পরিবেশের জন্য তো এক হতে পারি


  • June 4, 2022
  • (0 Comments)
  • 286 Views

সন্দেহ নেই পরিবেশ-সঙ্কট যত ঘনীভূত হচ্ছে পরিবেশ রক্ষার লড়াই, জীবন-জীবিকা রক্ষার লড়াই, নদনদী, বনভূমি রক্ষার লড়াই, জীববৈচিত্র রক্ষার লড়াই, বনবাসীর বনের অধিকারের লড়াইয়ে তত বেশি বেশি মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন। এবং পরিবেশ আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণও তীব্র হচ্ছে। উষ্ণায়নের প্রভাবে পাহাড়ে বরফ গলার হার বেড়ে গেলে তার কুপ্রভাব থেকে রক্ষা পায় না সুন্দরবনের জনপদ। এল নিনোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশ থেকে মহাদেশে। বিপর্যয় যখন এককাট্টা, একবগগা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, পরিবেশ আন্দোলনগুলিও তখন একজোট হয়ে উঠুক। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এমন শপথ আমরা নিতেই পারি। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

লাটাগুড়ি

কয়েক বছর আগে এ রাজ্যে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি পরিবেশ আন্দোলনের লোককথা হয়ে উঠেছিল। জল, জলাভূমি, জীববৈচিত্র নিয়ে কত শত কথাই না আমরা জানতে পেরেছি। রাষ্ট্র ও কর্পোরেট তো বটেই সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের প্রবল শক্তির বিরুদ্ধে সে এক অসম লড়াই। অজ্ঞানের বিরুদ্ধে জ্ঞানের, অর্থলোলুপতার বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের, প্রচণ্ড বেআইনের বিরুদ্ধে আইনের, বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে স্থানিক পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন কাম্য সাফল্য পায়নি এ কথা সত্য। কিন্তু, তার গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি। পুকুর বোজানোর বিরুদ্ধে কথা, পুকুরের পাড় বাঁধিয়ে জীববৈচিত্র ধ্বংস করার বিরুদ্ধে কথাগুলো উঠে এসেছিল বা এখনও ওঠে, জলাশয় বাঁচানোর লড়াইও যে চলতে থাকে তার পরিবেশ গড়ে উঠেছিল এমন এক আন্দোলনের ফলেই।

 

বিগত তিন দশকে ব্যাপক নগরায়ন এবং বাইপাস ও মেট্রো রেলের কল্যাণে কলকাতার সিংহভাগ জলাভূমি আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। ন্যাশনাল অ্যাটলাস অ্যান্ড থিমেটিক ম্যাপিং অরগানাইজেশন-এর সমীক্ষা মতে আটের দশকের শেষাশেষি ক্যালকাটা মেট্রোপলিটন করপোরেশন এলাকায় ৮৭৩১টি পুকুর ছিল। পরিবেশবিদরা বলছেন, ২০০৬ সালে গুগল স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে পুকুরের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮৮৯-তে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৪ শতাংশ পুকুর বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। বেহালা অঞ্চলে পুকুর, নীচু জলাভূমির প্রাচুর্যের ইতিহাস মুছে গিয়েছে নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়েই। শুধুই বেহালা নয়। গলফ গার্ডেন, আজাদগড়, বিজয়গড়, বাঘাযতীন, যাদবপুর এলাকাতেও নির্বিচারে বুজিয়ে ফেলা হয়েছে একের পর এক পুকুর। পরিবেশবিদদের হিসাব মতে ২০২১ সালের শেষাশেষি নাগাদ কলকাতা পুরসভা এলাকায় পুকুরের সংখ্যা হবে মেরেকেটে সাড়ে তিন হাজারের মতো। পরিবেশ দপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অবশ্য শহরে বর্তমান পুকুরের সংখ্যা নিয়ে নীরব। পুবে, দক্ষিণে শহর যত ছড়িয়েছে, একের পর এক ৪৪টি এলাকা কলকাতা পুরসভার ‘অ্যাডেড এরিয়ার অন্তর্গত হয়েছে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে বাইপাসের বাহু, মেট্রো রেল—তার সঙ্গে সঙ্গে একই দ্রুততায় হারিয়ে গিয়েছে পুকুর, নালা, বর্ষার জল ধরে রাখার মতো নীচু জলাভূমি, মায় টলি নালা।

 

পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে ১৯৯৭ সালে যেখানে ২৬৪টি ভেড়ি ছিল তা কমে দাঁড়িয়েছে দুশোর নীচে। সাম্প্রতিক অতীতে ধাপা মানপুর মৌজার বড় বনঘেরি ও রবি ঘোষের ভেড়ি বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। যে ৩৭টি মৌজা নিয়ে এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি তার মধ্যে ২০টি মৌজার ব্যাপক অংশ দখল হয়ে গিয়েছে। যা আর জলাভূমি বলে চেনার উপায় নেই। মুকুন্দপুর মৌজায় আর একটিও জলাভূমি অবশিষ্ট নেই। পশ্চিম চৌভাগা, চৌভাগা, নোনাডাঙা, জগতিপোতা, আটঘড়া, কুলবেড়িয়া, বেয়ন্তা, থাকদাড়ি, ধাপা মানপুর, গড়াই মৌজারও প্রায় একই পরিণতি হয়েছে। পূর্ব কলকাতা জলাভূমির আর রামসার সাইট-এর মর্যাদা থাকা উচিত কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। এরপরও এই জলাভূমি বাঁচানোর লড়াই জারি রয়েছে আদালতে, ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালে।

 

গণশ্ত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই কখনও সহজ ছিল না। তবু, রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পরিবেশ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। পুরুলিয়ার তিলাবনি পাহাড় কেটে গ্রানাইট সংগ্রহের ছাড়পত্র দেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদে নেমেছেন এলাকার চারটি গ্রামের মানুষ। এই ৩ মে পাহাড় কাটতে জেসিবি মেশিন এসেছিল। পাহাড়ের ক্ষতিও করেছে বেশ কিছুটা। শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীরা রুখে দাঁড়ালে তা ফিরে যায়। সম্প্রতি তারকেশ্বর-চকদিঘি রাস্তা চওড়া করার অজুহাতে নির্বিচারে রাস্তার দু’পাশের প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা শুরু হয়। এমনটা যে হবে তার আঁচ পেয়েছিল স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি। প্রশাসনের যথাস্থানে তারা তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আর্জি জানিয়েছিল। সে কথায় কান দেয়নি প্রশাসন। উল্টে ব্যাপক হারে গাছ কেটে ফেলা হয়। মরিয়া পরিবেশকর্মীদের বাধায় কিছু গাছ রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত করাত-বুলডোজারের উন্নয়ন সাময়িকভাবে হলেও বন্ধ করা গিয়েছে। বহরমপুরে একটির পর একটি জলাভূমি বুজিয়ে চলেছে রাজনীতিক-পুরসভা-প্রোমোটার জোট। তার বিরুদ্ধে মৌন অবস্থানও নিষিদ্ধ। প্রবীণ শিক্ষক-শিক্ষিকা, নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক, সামাজিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করে থানায় তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। বৃদ্ধ, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষককে অবস্থানস্থল থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ এ যেন এক নরকের দৃশ্য। জামিন পেয়েছেন তাঁরা, আন্দোলন থেকেও সরে আসেননি। বছর দুয়েক আগে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন-পুলিশ-বনদপ্তর লাটাগুড়িতে এলিফ্যান্ট করিডোরে বিপুল ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল। প্রতিবাদীরা হাই কোর্টে দরজায় পৌঁছতে না পৌঁছতে উন্নয়ন হাসিল করেছিল বৈদ্যুতিক করাত।

 

উত্তর থেকে দক্ষিণ পরিবেশ বাঁচাবার এমন বহু মরিয়া চেষ্টার কাহিনি তৈরি হয়ে চলেছে। এই মুহূর্তে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে পদযাত্রা থেকে প্রতিবাদ সভার খবর মিলছে। জলাশয়, পুকুর থেকে নদী বাঁচাও, খাল বাঁচাও ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। প্রায় এক ডজন সংগঠন গঙ্গায় জল ও পলির দাবিতে অর্থাৎ বাঁধ বাঁধার বিরুদ্ধে; চড়িয়াল খাল, আদি গঙ্গার পুনুরুদ্ধারের অর্থাৎ এই খাল ও আদি গঙ্গার সংস্কারের নামে নীচে পাইপবাহিত নালা এবং উপরে রাস্তা তৈরির মতো বিপর্যয়-উন্নয়নের বিরুদ্ধে ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় আশুতোষ কলেজ হলে প্রতিবাদ সভার ডাক দিয়েছে। অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় বিরসা মুক্ত মঞ্চ-এ পরিবেশ দিবস পালন করবে ‘প্রকৃতি বাঁচাও ও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ’। একটি পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন কীভাবে ভূমিপুত্র জনজাতিদের জীবন-জীবিকা রক্ষার আন্দোলন হয়ে উঠতে পারে অযোধ্যা-আন্দোলন তা দেখিয়েছে। ঠুরগা-বান্দু-কাঠালজোল ড্যাম প্রকল্প বাতিল থেকে বনাধিকার আইন, ২০০৬ অনু্যায়ী জল-জঙ্গল-জমির উপর বনবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা তাদের প্রধান প্রধান দাবি। বনাধিকারের দাবি তুলেছে ঝাড়গ্রাম নাগরিক উদ্যোগ। সুন্দরবনের মানুষের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার ডাক দিয়েছে এপিডিআর-এর দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটি।

 

‘পরিবেশ-অধিকার আন্দোলন’ ৪ জুন শ্যামবাজার থেকে বাগবাজার গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত পদযাত্রার ডাক দিয়েছে। সংগঠনটি তাদের প্রচার বার্তায় জানিয়েছে, “পরিবেশ দিবস উদযাপন আজ আর মেকি উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়। আজ তা প্রতিবাদের দিন, সঙ্কল্পের দিন।…বিভিন্ন পরিবেশ অধিকার আন্দোলনকে সন্নিবদ্ধ করতে ‘পরিবেশ-অধিকার আন্দোলনের জন্ম।’ এই মুহুর্তে রাজ্যে সর্ববৃহৎ বিপর্যয়-উন্নয়নের মডেল-প্রকল্প প্রস্তাবিত দেউচা-পাঁচামি কয়লা খনি। সংগঠকরা জানাচ্ছেন পরিবেশ ও জীবন বিরোধী এই প্রকল্পের বিরোধিতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে ‘পরিবেশ-অধিকার আন্দোলন’।

 

সন্দেহ নেই পরিবেশ-সঙ্কট যত ঘনীভূত হচ্ছে পরিবেশ রক্ষার লড়াই, জীবন-জীবিকা রক্ষার লড়াই, নদনদী, বনভূমি রক্ষার লড়াই, জীববৈচিত্র রক্ষার লড়াই, বনবাসীর বনের অধিকারের লড়াইয়ে তত বেশি বেশি মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন। এবং পরিবেশ আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণও তীব্র হচ্ছে। উষ্ণায়নের প্রভাবে পাহাড়ে বরফ গলার হার বেড়ে গেলে তার কুপ্রভাব থেকে রক্ষা পায় না সুন্দরবনের জনপদ। এল নিনোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশ থেকে মহাদেশে। বিপর্যয় যখন এককাট্টা, একবগগা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, পরিবেশ আন্দোলনগুলিও তখন একজোট হয়ে উঠুক। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এমন শপথ আমরা নিতেই পারি।

 

 

 

Share this
Leave a Comment