একটি মেয়ের নৃশংস হত্যা – সমাজের স্টিরিওটাইপ, মানসিক স্বাস্থ্য ও পপুলার কালচার


  • May 7, 2022
  • (0 Comments)
  • 236 Views

বহরমপুরে প্রাক্তন প্রেমিকাকে মেস থেকে ডেকে এনে প্রকাশ্য রাস্তায় নৃশংসভাবে হত্যা করেছে এক তরুণ। সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনার প্রতিবেদনে উঠে আসা সামাজিক স্টিরিওটাইপ, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অজ্ঞতা ও উদাসীনতা, স্কুলের পাঠ্যক্রমে যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচিতির আলোচনা অর্ন্তভুক্ত না করা আর পপুলার কালচার-এ প্রেমের নামে যৌন হিংসা ও মহিলাদের উত্যক্ত করাকে স্বাভাবিক করে দেওয়া – এই একটি ঘটনা স্পষ্ট করে দিল এরকম বেশ কিছু সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়, যার শিকার প্রতিনিয়ত হতে হচ্ছে সব বয়সের মহিলাদের। লিখলেন দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধী আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের কর্মী শম্পা সেনগুপ্ত

 

 

সম্প্রতি বহরমপুরের ঘটে যাওয়া এক নৃশংস খুনের ঘটনা অনেকগুলি প্রশ্নের সম্মুখীন করে আমাদের। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে বারবার আমরা পড়ছি সুতপা চৌধুরী নামে এক ছাত্রীর মৃত্যুর কথা; তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তার পূর্বতন প্রেমিক সুশান্ত চৌধুরী। এ কথা বলে রাখা ভালো যে ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্য রাস্তায়। কিছু মানুষ এই খুনের ভিডিও করেছেন তাদের মোবাইল-এ। কিন্তু সুশান্তর হাতে অস্ত্র ছিল বলে মেয়েটিকে সাহায্য করতে প্রায় কেউই এগিয়ে যাননি। যেকোনও ঘটনায় ভিডিও তোলা অবশ্য এখন দস্তুর। কেউ বিপদে পড়লে  দায়িত্ব নিয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করাটা এখনকার দিনে অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

 

এই ঘটনার রিপোর্ট লিখতে গিয়ে সংবাদমাধ্যম সমালোচিত হয়েছে, কারণ খুনী যুবকের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বারবার শিরোনামে তারা লিখছে সে মেধাবী, সে বিজ্ঞানের ছাত্র, সে কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করে ইত্যাদি। তার “মেধা” বা বিজ্ঞান পড়ার পরিচয়টাই বড় করে দেখার একটা প্রবণতা দেখা দিল এই সকল শিরোনামের আড়ালে। যে যুবক “মেধাবী” সে কেন একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মেনে নিতে পারবে না এবং পূর্বতন প্রেমিকাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেবে সেই বিশ্লেষণ কেউ করল না। বরং দেখানোর চেষ্টা করল যেন বিজ্ঞান বা কম্পিউটার নিয়ে পড়াই “বুদ্ধিমান” হওয়ার একমাত্র লক্ষণ। নিহত ছাত্রীটি মেধাবী ছিল কিনা কোনও সংবাদপত্র লেখেনি তবে “সুন্দরী” বলে তার নাম ছিল একথা কয়েকটি কাগজে লিখেছে অবশ্য।

 

আসলে আমরা সামাজিকভাবে এটাই ভাবতে শিখেছি একজন পুরুষ সে কোনওরকম প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারবে না; তার যে মেয়েটিকে ভালো লাগে সেই মেয়েটির তাকেই ভালো লাগতে হবে। এবং কোনওরকম ভাবে যদি প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় তা যেন সারা জীবন ধরে বয়ে নিয়ে চলতে হবে। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল প্রচুর পুরুষ যুবকটিকে সমর্থন করছেন। তারা লিখছেন এই মেয়েটির কোনও অধিকার ছিল না ছেলেটির সঙ্গে প্রেম করে তারপর সম্পর্কচ্ছেদ করা; এই মৃত্যু তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। সম্পর্ক ছেদ করলে কোন নারীকে খুন করা যেতেই পারে এই যে ধারণা তা এই বিশ্বাস থেকে আসে যে মেয়েরা পুরুষদের সম্পত্তি। “না বলার অধিকার  মেয়েদের নেই” আমাদের রাজ্যের প্রচুর সংখ্যক মানুষ যে এখনও এই চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন তা সংবাদমাধ্যমে কমেন্ট সেকশন দেখলেই স্পষ্ট হয়।

 

নারী আন্দোলন এবং শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা অনেক বছর থেকেই দাবি করছেন স্কুল স্তর থেকে সেক্সুয়ালিটি এবং জেন্ডার (যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচিতি) বিষয়ক আলোচনা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আমাদের দেশের শাসক দল বিভিন্ন কারণে এই দাবি মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে হয়েছে এই ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ বরং ছোট ছেলেমেয়েদের কুশিক্ষা দিতে পারে। অথচ একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে জেন্ডার, পারস্পরিক সম্পর্ক, কনসেন্ট বা সম্মতি বিষয়গুলি সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের কোন বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে না। নারী-পুরুষের এক সাধারন সম্পর্ক ভেঙে গেলেও নানা অত্যাচার গঠিত হচ্ছে। অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্যের সাঙ্ঘাতিক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। একটি প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে এখন। অথচ একটি সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে তো মানুষের পুরো জীবন দাঁড়িয়ে থাকে না।

 

সুশান্ত নামে যুবকটির বিষয়ে যে খবরগুলি আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়ছি সেখানেও তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির ইঙ্গিত পাচ্ছি। সে কোনও একসময় তার নিজের মাকেও মারতে গিয়েছিল; সর্বোপরি বেশ কিছুদিন স্নান করা ছেড়ে দিয়েছিল। খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করছিল না। এই ছোটখাটো ঘটনাগুলো খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায় যে তার মানসিক কিছু অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু তার পরিবার, পরিবারের মানুষেরা কি তার স্বাস্থ্য অবনতির কথা বুঝতে পেরেছিলেন? মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও আমরা এতটাই উদাসীন যে এরকম গরমের দেশে একজন যুবক যদি হঠাৎ স্নান করা বন্ধ করে দেয় তাহলে তার জন্য চিকিৎসার দরকার সেটা হয়তো আমরা বুঝতেও পারিনা। এই যুবকের সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দেখেও সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন তা কেন কারোর মনে হয়নি এও এক জিজ্ঞাসা।

 

পাঠ্যক্রমে সেক্সুয়ালিটি এবং জেন্ডার (যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচিতি) বিষয়ক আলোচনার অন্তর্ভুক্তি এখনও করা গেল না। আমাদের দেশে প্রেম বা নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা বোধ হয় তরুণ সমাজ পায় পপুলার কালচার বিশেষ করে সিনেমা থেকে। পপুলার সিনেমা হলে বা অন্যান্য মাধ্যমে যে সিনেমাগুলি দেখানো হয় সেখানে হিংস্র আচরণ খুবই বেশি থাকে আমরা জানি। যে সিনেমায় হিংস্রতা যত বেশি সেটি তত বেশি জনপ্রিয় হয় বলেই শোনা যায়। সিনেমায় মারপিট বা রক্তারক্তি ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাও যে অল্প বিস্তর কথা হয় সেটুকু কিন্তু আমরা শুনতে পাই না জেন্ডার বিষয়ক হিংসামূলক আচরণের বিষয়ে। বরং হিংস্র ব্যবহারকে রোমান্টিক বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে মূলস্রোতের সিনেমায়। সিনেমায় মারপিট এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য বন্ধের দাবি কেউ কেউ করেন বটে। তবে রোমান্টিকতার নামে যে সকল ভুল বার্তা দেওয়া হয় প্রতিনিয়ত তার বিরুদ্ধে কথা একদম শোনা যায় না।

 

“प्यार के इस खेल में, दो दिलों के मेल में
तेरा पीछा ना मैं छोड़ूंगा सोनिये
भेज दे चाहे जेल में
प्यार के इस खेल में…”

 

[“ পেয়ার কে ইস খেল মে, দো দিলো কে মেল মে

তেরা পিছা না ম্যায় ছোড়ুঙ্গা সোনিয়ে

ভেজ দে চাহে জেল মে

পেয়ার কে ইস খেল মে…”]

 

কিশোর কুমারের কন্ঠে জনপ্রিয় এই গানটি নিষিদ্ধ করার দাবি তাই এদেশে কখনও ওঠেনি। এই একই বার্তা নিয়ে আছে অনেক গান, সংলাপ – এগুলি আরও কত তরুণকে হিংস্রতার দিকে ঠেলে দেবে তা আমরা এখনও জানি না।

 

Share this
Leave a Comment