সেন্ট জেভিয়ার্স বিতর্ক: প্রশ্ন উঠুক শিক্ষা মহলের ভূমিকা নিয়ে


  • August 14, 2022
  • (0 Comments)
  • 305 Views

সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকাকে বরখাস্ত করার ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদ মাধ্যম উত্তাল। এত কিছুর মাঝে যা নিয়ে কথা হচ্ছে না, তা হল অ্যাকাডেমিক মহলের ভূমিকা। এখানকার শিক্ষাক্ষেত্রের দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক চরিত্রটি রয়ে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে। এই বিষয়টির উপরেই আলোকপাত করে বিশেষ লেখাটি লিখলেন প্রতিবন্ধী ও নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মী শম্পা সেনগুপ্ত

 

সম্প্রতি কলকাতার জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকাকে বরখাস্ত করা নিয়ে নানা কথা শুনতে শুনতে গিয়ে মনে হচ্ছে এই ঘটনা যেন এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কলকাতায় উচ্চ শিক্ষার জগতে প্রথম এই ধরনের নারী বিদ্বেষী ঘটনা ঘটল।

 

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, অধ্যাপিকা বরখাস্তের ঘটনাটি একেবারেই মেনে নেওয়া উচিত নয়। তিনি কী পোশাক পরবেন, কোন ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবেন এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের থাকতে পারে না। কিন্তু সত্যিই কি একজন ছাত্রের অভিভাবকের অভিযোগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় এই অন্যায়টি করেছে? এইভাবে ভাবলে বোধহয় ঘটনাটির বড় বেশি সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে, তাই নয় কি? এই একমাত্রিক চিন্তার বাইরে গিয়ে যদি আমরা আরেকটু বিশদে ভাবি? অভিযোগকারী ছাত্র এবং তার পিতা সম্পর্কে কতশত মীম, স্ট্যান্ড আপ কমেডি, জোকস তো ইতিমধ্যেই দেখা হয়ে গেল অথচ সত্যিই কোনও অভিভাবকের কাছ থেকে অভিযোগ এসেছিল কি না তা এখনও স্পষ্ট হল না।

 

আমরা এবার পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ শিক্ষার পরিস্থতি কতটা পুরুষতান্ত্রিক তা একবার ফিরে দেখি। এই ২০২২ সালেও কলকাতা শহরে এমন কলেজ আছে যেখানে ছাত্রীরা ইউনিফর্ম হিসাবে শাড়ি পরে যেতে বাধ্য হয়। একটি মেয়েদের কলেজে ছাত্রী একটি ক্লাসেও অনুপস্থিত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তার বাবা-মার কাছে এসএমএস চলে যায়। অন্য একটি গার্লস কলেজ আছে যেখানে ক্লাস না থাকলেও ছাত্রীদের বিকেল তিনটে অব্দি কলেজে আটকে থাকতেই হবে। তারা চাইলেও কোনোভাবেই কলেজ প্রাঙ্গণের বাইরে যেতে পারবে না। “উচ্চ শিক্ষা” পাওয়ার অভিলাষে ছাত্রীরা এইসব নিয়ম মেনে নিতে বাধ্য হয়।

 

মেটারনিটি বেনিফিট আইন অনুযায়ী আমাদের দেশে যেখানে ৫০ জনের বেশি কর্মী আছে সেখানে উপযুক্ত crèche থাকা নিয়ম। বছর তিন আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা বাড়িতে দু’বছরের কন্যা সন্তানকে একা রেখে যেতে না পারায় তাকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। এর জন্য তার বিভাগের  প্রধান এবং অন্য সহকর্মীরা তাকে নানাভাবে হেনস্থা করেছিলেন। তাকে বারবার করে বলা হয়েছিল তার চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত, কারণ ঘরে থেকেই সন্তান ঠিক মত মানুষ করতে পারবেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে crèch ফেসিলিটি রাখা উচিত সে কথা কেউ তাকে বলেননি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব টিচারস্ ইউনিয়ন আছে। তাদের কি আমরা এই crèche ফেসিলিটি-র প্রয়োজন সম্পর্কে খুব বেশি সরব হতে দেখেছি?

 

আর কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যৌন হেনস্থার বিষয়টি নিয়ে যদি বলতে শুরু করা যায় এত ঘটনা আছে যে, একটি লেখায় শেষ করা যাবে না। এর মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের প্রচারে আসে। কিছু ঘটনা নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই হয়। কিছুদিন বাদে সবাই সেসব কথা ভুলে যাই। একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট হোক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানেই এই ঘটনা ঘটে থাকুক না কেন কোন ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীনি সুবিচার পাননি। প্রতিটি ক্ষেত্রে জয় হয়েছে পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণার। খাতায়-কলমে অনেক কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট কমিটি আছে কিন্তু একটুখানি কান পাতলেই শোনা যায় বিভিন্ন সময় ছাত্রীরা তাদের ওপর ঘটা হেনস্থার কথা কথা নানাভাবে ব্যক্ত করছেন কলেজের বাইরের পরিসরে, ফর্মাল কমপ্লেন করতে ভয় পেয়েছেন। কখনো তা ফেসবুকে একটু রাগের প্রকাশ কখনো বা অবসরের আড্ডার রসালো গল্প হয়েই এইসব যৌন হেনস্থার ঘটনাগুলো থেকে গেছে। অ্যাকাডেমিক মহলের তীব্র প্রতিবাদ আমরা কখনোই দেখতে পাইনি।

 

এই প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে যদি জেভিয়ার্সের বর্তমান ঘটনাটি দেখি তাহলে কোথায় আমরা ভুল করছি সেটাও একটু দেখা দরকার। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কলকাতার অ্যাকাডেমিক মহলের চলমান পুরুষতান্ত্রিকতার আরও একটি জঘন্য নিদর্শন। বছর চারেক আগে কলকাতার এক সমকামী স্কুল শিক্ষক জানিয়েছিলেন তার যৌন পরিচিতির ভিত্তিতে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সেইসময় অভিজিত কুন্ডু নামে ঔ শিক্ষক এর পাশে অনেক জেন্ডার রাইটস এক্টিভিষ্ট দাঁড়িয়েছেন, অনেক লেখালেখিও হয়েছে। অথচ তারপরে অভিজিত কুণ্ডু আর চাকরি পেলেন কিনা, কলকাতার শিক্ষাক্ষেত্র কতটা জেন্ডার ইনক্লুশন করল সে খবর আর আমরা রাখিনি। জেভিয়ার্স এর ঘটনার প্রতিবাদ তো নিশ্চয়ই করা উচিত কিন্তু সামগ্রিক শিক্ষাক্ষেত্রকে জেন্ডার সচেতন করার এক সুনির্দিষ্ট প্রয়াস বড়ই প্রয়োজন। একাডেমিক মহলকে উইমেন’স স্টাডিজ-এর নামে বছরে একটি দু’টি সেমিনারের বাইরেও অনেক কাজ করতে হবে। তা নাহলে, আবার কয়েক বছর বাদে আমরা আবার অন্য কোনও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সই সংগ্রহ করব, সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করব। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। শিক্ষা জগতের দায় এই অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখানোর। এই দায়িত্ব তারা নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না।

Share this
Leave a Comment