দেউচা-পাচামি কয়লা খনি প্রকল্প : কিছু জরুরি তর্ক


  • March 2, 2022
  • (0 Comments)
  • 906 Views

… দেউচাকে উন্নয়ন বলে ভ্রম যেন না-হয়। দেউচা একটা লুঠের মডেল। দেউচা একটা খুনের মডেল। প্রাণ-প্রকৃতিকে গলা টিপে খুন করার মডেল। স্বদেশকে লুঠ হওয়া থেকে বাঁচান। প্রাণ-প্রকৃতিকে খুন হওয়া থেকে বাঁচান। লিখেছেন নন্দন মিত্র

 

 

সম্প্রতি রাজ্যের দেউচা-পাচামি ব্লকে কয়লা উত্তোলনের জন্য রাজ্য সরকার সচেষ্ট হওয়ায় বিরোধিতা-সমর্থন-আন্দোলন ইত্যাদির নতুন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দেউচা প্রকল্প নিয়ে ধারাবিবরণী দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ লেখায় মূলত আমরা এই প্রকল্প ঘিরে তৈরি হওয়া কয়েকটি বিতর্ককে বিচার করার চেষ্টা করব। কয়েকটি বিতর্ক পুরোনো, যে কোনও তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে জনবিরোধ তৈরি হলেই ওই বিতর্কগুলি প্রকট হয়ে ওঠে। আবার এই প্রকল্পকে ঘিরেও কয়েকটি পুরোনো বিতর্ক নতুন ক’রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেগুলোকেও বিচার করা প্রয়োজন আজকের প্রেক্ষাপটে। তবে সবকটি বিতর্ককেই আমরা বিচারের চেষ্টা করব প্রাণ-প্রকৃতির ঘনিয়ে ওঠা সঙ্কটের বাস্তবতা থেকে। অর্থাৎ, দেউচা-প্রকল্পটিকে আমরা প্রাণ-প্রকৃতির লেন্স দিয়েই প্রাথমিক ভাবে বোঝার চেষ্টা করব এবং এই বোঝার চৌহদ্দিকে ক্রমশ বাড়িয়ে আরও কতটা সামগ্রিক ক’রে তোলা যায় সেটারও চেষ্টা করব।

 

বিতর্কের মূল জায়গা দু’টি। এক, এই প্রকল্প জনহিতের প্রকল্প না জনবিরোধী পুঁজিতান্ত্রিক ‘অপউন্নয়ন’! দ্বিতীয় মূল বিতর্ক হল সাম্প্রতিক জলবায়ু সঙ্কটের আবহে নতুন করে কয়লা উত্তোলন ও কয়লানির্ভর তাপবিদ্যুতের পরিসর বাড়ানো কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? এই দুই মূল বিতর্কের খাঁজে খাঁজে অনেক প্রশ্ন ঢুকে আছে, সেগুলোকেও অল্প-অল্প ক’রে তর্কের আওতায় আনার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, বিদ্যুৎ সে অর্থে নিছক ভোগ্যপণ্য নয়। আধুনিক জীবনে বিদ্যুতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এবং এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশে বিদ্যুতের মূল যোগান কয়লা-বিদ্যুৎ থেকেই আসে। ফলে, দেউচা-পাচামির মত প্রকল্পের বিরোধিতার যাবতীয় উপাদানই জনমানসে দুর্বোধ্য ঠেকে যখনই আগামী দিনে বিদ্যুতের যোগানে কয়লার প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে।

 

সব তর্ক খতিয়ে দেখলে, সেই মূল প্রশ্নতেই আমরা এসে পৌঁছই, এ প্রকল্প আদৌ উন্নয়ন আনবে নাকি ধ্বংসের দিকে আরেক-পা এগিয়ে দেবে!

 

উচ্ছেদের প্রসঙ্গ

 

পুঁজির দখলে থাকা সময়কালে মানুষজনকে জীবন-জীবিকা, ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ না-করে তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ এগোতে পারে না। দেউচা-ও ব্যতিক্রম হবে না। প্রকল্প ঘিরে যে রাজনৈতিক বিরোধিতা এখনও অবধি দানা পেকেছে বলে জানা যাচ্ছে তা উচ্ছেদকে ঘিরেই। বস্তুত, দেউচা-পাচামিতে আন্দোলন ক্রমশ গড়ে উঠলে তার মূল রাজনীতি উচ্ছেদ এবং জমির প্রশ্ন ঘিরেই থাকবে। এবং তা খুব অবাস্তবও নয়। ভারতে  নয়া-উদারনীতির যুগে বহুজাতিক-অতিজাতিক পুঁজি-নিবিড় উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে উচ্ছেদ। তা সে এখানকার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম বা কিছু দূরের নিয়মগিরি বা নর্মদা হোক। সরকার সে কারণেই আগেভাগে প্যাকেজের চমকে উচ্ছেদের রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে লঘু করে দিতে সচেষ্ট। কিন্তু, উচ্ছেদের প্রসঙ্গটি এখানে আরও একটু গভীরে। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৩৩০০ একর এলাকার অধিবাসী বা অঞ্চলের ওপর জীবিকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের বাইরেও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা প্রকল্প এলাকার বাইরে বসবাস করেন। তাঁদের জমি প্রত্যক্ষত না-গেলেও, যে খোলামুখ বা ওপেন-কাস্ট পদ্ধতিতে এখানে কয়লা তোলার কথা হয়েছে তাতে কয়লায় স্তর অবধি পৌঁছতে উপরের ৮৫০ মিটারের মাটি এবং ব্যাসল্টের স্তর উড়িয়ে ফেলতে হবে। এর ফলে একটা বিস্তীর্ণ ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দূষণ জনিত ব্যাপক প্রভাব পড়বে। অথচ সরকারি হিসেবে এই আক্রান্ত মানুষেরা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বলে স্বীকৃত হবেন না। কয়লাখনির মত ব্যাপক দূষণকারী প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে বিস্তীর্ণ এলাকা ক্রমশ বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে এবং বড় পরিমানে অরণ্যাঞ্চল ধ্বংস হয় (ঠিক যেমন দেউচা-র ক্ষেত্রেও ঘটতে চলেছে), তাতে সাধারণ মুনাফা-কেন্দ্রিক অর্থনীতির বিচারে এই প্রকল্পগুলির ন্যায্যতা বিচার করা সম্ভব নয়।

 

বরং আসুন, দেখে নিই যে, মানুষেরা কয়লা উত্তোলন এবং তাপবিদ্যুতের মত প্রকল্পের জন্য এযাবৎ কাল উচ্ছেদ হয়ে এলেন এবং আগামী দিনেও হবেন তাঁদের কাছে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ পৌঁছচ্ছে। দেশের কয়লা সহ অন্যান্য খনি অঞ্চলের অধিকাংশই ছোটনাগপুর ও সংলগ্ন মালভূমি এলাকায়। যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অংশ রয়েছে। এই খনি অঞ্চলের অধিকাংশটাই অরণ্যাঞ্চল ও আদিবাসী মানুষের বাসভূমি। বস্তুত স্বাধীনতার পর থেকে এ ধরণের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য উচ্ছেদ হয়েছেন যে মানুষেরা তাদের অধিকাংশই আদিবাসী। বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রশ্নেও সব থেকে পিছিয়ে থাকা, বঞ্চিত মানুষেরাও আদিবাসী। অর্থাৎ যাঁদের ঘর-বার, অরণ্য, জীবিকা নষ্ট করে কয়লা তোলা হল, তাপবিদ্যুৎ হল, তাঁরাই শেষ অব্দি বিদ্যুৎ পেলেন না ঠিক মত। তাহলে এত কয়লা, এত তাপবিদ্যুৎ এতকাল ধরে কাদের খিদে মেটাল? একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জাতীয় গ্রিড থেকে আসা বিদ্যুতের থেকে আদিবাসী মানুষেরা কেরোসিনেই বেশি আস্থা রাখছেন। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের করা ওই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডে গ্রিড বিদ্যুৎ ব্যবহার করা আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ৮৭% থেকে কমে ৭৪% হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে কেরোসিনের ব্যবহার বেড়ে হয়েছে ১১% থেকে ২১%। যদিও অগষ্ট ২০১৯ থেকে জুলাই ২০২১ অবধি চলা এই সার্ভেতে এ ধরণের তথ্য উঠে আসা, কোভিড-১৯ লকডাউনের ধাক্কাতেও এই অবস্থা হয়ে থাকতে পারে। ২০২০-তে ভারতের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারেও ৫.৬%-এর হ্রাস লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ১৯৯৫-৯৬ নাগাদ যখন নয়া উদারবাদ ক্রমশ ভারতের বাজার দখল করতে উদ্যত হচ্ছে তখন মোটামুটি ৫০% ভারতবাসীর ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল। ২০১০ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও ৩৬% ভারতবাসীর ঘরে তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। আরও ৩৩% ভারতবাসীর কাছে খাতায় কলমেই বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল। মোদ্দায়, ৭০% ভারতবাসী তখনও বিদ্যুতহীনই ছিল বলা চলে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০১০-এর তুলনায় ২.৫ গুণ বৃদ্ধি পেলেও ৭% ভারতবাসীর কাছে এখনও বিদ্যুৎ অধরা বলেই অন্তত সংবাদে প্রকাশ। যদিও মোদি সরকার ২৮ এপ্রিল ২০১৮ ভারতের ১০০% বিদ্যুদায়ন হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছে।

 

ফলত দেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুদায়নের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উত্তরোত্তর ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টা খুব সরলরৈখিক নয়। তেমনটাই যদি হত তবে অনেক দিন আগেই এ দেশের প্রত্যেক ঘরে খাতায়-কলমে নয়, বাস্তবে বিদ্যুৎ পৌঁছে যেত। বরং উত্তরোত্তর বিদ্যুৎ ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে উচ্ছেদের সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর। সমানুপাতিক বলা চলে। উচ্ছেদের প্রসঙ্গটা এক্ষেত্রে মূলত জড়িত আদিবাসী মানুষদের তাঁদের প্রকৃতিলগ্ন গোষ্ঠী জীবন থেকে উচ্ছেদের মধ্যে। ভারতের মাথাপিছু বা মাথাপিছু বিদ্যুৎ ভোগের মাপকাঠি এখনো বিশ্ব গড়ের চেয়ে অনেক কম। এবং বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদার জায়গাটা মূলত শহর কেন্দ্রিক, শহর ভারতবর্ষ বনাম গ্রাম ভারতবর্ষে বিদ্যুতের বাস্তব চাহিদার প্রশ্নে ব্যাপক পার্থক্য এখনও রয়ে গিয়েছে। নিত্যনতুন ভোগ্যপণ্যের সমাহারে শহরে উত্তরোত্তর বিদ্যুতের চাহিদা তথা বিদ্যুৎ ব্যবসার বিকাশ ঘটলেও, গ্রাম-ভারত এখনও, কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ছাড়া সেভাবে তাদের সমষ্টি-জীবনে বিদ্যুতের চাহিদার জন্ম দিতে পারেনি। প্রতিটি রাজ্যের শহর এবং গ্রামের বিদ্যুৎ চাহিদার পার্থক্যের দিকে যদি তাকাই তবে সহজেই এ কথা অনুভূত হবে। অন্যদিকে যদি ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘ডাউন টু আর্থ’-এর একটি রিপোর্টের দিকে তাকাই তবে দেখব ১৯৮১-২০১১’র মধ্যে ৮৩০,০০০ হেক্টর অরণ্যাঞ্চল তথাকথিত ‘উন্নয়নী’ প্রোজেক্টের কারণে ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০% অরণ্য গিয়েছে খনির গহ্বরে। রিপোর্টে প্রকাশ ২০০৭-১১’এর মধ্যে অরণ্য ধ্বংসের এই গতি বৃদ্ধি পেয়েছিল ব্যাপক পরিমাণে। ওই সময়পর্যায়ে মোট ৫০,০০০ হেক্টর অরণ্যাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে ২৬,০০০ হেক্টর গিয়েছে কয়লা খনিতে। ১৮১টা কয়লা খনি শিল্পে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তাপবিদ্যুৎ তৈরির জন্য নির্ধারিত হয়েছিল ২২০০ হেক্টর এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য ৮৩৮৩ হেক্টর জমি। কয়লাখনি, তাপবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের এই বৃহদায়তন ‘উন্নয়ন’ মহাযজ্ঞশালায় এ যাবৎ কাল অবধি কয়েক লক্ষ হেক্টর অরণ্যপ্রাণ বলি গিয়েছে। আগামী দিনেও যেতে চলেছে। জনসংখ্যার ৭.৫% হওয়া সত্ত্বেও, এই সব প্রকল্পে নির্বিচারে উচ্ছেদ হয়ে চলেছেন আদিবাসী মানুষেরা। ১৯৯০-এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে সেই সময়কাল অবধি ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া মোট মানুষের ৪০%ই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর।

 

ফলত কয়লা খনি এবং তাপবিদ্যুৎকে বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে বিপুল পরিমাণ জমি নষ্ট, অরণ্য ধ্বংস এবং জনগোষ্ঠীর বিপুল পরিমান উচ্ছেদকে। খনিজ সমৃদ্ধ ভারতের মধ্যভাগ এবং পূর্ব অংশের মালভূমি অঞ্চলকে স্বাধীনতার পর থেকে বারে বারে ধ্বস্ত হতে হয় দেশীয় থেকে বহুজাতিক খনি কোম্পানিদের হাতে। বারে-বারেই আদিবাসীরা হয়ে দাঁড়ান উচ্ছেদের ‘সফট টার্গেট’।

 

অন্যদিকে, যে বিপুল পরিমাণ জমি কয়লা উত্তোলনের চালু পদ্ধতিটির জন্য প্রয়োজন হচ্ছে, সেটিরও যৌক্তিক হিসেব প্রয়োজন। ভারতে প্রায় ৯০% কয়লা খনিতেই খোলামুখ পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হয়। এবং নতুন সবকটি খনি ও আগামী দিনের প্রস্তাবিত খনির সবকটির ক্ষেত্রেই এই এক পদ্ধতি। অর্থাৎ কিনা কয়লার উপরের স্তর পুরোটা কেটে তুলে ফেলা হবে। পুরোনো পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতিতে অনেক বেশি জমি-র প্রয়োজন হয়। দেখা যাচ্ছে, প্রতি ১০ লক্ষ টন কয়লা তোলার জন্য ২০০০ একর জমির প্রয়োজন। ২০১০ নাগাদ ভারত সরকারের লক্ষ্য ছিল কয়লা উৎপাদন ক্ষমতা ২০২৪-২৫-র মধ্যে বাড়িয়ে ১২৬৭০ লক্ষ টনে নিয়ে যাওয়া হবে। তখনকার হিসেবেই এর জন্য প্রয়োজন ছিল অতিরিক্ত ৫৯৩,৭৯০ হেক্টর জমি, মূলত অরণ্যাঞ্চলের।

 

 

সাফ-কয়লা (ক্লিন কোল) বিদ্যুৎ কি সম্ভব?

 

ইদানিংকালে একটা নতুন শব্দ উঠেছে—পোস্ট ট্রুথ মানে উত্তর-সত্য। বলা হচ্ছে, সত্য-মিথ্যের যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি। উত্তরকালের এই যুগে সত্য নির্মিত হয়। ফলে নির্বিচার মিথ্যেকেও সত্য প্রমান করে দেওয়া যায়। তার জন্য রয়েছে আবিশ্ব নজরদারির নেটওয়ার্ক, কয়েকটি মেগা-টেক কোম্পানি কর্তৃক আমার আপনার মগজ-ধোলাইয়ের ২৪x৭ সু-ব্যবস্থা। ফলে, ‘সাফ কয়লা বিদ্যুৎ’-ও সত্যি হয়ে যেতে পারে, কোনও ভরসা নেই। এসব কথা সকলেরই কম বেশি জানা, তবুও বলে নেওয়া উচিত যে কয়লা খনি এবং তাপবিদ্যুৎ শুধুমাত্র বিপুল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়েই দূষণ ঘটায় না। তার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে জমা হয় মানুষের স্বাস্থ্য, ফসল এবং জমির উর্বরতা ধ্বংসকারী একাধিক অ্যাসিডিক অক্সাইড জাতীয় রাসায়নিকও। ভূগর্ভস্থ জল ব্যাপক পরিমাণে দূষিত হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেরুনো বর্জ্য জলের সংক্রমণে। এছাড়া, কয়লা পোড়ালে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়াও দূষণ ঘটায় ফ্লাই-অ্যাশ। কয়লার ওজন অনুযায়ী ২-৫% ফ্লাই-অ্যাশ প্রকৃতিতে জমা হয়, যা বায়ু-জল-জমিকে নষ্ট করে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসা তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, এই ফ্লাই অ্যাশের কারণে মানুষের মধ্যে হাঁপানি জাতীয় রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। পানীয় জলের মাধ্যমে ফ্লাই অ্যাশ শরীরে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে বিষাক্ত ধাতুর। খেতে কৃষকেরা জলসেচ করতে বাধা পাচ্ছেন ফ্লাই-অ্যাশে সেচ-পাইপ/খাল অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে। সব থেকে বিপজ্জনক বিষয়, ফ্লাই অ্যাশের মধ্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থের জমা হতে থাকা। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আধ-এক মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা মানুষজনের প্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে ফ্লাই অ্যাশের মধ্যে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনাও ভালো মাত্রাতেই থাকে। যে এলাকায় এই বটম-অ্যাশ বা ফ্লাই অ্যাশ ফেলা হয়, সেই এলাকা লাগোয়া বাসিন্দাদের মধ্যে তেজস্ক্রিয় সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি।

 

বিশ্ব-উষ্ণায়নের সব থেকে বড় একক কারণ কয়লার দূষণ। সারা বিশ্বের কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ৪৬% আসে কয়লা থেকে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্র(সেক্টর) থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের ৭২% এর জন্য দায়ী তাপবিদ্যুৎ। বিশ্বের দেশগুলো বিশ্ব-উষ্ণায়নের মাত্রা একদিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির মধ্যে থামিয়ে রাখার কথা বলছে আর অন্যদিকে কয়লা বিদ্যুতে রাশ টানার ন্যূনতম কোনও উদ্যোগ নেই। ‘প্রোডাকশন গ্যাপ (২০২১)’ রিপোর্টে উঠে আসছে, তাপমাত্রা ১.৫ বৃদ্ধির মধ্যে আটকে রাখতে গেলে যে পরিমান জীবাশ্ম-জ্বালানি উত্তোলন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রগুলি ২০৩০ সালের মধ্যে তার দ্বিগুণ মাত্রার জীবাশ্ম-জ্বালানি তোলার পরিকল্পনা ক’রে বসে আছে। জি-২০ দেশগুলি কোভিড-১৯ শুরুর পর থেকে ‘ক্লিন এনার্জি’র বদলে জীবাশ্ম-জ্বালানিতেই বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করতে উদ্যত হয়েছে। রিপোর্টে ভারত সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ২০১৬ সালে সরকার ২০৩০-এর মধ্যে নির্গমন মাত্রা ২০০৫-এর তুলনায় ৩০-৩৫% কমানোর কথা ঘোষণা করলেও, ‘আত্ম নির্ভর ভারত’-এর প্রচারে, ‘Unleash the power of coal’-এর মাধ্যমে ২০২৩-২৪-এর মধ্যে স্বাবলম্বী হবার পরিকল্পনা নিচ্ছে। কয়লা থেকে সরকারি কোষাগারে আয় বৃদ্ধি এবং বাজারে কয়লার যোগান বাড়ানোরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে কয়লা উৎপাদন ৬০% বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে সরকার। এবং সেই উদ্দেশ্যে জমি অধিগ্রহণে বাধা কমানোরও প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু কয়লা নয়, সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল উৎপাদনেও ৪০% বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে।

 

এ সবই হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্কট এক চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২০-তে ভারতের কয়লা ব্লকগুলিকে খুলে দেওয়া হয়েছে বিদেশি পুঁজির সামনে। শেষ এক দশকে কেন্দ্রের পরিবেশ মন্ত্রক কয়লা উত্তোলন প্রশ্নে জনগণ ও নাগরিক সমাজের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়াকেও ক্রমশ সঙ্কুচিত করতে করতে গিয়েছে। হিসেব পরিষ্কার, জলবায়ু সম্মেলন বা কপে গিয়ে বড় বড় ভাষণ দাও, আর অন্যদিকে মুনাফাখোর কর্পোরেটদের হাতে কয়লা ব্লক তুলে দাও, কয়লা বিদ্যুতের লাগামছাড়া বৃদ্ধি ঘটাও। বৃদ্ধিই এই ব্যবস্থার একমাত্র সূচক, যা কিনা কয়লার ময়লাকেও ধুয়ে সাফ ক’রে দিতে পারে। প্রাণ-প্রকৃতি ফুসফুসের সংক্রমণে, বন্যা-খরা-সাইক্লোনে মরে যাক, কর্পোরেট মহাপ্রভুরা যেন মুনাফা কামিয়ে যেতে পারেন।

 

 

কয়লা কি তবে ‘ফেজ-আউট’ করা উচিত?

 

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমে ঠিক করতে হবে, ঠিক কাকে আমরা বাঁচাতে চাইছি। যদি বর্তমান পুঁজি ব্যবস্থাকে বাঁচাতে চাই, তবে এক রকম উত্তর। যদি নিজেকে তথা উত্তর প্রজন্মকে তথা এই প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্কটকে রুখতে চাই তবে, এই মুহূর্ত থেকে কয়লা-খননে, কয়লা-বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক রাশ টেনে ধরা উচিত। এর কোনো দ্বিতীয় ‘বিকল্প’ ‘সমাধান’ হাজির নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ’ তথা আইপিসি-র ষষ্ঠ রিপোর্টে যে প্রবণতার কথা উঠে এসেছে তাতে ইঙ্গিত রয়েছে যদি কাল থেকে কার্বন-নির্গমনে ব্যাপক হ্রাস ঘটানো সম্ভবও হয়, তাতেও ১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে আটকানো যাবে না। কিন্তু, বৃদ্ধি ঘটলেও তা সময়ের সঙ্গে হ্রাস পাবে। অন্যথায়, যদি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উত্তরোত্তর বেড়ে চলে তাহলে ২০৫০-এর মধ্যেই ২.৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি হতে পারে তাপমাত্রায়। ২১০০ সাল অবধি তাপমাত্রা ৬.৬ ডিগ্রি বৃদ্ধির মুখে পৌঁছে যেতে পারে, যার অর্থ এ প্রাণ-বিশ্বের কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে তাই এখন হিসেব করতে হবে। কোনও রাখঢাক না-রেখে স্পষ্টতই এটা বুঝতে হবে জলবায়ু এখন এক রকমের এমার্জেন্সি! তাই, বুক ফুলিয়ে কয়লায় স্বনির্ভর হবার কথা ঘোষণা করা, কয়লা উত্তোলন ক’রে রাজ্যে শিল্পে জোয়ারের স্বপ্ন দেখা রাষ্ট্রনেতাদের এ কথা বোঝার সময় হয়েছে যে কয়লার বিষ গলায় নেবার ক্ষমতাও নীলকন্ঠ প্রকৃতির ফুরিয়েছে।

 

অবশ্য এ দেশের রাষ্ট্রনেতাদের এসব বোঝার সময় এখনও আসেনি। এ দেশের রাজনীতি প্রাণ-প্রকৃতির প্রশ্নে এখনও শৈশবাবস্থাও পেরোয়নি। কোনও ঘরানার রাজনীতিতেই প্রকৃতি-সঙ্কট মূল বিষয় হিসেবে এখনও হাজির হতে পারেনি। তিন দিক সমুদ্র ঘেরা একটি দেশের ব্যাপক উপকূল অঞ্চল যখন সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যাবার আশঙ্কায়, সমগ্র দেশের ভৌগোলিক মানচিত্র যখন ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে চলেছে সারা বছর ধরে, তখন নতুন করে কয়লা বিদ্যুৎ নিয়ে খোয়াব দেখা এবং দেখানো, এবং ‘কয়লার ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করা আমাদের পক্ষে এখন সম্ভব নয়’ জাতীয় ঘোষণার মতো আত্মহননকারী কথাবার্তা আর কিছু হ’তে পারে না। সমস্যা হল, ক্ষমতার রাজনীতির ধারার বিপ্রতীপে মানুষের কথা বলে যে ‘অন্য’ রাজনৈতিক শক্তিরা,  তাদের থেকেও এ ক্ষেত্রে কোনও আশাপ্রদ ইঙ্গিত আসে না। জলবায়ু যে একটা অত্যন্ত আপৎকালীন বিষয়, সেটা যদি তাঁরাও না অনুধাবন করেন, তাহলে রাজনীতি আর ‘বিকল্প’ থাকবে কোন প্রশ্নে!

 

সে কারণেই ভারতের জনপরিসরে ‘উন্নয়ন’ বনাম প্রকৃতি বিতর্কটি এত দুর্বল। সে কারণে কখনোই জনপরিসরে তর্কটির গভীরে পৌঁছনো সম্ভব হয় না। তর্ক গভীর হলেই তা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, জনগণের বোধের অসাধ্য হয়ে ওঠে। কারণ, জনতার সংলাপে এই তর্ক এখনও পাড়ার চায়ের ঠেকের ইস্যু হয়নি। লেখালেখি করেন অল্প কিছু মানুষ। সেগুলো পড়েন আরও অল্প কিছু মানুষ। এবং আকাদেমিয়ায় এক ধরণের ‘এই পেপার’-‘ওই পেপার’-‘সেই পেপার’ এর এদিক-ওদিক খেলার মধ্যেই যাবতীয় তর্ক, চর্চা সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ভারতের ক্ষমতা-রাজনীতির বাইরে থাকা বিকল্প ধারার রাজনীতি, শোষণ মুক্তির কথা বলা রাজনীতি যদি এই তর্ককে এখনও জনপরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা না-করে তবে দেউচার মতো হাজারটা প্রকল্প হলেও কার্যত তাঁরা এই লড়াইটা হেরেই বসে থাকবেন। যেখানে জনগণ বিরোধিতা করবেন, সেখানে কিছু প্রতিরোধ হবে। ফলত জনগণের বিরোধের ওপর দাঁড়িয়ে বিকল্প ধারা নিজের রাজনীতি শানাতেই পারে, কিন্তু তা ততক্ষণই স্থায়ী, যতক্ষণ বিরোধের আগুন স্থায়ী। প্রকৃতি প্রশ্নে নিজেদের রাজনীতিকে উন্নত না-করলে, জনপরিসরে সেই রাজনীতির ভিত্তি নির্মিত না-করতে পারলে, এই লড়াইটা এমনিই আগামী ৫০/১০০-বছরে আমরা হেরে যাব। কারণ, প্রকৃতির কতটা ততদিনে টিকবে কে জানে! রিওতে ’৯২-এর জলবায়ু সম্মেলনের পর রাষ্ট্রনায়করা ঘোষণা করেছিল, প্রকৃতি বাঁচাতে হবে বটে, তবে অর্থনীতির বৃদ্ধিকে আটকে ফেললে চলবে না। তা নিয়ে ফ্রেডরিখ জেমসন কৌতুক ক’রেছিলেন, প্রকৃতি চুলোয় যাক…পুঁজিবাদ না-গেলেই হল। তা, এই কথাটা পুঁজিপন্থীদের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, পুঁজি(বাদ)-বিরোধীদের ক্ষেত্রেও কিছু কম সত্য নয় বোধহয়। যা হোক…

 

সুইডিস তাত্ত্বিক আন্দ্রে মাম ফসিল ফুয়েল মানে জীবাশ্ম জ্বালানি ও পুঁজিবাদের নিবিড় ভালোবাসাবাসীর এই সম্পর্কটি নিয়ে চিন্তার একটি নতুন দিককে উন্মোচন করেছেন তাঁর ‘ফসিল ক্যাপিটাল—দ্য রাইজ অফ স্টিম পাওয়ার অ্যান্ড রুটস অফ গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বইতে। তিনি দেখিয়েছেন ফসিল ক্যাপিটাল বা আধুনিক পুঁজিবাদের জন্মকালীন ভিত্তিটিই তৈরি হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে। মাম দেখাচ্ছেন, শুরুতে ব্রিটেনে কারখানাগুলি প্রথম দিকে তৈরিই হচ্ছে নদীর ধারে, কারণ নদীর জলের প্রবাহই ছিল শিল্পবিপ্লবের শুরুতে শক্তির মূল উৎস। ফলে কারখানাগুলি তৈরি হচ্ছে নগর থেকে দূরে, নদীর আশপাশে, যেখানে শ্রমিক যথেষ্ট পরিমাণে নেই। কারখানা চালাতে গেলে নগর থেকে শ্রমিক নিয়ে আসতে হচ্ছে, তাদের জন্য বাসস্থান তৈরি করতে হচ্ছে, কারখানা ঘিরে একটা নগর তৈরির দায়িত্বও এসে পড়ছে পুঁজিবাদীদের ঘাড়ে। নদীর প্রবাহ থেকে স্টিম ইঞ্জিনে সরে যাওয়াটা পুঁজিবাদের পক্ষে খুব সস্তা-সুবিধেযোগ্য ছিল এমন নয়। কারণ, সেই অর্থে সস্তা নদীর প্রবাহই। কিন্তু, তা সত্ত্বেও কয়লানির্ভর স্টিম ইঞ্জিন পুঁজিবাদকে নতুন প্রাণ দিল অন্যভাবে। মাম দেখাচ্ছেন, নদীর প্রবাহ থেকে শক্তির যোগান স্টিম ইঞ্জিনে পরিবর্তিত হবার মধ্যে দিয়ে পুঁজিপতিদের কাছে শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে আরও নিপুণভাবে শোষণ করার সুযোগ ক’রে দিল। ইঞ্জিনিয়ারেরা নদীর প্রবাহকে এক মিল থেকে অন্য মিলের মধ্যে ভাগ করার দুর্দান্ত সব পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু তার জন্য দরকার ছিল বড় বাঁধ, খাল কাটা, স্লুইস গেট ইত্যাদির। প্রশ্ন দাঁড়াল কে এর জন্য বিনিয়োগ করবে! আবার, এক সব মিলই যদি শক্তির প্রশ্নে সমান যোগান পেতে শুরু করে তাহলে প্রতিযোগিতা-মূলক বাজারটাও বিশেষ চাঙ্গা হয় না। সে সময় নদীর প্রবাহ শুধু খরচের প্রশ্নেই অনেক সস্তা ছিল তা নয়, নদীর প্রবাহ শক্তির ৮০-৮৫%-ই যন্ত্রের শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারত। অন্যদিকে সে সময়ের প্রযুক্তিতে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন মাত্র ২-৪% শক্তিকেই পরিবর্তিত করতে পারত যান্ত্রিক শক্তিতে। তা সত্ত্বেও, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর স্টিম ইঞ্জিন পুঁজিবাদের সামনে এমন একটা পথ খুলে দিল যাতে তাদের ‘স্বাধীনতা’ অনেক বেড়ে গেল। প্রথমত, নদীর প্রবাহকে বাঁধার জন্য যে প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ জরুরি তার প্রয়োজন পড়ল না। মিলগুলো নদীর ধারে করার প্রয়োজন পড়ল না, তাই সেখানে শ্রমিকদের কলোনি তৈরি, স্কুল, চার্চ তৈরির দরকার পড়ল না। নগরের মাঝখানে, বস্তির কোল ঘেঁষেই মিলগুলো খুলে ফেলা গেল। শ্রমিকের বাসস্থানের দায়িত্ব এড়ানো গেল। আবার পুঁজিবাদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারটিকেও দিব্যি বাঁচিয়ে রাখা গেল। মাম বলছেন, স্টিম ইঞ্জিন নদীর প্রবাহ রূপান্তরের চাকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিতে গেল কারণ সেটি তুলনায় পশ্চাদবর্তী উৎপাদিকা শক্তি ছিল।

 

ফলে, আন্দ্রে মামের গবেষণা আমাদের চিরায়ত ধারণাটিকেই একভাবে ধাক্কা দেয়, যে পুঁজিবাদের গতি উৎপাদিকা শক্তির ক্রমবিবর্তন তথা আধুনিকীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে হয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতির চোখ দিয়ে দেখলে, দেখা যাচ্ছে এই বিবর্তনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ চিরকালই সেই বিকল্পটিকেই সবসময় বেছেছে যেটির মধ্যে দিয়ে পুঁজির বিকাশ জোরদার হবে, শ্রমিক এবং প্রকৃতি শোষণের রাস্তাটি চওড়া হবে। যে সময়কালকে পুঁজিবাদের ‘প্রগতিশীল’ সময় বলেই বিবেচনা করা হয়, সে সময়টি নিয়েই যখন এতগুলো প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে তখন সাম্রাজ্যবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশেষ করে আশির দশক পরবর্তী কর্পোরেট পুঁজিবাদের একচেটিয়া রাজের সময়টি সম্পর্কে কোনও ন্যূনতম আশাও রাখা উচিত কি? এই ব্যবস্থাটির ন্যূনতমও কোনও ন্যায়বোধ বা ‘এথিক্স’ নেই, শুধু বৃদ্ধির অবাধ চক্রটিকে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া। জীবাশ্ম জ্বালানির আঁচে এই ব্যবস্থার এত বাড়-বাড়ন্ত। আঁচ নিভে গেলে অবাধ বৃদ্ধির চক্র ভেঙে যাবে। জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পুঁজিবাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র শক্তির যোগানের সম্পর্ক নয়। এটি আবিশ্ব শ্রমিক এবং প্রকৃতি শোষণের মধ্যে দিয়ে অতিমুনাফা এবং অবাধ প্রতিযোগিতার বেলুনকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান সুতো। সেই অর্থে পুঁজিবাদের প্রধানতম জিয়ন কাঠির একটা। পুঁজিবাদের ‘অ্যাকুমুলেশন’ বা ‘পুঞ্জিভবন’-এর নিয়মের মধ্যে জীবাশ্ম-জ্বালানি নির্ভরতা ঢুকে রয়েছে। সেটিকে পুঁজিবাদের পক্ষে রাতারাতি কেন কখনোই বদলে ফেলা সম্ভব নয়। সেটি করতে গেলে অন্তত এই ব্যবস্থাটারই একটা বিপ্লবী ক্রমরূপান্তর প্রয়োজনীয়। পুঁজি কি আর নিজের মৃত্যু চায়?

 

ফলে, ‘কোল অর নো-কোল’—এই তর্ক আজকের দিনে অর্থহীন। কোনও তর্কই বাস্তবত নেই। বিষ খাওয়া উচিত না উচিত নয়, এ নিয়ে কি জনসমাজে তর্ক হয়! কিন্তু, আমাদের জনপরিসরের পশ্চাদপদতার কারণেই এটা এখনো তর্ক হিসেবে বেঁচে রয়েছে। বেঁচে যেহেতু রয়েছে তাই এর উত্তর দেবারও প্রয়োজন রয়েছে। উত্তর দিতে গেলে প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হতে হবে তা হল, বিদ্যুৎ তথা শক্তির প্রয়োজনীয়তা তাহলে মিটবে কী করে? সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, হাওয়া-বিদ্যুৎ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এগুলো দিয়ে কি সম্ভব? এগুলোর মধ্যেও কি প্রকৃতি ধ্বংসের উপাদান নেই?

 

আছে। ভয়ঙ্করভাবেই আছে। মুনাফাখোর একচেটিয়া এই ব্যবস্থার হাতে এই সবকটি শক্তি-উপাদানই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। এবং হচ্ছেও। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য একরের পর একর অরণ্য, জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। হিমালয়ের প্রাণ-প্রকৃতির ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে এনেছে নদীর উচ্চপ্রবাহে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্মিত বাঁধ। পরমাণুবিদ্যুতের মত ভয়ঙ্কর কিছু তো হতেই পারে না! কারণ এই মুনাফাখোর লুম্পেনদের বিশ্বের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাদের পোষা এজেন্টদেরও যেমন মানুষের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না। ভয়ঙ্কর তেজস্ক্রিয় পরমানু-বর্জ্য এরা যেখানে সেখানে, সমুদ্র গর্ভে ফেলতে পারে, এবং ফেলছেও। সৌরবিদ্যুতের বাজার খুলবে বুঝতে পেরে হাঙরেরা ওখানেও ঝাঁপিয়েছে। ভারতের বর্তমান সরকারের পেয়ারের শিল্পগোষ্ঠী আদানি বিশাল বিনিয়োগ করে বসে আছেন। সহজ কথা, এরা মুনাফা কামাতে চায়, বৃদ্ধির চক্রটিকে টিকিয়ে রাখাই এদের উদ্দেশ্য। আর বাকি সব কিছুই সস্তা। ফলে, এরা এখন যাতেই হাত দেবে, প্রকৃতির সঙ্কট ডেকে আনবে। এই সব কিছুর মধ্যে কয়লার একটা বাড়তি গুরুত্ব আছে। সেটি হল, বিশ্ব-উষ্ণায়নের প্রধানতম কারণ কয়লা এবং কয়লা-বিদ্যুৎ। তাই, ওটা সর্বাগ্রে বন্ধ হওয়া উচিত। সারা বিশ্বের সমস্ত ঘরে যে তারপরেও বিকল্প মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পও রয়েছে। প্রশ্নটা এখানে বিশ্বের বাস্তব বিদ্যুৎ চাহিদার নয়। বাজারের কাছে প্রশ্নটা বিদ্যুৎ ব্যবসার। বিদ্যুতের বাজারকে জোরদার করবার। তা নিয়ে শেয়ার বাজারে লগ্নী-পুঁজির বিকাশ ঘটানোর। দেশের মানুষের, শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য অত বড় বড় গ্রিড বানানোর প্রয়োজন পড়ে না। তাতে বিদ্যুতের অপচয়ই বেশি হয়। শিল্প এবং দেশের মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুদায়ন, ছোট গ্রিডের মাধ্যমে অনেক ভালো ভাবে করা সম্ভব। তাতে বিদ্যুৎ অপচয় যেমন কম হয়, প্রকৃতির ক্ষতিও কম হয়। মুশকিল হল, তা দিয়ে যথেষ্ট মুনাফা হয় না। আন্তর্জাতিক বাজার চনমনে হয় না। আজকের দেউচা-পাচামিকে তাই দেশের, শিল্পের বিদ্যুৎচাহিদা, রাজ্যে শিল্পের বিকাশ, আত্মনির্ভরতা দিয়ে বুঝলে হবে না। কারণ এর কোনওটা ঘটাতেই দেউচার প্রকল্প হচ্ছে না। হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর পুঁজিবাদের আগুন যোগাতে, আন্তর্জাতিক শক্তির বাজারে পুঁজির বিকাশ ঘটাতে।

 

 

পাওয়ার গ্রিড অর্থনীতিকে চিনুন!

 

এখনো অবধি দেউচা-পাচামি’র প্রকল্প ঘিরে যতটুকু বিরোধিতা দানা বেঁধেছে তাতে জমির প্রশ্নটাই সব থেকে বড়। হবার কথাই। এর আগে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম, পরবর্তীতে ভাঙড়েও জমি প্রশ্নটিই বড় ছিল। কিন্তু, জমি প্রশ্নটির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সব থেকে বড় সীমাবদ্ধতা হল, জমি প্রশ্ন ‘উন্নয়ন বনাম অপ-উন্নয়ন’ বিতর্কটাকে পুঁজি-বাজারের এক্তিয়ারের বাইরে নিয়ে যেতে পারে না। ফলে, সবসময়েই দরাদরির একটা জায়গা থেকে যায়। এবং রাষ্ট্র তথা পুঁজি সেইখানটাকেই বড় করে তোলে।

 

মৃদু রাষ্ট্র থেকে অতি-রাষ্ট্র সকলেই তার-তার ভাষায় জমিকে পুঁজি-বাজারের তুল্যমূল্যতায় নিয়ে আসতে চায়। হয় গায়ের জোরে, নয় টাকা-পয়সা, লোভ, প্যাকেজ ইত্যাদির জোরে। এখানেই বিতর্কের মূল প্রশ্নটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন জলবায়ু সঙ্কট তথা প্রাণ-প্রকৃতির প্রশ্নের দিকে। কারণ জমির বিনিময়ে জমি হতে পারে, উচ্ছেদের বিনিময়ে পুনর্বাসন হতে পারে, জীবন-জীবিকার বিনিময়ে চাকরির দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বিকল্প একটা পৃথিবী দেবার ক্ষমতা এই পুঁজি-ব্যবস্থার নেই। নেই বলেই, যারা ‘বিকল্প কী, বিকল্প কী’ বলে তেড়ে আসবে তাদের সমস্ত যুক্তিকে একবাক্যে নাকচ ক’রে দেওয়া যেতে পারে। কারণ, বিকল্প কিচ্ছু নেই। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত বুঝি যে প্রাণ-প্রকৃতিকে টিকে থাকতে হবে। তাই, প্রকৃতি ধ্বংসকারী কোনও প্রকল্পকে আর কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না। পুঁজির অবাধ্য বৃদ্ধির ধুয়োয় বন্যপ্রাণ, অরণ্যপ্রাণের ধ্বংস আর ঘটানো চলবে না। অর্থনীতির যুক্তিতে আর কোনও তুল্যমূল্যতা আমরা প্রকৃতিকে মাপব না। রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রশ্ন সমাজ-পরিসরে যদি এই দিকে না-এগোতে পারে, তবে আজ দেউচা যদি আটকেও যায়, কাল অন্য কিছু হবে। খেয়াল ক’রে দেখুন, সিঙ্গুর প্রশ্নে ‘উন্নয়ন’ বিতর্ক শুধু জমি প্রশ্নে আটকে থাকার কারণেই কিন্তু আজ বড় অংশ মানুষ, যারা সেদিন ন্যায্য বিরোধিতা করেছিলেন, তাদেরও মনে হতে শুরু করেছে, ‘জমি তো ফিরল না, অতএব শিল্প হলেই ভালো হত’। সিঙ্গুর বহুজাতিক পুঁজির একচেটিয়া প্রশ্নকে যে বিরোধিতা করেছিল তা আজ শুধুমাত্র ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যেই আটকে থেকে গেল। ‘উন্নয়ন’ বিতর্কটাও আবারও ওই এক জায়গা থেকেই শুরু হচ্ছে। আজকের কর্পোরেট পুঁজিবাদ যে জটিল আবর্তের মধ্যে দিয়ে চলে তাকে জনবোধ্যভাবে বুঝতে পারা শক্ত। কিন্তু, প্রকৃতি-প্রশ্নের বিপরীতে তার যাবতীয় জটিল চলাচল মোদ্দায় গোদা হয়ে আসে। সেখানে প্রকৃতির শোষণ কোন মাত্রায় হচ্ছে এবং আসন্ন সঙ্কটের মুখে তা আদৌ জরুরি কিনা— এটাই মুখ্য প্রশ্ন। আর সে প্রশ্নে উত্তর হল, দেউচা-পাচামির প্রকল্প মূলত প্রকৃতিকে শোষণ করবে, বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বিপুল বাড়িয়ে তুলবে, দূষণ বৃদ্ধি করবে এবং অরণ্য ধ্বংস করবে। আসন্ন সঙ্কটের কথা মাথায় রাখলে, এই প্রকল্প সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, অপ্রয়োজনীয়, আত্মহত্যাসম উদ্যোগ।

 

‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর কয়লা-বিদ্যুতে নতুন করে জোয়ার তোলার একমাত্র কারণ উপমহাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবসাকে জোরদার ক’রে তোলা। তার জন্যই তৈরি হয়েছে কেন্দ্রের পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন, যার ৪২.১% মালিকানা বেসরকারি। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল — এই চার দেশের সীমান্তকে বিদ্যুতের গ্রিডে জুড়ে ফেলার জন্যই বড় বড় পাওয়ার গ্রিডের নির্মণ চলছে দেশ জুড়ে। কিছুকাল আগে ভাঙড়ের পাওয়ার গ্রিড বিরোধী আন্দোলনের সময় এই সব তথ্য সামনে এসেছে। তখনই দেখা গিয়েছিল, এই পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন মোটেও ভারতের গ্রামে-গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে তৈরি হয়নি। তার উদ্দেশ্যও তা নয়। বরং আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুদানে পুষ্ট হয়ে, তাদেরই নির্দেশ মাফিক একটি অবাধ বিদ্যুৎবাণিজ্যের নির্মাণকল্পেই তার যাত্রা শুরু। সমগ্র বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভয়ঙ্কর কেন্দ্রিকরণের হাতিয়ার এই পাওয়ার গ্রিড, যার বণ্টন প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্ষয় হয়। উল্টোদিকে ছোট-ছোট বিকেন্দ্রীভূত গ্রিড ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কিন্তু সহজেই বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ সম্ভব। তাতে বিদ্যুতের ক্ষয়ও কম হয়। কিন্তু, আসল উদ্দেশ্য তো অন্য। তাই, দেউচা-পাচামি দিয়ে যিনি বিদ্যুতের স্ব-নির্ভরতা দেখবেন বা রাজ্যের আটকে থাকা ‘শিল্পায়ন’-এর খোয়াব দেখবেন, তিনি নেহাতই মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন। আদানি-আম্বানি-টাটা সহ প্রাইভেট খেলোয়াড়েরা বিদ্যুৎ ব্যবসায় জাল পেতে বসেছে। সমগ্র উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে বিদ্যুতের জাল ছড়িয়ে দেবার জন্য এত কয়লা উত্তোলন, কয়লা বিদ্যুতে জোর। দেউচা-র জমির থেকে অনেক অনেক বড় ওদের নীলনকশা। এই বিদ্যুতজাল শুধু জমি কাড়বে না, উচ্ছেদ করবে না, দেশের মানুষের বিদ্যুতের খরচও বাড়িয়ে তুলবে বহুগুণ। ঠিক যেমনটা একচেটিয়াকরণের কারণে হয়। দেউচা-পাচামি বিদ্যুতকে সস্তা করবে না। ওটা ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনে বিদ্যুৎ খরচ মেটাতে দেশের মানুষের জীবনে টান পড়বে। আর টান পড়ছে প্রাণ-প্রকৃতিতেও। এই বড় ছবিটা জনপরিসরে স্পষ্ট করার দায়িত্ব কি আমরা নেব না?

 

লেখা শেষের কথা

 

পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থা, বেকারত্ব নিয়ে চিন্তিত মানুষজনের অনেকেই মনে করছেন, দেউচা-পাচামির মত বড় প্রকল্প হলে রাজ্যের আর্থিক প্রগতি হবে। কর্নাটক, মহারাষ্ট্রের মত এ রাজ্যেও বিনিয়োগ আসবে। নিত্যনতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে। রাজ্যের মানুষকে পরিযায়ী হতে হবে না আর। বেকারত্বও বড় মাত্রায় ঘুচবে। আশির দশকের পর থেকে কর্পোরেট পুঁজি তথা নয়া উদারবাদের ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প এভাবেই মিথ্যে মায়ায় ভর করে নির্বিশেষ লুঠতরাজ চালিয়েছে। নানা দেশে সে মায়া বেশ খানিক কাটলেও, ভারতে এখনও এই মায়ার প্রভাব ক্রমবর্ধমান। তবে, বেড়ালের ভাগ্যে মানে রাজ্যের ভাগ্যে যে এবারেও শিকে ছিঁড়বে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। বিশ্বে যেমন পুঁজিবাদের ভাগ করা গ্লোবাল নর্থ বনাম গ্লোবাল সাউথ আছে, এ দেশের শাসক শ্রেণিও একই ভাবে স্বাধীনতার পর ভারতকে পশ্চিম আর পূর্বে ভেঙে নিয়েছে। যেখানে পূর্ব প্রান্ত মূলত যোগান দেবে কাঁচামাল থেকে শ্রম-প্রকৃতি আর পশ্চিমপ্রান্তে বিনিয়োগের কেন্দ্র গড়ে উঠবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই গড়ে উঠেছে ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, মুম্বই, দিল্লি এনসিআর। কীভাবে পূর্বের এই রাজ্যের পুঁজিনির্ভর অর্থনীতিকেও ভেঙে দেওয়া হয়েছে সেটি জানতে আগ্রহীরা ৮ জানুয়ারি ২০২২-এ আনন্দবাজারে প্রকাশিত সাংবাদিক শুভজিৎ বাগচীর উত্তর সম্পাদকীয় পড়তে পারেন।

 

ফলে, বিনিয়োগ এ রাজ্যে সেখানেই আসবে যেখানটা লুঠ করা যায়। এবং তার জন্য কোনও নতুন কর্মক্ষেত্রও খুব বিকশিত হবে না। যতটুকু কর্মক্ষেত্র বিকশিত হবে, সেটা ভারতের পশ্চিমে। ভারতের শাসক শ্রেণির এই অর্থনৈতিক প্রকল্পে বদল কিছু আসেনি। পূর্বপ্রান্তের সম্পদ লুঠের কার্যক্রম আরও জোরদার হওয়া ছাড়া। তাই, দেউচাকে উন্নয়ন বলে ভ্রম যেন না-হয়। দেউচা একটা লুঠের মডেল। দেউচা একটা খুনের মডেল। প্রাণ-প্রকৃতিকে গলা টিপে খুন করার মডেল।

 

স্বদেশকে লুঠ হওয়া থেকে বাঁচান। প্রাণ-প্রকৃতিকে খুন হওয়া থেকে বাঁচান।

 

Share this
Leave a Comment