অনাধিকারের কথা


  • May 1, 2022
  • (1 Comments)
  • 340 Views

রুপম দেব

 

উত্তরবাংলার চা বাগানের আশপাশেই রয়েছে বহু বসতি ও গ্রাম। ইতিহাসের পাতায় দেখলে জানা যায়, এই গ্রামগুলোতে যেমন ছিল রাভা, মেচ আদিবাসী তেমনি কারোর বসত গড়ে উঠেছে বনদপ্তরের অধীন জঙ্গলে শ্রমিক হিসেবে কাজ  করতে করতে। বাগানের বহু সর্দার যারা ছোটনাগপুর থেকে ছলেবলে বহু আদিবাসীকে নিয়ে এসেছিল তারাও ব্রিটিশদের কাছে উপহার স্বরুপ পেয়েছিল জমি। বাগানে হাট্টাবাহার প্রথা ছিল স্বাধীনতার পরেও। অর্থাৎ ম্যানেজার চাইলে শ্রমিককে বাগান থেকে বিতাড়িত করে দিতে পারত। অন্য বাগানেও কাজ করার উপায় ছিল না শ্রমিকদের। শুধু মাত্র বাঁচার তাগিদে জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে ছিল তাদের বাস। এই সব অঞ্চল তাই তখনকার দিনে চা বাগানের মানুষের কাছে মোটেই বাসযোগ্য মনে হত না। বহু বাঙালি অন্ধকারময় শহর ছেড়ে বাগানে কাজ করত কারণ স্টাফ কোয়ার্টারে জেনারেটারের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল। ছিল আরো নানান সুযোগ সুবিধা। এই আকর্ষণ অনেকেই স্বল্প মাইনের সরকারি চাকরি না করে বাগানের স্টাফ বা সাব স্টাফের কাজে যুক্ত হত।

 

প্রায় ১৫০ বছর পার হতে চলল। আজ বাগানের শ্রমিকের হাজিরা ২০২ টাকা, জমির অধিকার নেই, চা পাতা তোলা ছাড়া বিকল্প কাজ নেই ছেলে মেয়েদের। বাড়ির ছাদ গড়তে গেলে ম্যানেজারের শো-কজ নোটিশ চলে আসে। তাই আজ বাগানগুলো বসতির দিকে চেয়ে থাকে। কৃষিজমি, সরকারি চাকরি ও সুন্দর ভাবে গড়ে তোলা ঘরবাড়ির সাথে অনেকেই উন্নততর জীবনযাপন করছে। বাগানের মানুষের থেকে তো ঢের ভালো তা বলাই যায়। বসতি বা গ্রামগুলোকে জমিদারি প্রথা থেকে আমরা বার করতে পারলেও চা শিল্পের ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে আজও  চা শ্রমিক আদিবাসীদের মুক্ত করতে বাংলা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি প্রকল্পগুলো বাগানে চালু করার মাধ্যমেই শ্রমিকদের জীবনযাত্রা উন্নততর হবে তা ভাবা ভুল যদিও বহু চর্চিত ন্যূনতম মজুরি আইন লাগু করা হবে বলে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ অবধি ১৭টা মিটিং হলেও সমাধান হয়নি। একবার ভাবুন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আমরা ন্যূনতম মজুরি চালু করতে পারিনি অর্থাৎ যে মজুরি দিয়ে শ্রমিক পরিবার বেঁচে থাকবে এবং পরেরদিন শ্রমিক তার শ্রম দেবে। পুরো বিশ্বের শ্রমিক যখন ফেয়ার ওয়েজ বা লিভিং ওয়েজের কথা বলছে তখন চা শ্রমিকদের জন্য ব্রিটিশদের চালু করা হাজিরা দিয়েই আমরা যেন সন্তুষ্ট। তবে শোষণের এখানেই শেষ নয়। ঠিকা শ্রমের মাধ্যমেও মালিকেরা অধিক পরিমাণ মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছে শ্রমিকের থেকে। ব্যাপারটা এভাবে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ডুয়ার্স ও তরাইতে ২৫ কেজি চা পাতা একজন শ্রমিক তুললে সে হাজিরা পায় ২০২ টাকা। এবার তার অধিক পাতা যদি তোলা হয় তখন ঠিকাশ্রমের কথা আসে। যা প্রত্যেক কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা। এবার এক জন শ্রমিক ৫০ কেজি পাতা তুললে সে ২৫ কেজির জন্য পাবে ২০২ টাকা আর অধিক ২৫ কেজির জন্য তার প্রাপ্য ৭৫ টাকা। অর্থাৎ বাকি ১২৭ টাকা মালিকের পকেটে। শ্রমিক সংগঠন ও নেতা মন্ত্রীরা মজুরি বাড়ানোর কথা বললেও ঠিকাশ্রম নিয়ে কারোর কোন সারা শব্দ দেখছি না। তার মধ্যে শ্রমিকের ঘাড়ে প্রো-রেটা বলে এক আজব নিয়ম মানতে হয়। যা শ্রমিক মহলে পোরোটা বলে পরিচিত। বিষয়টি হল আপনি যদি ২৫ কেজি পাতা তুলতে না পারেন তাহলে কেজি প্রতি আপনার মজুরি কাটা যাবে। ভরা মরশুম বা শুখা মরশুমে প্রো রেটা কত হবে তা ঠিক করবে বাগানের ম্যানেজার। পাতা ওঠা নির্ভর করে গাছের রক্ষণাবেক্ষণ ও রিপ্ল্যান্টেশনের উপর। সাধারণ ভাবে ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে  চা গাছ বাণিজ্যিকভাবে অনুৎপাদক হয়ে যায়। আমাদের উত্তরবঙ্গের বহু চা বাগিচার গাছের বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে । কিন্তু পাতা না থাকার দায় মালিক নেবে? নাকি নিতে হবে চা বাগানের শ্রমিকদের?

 

এই সবের মাঝেই উঠে আসবে বস্তাপচা পুরনো যুক্তি। চা শিল্প নাকি মন্দা রয়েছে। তাই মালিকের কিছু করার নেই আর সরকারের হাত পা বাঁধা। শুধু উত্তর আসবে না তামিলনাড়ুর কন্নুরে ২০১৯-২০ সালে চায়ের অকশন সেন্টারে দাম ৮৫.৩০ পয়সা থাকা সত্ত্বেও তামিলনাড়ুর চা শ্রমিকেরা মজুরি পেতে পারে ৪২৫ টাকা। আর শিলিগুড়ির অকশন সেন্টারে ডুয়ার্স তরাইয়ের চায়ের দাম ১৩৪ টাকা ৬৭ পয়সা হলেও শ্রমিকের মজুরি ২০২ টাকা কোন যুক্তিতে? লুকিয়ে থাকা যুক্তি অবশ্য রয়েছে। আমাদের দেশে ভোটার দিয়েই ভোটে জয় পাওয়া যায় না তার জন্য চাই নোট। এই নোট বহু যুগ ধরেই চা মালিকেরা চাঁদা হিসেবে দিয়ে আসছে। এমন আবহাওয়াতে নেতাদের সাথে শ্রমিকদের বিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। তাইতো যে বাংলার মেয়েরা দিদিকে দেখে দু হাত তুলে ভোট দেয়। সেই বাংলার আদিবাসী মহিলারা দিদির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। সারা রাজ্যের মধ্যে চা বলয়ের কালচিনি ও মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রতে পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটার অধিক থাকা সত্ত্বেও  বিধানসভায় শাসক দলের দুই প্রার্থীকে প্রায় ৩০০০০ হাজার ভোটে হারতে হয়। আসলে জীবনের প্রাথমিক অধিকারগুলো না পেলে কোনও খয়রাতিই চা বাগানের মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটাবে না। শাসকদলের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি ভদ্রসমাজও সেটা বুঝতে ব্যর্থ।

 

লেখক উত্তরবঙ্গে কর্মরত সামাজিক কর্মী।

Share this
Recent Comments
1
  • দারুন 👌তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। অনেক অজানা তথ্য্য জানা গেলো। লেখক কে অনেক ধন্যবাদ।👏👏

Leave a Comment