অনুন্নত রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাবার্ডের হিসাবে মাথাপিছু আয়ের জাতীয় গড় বার্ষিক ১,২৭,৩৭০ টাকা। জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর-পূর্বের প্রায় সব রাজ্য; বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, ছত্তিশগঢ়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ এই অনুন্নত রাজ্যের তালিকায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের গড় মাথাপিছু আয় ১,০০,৩৮৯ বলে নাবার্ড নির্দিষ্ট করেছে। এই হিসাবে এ রাজ্য দেশে ১৯ নম্বরে।

 

‘ট্রেন্ডস অ্যান্ড বিহেভিয়ারিয়াল প্যাটার্নস অব ক্রেডিট-ডিপোজিট রেশিওস অব সিডিউলড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক’ শীর্ষক এই রিপোর্টে নাবার্ডের কথায়, “অবনতির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত। যেখানে টাকা জমা এবং টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ধার পাওয়া দুটোই কমেছে। তবে টাকা জমা হারের থেকে ঋণ পাওয়ার হার কমছে বেশি।“ অর্থাৎ, আয়ের সংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, কাজের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার ফলেই টাকা ব্যাঙ্কে জমা রাখা বা সঞ্চয়ের সুযোগ কমেছে। এবার জাতীয় নমুনা সমীক্ষা সংস্থা (এনএসএসও)-র একটি সমীক্ষার দিকে তাকাব। এই সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের মোট যুব সম্প্রদায়ের ৩৩ শতাংশকে একেবারে কর্মহীন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের না আছে চাকরি, না আছে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, না তাঁরা যুক্ত কোনও পেশাগত প্রশিক্ষণে। এবং এখানে লিঙ্গ বৈষম্যও অত্যন্ত প্রকট। দেশের ২১ থেকে ২৯ বছর বয়সের যুবকদের ক্ষেত্রে এই কর্মহীনতা যেখানে ১৫.৪%, সেখানে যুবতীদের ক্ষেত্রে তা ৫১.৭%। এবং এই কর্মহীন যুবতীরাই সংসারের ৯০% কাজ করেন, যার কোনও মূল্যই নেই পরিবার কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে।

 

অতি সম্প্রতি পরিযায়ী শ্রমিকদের সহায়তার জন্য পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ (বেঙ্গল মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড) গঠন করেছে। এবং এও স্থির করা হয়েছে, বিপদগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তা করার জন্য কেরল, দিল্লি, মহারাষ্ট্রে আঞ্চলিক কার্যালয় গড়ে তোলা হবে। আরও ঘোষিত হয়েছে যে, কোনও পরিযায়ী শ্রমিক দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে ৫০ থেকে এক লক্ষ টাকা অবধি সাহায্য করা হবে। এবং কর্মরত অবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা, দুর্ঘটনায় মারা গেলে দু’লক্ষ টাকা। ভিন রাজ্যে মারা গেলে দেহ রাজ্যে ফিরিয়ে আনতে ২৫ হাজার টাকা এবং ওই রাজ্যেই দেহ সৎকার করতে চাইলে পরিবারকে তিন হাজার টাকা দেওয়া হবে। রাতদিন সাতদিনের এই পরিষেবা পাওয়া এবং নাম নথিভুক্ত করার জন্য একটি পোর্টালও চালু হবে। এক সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৮ লক্ষের মতো। ওই আধিকারিক জানিয়েছেন, লকডাউনের সময় ৪২ লক্ষ মানুষ রাজ্যে ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক।

 

বাহানাগা বিপর্যয় রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্কটকে ফের বেআবরু করে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য দুর্ঘটনাস্থল থেকেই ঘোষণা করেছিলেন প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা সাহায্য দেওয়া হবে। গুরুতর আহতরা পাবেন এক লক্ষ টাকা এবং কম আহতরা ৫০ হাজার টাকা। গত মে মাসে শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ গঠন, করমণ্ডল বিপর্যয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর দ্রুত উপস্থিতি, অ্যাম্বুল্যান্স, চিকিৎসক, নার্স পাঠানো, রাজ্যের একাধিক হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে প্রশংসা যোগ্য। কিন্তু, একই সঙ্গে যে প্রশ্নটি সঙ্গত ভাবেই উঠবে তা হল, পরিযায়ী শ্রমিক নীতি শুধু কি তাহলে নাম নথিভুক্ত করা এবং দুর্ভোগে পড়লে ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় দাঁড়াল? এই যে লকডাউনের সময় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে আর কাউকে ভিন রাজ্যে যেতে দেবেন না, সে কথা তো রাখা গেল না। এ আসলে বিশেষ সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে কাঁচা আবেগের কথা। এ প্রতিশ্রুতি কারোর পক্ষেই রক্ষা করা সম্ভব নয়। সুখেই হোক কিংবা দুঃখে; একটু ভালো আয়ের জন্য হোক কিংবা আরও উন্নততর জীবনের স্বার্থে; যুদ্ধবিগ্রহ, অতিমারি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়—যুগে যুগে মানুষ ঘর ছেড়েছে। আদিম যুগ থেকেই মানুষের ইতিহাস তাই পরিযাণের ইতিহাস।

 

সে যাই হোক। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময় পরিযায়ী শ্রমিকের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ঘোষণা করেছিলেন। সেটি হল, ২০২০ সালের ৩ জুন, তিনি জেলাশাসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলায় জেলায় ফিরে আসা প্রত্যেক পরিযায়ীর নাম ও পেশা নথিভুক্ত করার। কে কোন কাজে দক্ষ কিংবা আধা দক্ষ তা চিহ্নিত করা। ঘোষণা অনুযায়ী উদ্দেশ্য ছিল, একটি ‘স্কিল ব্যাঙ্ক’ তৈরির। এবং এই তালিকা অনুযায়ী, যারা জরি কিংবা সোনার কারিগর, যারা রাজমিস্ত্রি, কাঠের কাজে দক্ষ তাঁদের ‘স্কিল ব্যাঙ্ক’-এ নথিভুক্ত করে ছোট, মাঝারি, ক্ষুদ্র শিল্প দপ্তরের মাধ্যমে কাজ দেওয়া। সে পরিকল্পনার গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে বর্তমানে প্রায় কিছুই জানা যায় না। গুজরাত, মহারাষ্ট্র থেকে কেরালায় সোনা, হিরের কারিগরদের চাহিদা আজও তুঙ্গে। তেমনই চাহিদা জরি কারিগর কিংবা দর্জিদের। এ রাজ্যে জরিশিল্পের প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। ভিন রাজ্যের তুলনায় তাঁদের মজুরি হাস্যকর ভাবে কম। তবু, লকডাউনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার তাড়নায় অনেক কারিগরই চেয়েছিলেন সরকার যদি উদ্যোগ নিয়ে মধ্যস্থতা করে, সারা বছরের, বিশেষ করে বিয়ে, পূজা, পরবে নিয়মিত অর্ডার এবং সম্মানজনক মজুরি মেলে তবে আর ভিন রাজ্যে যাবেন না তাঁরা।

 

কোথায় কী? আজও তাঁরা ‘লেবার ট্রেন’-এর যাত্রী হয়েই রইলেন। অতিমারির পর শুধু নাম বদল হয়ে ‘পরিযায়ী এক্সপ্রেস’ হয়েছে। সরকারও পরিযায়ী সুরক্ষা মেপে চলেছে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে। আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, নির্মাণ শ্রমিক বিষয়ক আইন, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা আইনগুলির কথা আর উঠছে না। আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছে না শ্রম দপ্তর কিংবা তার অধীনে তৈরি শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ। ক্ষতিপূরণ তো মালিকরাও দেয়। চেপে ধরতে পারলে পাঁচ লক্ষ টাকার ঢের বেশি দেয়। দেয় শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বলে নয়, শ্রমিক সুরক্ষাহীন বেআইনি কারবার ঢাকতে, মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে শ্রমিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য। একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কেন সেই মালিকদের মতোই শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারবে? ক্ষতিপূরণই শুধু শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের কাজ হতে পারে না। কল্যাণ কী তা জানা-বোঝার জন্য কর্তারা অন্তত পক্ষে পরিযায়ী, নির্মাণ শ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা আইনের পাতাগুলো উলটে দেখুক। আরও অনেক কিছুই তো করার বাকি রইল। আগে এইটুকু হোক।

 

ছবি : নির্মল দাস

 

Share this
Leave a Comment