বানের জলে ভাসছে শিলচর, তৃষ্ণার জলের জন্য হাহাকার


  • June 27, 2022
  • (0 Comments)
  • 1117 Views

বন্যার জলে গৃহবন্দি শিলচর শহর। জল নেই, খাবার নেই, ওষুধ নেই। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবস্থা হয় বিচ্ছিন্ন কিংবা অতি দুর্বল। বানের জলে ইতিউতি ভেসে উঠছে লাশ। সাত দিনের বেশি এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেন শিলচরের বাসিন্দা অপরাজিতা দে। শহরের, সহ-নাগরিকদের, এবং নিজের সেই অসীম দুর্দশার কথা গ্রাউন্ডজিরোকে জানালেন তিনি। একটি নাগরিক প্রতিবেদন।     

 

তারিখ ২৫ জুন, রাত ৮টা, এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী শিলচর শহরে, শুধুমাত্র শহরে তিনটা লাশ ভেসে উঠেছে। বন্যায় ডুবে হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা সংবাদমাধ্যমে এখনও বেরোয়নি। শহর শিলচর ভাল নেই, সুস্থ নেই। ‘শহর’ শব্দের উচ্চারণ খুব সচেতন ভাবেই একটু জোর দিয়ে নিলাম, কারণ শহরের বাইরের খবর এই উপত্যকার মানুষের কাছেও নেই পুরোটা। এই ‘নেই’ এর অনুপাতই এখন শিলচরে বেশি। গ্রামের খবর ‘নেই’, পানীয় জল ‘নেই’, খাদ্য ‘নেই’, বিদ্যুৎ ‘নেই’, ইন্টারনেট ‘নেই’, মোবাইল নেটওয়ার্ক ‘নেই’, ওষুধ ‘নেই’, কোনও যোগাযোগ মাধ্যম ‘নেই’, বাড়ি-ঘর ‘নেই’, মনে শক্তি ‘নেই’, দেহে প্রাণ ‘নেই’। আছে শুধুমাত্র জল, মানুষের হাহাকার, একটু বেঁচে থাকার কাতর আর্তনাদ।

 

যারা এই পরিস্থিতির শিকার হননি কোনওদিন, হতেও যেন না হয়; তারা একবার ভেবে দেখুন। শনিবার কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার সময় দেখলেন শহরের অনেক রোডে হাঁটু জল। আপনি নিশ্চিত কারণ এখনও পর্যন্ত কোনওদিন বন্যায় আপনার বাড়ি জল ওঠেনি। কিন্তু রোববার আপনার এবং পরিচিত আরও অনেকের উঠোন পর্যন্ত জল। বিদ্যুৎ সকাল থেকে নেই। প্রথম উপলব্ধি করলেন বিদ্যুৎ খুব তাড়াতাড়ি আসবে না, তাই মোমবাতিটা বা কেরোসিনের বাতিটা বা ইনভার্টার দিয়ে আলো সাবধানে জ্বালাতে হবে। বাজারে গিয়ে কিছু জিনিস কিনতে গিয়ে দেখলেন যে দোকানপাট বন্ধ, আপনি নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসই না কিনে বাড়ি ফিরলেন। সোমবার আসতে আসতে আপনার ঘরে হাঁটু জল, আপনার গলিতে গলা জল এবং অন্যান্য অঞ্চলের অনেকের বাড়ির গ্রাউনফ্লোর জলের তলায়, অনেকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তার পর বুঝতে পারলেন খেতে বসেও একটু মেপে খেতে হবে, জল বাড়ছে বেরোতে পারবেন না বা দোকান খোলা পাবেন না অনেক দিন। তারপর বুঝতে পারলেন, যে জল বেমালুম প্রতিদিন ব্যবহার করেন সেটাও মেপে ব্যবহার করতে হবে। এভাবে কারও দু’দিন, কারোর তিন দিন, কারোর চার দিন পর্যন্তও কাটল। তারপর? মোমবাতির শেষ আলো টুকুও নিভে গেল, জলের শেষ বিন্দু দিয়ে গলা ভেজালেন এবং এই আশায় প্রহর গুণছেন যে কেউ যদি এসে সাহায্য করে যায়। ফোন পুরো বন্ধ হওয়ার আগে আপন জনকে জানিয়ে রাখলেন, পাশের শহরের ভাইবন্ধুদের জানিয়ে রাখলেন। এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আপনার নিজের কোনো কিছু বোঝার আগেই আপনি পুরো জলবন্দি হয়ে গেলেন, কারণ কোনও সতর্কবাণী দেওয়া হয়নি। বুধবার আসতে আসতে আপনি একদম বিধ্বস্ত।

 

শিলচরে ১৮ তারিখ, শনিবার থেকেই বন্যার জল বাড়তে থাকলেও মানুষ অজান্তেই ফাঁদে আটকে পড়ল। ইনভার্টার বা পাওয়ার ব্যাঙ্কের সুবিধে বেশিরভাগ মানুষেরই নেই। খাদ্যসামগ্রী বেশির ভাগ মানুষই খুব বেশি হলে এক সপ্তাহের জন্য সংগ্রহ করে রাখেন। দিন আনা দিন মজুরের কথা এখানে লিখছিই না, তাঁদের সংগ্রামটা আরও কঠিন, তাদের সাথে কথা না বলে তাদের কথা লেখাটাই অনুচিত। যাদের ঘরে খাদ্য আছে পর্যাপ্ত, তাঁদের কাছেও জল নেই। বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে খেলেই হয়–এই ধরণের উত্তরই অনেকের মাথায় ঘুরছে নিশ্চয়ই। কিন্তু যখন সবাই উপলব্ধি করল স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে অনেক দিন লাগবে, ততক্ষণে বন্যায় অনেকের বাড়ি জলের তলায় হারিয়ে গেছে বা অনেকে নিজের বাড়িরই ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন এবং বৃষ্টি তখন প্রায় নেই। তার পরও অনেকেই বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে সেটা খেয়েই বেঁচে আছেন। যাদের সেই জল নেই তারা বন্যার দূষিত জল ফুটিয়ে খাচ্ছেন। এটাতেও সমস্যা আছে, জল না ফুটিয়ে খাওয়া মানে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। অতিরিক্ত পরিমাণ জল ফোটাতে গিয়ে অনেকেরই রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। ফলে খাদ্য ও জল দুটোর অভাবে কত জন মারা যাচ্ছেন সেই অঙ্ক কোনওদিন মিলবে না। অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনার উদ্দেশ্যে শিলচর আসে, অনেকে চাকরির জন্য শিলচর বাড়ি ভাড়া করে থাকে। বাড়ির মালিক যাঁদের সাহায্য করছেন তাদের দেহে প্রাণ আছে। যাঁদের মালিক নেই? এক দু-সপ্তাহের খাদ্যসামগ্রী ক’জন ছাত্রের আছে! অনেকের বাড়িতে শিশু আছে, তার খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তার ওষুধ নেই। অনেকের বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা অথবা আত্মীয় পরিজন আছেন যাদের নির্দিষ্ট খাবারের প্রয়োজন, নির্দিষ্ট ওষুধের প্রয়োজন, দুটোর কোনওটাই নেই। এখানেও দুর্ভোগের শেষ নয়। অনেকের বাড়ির আত্মীয় প্রিয়জন মারা গেছেন। প্রিয়জনের মৃত দেহ চোখের সামনে গলে-পচে বিকৃত আকার ধারণ করেছে। বাধ্য হয়ে এখন সেগুলো মানুষ বন্যার জলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। কারণ শ্মশানভূমিও জলের তলায়। প্রতিদিন বন্যার জলে মৃতদেহ ভেসে উঠছে। বন্যার জলে ডুবে, নাকি সাপের কামড় খেয়ে, নাকি অন্য কোনও অজ্ঞাত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সেই রহস্য কোনওদিন উদ্ধার হবে না। এক জন মৃত বাজারের ব্যাগ হাতে আঁকড়ে ধরে আছেন। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে পরিবারের মুখে দুটো অন্ন তুলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন নিশ্চয়ই। এক জন মৃতের শরীর ভেলায় খোলা আকাশের নিচে রাখা। এই ভেলা দিয়ে কেউ আর স্বর্গ থেকে এই মানুষটার প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসবে না।

 

শিলচরে এই বন্যার জন্য মানুষ গৃহবন্দি অবস্থার আজ সাত দিন। অনেকের ঘরে আজও এক বোতল জল নিয়ে কেউ যেতে পারেনি, এক প্যাকেট বিস্কুট অথবা একটু চিড়ে বা একটু চাল-ডাল নিয়ে কেউ যেতে পারেনি। এখনও অনেকের বাড়ি জরুরি ওষুধটা কেউ চাইলেও পৌঁছে দিতে পারছেন না, চোখের সামনে আপনজনের তিলতিল করে প্রাণ বেরিয়ে যেতে দেখছেন, অনেকের বাড়িই জল এবং অন্ধকারে ডুবে থাকে, পরিবার-পরিজনের সাথে এখন আর যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। ফেসবুক খুললেই শুধু ‘আমার বাবা কিডনির রোগী, এই ওষুধ না পেলে মারা যাবেন’; ‘আমার মা ক্যান্সারের রোগী, অমুক ওষুধ না পেলে মারা যাবেন’; ‘আমার বাড়ি তিন মাসের বাচ্চা আছে, সে হৃদরোগে আক্রান্ত তাই মায়ের দুধ খাওয়ানো যাবে না, তার কোনও খাওয়ার নেই’। তাঁরা সবাই বেঁচে আছেন কি না কেউ জানে না। যাঁরা নিজের পরিবার বা বৃদ্ধ মা-বাবাকে এখানে রেখে চাকরির বা পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বাইরে থাকেন, তাঁদের মানসিক অবস্থা অকল্পনীয়। নেটওয়ার্ক নেই অথবা ব্যাটারি নেই। তাঁরাও অসহায় হয়ে ফেসবুকে নিজের বাড়ির ঠিকানা পোস্ট করছেন। ‘অমুক লেনে আমার বৃদ্ধ মা-বাবা থাকেন, তিন দিন ধরে যোগাযোগ নেই তাঁদেরকে কেউ খাবার পৌঁছে দিন’; ‘অমুক লেনে আমার স্ত্রী আর চার বছরের ছেলে আছে, তাঁদেরকে জল পৌঁছে দিন’। কিন্তু কে কার কথা শুনবে? কয়েক হাজার মানুষের কয়েক লক্ষ অসহায়তার বার্তালিপি দিয়ে এই আরেক বন্যা বইছে ফেসবুকে।

 

হ্যাঁ, অনেক হেল্পলাইন নাম্বার দেওয়া আছে, সেটা ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু অগণিতবার ফোন করার পরও আপনি ওপাশে পৌঁছতে পারবেন না, অথবা পৌঁছলেও শুধুমাত্র আপনার নাম ঠিকানা লিখে রাখা হচ্ছে। তাছাড়া যাদের নেটওয়ার্ক নেই বা বিদ্যুৎ নেই বলে ফোন অফ, তাদের যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ। পাশের শহর থেকে কেউ তাঁদের হয়ে ফোন করতে গেলে, সঠিক ঠিকানার প্রয়োজন। হ্যালিকপ্টার দিয়ে ত্রাণসামগ্রী বণ্টন করা হচ্ছে, সেই সংবাদও একদম সঠিক। কিন্তু সেটা পাচ্ছে কে, কেউ জানে না। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদে দাঁড়িয়ে ত্রাণের জন্য হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকল। কিন্তু একশোটা বিল্ডিং-এর মধ্যে একটা ছাদে গিয়ে পড়ল সেই ত্রাণ। এনজিও-গুলো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন বা ক্লাবের যুবকরা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের প্রাণের বাজি রেখে মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদেরকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে। কিন্তু কয়েক হাজার ফোন, এসএমএস হোয়াটসঅ্যাপ থেকে সবার কাছে চাইলেও তাঁরা পৌঁছতে পারছে না। তাছাড়া অনেক দোকান, গুদাম ঘর, এটিএম জলের তলায়। খাদ্যসামগ্রীর অভাব, জিনিস পেলে সেটা নিয়ে যাওয়ায় জন্য নৌকার অভাব, নৌকা পাওয়া গেলে জলের প্রবল স্রোত তাঁদের সমস্ত ইচ্ছা ও উদ্যমকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশের করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলার একাধিক অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক মানুষ শিলচরে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করছেন, কিন্তু রাস্তা যে নেই। শিলচর শহর একটা দ্বীপে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া কিছু দিন আগের বন্যায় বরাক উপত্যকার সাথে বাইরের সংযোগ রেলপথে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, হাইওয়ে যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আছে, সেটাকেই হয়তো নরক দর্শন বলে। ফলে পুরো উপত্যকাতেই খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের হাহাকার। ভুবনেশ্বর থেকে এনডিআরএ-এর একটা ছোট দল এসেছে বটে, কিন্তু সেটা সমুদ্র থেকে চামচ দিয়ে জল তোলার নামান্তর। ঘন জনবসতিপূর্ণ শিলচরের অলিগলি তাঁদের চেনা নেই, অনেক গলি দিয়ে উদ্ধারের নৌকা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে রক্ষাকার্য বা ত্রাণ বিতরণ হয়নি। সাহায্যের অপেক্ষায় অনেকেরই আয়ু ফুরিয়ে গেছে।

 

বলা হচ্ছে বাঁধ কেটে বন্যা আনা হয়েছে। বন্যা কারও বিলাসিতা হতে পারে এটা শিলচর ছাড়া হয়তো কোথাও শোনা যাবে না। তাহলে সব শেষে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। বাঁধ কে বা কারা কেটেছে? বাঁধ কেন কাটা হয়েছে? তাদেরকে কি খুঁজে বের করা হয়েছে? বাঁধ কাটার ভিডিও নাকি ভাইরাল হয়েছে, তাহলে সেই ‘ভাইরাল’ ভিডিও সবার কাছে পৌঁছচ্ছে না কেন? তাদের সনাক্ত করা হয়ে থাকলে তাদের কি কোনো শাস্তি হবে? এক শনিবার থেকে আরেক শনিবারে পৌঁছেও কিছু অঞ্চলে এখনও এক বিন্দু জল পৌঁছায়নি। কেন পৌঁছায়নি? যে ছেলেগুলো এই বিষাক্ত জলে ডুবে কোনও ভাবে মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনার বা তাঁদেদেরকে ন্যূনতম খাবার পৌঁছে দিয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ রক্ষা করছে, তাঁদের কিছু হলে সেই দায়িত্ব কে নেবে? তাঁরা অসুস্থ হলে চিকিৎসার দায়িত্ব কার? সেই শনিবার ১৮ জুন যখন শিলচরের লিংক রোড, সোনাই রোড এবং শহরের অন্যান্য অনেক অঞ্চলে হাঁটুর উপরে জল, তখন কাছাড়ের এক মন্ত্রী ত্রিপুরা আরেকজন গুজরাটে কেন ছিলেন? যদি বলা হয় এই রস্তাগুলোতে প্রতি বছর বর্ষায়ই জল হয়, এগুলো কৃত্রিম বন্যা, তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় প্রতিবছর এই এলাকার জনসাধারণকে কৃত্রিম বন্যার মুখোমুখি হতে হয় কেন? অনেকে বলছেন প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছে তাই এমন বন্যা হয়েছে। প্রকৃতি রুষ্ট হওয়ার কারণ কী? তার জন্য দায়ী কি শুধু সরকার বা প্রশাসন না আমরা সাধারণ মানুষও? আমাদের কি চাই, শপিং মল নাকি পুকুর? ধান খেত নাকি উঁচু ফ্ল্যাট বাড়ি? চা বাগান নাকি এয়ারপোর্ট? সবুজ ঘন পাহাড়ি রাস্তা নাকি সব ধ্বংস করে চার লেনের রাস্তা? এই প্রশ্নগুলো আগে ভাবতে শিখতে হবে। ‘ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন’।

 

Share this
Leave a Comment