ফরট্রেস কনজারভেশন : আদিবাসী উচ্ছেদের নীল নকশা


  • May 26, 2022
  • (0 Comments)
  • 441 Views

বাঘ বাঁচাতে হবে বলে, বাঘ সংরক্ষণ করার মতো বন রক্ষা করতে হবে বলে, বাঘের পেট ভরার মতো খাদ্য মজুত রাখতে হবে বলে—উচ্ছেদ করা হচ্ছে বনবাসীদের। অথচ, এই সরকারি নীতিতেই সেই স্থান দখল করছে মাইনিং কোম্পানি। আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ করে গড়ে উঠছে ট্যুরিস্ট রিসর্ট, আদিবাসীদের গড়া বাঁধ, জলাশয় দখল নিয়ে তৈরি হচ্ছে ইকো-ট্যুরিজম কমপ্লেক্স। সম্বচ্ছর বাঘবনের দখল নিয়েছে দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্ট। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

বন ঘেরো, দুর্গ গড়ো, বনবাসী তাড়াও— এখন এই হল দেশের কেন্দ্রীয় বননীতি। স্বাধীন ভারতে এর শুরু অবশ্য ১৯৭২ সাল থেকে। অর্থাৎ, যবে থেকে ব্যাঘ্র প্রকল্প বা টাইগার রিজার্ভগুলি জন্ম নিল। বন থেকে বিশেষভাবে এই বাঘবনগুলি থেকে প্রথমাবধি বনবাসীদের উচ্ছেদ চলেই আসছে। বহু লড়াইয়ের ফসল তফসিলি আদিবাসী/ জনজাতি এবং অন্যান্য পারম্পরিক বনবাসী (বনাধিকার স্বীকার) আইন, ২০০৬ বা সংক্ষেপে বনাধিকার আইন (এফআরএ)-কে এই চণ্ডনীতি বিন্দুমাত্র স্বীকার করে না। উল্টে বর্তমান সময়ে ‘ফরট্রেস কনজারভেশন’ আরও অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

 

ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (এনটিসিএ) —এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে ব্যাঘ্র প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের ৫০টি ব্যাঘ্র প্রকল্পের ৭৫১টি গ্রাম থেকে ৫৬,২৪৭ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ৪৪ হাজারেরও বেশি পরিবারের আনুমানিক ২২০,০০০ জন এখনও অবধি কোনও ‘রিলোকেশন প্যাকেজ’ পাননি। অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতিমাফিক আর্থিক সাহায্য, বাস্তুভিটে, বাড়ি, চাষের জমি কিছুই তাঁদের দেওয়া হয়নি। আর যাঁরা পেয়েছেন সেখানেও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শুধু, তাই নয় যাঁরা বন লাগোয়া অঞ্চলে বাস করেন এবং জীবনজীবিকার জন্য যুগ যুগ ধরে বনের উপর নির্ভরশীল, তাঁদের উপরও বন থেকে গৌণ বনজ দ্রব্য সংগ্রহের উপর নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে এসেছে। অথচ, বনাধিকার আইন মোতাবেক এই বনজ বস্তুগুলি সংগ্রহ, ব্যবহার, বিক্রির আইনি অধিকার রয়েছে বনবাসীদের।

 

বাঘ বাঁচাতে হবে বলে, বাঘ সংরক্ষণ করার মতো বন রক্ষা করতে হবে বলে, বাঘের পেট ভরার মতো খাদ্য মজুত রাখতে হবে বলে—উচ্ছেদ করা হচ্ছে বনবাসীদের। অথচ, এই সরকারি নীতিতেই সেই স্থান দখল করছে মাইনিং কোম্পানি। আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ করে গড়ে উঠছে ট্যুরিস্ট রিসর্ট, আদিবাসীদের গড়া বাঁধ, জলাশয় দখল নিয়ে তৈরি হচ্ছে ইকো-ট্যুরিজম কমপ্লেক্স। সম্বচ্ছর বাঘবনের দখল নিয়েছে দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্ট।

 

শুধুই কি এনটিসিএ বন থেকে বনবাসীদের উচ্ছেদ করতে ব্যস্ত? (বনকর্তারা অবশ্য বলেন ‘স্থানান্তরণ’। তাঁদের দাবি, মানুষ ‘রিলোকেশন প্যাকেজ’ পাচ্ছেন এবং তা যথেষ্ট মনে করছেন বলেই বন ছেড়ে যাচ্ছেন।) এই মডেলটিকে মদত দিয়ে চলেছে ডব্লিউডব্লিউএফ, কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াইল্ড লাইফ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া, ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া, সাতপুরা ফাউন্ডেশন-এর মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংগঠনগুলো। খনি ও অন্যান্য শিল্প-মালিকরাতো আছেনই। বনাধিকার আইনকে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে, আদালতে মামলা ঠুকে, মিডিয়ার সাহায্যে বনবাসীদের অপরাধী সাজিয়ে—মানুষহীন বন সংরক্ষণের মডেলকে চ্যাম্পিয়ন করতে সরকার ও বনকর্তাদের মদত দিয়ে চলেছে এই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলিও। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘স্ট্রাগলস ফর দ্য রাইট টু লিভ ইন ফরেস্টস ডিক্লেয়ারড প্রোটেকটেড এরিয়াজ ইন ইন্ডিয়া : এক্সপেরিয়েন্স অফ কমিউনিটিজ ইন মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ অ্যান্ড ছত্তিসগড়’ ( বাংলা ভাষাতেও বইটি অনূদিত হয়েছে— ‘ভারতের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বাঁচার অধিকারের লড়াই : মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিসগড়ের অভিজ্ঞতা’।) শীর্ষক এক অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে এমনই অভিযোগ উঠে এসেছে। ওয়ার্ল্ড রেইনফরেস্ট মুভমেন্ট (ডব্লিউআরএম) এবং অখিল ভারতীয় বন-আন্দোলন মঞ্চ-এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে।

 

আইইউসিএন-এর দ্বিতীয় এশিয়া পার্ক কংগ্রেস-এ উপস্থাপিত হবে এই রিপোর্ট। ২৪ মে শুরু হয়েছে এই কংগ্রেস। মূল স্লোগান ‘স্টপ দ্য রেসিস্ট কনজারভেশন মডেল’। কংগ্রেস চলবে ২৯ মে পর্যন্ত। এক প্রেস বিবৃতিতে ডব্লিউআরএম জানিয়েছে, এশিয়া মহাদেশে সংরক্ষিত অঞ্চল বৃদ্ধি করার অর্থ উচ্ছেদ, হিংসার বাড়বাড়ন্ত এবং আরও বেশি বেশি করে অরণ্যবিনাশ। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তারা অভিযোগ তুলেছে, বৃহৎ সংরক্ষণকামী এনজিও, রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং তাদের সহায়কদের কাছে সংরক্ষিত অঞ্চল মানে বন্দুকধারী রেঞ্জারদের তত্বাবধানে থাকা মানুষবিহীন এলাকা। তাদের মতে, এশিয়া মহাদেশ জুড়ে সংরক্ষিত এলাকাগুলি হিংসা, উচ্ছেদ এবং বনবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের বিরক্তিকর ইতিহাসে ভরা। ডব্লিউআরএম জানিয়েছে, এই কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২০২০ পরবর্তী ‘বিশ্ব জীববৈচিত্র্য কাঠামো বা ‘গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ পরিকল্পনা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০ শতাংশ ভূমি ও জল সংরক্ষণের আওতায় আনার জন্য লড়াই করা।

 

ঊল্লেখিত রিপোর্টটিতে যে তিন রাজ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আদিবাসীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়েছে একনজরে তা দেখে নেওয়া যাক।

 

মহারাষ্ট্র

বোর টাইগার রিজার্ভ :

  • নওয়ারগাঁও গ্রাম স্থানান্তরিত।
  • রিজার্ভের কোর এলাকায় আর কোনও গ্রাম নেই।
  • বাফার এলাকায় এখনও ৩৬টি গ্রাম আছে।
  • রিজার্ভের ভিতর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।

 

তাড়োবা-আন্ধারি টাইগার রিজার্ভ :

  • ২০০৭ সালে টাইগার রিজার্ভ হিসাবে গড়া হয়েছে।
  • ৫টি গ্রামকে হয় উচ্ছেদ করা হয়েছে বা স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
  • রন্তালোধির গ্রামবাসীরা এবং কোলসা গ্রামের ৯৭টি পরিবার গ্রাম ছাড়তে অস্বীকার করেছে।

 

পেঞ্চ টাইগার রিজার্ভ :

  • ২০০২ সালে তোতলাদোহ গ্রামটিকে হিংসাত্মকভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
  • ফুলজারি গ্রামের বাসিন্দারা রিজার্ভের ভিতরেই বাস করছেন। বনের গৌণ সম্পদ সংগ্রহ এবং মাছধরায় বিধিনিষেধের জন্য জীবনজীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

 

মধ্যপ্রদেশ

রাতাপানি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য :

  • ১৯৭৬ সাল থেকে এই এলাকাটি বেড়েই চলেছে।
  • এই অভয়ারণ্যে ২৯টি গ্রাম আছে।
  • কোর অঞ্চল এবং প্রস্তাবিত টাইগার রিজার্ভের মধ্যে ৯টি গ্রাম আছে।

 

পান্না টাইগার রিজার্ভ :

  • বাফার এলাকায় ৪৯টি গ্রাম আছে।
  • বনদপ্তর এই গ্রামগুলি উচ্ছেদ করার জন্য বারবার চেষ্টা করছে।
  • ২০১৬ সাল থেকে গোষ্ঠীগত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গ্রামগুলির অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

 

ছত্তিসগড়

ভোরামদেও অভয়ারণ্য :

  • গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বাইগা (বিশেষভাবে সঙ্কটাপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী) সম্প্রদায়কে কোর এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই আদিম গোষ্ঠীটি বনের ভিতরেই বংশানুক্রমে বসবাস করত।
  • ক্ষতিপূরণ হিসাবে পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা, নতুন বাড়ি, স্কুল, চিকিৎসার সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তার কিছুই দেওয়া হয়নি।

 

সেমারসট ও তামোর পিংলা অভয়ারণ্য :

  • কেন্দুপাতা সংগ্রহে গ্রামবাসীদের উপর বনদপ্তর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই পাতা সংগ্রহ ও বিক্রি গ্রামবাসীদের অন্যতম প্রধান জীবিকা।
  • এই অঞ্চলে হাতি ছিল না। বর্তমানে হাতির পাল গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

 

আচানকমার অভয়ারণ্য :

  • এটিকে সঙ্কটাপন্ন ব্যাঘ্র আবাস হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
  • প্রায় ২৪৯টি পরিবারকে ২০০৯ সালে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এঁরাও প্রধানত বাইগা সম্প্রদায়ের। এছাড়াও রয়েছেন গোন্দ আদিবাসী গোষ্ঠী।
  • এঁদেরকেও ১০ লক্ষ টাকা, পরিবার পিছু ৫ একর কৃষিজমি, বাড়ি, স্কুল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, জীবিকার সংস্থানের কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবে মিলেছে পরিবার পিছু নগদ ৫০০০ টাকা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর কিছু মেলেনি।
  • ‘স্থানান্তরিত’ পরিবারগুলি এখন বনের প্রান্তে বসবাস করছে। যে কোনও ধরণের বনজদ্রব্য সংগ্রহে তাঁদের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

 

বারওয়ানাপারা অভয়ারণ্য :

  • তিনটি গ্রামকে তুলে ‘পুনর্বাসন’ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
  • যে পরিবারগুলি নিজেদের এলাকায় থাকবে বলে স্থির করেছে তাঁদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালান হচ্ছে।

 

একনজরে এই হল ফরট্রেস কনজারভেশন। সরাসরি বনাধিকার আইন লঙ্ঘন করে বনজদ্রব্য সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা জারি করার অর্থ আদিবাসী, বনবাসীদের জীবনজীবিকার সামান্য উপায়গুলো থেকেও বঞ্চিত করে। এক কথায় ভাতে মারা। গাল ভরা প্রতিশ্রুতির পরও অধিকাংশই ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ পাননি। দেখা গেছে যাঁরা জমি পেয়েছেন, সেই জমি পাথুরে ও অনুর্বর। অন্যদিকে আবার, অভয়ারণ্যের মধ্যেই খনি ও খাদানকে অবাধ ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও হাইওয়ে, ব্রডগেজ লাইনের জন্য অবাধে গাছ কাটা চলছে। এবং পর্যটন ব্যবসাও লাগামহীন হয়ে উঠেছে।

 

ডব্লিউআরএম রিপোর্ট বলছে, “ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (এফআরএ) বা বনাধিকার আইন প্রণয়নের ফলে বহু ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ আমল থেকে অনুসৃত হয়ে আসা এবং উপর থেকে চাপানো সংরক্ষণ নীতি ও আইনগুলির অবসান ঘটার কথা ছিল। এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যই ছিল বনবাসী সম্প্রদায়গুলির বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করে জঙ্গলে তাদের এবং গ্রামসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃত্বকে জোরদার করা।”

 

২০০৬ সালের বনাধিকার আইনের প্রস্তাবনায় স্বীকার করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বনবাসীদের উপর ঐতিহাসিক অন্যায় সঙ্ঘটিত হয়ে চলেছে। ভাবা গিয়েছিল সেই অন্যায়ের অবসান ঘটবে। দেড় যুগ পার হওয়ার পর এ কথা পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, সরকার, বন-আমলা, কর্পোরেট, এক শ্রেণির এনজিও দেশের বননীতিকে ব্রিটিশ যুগে ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে। যে ব্রিটিশদের নীতিই ছিল বনবাসীদের উচ্ছেদ করে বনের সব সম্পদ বেচে খাওয়া।

 

ফীচার ছবি – মধ্যপ্রদেশের নেগাঁও-জামনিয়া এলাকায় আদিবাসী উচ্ছেদ

Share this
Leave a Comment