বৃষ্টির অভাবে গভীর সঙ্কটে দক্ষিণবঙ্গের ধানচাষি 


  • September 8, 2022
  • (0 Comments)
  • 348 Views

দেবাশিস আইচের প্রতিবেদন

 

মজুর আনতে পুরুলিয়ায় লোক পাঠাননি বর্ধমানের ‘মনিব’রা। ফি-বছর ধান রুইতে শয়ে শয়ে আদিবাসী কৃষিমজুর যান রাজ্যের খাদ্যগোলায়। মনিবরা লোক পাঠান। বা ডাক পেয়ে পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ড এবং কিছুটা বাঁকুড়ার আদিবাসী শ্রমিকরা নামালে আসেন। এক-একটি ছোট ট্রাকে ৪০-৪৫ জন গাদাগাদি করে, কিংবা বাসে, ট্রেনে আসেন বর্ধমানে। এবার এ দৃশ্য দেখেননি মানভূম ১ ব্লকের তামাখুন গ্রামের ভীম মাহাত। সেই কয়েক পুরুষের দীর্ঘ পরম্পরায় এবার ছেদ পড়ল। এদিকে ভাদ্র মাসের তৃতীয় সপ্তাহ শেষ হতে চলল।

 

সে কথা স্বীকার করলেন, গলসি ২ ব্লকের ভারিচা গ্রামের মানস হাজরা। জানালেন, অনিয়মিত এবং স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি হয়েছে এবার, ডিভিসিও জল ছেড়েছে দেরিতে। এক যোগে সারা জেলা জুড়ে বৃষ্টি হয়নি। তাই যেখানে যখন জল পাওয়া গিয়েছে সেখানেই দ্রুত ট্রাক্টর দিয়ে স্থানীয় কৃষিমজুর দিয়ে চাষ শুরু করে দিয়েছেন চাষিরা। যেমন, মন্তেশ্বর, মঙ্গলকোটে আলু চাষ বেশি। ধান তুলেই আলু চাষ হবে। সেখানকার চাষিরা ডিপ টিউবয়েল আর কিছুটা বৃষ্টির জল পেতেই ধান রোয়া শুরু করে দেন। ১০ দিনের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যায়। ভিনজেলা থেকে শ্রমিক আনার সময় কই? আবার যখন মেমারির রোয়া শেষ হয়েছে মজুররা ট্রেন ধরে চলে গিয়েছেন গলসি। সেখানেও স্থানীয় শ্রমিক আছেন। এক মৌজার কাজ শেষ হলে তাঁরাই পৌঁছে গিয়েছেন আরেক মৌজায়। জলের অভাবে চাষের অনিশ্চয়তায় রোয়ার কাজ হারালেন শত শত আদিবাসী শ্রমিক। যে গ্রামগুলি থেকে তাঁরা আসবেন সেখানে তো ক্ষুধার রাজত্ব। অথচ, দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে বৃষ্টির আকাল, রাজ্য জুড়ে সারের কালোবাজারি, ১৪৫০ টাকার সার বিক্রি হচ্ছে কোথাও ১৯৮০ টাকায় কোথাও বা ২০২২ টাকা। দাম বেড়েছে কীটনাশকের। আবার বর্ষার জল নির্ভর চাষে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে হচ্ছে মাটির নীচের জল। ব্যয় বাড়ছে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের পিছনে। নিরুপায় তাঁদের সাবেক মনিবরাও। রাজ্যে চাষবাস যে সঙ্কটে তার এক অন্যতম সূচক আদিবাসী শ্রমিকদের ঘরবন্দি হয়ে থাকা।

 

কেমন চাষ করলেন এবার পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর ব্লকের শেখ লিয়াকত আলি? ১২ নং সরিষাখোল অঞ্চলের তাঁর তাবাগেড়া গ্রামের চাষিদের অবস্থা শোচনীয়। শ্রাবণের শেষে ধান রুইয়ে ছিলেন। ২০-২৫ দিন পর গাছ হয়েছে বটে কিন্তু বাড় হয়নি তেমন। বৃষ্টি হয়নি একেবারেই। ডিপ টিউবওয়েলের জল ঢেলেও ঢেলেও কাজ হয়নি। তৃষ্ণায় বুক ফাটার মতোই মাটি ফেটে চৌচির। প্রখর রোদে যেমন বাস্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে, তেমনই সোঁ সোঁ করে জল টেনে নিচ্ছে মাটি। ওদিকে জল নেই কংসাবতীতেও। জমিতে নিড়ানি দিচ্ছেন চার-পাঁচ জন স্থানীয় শ্রমিক। গাছতলায় বসে তারই তদারকি করছেন লিয়াকত। বললেন, “ধান যে পাব সেই আশা করি না। বৃষ্টির জলে যে সতেজতা থাকে, নলকূপের জলে থাকে না। মায়ের দুধে মানুষ আর গাইয়ের দুধে, হরলিকস খেয়ে মানুষ—তফাত তো হবেই।”

 

আর পুরুলিয়ার ভীম মাহাত? ১৪ বিঘা জমির তিন বিঘাতে ধান লাগাতে পেরেছিলেন ভাদ্রের ৬-৭ তারিখে। সেটুকুও তুলতে পারবেন সেই আশা কম। জানালেন, গত বছরও শ্রাবণ মাসের ৪-৫ তারিখের মধ্যে সারা জেলার ধান রোয়া হয়ে গিয়েছিল। তামাখুনে ৭৫-৭৬ বিঘার এক বাঁধ আছে। ভীম জানালেন, গত বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করে সে বাঁধের সংস্কারও হয়েছে। এই বর্ষায় তার জল তলানিতে। বাঁধের নীচে বিঘার পর বিঘা জমি মাঠ হয়ে আছে। গরু চরছে। চাষই হয়নি। এই বাঁধের জলে বুন্দিয়া, তামাখুন মৌজার চাষ হয়ে যায়।

 

ভীম জানালেন, মানবাজার ১, মানবাজার ২, বান্দোয়ান, বরাবাজার, পুঞ্চা সর্বত্রই এক অবস্থা ১০ শতাংশ চাষ হয়েছে কি না সন্দেহ। বললাম সেকি, কাগজে লিখেছে আপনাদের উপ-কৃষি অধিকর্তা চন্দন পাল জানিয়েছেন, পুরুলিয়ায় ৬৯% জমিতে ধান রোয়া হয়ে গিয়েছে। ভীম বললেন, ব্যাপারটা কি জানেন তো আপনি গাড়ি চেপে বান্দোয়ান থেকে পুরুলিয়া গেলেন, দেখলেন পথের দু’পাশে ধান লাগানো হয়েছে। আরে ওতো বহাল জমি। ভাবলেন খুব চাষ হয়েছে। উনারা তো গাড়ি থেকে নামেন না। কানালি, বাইদ জমিতে চাষ কোথায়? অধিকর্তা অবশ্য একই সঙ্গে জানিয়েছেন, জেলার ৫৫ শতাংশ উঁচু জমি অর্থাৎ কানালি ও বাইদ জমিতে এ বছর আর চাষই হবে না।”

 

হাহাকার মুর্শিদাবাদেও। আমপানে মার খেয়ে এ বছর রাজ্যে দেড় গুণ বেশি জমিতে পাট চাষ করেছিলেন চাষিরা। মুর্শিদাবাদ তার অন্যতম। বৃষ্টির অভাবে পাট পচানোই যায়নি। শুধু তাই নয়, যেখানে বিঘায় ৪ কুইন্টাল পাট হয় এবার এক থেকে দেড় কুইন্টাল হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ অবধি পাট চাষের ১২টি জেলায় মাত্র ২০% পাট তোলা গিয়েছে। আর বাজারে পৌঁছেছে ৫ শতাংশ পাট। এই তথ্য পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কৃষক সভার। পাট চাষের মার সামলানো যায়নি এদিকে ধানের মরশুমেও অনাবৃষ্টি। বহরমপুর ব্লকের ছয়ঘেরি গ্রামের মৌসুমি বিশ্বাস জানান, বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। দু’দিন বৃষ্টি হল তো, ১০ দিন বৃষ্টি নেই। তার উপর সূর্যের তীব্র তাপে জল টেনে নিচ্ছে। অধিকাংশ চাষিই চাষ করতে পারেননি। পাটে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, ধানেও হবে। তিনি আরও জানান, নদী থেকে জল তুলে যেখানে চাষ হয় সেই বহরমপুরের একাংশ, হরিহরপাড়া, ডোমকল, জলঙ্গিতে ধান রোয়া গিয়েছে। ডিপ টিউবয়েলের জলে কিছু ধান রোয়া হয়েছে। কিন্তু, অধিকাংশ জমিতে চাষই হয়নি। যা হয়েছে তাতে ফলন কী হবে সে নিয়েও ধন্দে এই কৃষকরত্ন উপাধি পাওয়া প্রান্তিক চাষি।

 

তুলনামূলক ভাবে ভাল খবর পাওয়া গেল বাঁকুড়া খাতড়া থেকে। বরমেটালা গ্রামের বাহাদুর রজক শ্রাবণ মাসের শুরুতেই পরিবারের ৬০ বিঘা জমির ৫০ বিঘাতেই ধান লাগাতে পেরেছেন। বাকিটা সবজি। সৌজন্য শ্রাবণের ঝাঁপানো বৃষ্টি এবং কংসাবতীর সেচের জল। সেচ খাল আর জোড় লাগোয়া তাঁদের জমি। ব্লকের ডাঙ্গা জমি ছাড়া সর্বত্রই চাষ হয়েছে বলে তিনি জানান। এখন বৃষ্টি না থাকলেও সেচ খালে যা জল আছে তাতেই ধান উঠে যাবে বলেই তাঁর আশা।

 

গলসি ২ এর ১৪০০ হেক্টর জমিতেই চাষ হয়েছে। কিন্তু জেলার জঙ্গলমহল এলাকার আউশগ্রাম ১ ও ২ ব্লকে বহু জমিতেই চাষ হয়নি। মঙ্গলকোট ও খণ্ডঘোষের কিছু জমিতেও চাষ সম্ভব হয়নি। অন্যত্র সব জমিতেই ধান রুইতে পেরেছেন চাষিরা। কিন্তু, কেমন হয়েছে চাষ? এই ঘাটতি বৃষ্টিতে। ভয়ের কথা শোনালেন গলসির কুতুবউদ্দিন মণ্ডল। ডিপ টিউবওয়েল আর ডিভিসি-র সেচের জলের উপর নির্ভর করা চাষে এবার ধানগাছের বাড় গেছে কমে। মাটির নীচের জল তুলে তুলে ঢাললেও জমিতে জল দাঁড়াচ্ছে না। জমি শুকিয়ে ফাটল ধরে গেছে। আষাঢ়ে বৃষ্টিই হয়নি। আবহাওয়া ও কৃষি দফতরের হিসাব মতো দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৪৬ শতাংশ। কুতুবউদ্দিন বলেন, শ্রাবণ মাসে কিছুদিন ভাল বৃষ্টি হওয়ায় শ্রাবণের ২০-২৫ (৬-১১ অগস্ট) থেকে ভাদ্রের ৫,৭, ১০ তারিখ (২২-২৭ অগস্ট) পর্যন্ত ধান রুইয়েছেন কৃষকরা। আবারও বর্ষা তার খামখেয়ালি রূপ দেখাতে শুরু করে।

 

কুতুবউদ্দিন, মানস হাজরারা জানালেন, উচ্চ ফলনশীল ধানগাছ যেখানে ১৪ থেকে ১৮টা পাশকাঠি ছাড়ে সেখানে বড় জোর ৮ থেকে ১০টি পাশকাঠি দেখা যাচ্ছে। কোনও কোনও মৌজায় সেটাও ছাড়েনি। যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন বৃষ্টি কিংবা ডিভিসির জলে ভাসিয়ে দিলেও আর কোনও লাভ নেই। সময়টাই পেরিয়ে গিয়েছে।

 

বাংলার চাষ ও চাষি যে গভীর সঙ্কটে এই উপলব্ধিটি কর্তাব্যক্তিদের আছে বলে মনে হয় না, তারা বরাভয় দিচ্ছেন। ধানের গোলা বর্ধমান থেকে যখন মানস হাজরা, কুতুবউদ্দিন মণ্ডলরা বলছেন এবার ২০-২৫ শতাংশ উৎপাদন কম হবে। ২২ অগস্টের সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর যেখানে অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রায় ৩৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ হয়েছিল সেখানে এই একই সময়ে ২৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে রোপণ হয়েছে। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, বীরভূমে ৫৫% জমিতে, পুরুলিয়ায় ৬৫%, মুর্শিদাবাদে ৩৮ শতাংশ, মালদহে ৩০% জমিতে চাষ হয়নি। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২২ অগস্ট ২০২২) ৪ সেপ্টেম্বরের আর এক রিপোর্ট রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে, অবস্থার উন্নতি হয়েছে। গত বছর ৪২ লক্ষ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছিল এবার ৩৯ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা গিয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র তিন লক্ষ হেক্টর কম চাষ হয়েছে। যদিও রাজ্যে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৩ লক্ষ হেক্টর। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২)

 

কোন মন্ত্রবলে এতটা ‘উন্নতি’ হল তা কৃষিমন্ত্রীই জানেন। ৬-৮ সেপ্টেম্বর পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমানের চাষিদের সঙ্গে কথা বলে এমন ‘উন্নতি’র কথা শোনা যায়নি। উল্টে মৌসুমি বিশ্বাস মুর্শিদাবাদকে খরা কবলিত জেলা বলে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর আরও দাবি, যেসব চাষিরা কেসিসি (কিষান ক্রেডিট কার্ড) ঋণ নিয়েছেন তাঁদের ঋণ মকুব করুক সরকার।

 

ছবি : শেখ লিয়াকত আলি ও ভীম মাহাত।

 

Share this
Leave a Comment