কোন ধর্মীয় চিহ্নযুক্ত পোশাকও না পরার অধিকার থাক মেয়েদের


  • April 5, 2022
  • (0 Comments)
  • 816 Views

আপাতত টিপ বিতর্কে উত্তাল বাংলাদেশ। পথচলতি এক নারীকে একজন উর্দীপরা অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘টিপ পরছোস কেন?’ সঙ্গে অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার ও পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া। এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়ের নামে ভয় দেখানো, মৌলবাদী আস্ফালন। রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক পরিচয়। ধর্ম যাই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই চলে মহিলাদের পোশাক, আচরণ নিয়ন্ত্রণের খেলা। কখনও টিপ, কখনও হিজাব। লিখছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

কোনও মেয়ে টিপ পরেন, কেউ চুড়ি পরেন, কেই কোনও প্রসাধন করেন না, গয়না পরেন না, কেউ শাড়িতে স্বচ্ছন্দ, কেউ শর্টস-এ। প্রশ্নটা পছন্দের। প্রশ্নটা সেই পছন্দেরও যা ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড’ নয়, যা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে চাপিয়ে দেওয়া নয়। মেয়েদের যা পছন্দ তাই পরবেন, তাই পরেই বাইরে বেরোবেন, যেখানে ইচ্ছে যাবেন – এইটিই স্বাধীনতা। আবার সেই স্বাধীনতা আর পছন্দের কথা বলে তার মাথার মধ্যে মগজধোলাইয়ের মতো কিছু অভ্যাস, কিছু প্রথা ঢুকিয়ে দেওয়াটাও বেশ পরিচিত ছক। মুশকিল হল, এই ছকটা থেকে কিছুতেই সব বুঝেও বেরোতে পারেন না মেয়েরা বা বলা ভালো বেরোতে দেওয়া হয় না। কখনও মৌলবাদ, কখনও পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাদের নিয়ন্ত্রণ করে যেতে থাকে।

 

সেই কারণেই রাস্তায় একজন উর্দীধারী একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, “টিপ পরছোস কেন?” বাংলাদেশের মাত্র কয়েক দিন আগের এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয় ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ আমাদের বিশেষত মেয়েদের উপর কেমন করে ছড়ি ঘোরাতে থাকে। নিজের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেও সে একজন মেয়ের পোশাক, প্রসাধন, সাজগোজের উপর নীতি পুলিশগিরি চালাতে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের এই ঘটনা, সমালোচনা, প্রতিবাদ, সমর্থনে ভরে গেছে। যা খুবই স্বাভাবিক। সামাজিক মাধ্যমের গুরুত্ব কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য তো বটেই। আবার একই ভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে সেই উর্দীধারীর বর্ণনা করতে গিয়ে যে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত করে।

 

আসলে মৌলবাদ তো এটাই চায়। ধর্মের মুখোশটা পরিয়ে দিয়ে কর্তৃত্ব ফলিয়ে যাওয়া। আর সমাজে সেইটি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল মেয়েদের উপরে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করা। কখনও তার শরীর তো কখনও তার পোশাক। নিজের সুবিধা মতো বেছে নেওয়া যেতে পারে সবটাই। আর এরই ফাঁকে গুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে পছন্দ, স্বাধীনতা আর অধিকারের সংজ্ঞাগুলো। ধর্মের খেলা খেলতে গিয়েই তাই স্কুলে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রীদের হিজাব। আবার অন্যদিকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় একটি পরিচিতিকে এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার করা যেতে পারে নারী স্বাধীনতা, নারীর অধিকারে বর্ম হিসাবে। যেকোনও ধর্মীয় চিহ্নই যে আসলে মেয়েদের পুরুষ তথা পুরুষতন্ত্রের অধীনে রাখার এক কৌশল বিশেষ তা আমরা সকলেই বুঝি। কিন্তু বিষয় হল, আমরা একটা আশ্চর্য ষড়যন্ত্রের বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাই। যেখানে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে সেগুলিকেই নিজেদের অজান্তে নিজেদের অস্ত্র বলে ধরে নিই। আর রাষ্ট্র তখন মুচকি হাসে।

 

কারণ মেয়েদের উপরে নীতি পুলিশ চালানোর জন্য এরচেয়ে ভালো উপায় আর কীই বা হতে পারে। এবং মেয়েদের উপর নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার গা-শিউরানো প্রকাশ, নির্যাতন চালাতে পারালে সমাজের উপর কর্তৃত্ব ফলানো অনেক সহজ হয়ে যায়। মেয়েদের ঘরের ভেতর ফেরত পাঠিয়ে দিলে, তাদের সাজগোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, তাদের পরিবারের-কর্মক্ষেত্রের-সমাজের পুরুষদের দখলদারির মধ্যে পাঠিয়ে দিতে পারলে রাষ্ট্রের শাসন অনেক বেশি মজবুত হয়ে যায়। সেখানে রাষ্ট্রের ধর্মীয় চেহারা প্রকট করে তোলা সহজ হয়। যেমনভাবে কায়েম হয় তালিবানি শাসন। কয়েক দশক আগের আধুনিক আফগান মহিলাদের ছবি ফিরে আসে আমাদের নিউজ ফিড-এ। আমরা শুনি কীভাবে শিক্ষায়, কাজের জগতে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করা আফগান মহিলাদের সমস্ত কিছু ছেড়ে ফিরে যেতে হয় আপাদমস্তক ঢাকা পোশাকের ঘেরাটোপে। ধর্মের নামে, রাষ্ট্রের নামে। এরপরেও যখন ধর্মীয় চিহ্ন বহনকারী কোনও পোশাকের সমর্থনে আওয়াজ তুলব, তখন কি আরও কিছুটা সচেতন হব না। সোচ্চার হওয়ার কথা যেকোনও ধর্মীয় চিহ্ন নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢোকার, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের, পোশাকের ভিত্তিতে বৈষম্য করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলুক নিরন্তর। কিন্তু পৃথিবীর এক প্রান্তে যা মহিলাদের সমস্ত স্বাধীনতা, পরিচিতি কেড়ে নিচ্ছে, তা দিয়ে মেয়েদের উপর সূক্ষ্মভাবে চাপিয়ে দেওয়া পছন্দের ধ্বজা ওড়ানোর আগে দু’বার ভাবতে হবে বৈ কি।

 

ঠিক যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুত্ববাদী এ দেশে সনাতন ভারতীয় হিন্দু ধর্মের নামে নির্দিষ্ট এক ধরনের পোশাকের ঐতিহ্য মহিলাদের মধ্যে চালু করতে চাইছে, প্রতিবেশী দেশেও সেভাবেই টিপ-কে ধরে নেওয়া হয়েছে সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামপন্থী মহিলা পরিচিতির পরিপন্থী হিসাবে। ছকটা একই। মুদ্রার এ-পিঠ আর ও-পিঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ নিয়ে অপশাসন চাপিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের মহিলারা সোশ্যাল মিডিয়ায় টিপ পরা ছবি পোস্ট করছেন, তাদের সমর্থনে বিশ্বের নানা প্রান্তের মহিলারাই টিপ পরে ছবি দিচ্ছেন। এবং এই সমর্থনের প্রতি সম্পূর্ণ সহমত পোষন করেও এ কথা বলতেই হচ্ছে টিপ, শাড়ি, চুড়ি বা অন্য যা কিছু দিয়েই মহিলাদের বাক্সবন্দী করে ফেলাটা বেশ সমস্যাজনক। যে মেয়েটি কোনও দিনও টিপ পরে না, ব্যক্তিগত পছন্দে যার প্রসাধনের বাইরেই রয়ে যায় টিপ তাহলে এই ধর্মীয় পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গেলে সে কি নিজের পছন্দের কিছু ব্যবহার করতে পারবে? সে কি দিতে পারবে নিজের খালি কপালের ছবি? বা তার শরীরের কোনও ট্যাটু-র ছবি? তখন আবার ‘সহি’ নারীবাদীরা তাদের প্রতিবাদের ভাষাকেই উল্টে প্রশ্ন করবেন না তো?

 

মুশকিল হল সমস্ত আন্দোলনগুলিকে বড় বেশি ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট’ বা নিজেদের প্রয়োজনে যথাযথভাবে জুৎসই করে নেওয়ার প্রবণতা আজকের এই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে প্রবল। তাই নারীবাদকেও হয় ঐতিহ্যশালী হতে হয় নয়তো কর্পোরেটাইজড। এই দু’টি গল্পের বাইরে থেকে জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া নারীবাদের আখ্যানগুলি আলোচনার পরিসরের বাইরে রয়ে যায়, আলোকবৃত্তে আসার সুযোগ হয় না তাদের। সেই কারণেই যে কোনও ধর্মের পুরুষতন্ত্রের অপরিশীলিত, সুযোগসন্ধানী আগ্রাসন নেমে আসে পৃথিবীর সমস্ত দেশে মেয়েদের উপর, তাদের গতে বেঁধে বাক্সতে বন্দী করার জন্য। পণ্যের বাজারের ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-এর গপ্প আর ম্যানুফ্যাকচার্ড পছন্দের সমীকরণ থেকে বেরোতে না পারলে এই পৃথিবীরই নানা প্রান্তে খেটে খাওয়া, অধিকারের লড়াই লড়া মেয়েদের থেকে আদপে কিছুই শেখা হয়ে উঠবে না আর পুরুষতন্ত্রের তর্জন-গর্জন চলতেই থাকবে।

 

Share this
Leave a Comment