মানুষ-ভাসান


  • October 7, 2022
  • (0 Comments)
  • 732 Views

চা বাগান, জঙ্গল ঘেরা, অখ্যাত এক নদীর তীরের কোন এক প্রান্তিক শহরের ঘরে ঘরে বেজে ওঠা অকাল বিসর্জনের বলির বাজনা অচিরেই ডুবে যাবে রাজ্যজোড়া কার্নিভালের বিসর্জনের বোলে। সে বোল কোথাও কোথাও, কোনও কোনও মানুষের কানে ঢেলে দেবে গরম সীসা— ‘মানুষ থাকবে কতক্ষণ, মানুষ যাবে বিসর্জন।’ লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

আমরা বিপদকে ঘরে ডেকে পিঁড়ি  পেতে বসিয়েছি। ভেবেছি দুধ-কলা দিয়ে পোষ মানাব। আর যখন সর্বনাশ ঘটে, তখন কেবলই  কপাল চাপড়ানো, হাহাকার আর আর্তনাদ। কান ভারী হয়ে আসে, মন ভারাক্রান্ত হয়। খবরে চোখ রাখা যায় না, স্নায়ু অবশ হয়ে পড়ে। তবু, সমাজমাধ্যম জুড়ে একটি শ্রেণির মানুষ এই বীভৎসতার উদযাপনে মেতে ওঠে। যত বীভৎস তত উদযাপনের মাত্রা বাড়ে। ভাবখানা এমন সত্য উদঘাটনের এক মহতী কর্মে তাঁরা ব্রতী। এ ক্ষেত্রে ফুলেফেঁপে ওঠা নদী আর মানুষের অসহায় ভেসে যাওয়া ছাড়া আর কোনও সত্যই সেখানে প্রকাশ পায় না। পায় না কেননা ওই দৃশ্যটুকু তাঁরা যন্ত্রের সাহায্যে বন্দি করতে এবং ছড়িয়ে দিতে জানেন। আর কোনও তথ্যই সেখান থেকে মেলে না। যা মেলে তা কেবলই দোষারোপ, কাদা ছোড়াছুড়ি।

 

মানুষ এভাবে ভেসে গেল কেন? তাঁরা তো ভাসান দিতে গিয়েছিলেন, ভেসে যেতে নয়। বুড়ো-বুড়িরা গিয়েছিলেন। শিশু-কিশোরের হাত ধরে মা-বাবারা গিয়েছিলেন, অঢেল সংখ্যক যুবক-যুবতীও গিয়েছিলেন। যদি বিপদের আঁচ পেতেন, তবে কি বাবা-মায়েরা ছোট ছেলেমেয়েদের হাত ধরে নিয়ে যেতেন? যেতেন না। বিপর্যয় যাঁদের কাছে রঙ্গ-তামাশা তাঁদে কথা আলাদা। যেমন, নিম্নচাপের, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস মিললেই একদল দিঘা কিংবা বকখালি ছোটেন। বিপর্যয় মোকাবিলায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি না পারি, ‘ডিজাস্টার ট্যুরিজম’-এ আমাদের বড় আহ্লাদ। থাক সে কথা। আপাতত প্রশ্ন হল মানুষ-ভাসান কেন দেখতে হল?

 

এমনটি নয় যে, হড়পা বান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন স্থানীয় পুরসভা, পুলিশ, প্রশাসন। এমন নয় নদী ভাঙন, বিপদসংকুল বিসর্জনের ঘাট সম্পর্কে কেউ কিছুই জানতেন না বা আবহাওয়ার মতিগতিও কর্তাব্যক্তিদের জানা ছিল না! সক্কলে সব জানতেন। অন্তত, উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাগজ উত্তরবঙ্গ সংবাদ ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন তিনটি খবর করেছে এই মাল নদী, বিসর্জনের ঘাটের দুরাবস্থা, ঘাটের কাছে শহরের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ভাঙন, হড়পা বানের আশঙ্কা নিয়ে। এমনকি একথাও জানিয়েছিল, কয়েকদিন আগেই হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল একটি পাথর-বালি তুলতে আসা লরি। তবু, প্রতিটি প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংশ্লিষ্ট কর্তাদের বক্তব্যে কোথাও কোনও আশঙ্কা, উদ্বেগের চিহ্ন মিলবে না। ফলে কোনও বিকল্প পথের খোঁজও তাঁরা নেননি। যেটা করেছেন, তা হল ঘাটের কাছে নদীর পাথর-বালি দিয়ে একটা বাঁধ তৈরি করেছেন। যাতে নাকি নদীর জল সেখানে এসে এমনভাবে জমবে যে বিসর্জনে কোনও বাধা পড়বে না। দূরে নদীর বুকেও যেতে হবে না। মাল পুরসভার চেয়ারম্যান, পুরপিতা বা প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা নদী বিশেষজ্ঞ—এমন অপবাদ এখনও পর্যন্ত কেউ দেননি। কিন্তু তাঁরা যা করেননি, তা হল, কোথাও কোনও শৃঙ্খলা কিংবা নিয়ন্ত্রণ, সতর্ক করার চেষ্টা। এবং এটাও স্পষ্ট যে, আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, নদীর উজানে কোথাও ভারী কিংবা মেঘভাঙা বৃষ্টির হচ্ছে কি না, হতে পারে কি না—সকাল-বিকাল তার তথ্যতালাশও করেননি। জেলা জুড়েই তো তা করার কথা। আলিপুরদুয়ার হোক কিংবা জলপাইগুড়ি প্রায় সর্বত্রই তো পাহাড়ি নদীতেই বিসর্জন হবে। ৩, ৪, ৫ উত্তরবঙ্গের সব জেলায় হালকা থেকে মাঝারি, কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। আবহাওয়া দফতরের ‘মৌসম’ অ্যাপ থেকে স্থানিক ও নির্দিষ্ট অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেলে।

 

যদি প্রশাসন এটুকু করত তবে আমাদের এই দৃশ্য দেখতে হত না। আনন্দে অনেকটাই লাগামছাড়া হয়ে পড়া মানুষজনকে শুধু সতর্ক নয়, লাগাম পড়াবে না প্রশাসন? মাল খুবই ছোট, প্রান্তিক শহর। অর্থবল বা প্রশিক্ষিত লোকবল সে শহরে নেই। কিন্তু, বিপদের আভাস ছিল। জেলা প্রশাসনের কি উচিৎ ছিল না, বিপদসংকুল ঘাটগুলিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা? এটি স্পষ্ট তেমন কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। মানুষগুলোকে ভেসে যেতে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের রক্ষা করার আগাম কোনও উদ্যোগই ছিল না। তাই রক্ষা করা যায়নি। জেলা সদর থেকে যখন প্রশিক্ষিত উদ্ধার কর্মীরা পৌঁছেছেন ততক্ষণে যা ঘটার তা ঘটে গেছে। এই বিপর্যয় থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নেব এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। আমাদের পূজা এখন আন্তর্জাতিক। অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। চা বাগান, জঙ্গল ঘেরা, অখ্যাত এক নদীর তীরের কোন এক প্রান্তিক শহরের ঘরে ঘরে বেজে ওঠা অকাল বিসর্জনের বলির বাজনা অচিরেই ডুবে যাবে রাজ্যজোড়া কার্নিভালের বিসর্জনের বোলে। সে বোল কোথাও কোথাও কোনও কোনও মানুষের কানে ঢেলে দেবে গরম সীসা— ‘মানুষ থাকবে কতক্ষণ, মানুষ যাবে বিসর্জন।’

 

আমরা এই শোক ভুলে যাব। আবারও বন কেটে, নদীর বুক থেকে লাগামহীনভাবে পাথর-বালি তুলে, পাহাড়ি নদীতে বাঁধ বেঁধে বেঁধে ধ্বংস করে দেব প্রবাহ, নদী নির্ভর জীব আর যত বৈচিত্র্য। আমাদের তো আরও চাই। আরও আরও চাই। যত সরকার, যত কর্পোরেট হাত ধুয়ে নেমেছে আমাদের স্ফূর্তির খাইকে গড়ের মাঠ করে দিতে। সেই খাই মেটাতে গেলে বিপদকে ঘরে ডেকে পিঁড়ি পেতে না বসালে চলে কী করে!

 

Share this
Leave a Comment