আক্রান্ত অভিনেতা-নাট্যকার, বন্ধ হল বিদূষক-এর নাট্টোৎসব, প্রতিবাদে নাট্য ও মানবাধিকার কর্মীরা


  • December 29, 2022
  • (0 Comments)
  • 1031 Views

তৃণমূল দলের হাতে আক্রান্ত অভিনেতা-নাট্যকার অমিত সাহা, বন্ধ হল বিদূষক-এর নাট্টোৎসব, প্রতিবাদে নাট্য ও মানবাধিকার কর্মীরা। অনিমেষ দত্তর প্রতিবেদন।

 

গণতন্ত্রের উপর, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর গোটা দেশজুড়ে এবং রাজ্যে যে সাঁড়াশি আক্রমণ চলছে তারই ধারাবাহিকতায় আরও এক নতুন ঘটনার সংযোজন হল শহর কলকাতায়। পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চলে নাট্যদল “বিদূষক নাট্যমণ্ডলী” আয়োজিত নাট্য উৎসব বন্ধ করে দেওয়া হল গায়ের জোরে এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে অভিনেতা নাট্য নির্দেশক অমিত সাহাকে বেধরক মারধর করা হল। পুরো ঘটনাটিই ঘটালেন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব। তৃণমূল কংগ্রেসের লুম্পেনরাজের আরেকটি জলজ্যান্ত ধটনার সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ।

 

গত ২৪ ও ২৫ ডিসেম্বর দু’দিন ব্যাপী নাট্য উৎসবের আয়োজন করেছিলেন “পূর্ব কলকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলী”। বেলেঘাটার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত রাসমেলা প্রাঙ্গন, যেখানে বহু বছর ধরে রাসের মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, সেখানেই হওয়ার কথা ছিল এই নাট্যউৎসব। মেলা প্রাঙ্গনের মাঠটি যে ট্রাস্টের অধীনে তাদের অনুমতি নিয়েই বেশ কয়েকটি পথনাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসবটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছিলেন বিদূষক নাট্যমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য, নাট্যনির্দেশক ও বিশিষ্ট অভিনেতা অমিত সাহা এবং দলের অন্যান্য সদস্যেরা। ২৪ ও ২৫ তারিখকে কেন্দ্র করে তার বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই দলের সদস্যেরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করা শুরু করেন এবং উৎসবের প্রচার করেন। বিদূষক নাট্যমণ্ডলী বেলেঘাটা অঞ্চলে নাট্যচর্চা করছে প্রায় কুড়ি বছর ধরে। এর আগেও বহুবার ওই এলাকায় নাট্য উৎসব আয়োজন করেছে তারা, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাটকের দল এসে নিজেদের নাটক উপস্থাপন করে গেছে। বিদূষক নাট্যমণ্ডলী ওই অঞ্চলে নাট্যচর্চার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পিছিয়ে থাকা এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন ত্রাণ সাহায্য নিয়ে। এলাকার বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কাজ করেছে। এমনকি প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের নাট্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের দিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন বহুবার। বিদূষক নাট্যমণ্ডলী মূলত পথনাটক বা তৃতীয় ধারার নাটকই উপস্থাপন করে। আর তৃতীয় ধারার নাটকের ক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। কোনো সরকারি “গ্রান্ট” না নিয়ে তারা মানুষের টাকায় মানুষের নাটককেই নিজেদের নাট্যদর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।

 

নাট্য উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগের দিন দলের সদস্যরা জানতে পারেন যে ওই মেলাপ্রাঙ্গণে “কেক উৎসব” আয়োজন করা হয়েছে। অমিত সাহা জানাচ্ছেন, “আমরা থানায়, পুরপ্রতিনিধির কাছে ইনভিটেশন দিয়েছিলাম। সকালবেলা (২৩ ডিসেম্বর) আমরা ওখানে দেখতে পাই যে তীব্রভাবে মাইক বাজছে এবং জানতে পারি যে ‘কেক উৎসব’ হচ্ছে। এত জোরে মাইক বাজলে আমাদের ছোট পরিসরে এই নাটকের অনুষ্ঠানটি বিঘ্নিত হবে, তাই, সেটা নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা পুর প্রতিনিধির অফিসে যাই, কিন্তু সেই সময় তারা ছিলেন না। তারপর অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ ফোন আসে যে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনে যে ডেকোরেশন এর কাজ হচ্ছিল তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারপর আমরা ছুটে যাই সেখানে। তৃণমূলের কিছু কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় নেতা অলোক দাস।” অমিত সাহা আরও বলেন, “আমরা গাড়ি থেকে নেমে ওখানে পৌঁছানো মাত্রই আমাদের কোনোরকম কথা বলার সুযোগটুকু না দিয়েই চড়চাপড় মারা শুরু করে, ধাক্কা দিতে দিতে আমাদের রাস্তায় এনে ফেলা হয়। আমরা কেক উৎসবের সঙ্গেই কী করে আমাদের নাট্য উৎসবটিও করা যায় তা নিয়েই কথা বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো কথা বলার সুযোগই আমাদের দেওয়া হয়নি।” তৃণমূল নেতা অলোক দাসের হাতে আক্রান্ত হন অমিত সাহা। ছিঁড়ে দেওয়া হয় নাট্য উৎসবের পোস্টার, ফ্লেক্স। সম্পূর্ণ ঘটনাটি বিস্তারিত ভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে জানান অমিত সাহা। স্বাভাবিক ভাবেই হামলাকারী তৃণমূল নেতা অলোক দাসের কন্যা, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের পৌরমাতা অলোকানন্দা দাসের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাঁর পৌর এলাকায় একজন অভিনেতাকে এভাবে হেনস্থা করা হল, কিন্তু তিনি পরবর্তীতে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি।

 

এই ঘটনা কি নতুন? কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গে তো এর আগেও গায়ের জোরে, ক্ষমতার জোরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নাটকের শো, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। টেলিভিশনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শিল্পের স্বাধীনতা, শিল্পীর স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে বিতর্ক সভা হয়ে আসছে। শাসক দল আয়োজিত বিভিন্ন উৎসবে বাংলার শিল্পীদের রমরমা। এমনকি সম্প্রতি আয়োজিত “কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে” মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অন্যান্য তৃণমূল নেতৃত্বের উপস্থিতিতে অমিতাভ বচ্চনের গলায় শোনা গেছে বর্তমান সময়ে সিনেমায় সেন্সরশিপ বিরোধী কথাবার্তা এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষে মন্তব্য। আর অপরদিকে অভিনেতা, শিল্পীদের উপর শাসকদলের এই আক্রমণ। মানবাধিকার কর্মী রাংতা মুন্সী আমাদের জানাচ্ছেন, “আমরা মানবাধিকার আন্দোলন যবে থেকে করছি, তবে থেকেই শাসকদলের আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাজ্য সরকার মিটিং-মিছিল করতে দেয়নি। মতপ্রকাশের অধিকারের দাবিতে সংঘটিত হওয়া মিছিল, পথসভা করতে দেয়নি। এই ঘটনাটা নতুন কিছুই নয়, আরেকটা মাত্রা পেল। আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করছি, দরকার হলে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব, শারীরিক নিগ্রহের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে।” রাংতা মুন্সীর মতো আরেক মানবাধিকার কর্মী আলতাফ আহমেদ জানাচ্ছেন, “সমস্ত শাসক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করেছে। শাসকের মনের মতো না হলে সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে বন্ধ করার ক্ষেত্রে সমস্ত শাসক দলেরই একই ভূমিকা থেকেছে। মানুষের অধিকারকে চেপে রাখার বিরুদ্ধে যারা কাজ করেন তাদের উপর আক্রমণ চলেই যাচ্ছে। শুধু তৃণমূল বলে নয়, সবাই। এই ঘটনাটা কলকাতা বলে তাও নজরে এসেছে, জেলা মফস্বলে ঘটলে খবরও হয় না। প্রতিবাদ জরুরি।”

 

সেই ব্রিটিশ শাসনের সময়ে “নীলদর্পণ” নাটকের শো বন্ধ হওয়া থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শাসক দলের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে বাংলা থিয়েটার। আক্রান্ত হওয়ার তালিকায় উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্রের মতো প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব ও তাদের নাটকও যেমন আছে, তেমনই আছে নাম জানা, না জানা অজস্র নাট্য দলের নাটক। উৎপল দত্তের “কল্লোল” নাটকের শো চলাকালীন কংগ্রেসের গুন্ডাদের হামলার কথা আমরা সবাই জানি। বামফ্রন্ট আমলে তিস্তাপারের বৃত্তান্ত নাটকটি তৎকালীন শাসকদলের রোষানলে পড়েছিল। তৃণমূল সরকারের আমলেই নাট্যকর্মী শুভঙ্কর দাসশর্মা আক্রান্ত হন। “জনগণমন” গোষ্ঠীকে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় আক্রমণের শিকার হতে হয়। শুভঙ্কর দাসশর্মা জানাচ্ছেন, “কথা বলার পরিবেশটাই আর থাকছে না এ রাজ্যে। শাসক দলের গুন্ডারা হঠাৎ করে অমিত সাহাকে মারছে এমন নয়, তারা যেখানেই  যাকে পারছে তাকেই মারছে। এই ধরনের নাট্য উৎসবগুলি সরকারের সহযোগিতায় হয় না, মানুষের টাকায় হয়, এই জিনিসগুলো তারা মেনে নিতে পারছে না।” শুভঙ্কর দাসশর্মা আরও বলেন, “জনগণের একটা শক্তি কিছু করতে চাইলে তখনই তারা সরকারের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। একমাত্র জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ জরুরি এদের আটকাতে গেলে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির একসাথে এগিয়ে আসা উচিত।”

 

বাংলায় তৃতীয় ধারার নাটকের ইতিহাস দীর্ঘ কয়েক দশকের। আর সেই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন বাদল সরকার। বাদল সরকারের নামে তৈরি হওয়া “বাদল সরকার নাট্যচর্চা কেন্দ্র” এর সদস্য দেবাশিসবাবুর মতে, “আমরা জানি এইগুলো ঘটবে। দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এই আক্রমণ নাট্যকর্মীদের উপর। আমরাও সেই ১৯৭৪ সাল থেকে বাধা পেয়ে আসছি। বাধা আসবে এটা মেনে নিয়েই আমাদের কাজ করে যেতে হবে।”

 

পথসেনা নাট্যগোষ্ঠীর কর্ণধার শ্যামল মুখার্জি জানাচ্ছেন, “আমরা পথসেনাও এর আগে এই সবের সম্মুখীন হয়েছি। শাসকের আলাদা কোনো পরিচয় নেই। তার মুখের উপর কোনো কথা বলা যাবে না। আমরা একজোট নই, আর এই সুযোগটাই এরা নিচ্ছে। কিছু দল, ব্যক্তিরা গ্রান্ট পাওয়ার লোভে চুপ থাকছে। আর যারা গ্রান্ট না নিয়ে মানুষের টাকায় থিয়েটার করছেন তাদের উপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের একসাথে প্রতিবাদ করতে হবে।”

 

 

তৃণমূল কংগ্রেস দলে অর্পিতা ঘোষ, শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর মতো নাট্যব্যক্তিত্বরা আছেন, কিন্তু তারা ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই অন্য একজন নাট্যব্যক্তিত্বের উপর হওয়া নিজেদের দলের এই হামলার বিরুদ্ধে একটি বারের জন্যও মুখ খোলেননি। ২৮ ডিসেম্বর বিদূষক নাট্যমণ্ডলী বেলেঘাটা সুকান্ত মঞ্চের সামনে এই ঘটনার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত করেন। সেখানে প্রতিবাদে সামিল হন মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র, বোলান গঙ্গোপাধ্যায়, পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য, অভিনেতা বিমল চক্রবর্তী, দীপক হালদার, সায়ন ঘোষ সহ নাট্য, সিনেমা তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত বহু মানুষ, ছাত্রছাত্রী সংগঠন, নাটকের দল, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীরা। ধিক্কার জানিয়েছেন মিরাতুন নাহার, অভিনেতা-পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, অভিনেতা কৌশিক সেন সহ আরও অনেকে। ঠিক একদিন আগেই ফুলবাগান মেট্রোর সামনে এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর।

 

বিদূষক নাট্যমণ্ডলী আমাদের জানিয়েছে যে সেদিনের হামলার মুখে পড়ে নাট্য উৎসব আপাতত মুলতবি করা হলেও জানুয়ারি মাসেই এই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। শিল্পের স্বাধীনতা, শিল্পীর স্বাধীনতা, সংস্কৃতি চর্চার অধিকার, বাকস্বাধীনতা এই শব্দগুলিকে শাসক দল প্রহসনে পরিণত করেছে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপর আক্রমণ বাংলার বর্তমান গণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষকে চিত্রায়িত করছে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের একজোট হয়ে গণতন্ত্র রক্ষা, বাংলা থিয়েটারকে রক্ষা করা ছাড়া আগামী দিনে আর কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।

 

Share this
Leave a Comment