হেলেন কেলার – প্রতিবন্ধী অধিকার ও নারী অধিকার আন্দোলনের এক দৃঢ় রাজনৈতিক স্বর


  • June 27, 2022
  • (0 Comments)
  • 419 Views

হেলেন কেলার। না, তিনি শুধু আমাদের পাঠ্যপুস্তকের মণীষীদের ছোট ছোট গল্পের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া কোনও মহামানবী নন, সিনেমায় উঠে আসা কোনও অলৌকিক, অদ্ভূত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলা ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ নারী নন, হেলেন কেলার – প্রতিবন্ধী ও নারী আন্দোলনে রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত করার একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। হেলেন কেলার-এর ১৪২তম জন্মদিন পেরিয়ে তাই নতুন করে প্রতিবন্ধী অধিকার, নারী অধিকার ও রাজনৈতিক-সামাজিক অধিকারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাঁর পাঠ ও চর্চা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনের কথা বললেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

নারীর শরীর, নারীর অধিকার – সারা পৃথিবী জুড়ে যত বেশি এই বিষয়টি নিয়ে নারীবাদী আন্দোলন উত্তাল হয়ে উঠছে তত বেশি করে বিষয়টির উপরে নানা দিক থেকে নেমে আসছে বিভিন্ন রকমের আঘাত, কোণঠাসা করে দেওয়ার বিবিধ প্রক্রিয়া চোখে পড়ছে বিশ্বের নানা দেশেই। তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশে সে দেশের মহিলাদের গর্ভপাতের অধিকার খর্ব হয়ে যাওয়া। আমেরিকায় অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে মহিলাদের নিজের শরীরের উপর ব্যক্তিগত অধিকারের নিরিখে গর্ভপাতের যে অধিকার দেওয়া ছিল, তা এই সাম্প্রতিক রায়ে কার্যত বাতিল হয়ে গেল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র্রের বিভিন্ন স্টেট-এ এখন সেখানকার নিয়ম অনুযায়ী গর্ভপাতের অধিকার বজায় রাখতে পারবে বা বাতিল করতে পারবে। এ যেন নারীর অধিকার আন্দোলনে ৫০ বছর পিছিয়ে যাওয়ার সমান, যেখানে আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের তথাকথিত উন্নততম দেশে মহিলাদের নিজের ইচ্ছে ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সন্তান ধারণ বা না ধারণের অধিকারকে আইনত আটকে দেওয়া হচ্ছে, নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে, এমনকি হয়তো আইনত অপরাধ হিসাবেও গন্য করা হতে চলেছে।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতেই যে মানুষটির ১৪২তম জন্মদিন ২৭ জুন ২০২২, তাঁকে মনে করাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হেলেন কেলার। না, তিনি শুধু আমাদের পাঠ্যপুস্তকের মণীষীদের ছোট ছোট গল্পের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া কোনও মহামানবী নন, সিনেমায় উঠে আসা কোনও অলৌকিক, অদ্ভূত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলা ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ নারী নন, হেলেন কেলার – প্রতিবন্ধী ও নারী আন্দোলনে রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত করার একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গর্ভপাতের অধিকার খারিজের রায়ের ঘোষণা শোনার পর তাই ১৯১৪ সালে করা তাঁর একটি উক্তি অত্যন্ত সময়োপযোগী মনে হয় – “No one has ever given me a good reason why we should obey unjust laws.” হেলেন কেলার জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে সরব ছিলেন আজীবন এবং তাঁর রাজনৈতিক কাজের মধ্যে নারী অধিকারের এই বিষয়গুলি বরাবর প্রাধান্য পেয়েছে, তিনি মন্তব্য করেছেন, “Every child has a right to be well-born, well-nurtured and well-taught, and only the freedom of women can guarantee him this right,” তিনি জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার লড়াইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের পুরুষদের তুলনায় হীন প্রতিপন্ন করার মানসিকতাকে তিনি খারিজ করেছন এই বলে যে, “The inferiority of women is man-made.” সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মহিলাদের সম্পূর্ণ সমানাধিকারের পক্ষে সওয়াল করে গেছেন।

 

এতগুলি বছর পেরিয়ে এসে আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে হেলেন কেলার-এর মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে যদি আমরা ফিরে না দেখি, তাহলে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়। এবং আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে অনবরত কাজ চলে ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার বা ইতিহাসের এক এমন চিত্র নির্মাণের যা দেখালে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা নষ্ট হয় না, বৈষম্য ও সমানাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। সেই কারণেই তাঁর জীবিতাবস্থাতে ও মৃত্যুর পরেও হেলেন কেলার-এর রাজনীতি, নারী অধিকারের প্রশ্নে তাঁর লড়াই সব সময়েই আলোচনার বাইরে রয়ে যায়। হ্যাঁ, তাঁকে দেখানো হয় একজন অনুপ্রেরণা হিসাবে। যিনি তাঁর একাধিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে একজন মহিয়সী নারী হয়ে উঠেছেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা, শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা ও কথা বলার প্রতিবন্ধকতা ছিল তাঁর। এইসব সহ-ই তিনি তৎকালীন র্যাপডক্লিফ কলেজ যা পরবর্তী সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে, সেখানে পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন। বই লেখেন, বক্তৃতা দেন, কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশ। তাঁর শিশুকাল থেকে বড় হয়ে ওঠা, সেখানে তাঁর বিভিন্ন কিছু শেখার যে লড়াই, মনের জোর তা চমৎকারভাবে ছোটদের পড়ানো হয়, এমনকি আমরা বড়রাও অবাক হয়ে যাই। অথচ তাঁর সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগদান, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তাঁর রাজনীতি, দারিদ্র্য-প্রতিবন্ধকতা-শ্রমিকদের সমস্যার মধ্যে যোগসূত্র উপস্থাপনে তাঁর ভূমিকা, মহিলাদের সমানাধিকার, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পক্ষে তাঁর অবস্থান, ফ্যাসিজম-এর সর্বতোভাবে বিরোধীতা – এই অতি প্রয়োজনীয় দিকগুলি রয়ে যায় আলোচনা ও জানার পরিধির বাইরে। খুব নির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত কর্মীরা, গবেষকেরা ছাড়া হেলেন কেলার-এর সামাজিক, রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে অন্যান্যদের মধ্যে তেমন চর্চা আজও চোখে পড়ে না, এমনকি আলাদাভাবে নারী আন্দোলনেও নয়। অথচ নারী আন্দোলনের মনে রাখা দরকার ১৯১২ সালে হেলেন লিখেছিলেন কাজের জায়গায় মহিলাদের অধিকার প্রসঙ্গে, “The woman who works for a dollar a day has as much right as any other human being to say what the conditions of her work should be,” এবং তারও আগে ১৯০৪-এ লিখছেন, “I think the degree of a nation’s civilization may be measured by the degree of enlightenment of its women.”

 

হেলেন কেলার-এর জীবন নিয়ে যখনই যেটুকু কথা ওঠে সেখানেই তাঁকে যেন এক চিরন্তন শিশুর মতোই উপস্থাপনা করা হয়। যে তার প্রতিবন্ধকতার কারণে অস্থির, রাগী, ধৈর্য্যহীন। তারপর ধীরে ধীরে শিক্ষকের সহায়তায় তিনি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করছেন, সেগুলি সত্ত্বেও তিনি জীবনে সফল হয়ে উঠছেন, শান্ত হয়ে যাচ্ছেন, তাঁর মতো আরও মানুষকে প্রেরণা দিচ্ছেন। তাঁর মধ্যে কোনও দোষ নেই, তিনি ব্যক্তি মানুষ কেমন তা জানা যাচ্ছে না, প্রায় একজন দেবী করে তোলা হচ্ছে তাঁকে। সমস্যাটা ঠিক এখানেই। একজন প্রতিবন্ধী এবং একজন নারী। এই দুই পরিচয়েই আরও অসংখ্য প্রতিবন্ধী নারীর মতোই হেলেন কেলার-এরও পরিচিতির দিক থেকে দু’ভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। প্রতিবন্ধী নারী হিসাবে তাঁর লেখাপড়া, কাজ, লেখালেখি, রাজনীতি, সক্রিয় আন্দোলন – এগুলি কিছুই প্রাধান্য পাচ্ছে না। তিনি এই সময়ের যে সামাজিক মডেল-এর প্রেক্ষিতে সেই সময়েই প্রতিবন্ধকতাকে দেখতে পেরেছিলেন তাই আটকে যাচ্ছে করুণা ও প্রেরণার প্রচলিত ছকে। তিনি তাঁর সোশ্যালিস্ট রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় ও আদর্শে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিকেও বিশ্লেষণ করেছিলেন। যেভাবে তাঁর মতো একজন মানুষকে দেখানো হয় তা হল – ‘আহা, প্রতিবন্ধী হয়েও, তাছাড়া একজন মহিলাও বটে, দেখেছো উনি কত সফল’ কিংবা ‘ইশ্, এতরকম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি কতটা সাফল্য অর্জন করেছেন, তার উপরে আবার মেয়ে! তাহলে সব থাকতেও আমরা পারব না কেন?’ – তা তাঁর প্রতিবন্ধী পরিচিতিটাকে হয় করুণা করছে এবং যেন যা তাঁর প্রাপ্য নয় তা প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তিনি কোনওভাবে পেয়ে গেছেন তেমন ইঙ্গিত করছের, নতুবা তিনি দেবীসমা, তাঁকে দেখে অনুপ্রাণীত হতে হবে বলে তাঁর যে অধিকার ও তাঁর লড়াইয়ের ধাপগুলিকেও অস্বীকার করা হচ্ছে। এবং দু’ক্ষেত্রেই তাঁর নারী পরিচিতিটিকেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

ঠিক এই মানসিকতার বিপ্রতীপেই অবস্থান ছিল হেলেন কেলার-এর। আমরা আজ যাকে ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ বলি অর্থাৎ এমন এক সমাজ যেখানে প্রতিবন্ধী সহ সমস্ত প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষেরা কোনও রকম বৈষম্যের মুখোমুখি না হয়ে অর্ন্তভুক্ত হবেন সেই সমাজের কথাই বলেছিলেন হেলেন কেলার। তিনি একদিকে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য মূলস্রোতের শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষার জন্য পরিসর বড় করার কথা বলেছে, তেমনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তিনি বলেছেন বৃহত্তর ক্ষেত্রে সমস্যাটি হল আমাদের সমাজ এমন নয় যেখানে সমাজের সমস্ত সদস্য সঠিকভাবে জায়গা পান। অর্থাৎ তাঁকে ‘আইকন’ বানিয়ে যেভাবে একরকমভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদের উপরেই প্রকারন্তরে দায় চাপানো হয় সমাজের কাঠামোর মধ্যে মানিয়ে নেওয়ার তিনি সেটিকেই নস্যাৎ করেছেন। প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের যে দায়িত্বের কথা বারবার বলা শুরু হয় যে ‘ব্যারিয়ার ফ্রি’ বা বাধাহীন পরিকাঠামো গড়ে তোলার যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধকতাসহ সমাজে অংশগ্রহণকে সহজ করবে তারই মূল সুর বেঁধে দিয়েছিলেন হেলেন কেলার। মনে রাখা দরকার, ১৯১৩ সালে এক পত্রিকায় তিনি লিখছেন, “When we inquire why things are as they are, the answer is: The foundation of the society is laid upon a basis of individualism, conquest, and exploitation, with a total disregard of the good of the whole.”

 

হেলেন কেলার এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেই তৈরি করেছেন নিজের পরিচিতি, কাজ করেছেন নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। প্রতিবন্ধী অধিকার, শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার এক বিন্দুতে মেলানোর চেষ্টা করেছেন। এবং এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটে চলা বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনার সঙ্গে সামাজিক পরিকাঠামোর ‌ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, রাষ্ট্রীয় শোষণ ও পুঁজিবাদের এক অর্ন্তনিহিত যোগসূত্র রয়েছে তা তাঁর রাজনৈতিক কাজকর্ম, লেখা, বক্তব্য ইত্যাদির মাধ্যমে বারেবারেই স্পষ্ট করেছেন। অথচ প্রথম থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতিটিকে আড়াল করার বা ছোট করে দেখানোর প্রচেষ্টা কম হয়নি, যে কারণে এখনও তিনি একজন প্রতিবন্ধী ‘আইকন’ হিসাবে যতটা বিশ্বস্বীকৃত, তাঁর রাজনৈতিক কাজকর্ম বা আদর্শ সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই ততটা জানেন না। আমরা যেন ভুলে না যাই তাঁর রাজনীতির ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়েই তিনি বলছেন, “Are the political and industrial needs of women less genuine than those of men? Let us put an end to this stupid, one-sided, one-power arrangement and have suffrage for all – an inclusive suffrage that takes in everybody. After all, the aim of every good man and woman is justice.”

 

তাঁর সময়েও যতক্ষণ তিনি প্রতিবন্ধকতা বিষয় কাজ করেছেন, বক্তব্য রেখেছেন ততক্ষণ তাঁকে অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখা হয়েছে, তাঁর সাফল্যকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই তিনি নিজের রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন, অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তখনই তাঁর প্রতিবন্ধকতাকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি তাঁর প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজস্ব চিন্তাভাবনা তৈরি করতে বা তার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম নন, তিনি নিশ্চয়ই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত, তাঁর বক্তব্য গুরুত্বহীন ইত্যাদি। এগুলি অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিকতার প্রকাশ, একজন প্রতিবন্ধী নারীর স্বর দাবিয়ে দেওয়ার সচতুর প্রয়াস। হেলেন কেলার অবশ্য তাঁর জীবদ্দশায় সব সময়েই এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। যারাই যখন তাঁর রাজনৈতিক, সামাজিক চিন্তাভাবনাকে গুরুত্বহীন বলতে চেয়েছেন তাদের কড়া উত্তর দিয়েছেন, কোনওভাবেই নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি এবং নিজের প্রতিবন্ধী পরিচিতিকে নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিসহ দাঁড় করিয়েছেন।

 

আবার অন্যদিকে প্রতিবন্ধী আইকন হিসাবে তাঁর ভাবমূর্তি কেমন হবে, ব্যক্তিজীবনে নিজের প্রেম ও বিয়ে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর থাকবে কি না, নিজের সুখ-দুঃখ-মানসিক অবস্থার প্রকাশ তিনি প্রকাশ্যে করতে পারবেন কি না, এমনকি তাঁর কোন্‌ ধরনের ছবি ছাপা হবে বা হবে না, তিনি প্রসাধন করতে পারবেন কি না – এগুলি পেশাগত, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে এবং সম্ভবত হেলেন কেলার-এর অনিচ্ছায়। এগুলিও পরোক্ষে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতার প্রকাশ, যার বিরুদ্ধে হেলেন কেলার সেভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেননি।

অবশ্যই তিনিও কোনও কোনও ক্ষেত্রে সমালোচনা বা প্রশ্নের উর্দ্ধে নন। কোনও কোনও সময়ে তাঁর বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। যেমন প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে সরব হেলেন কেলার যখন ১৯১৫ সালে বলিঙ্গার বয় ঘটনায় একটি একাধিক প্রতিবন্ধকতাসহ জন্ম নেওয়া সদ্যোজাত শিশুকে অস্ত্রোপচার না করে মৃত্য ঘটানো চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বলেন। তিনি সেই চিকিৎসকের পক্ষে বলেছিলেন, “Heiselden performed a service to society as well as to the hopeless being he spared from a life of misery… the world is already flooded with unhappy, unhealthy, mentally unsound persons that should never have been born”, ধর্মীয় কারণে যারা শিশুটির এহেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে ছিলেন, তারা আবার সেই সময়ে হেলেন কেলারকেই প্রতিবন্ধী অথচ সফল মানুষের উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। ঠিক কোন জায়গা থেকে হেলেন নিজে এই বক্তব্য রেখেছিলেন তা নিয়ে আজও প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য তিনি এ প্রসঙ্গেই বলছেন, “The baby’s death has brought us face to face with the many questions of eugenics and control of the birth rate – questions we have been side stepping because we are afraid of them.” যদিও এই বক্তব্যও প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা পুরোপুরি সমর্থন করছেন না।

 

সুতরাং আইকন-ও যে সমালোচনা ও প্রশ্নের বাইরে নন, তার রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন থাকলেও তাও হেলেন কেলার-ই বুঝতে সাহায্য করেন। নিজের বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চায় যাতে শ্রমিকেরা বেশি সংখ্যক সন্তানের জন্ম দেয় যাতে, শ্রম সস্তা হয়। তিনি এই প্রসঙ্গেই যখন পুঁজিবাদকে নিয়ে আসছেন, নিয়ে আসছেন কেন শ্রমিকদের মধ্যে ও সার্বিকভাবেই জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে, বলছেন, “If the families of the workers are left to the uncontrolled caprice of nature, we shall have a larger percentage of children that are forced to toil in the mills and factories – who are denied their birthright of education and play. …Those that survive bring into the world, in spite of themselves, an even larger number of deformed, sickly, feebleminded children. Only by taking responsibility of birth control into their own hands can they roll back the awful tide of misery that is sweeping over them & their children. Once it was necessary that the people should multiply and be fruitful, if the race was to survive. But now to preserve the race, it is necessary that people hold back the power of propagation.” তখন পুঁজিবাদের আগ্রাসন ও নারী অধিকারকে সমর্থন করলেও সেই প্রেক্ষিতকে টেনে এনে তাঁর কোনও প্রতিবন্ধী শিশুর ইউথানেশিয়া-র পক্ষে দাঁড়ানোকে সমর্থনযোগ্য মনে করেননি তৎকালীন সময়ের ও পরবর্তী সময়ের অনেকেই, যেমন এখনও করেন না।

 

হেলেন কেলার-কে বোঝা ও জানার গুরুত্ব তাই প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনে কোনওদিনই কমবে না। শিশু বা দেবী নন, তিনি একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় প্রতিবন্ধী নারী, যাঁকে ১৯১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে যখন প্রশ্ন করা হচ্ছে বিপ্লব না শিক্ষা তিনি কোনটা বেছে নেবেন, তিনি বিনা দ্বিধায় উত্তর দিচ্ছেন – বিপ্লব। বলছেন, “Revolution. We can’t have education without revolution. We have tried peace education for 1,900 years and it has failed. Let us try revolution and see what it will do now. I regret this war [World War I]… And the workers are learning how to stand alone. They are learning a lesson they will apply to their own good put in the trenches. … Under the obvious battle waging there is an invisible battle for the freedom of man.”

 

আজ যখন মহিলাদের শরীরের উপর তার অধিকার একভাবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তখন আবারও একবার মনে করে নেওয়ার সময় যে এই মহিলাদের ভোটাধিকার, যা তাদের নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি, রাজনৈতিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার স্বীকতি সেই ভোটাধিকার আদায়ের লড়াইতে হেলেন কেলার বলেছিলেন, “Without vote, women cannot solve satisfactorily some problems of living importance to them such as questions of public health, the education and welfare of little children, and the conditions under which women must labor.” এবং কোনওভাবেই ভোলা যাবে না মহিলাদের ভোটাধিকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “Rights are things which we get when we are strong enough to make our claim to them good. Today women are asserting their rights; tomorrow nobody will be foolhardy enough to question them.” হেলেন কেলার-এর ১৪২তম জন্মদিন পেরিয়ে তাই নতুন করে প্রতিবন্ধী অধিকার, নারী অধিকার ও রাজনৈতিক-সামাজিক অধিকারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাঁর পাঠ ও চর্চা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়ে যায়।

Share this
Leave a Comment