সিবিএসই-র দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের পাঠ্যবই থেকে বাদ গেল ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব 


  • April 21, 2023
  • (1 Comments)
  • 1171 Views

২১ এপ্রিল, ২০২৩ ।  অনিমেষ দত্ত

 

কিছুদিন আগেই ইতিহাস বই থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল মোঘল আমল। বাদ গিয়েছেন মহাত্মা গান্ধীও। আর এই সিলেবাস থেকে ছেঁটে ফেলার তালিকায় আরও এক সংযোজন হল চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সত্যপাল সিং বলেছিলেন—ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ভুল! তিনি দাবি করেছিলেন, “বানর থেকে মানুষ হতে কেউ দেখেনি, তাই ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ভুল। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমগুলি বদলে ফেলা উচিত…”। সেই মন্তব্যের সূত্র ধরেই যেন বাদ পড়লেন ডারউইন! সিবিএসই-র দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বইতে নবম অধ্যায়ের নাম ছিল ‘বংশগতি ও বিবর্তন’, সেখানেই ‘বিবর্তন’ হাওয়া হয়ে এখন শুধু পড়ে আছে বংশগতি! বিবর্তনবাদ তত্ত্ব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং বা সংক্ষেপে এনসিইআরটি।

 

হঠাৎ ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বে কোপ মারা হল কেন? 

 

উনিশ শতকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের লেখা বই ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটায়। তখনও অবধি বিশ্বে প্রাণের উৎস সম্বন্ধে নানান গবেষণা, বিতর্ক চলছে। ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধকারে ডুবে থাকা বিশ্বে প্রাণের উৎস এবং বিবর্তনের ধারণাকে বদলে দেন চার্লস ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদ তত্ত্ব-র মাধ্যমে। ডারউইনের মৃত্যুর পর আজ একুশ শতকেও বিবর্তন তত্ত্বের উপর নানান গবেষণা, লেখালেখি, বিতর্ক চলছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানে এবং বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অবধি বিবর্তনবাদ তত্ত্ব গৃহীত একটি থিওরি। যাকে আকর ধরেই জীববিজ্ঞানীরা নানান খোঁজ চালাচ্ছেন। আর ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব গৃহীত বলেই উনিশ শতকের মতোই আজও বহু গোঁড়া ধর্মীয় মতামত নস্যাৎ হয়ে যায়। আর ভারতের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দর্শনের একেবারে বিপরীতে অবস্থান বিবর্তনবাদের, তাই বিবর্তন — বাদ!

 

ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস অনেক বছরের। আবার বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক দশন চর্চার ইতিহাসও বহু পুরনো। কিন্তু স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান পাঠ্যবইগুলিতে সারা বিশ্বে স্বীকৃত বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানের প্রমাণগুলিই পড়ানো হয়ে এসেছে এবং এখনও হচ্ছে। এক জন গড় পড়ুয়া (সে যে ধর্মবিশ্বাসেরই হোক) অন্তত এটুকু জানে যে ‘বানর থেকে মানুষ হয়েছে’… এর আশেপাশে কিছু একটা তত্ত্ব আছে। কিন্তু এরপর থেকে সিবিএসই বোর্ডের ছেলেমেয়েরা তা আর শিখবে না। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অন্যান্য অনেককিছুর মতোই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছে বিজ্ঞানশিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চাকে। বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের করা বিভিন্ন মন্তব্যগুলোর দিকেই একটু চোখ ফেরানো যাক।

 

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ভারতীয় গোরুর দুধে সোনার ভাগ থাকে। একাধিক মামলায় অভিযুক্ত বিজেপির সাংসদ সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুর বলেছিলেন, গো-মূত্র থেকে ক্যান্সার রোধ করা যায়। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের দাবি ছিল, গোরুর গোবর কোহিনূর হিরের চেয়েও নাকি দামি। ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা বিপ্লব দেবের দাবি ছিল, মহাভারতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের মতো একটি মঞ্চে নাগেশ্বর রাও দাবি করেছিলেন, রাবনের কাছে বিভিন্ন রকমের এরোপ্লেন ছিল, এমনকি লঙ্কায় এয়ারপোর্ট ছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কীভাবে ভুলে যাব আমরা। তিনি দাবি করেছিলেন, আকাশে মেঘ থাকলে র‍্যাডারের আওতা থেকে ফাইটার জেট ধরা পড়ার হাত থেকে নাকি বেঁচে যায়। দেশে কৃষক আত্মহত্যা যখন চরম পর্যায়ে, তখন বিজয় সারদেশাই দাবি করেন, ভালো ফসলের জন্য ‘ওম রুম জুম শাহ’ মন্ত্র উচ্চারণ করা উচিত! মন্ত্র উচ্চারণে ফসল ভালো না হলেও ২০১৬ সাল থেকে কৃষক আত্মহত্যার তথ্য গায়েব হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি টেস্টটিউব বেবি, পুষ্পক রথ, গণেশের মুণ্ড প্রতিস্থাপন ইত্যাদি মন্তব্য আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির উদ্রেক সৃষ্টি করে। কোভিড অতিমারির সময় যেখানে প্রয়োজন ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকাঠামো গঠন করে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার, সেখানে বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা যজ্ঞ করেছেন। মন্ত্রী রামদাস অঠয়ালের ‘গো করোনা, করোনা গো’ স্লোগান মনে পড়ে নিশ্চয়ই? কোভিড যোদ্ধা অর্থাৎ ডাক্তার নার্স থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি না মানা হলেও তাঁদের উৎসাহিত করার জন্য থালা বাজিয়ে কিংবা মোমবাতি জ্বালিয়ে অপবিজ্ঞানের উল্লাস নৃত্য করার নিদান দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

 

এই সমস্ত অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য কি বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা না জেনেই করেন? আজ্ঞে তা মনে হয় না। ভারতে বিজ্ঞান যেখানে এখনও শুধুমাত্র ল্যাবরেটরিতেই বন্দি, সেখানে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ছড়ানোর কাজ বিজেপি সরকার করবে তা আশা করাই অর্থহীন। উল্টে এই সমস্ত মন্তব্য করে ভারতের সাধারণ মানুষকে একটি নির্দিষ্ট দিকে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দর্শনের পক্ষে জড়ো করার কাজ করে গেছে ভারত সরকারের প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির মূল জায়গা হল প্রাথমিক শিক্ষা। আর সেখানেই প্রতিবছর সরকার বরাদ্দ অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে। নরেন্দ্র দাভোলকর, এমএম কালবুর্গির মতো মানুষ যাঁরা বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা প্রচার ও প্রসারের কাজ করেছেন তাঁদের হত্যা করেছে এই ধর্মান্ধরা। শুধুমাত্র এই সমস্ত অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য করে কিংবা যুক্তিবাদী মানুষদের খুন করে ভারতকে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার বিপক্ষে দাঁড় করানো তো সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন পাঠ্যক্রমগুলিতেও বদল ঘটানো। বিজেপি সরকারের সময়েই হু হু করে বেড়েছে জ্যোতিষ চর্চা৷ গো-মূত্র, গোবর নিয়ে গবেষণা। আর অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় কমানো হয়েছে বরাদ্দ অর্থ।

 

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে বিজেপি সরকার প্রথম বাজেটেই বরাদ্দ কমায় বিজ্ঞান গবেষণায়। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় বাজেটের তুলনায় ৩.৯ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে ২০২২-২৩ বর্ষে ১৪,২১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয় বিজ্ঞান গবেষণা খাতে। যা মোট বাজেটের মাত্র ০.৭ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে চীন ২ শতাংশ, জাপান ৩.৪ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২.৭ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে। ২০১৭ সালে এই বাজেট কমিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে “মার্চ ফর সায়েন্স” নামের একটি সারা ভারতব্যাপী স্বেচ্ছাসেবী মঞ্চ। ডারউইন বাদ পড়ার পর ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি এবং ভারতের নানা প্রান্তের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংগঠন, প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৮০০ বিজ্ঞানী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, ছাত্রছাত্রীদের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি খোলা চিঠিতে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ডারউইনের তত্ত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।

 

চিঠিতে বলা হয়েছে, “We, the undersigned, have learned that sweeping changes are being proposed in the CBSE curriculum in the secondary and senior secondary courses. These changes, first introduced as a temporary measure during the Corona pandemic, are being continued even when schooling has gone back to offline mode. In particular, we are concerned with the exclusion of the teaching of Darwinian evolution from the 10th standard curriculum, as seen in the information (see https://ncert.nic.in/pdf/BookletClass10.pdf, page 21) available on the NCERT website.”

 

অর্থাৎ করোনা অতিমারির অজুহাত দেখিয়ে সেসময় সিবিএসই-র সিলেবাসে যে কাটছাঁট করা হয়েছিল, তাতে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান শিক্ষাবর্ষে অফলাইন মাধ্যমে হওয়ার পরেও সেই বাদ দেওয়া সিলেবাসই বহাল রয়েছে, যেখানে বাদ রাখা হয়েছে বিবর্তনবাদ তত্ত্ব।

 

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, “Knowledge and understanding of evolutionary biology is important not just to any sub-field of biology, but is also key to understanding the world around us. Evolutionary biology is an area of science with a huge impact on how we choose to deal with an array of problems we face as societies and nations from medicine and drug discovery, epidemiology, ecology and environment, to psychology, and it also addresses our understanding of humans and their place in the tapestry of life. Although many of us do not explicitly realise, the principles of natural selection help us understand how any pandemic progresses or why certain species go extinct, among many other critical issues. An understanding of the process of evolution is also crucial in building a scientific temper and a rational worldview. The way Darwin’s painstaking observations and his keen insights led him to the theory of natural selection educates students about the process of science and the importance of critical thinking. Depriving students, who do not go on to study biology after the 10th standard, of any exposure to this vitally important field is a travesty of education. We, the undersigned scientists, science teachers, educators, science popularisers and concerned citizens disagree with such dangerous changes in school science education and demand to restore the theory of Darwinian evolution in secondary education.”

 

অর্থাৎ বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ছাত্রছাত্রীদের জানা কতটা জরুরি। যে তত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর ধারণা তৈরি হয় এবং বিশ্বকে দেখার বা বোঝার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয় শিক্ষার্থীদের।বিজ্ঞান শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের আসার পরিমাণ এমনিতেই কম। যারাও বা আসে, শুধুমাত্র চাকরির জন্য কিছু টেকনিক্যাল স্কিল শেখার জন্য। এই অবস্থার বদল ঘটিয়ে যেখানে সরকারের উচিত আরও বেশি বেশি করে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা প্রচারের, প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য করে তোলার, সেখানে সিলেবাস থেকে বিবর্তনতত্ত্ব বাদ যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের আরও অপবিজ্ঞান শিক্ষার দিকে ঠেলে দেওয়া বৈকি।

 

An appeal Against Exclusion of Evolution from Curriculum

https://docs.google.com/forms/d/e/1FAIpQLSd_n1jXOuT5KbOoH5mJX7EPtp22PqKemUfMXawFjnsHAiRIQQ/viewform

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Pushpal Ghosh on April 21, 2023

    Save India from entering in the dark ages of ignorance and irrationality — now or never

Leave a Comment