ডুমুরজলায় খেলনগরী : হাওড়ার ফুসফুস বাঁচাতে নাগরিক আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে


  • January 30, 2022
  • (0 Comments)
  • 986 Views

‘হাওড়ার ফুসফুস ডুমুরজলা’, হাওড়া শহরবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের ভবিষ্যৎকে অনেকাংশে নির্ধারণ করে৷ পূর্ণবয়স্ক গাছগুলো প্রায় ১৫ লাখ হাওড়াবাসীর ৪০ শতাংশ অক্সিজেনের যোগান দেয়৷ এ ছাড়াও স্থানীয় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অনেকটাই জুড়ে আছে এই মাঠের সঙ্গে। …মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে আঘাত এনে, পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত করে, মানুষকে তাদের সংস্কৃতি, তাদের ইতিহাস, তাদের মুক্ত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যে উন্নয়ন যজ্ঞ চলছে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও ব্যাপক নাগরিক আন্দোলন আজকের আশু প্রয়োজনীয় কর্তব্য হয়ে পড়েছে। লিখেছেন ডুমুরজলা আন্দোলনের সংগঠক তৃষিতা মান্নাঅনিমেষ দত্ত

 

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে আসা ‘খেলনগরী’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ডুমুরজলাকে বাঁচানোর লড়াই আজ প্রায় ছ’মাস অতিক্রম করতে চলেছে৷ প্রকল্পটির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলা সত্ত্বেও রাজ্য সরকারের কার্যনির্বাহী সংস্থা ‘হিডকো’ বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলেছে এবং ‘সিএবি’-র প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম বানানোর জন্য ৮-৯ বিঘার একটি পুকুর বুজিয়ে সংলগ্ন এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বেশ কিছুটা নষ্ট করে ফেলেছে৷

 

ষাটের দশকে ডুমুরজলা এলাকাটি ছিল কৃষিজমি এবং বর্তমান মাঠটির থেকে আকারে কয়েক গুণ বড়৷ তৎকালীন রাজ্য সরকার কৃষকদের থেকে এই মর্মার্থে জমিগুলি অধিগ্রহণ করে যে, এই স্থানটি শুধুমাত্র খেলাধূলার জন্যই ব্যবহৃত হবে৷ কিন্তু অধিগ্রহণের পর জমিটি অব্যবহৃত পড়ে থাকে এবং হয়ে ওঠে স্থানীয়দের খেলার মাঠ৷ তবে এই ধ্বংসলীলার সূত্রপাত হয় কয়েক দশক আগে বামফ্রন্ট সরকারের হাত ধরে৷ হঠাৎই ঘোষণা করা হয়, এই ডুমুরজলায় তৈরি হবে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়াম এবং মাঠটির একধারে কিছুটা জমিতে গড়ে ওঠে ‘হাওড়া ইন্ডোর স্টেডিয়াম’, যা বর্তমানে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে৷

 

২০১৩ সালে এই জমিটি হাওড়া উন্নয়ন সংস্থা (এইচআরটি)-র থেকে হস্তান্তরিত হয় আরবান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন-এর হাতে৷ এরপর ২০১৭ সালে ‘হিডকো’-র কাছে ৫৬ একর জমিটি হস্তান্তরিত করা হয় এবং হঠাৎ করেই বছরখানেক আগে ‘খেল নগরী’ বা ‘স্পোর্টস সিটি’ গড়ে ওঠার প্রস্তাবনা পাশ হয়ে আসে নবান্ন থেকে৷ স্থানীয় মানুষ এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই সরকারপক্ষ তাদের এই অবৈজ্ঞানিক প্রকল্পটিকে চাপিয়ে দেয় হাওড়াবাসীর ওপর৷ এর কিছু মাসের মধ্যেই মাঠের মধ্যে মাটি কাটা এবং ফুটবল মাঠের বেশ কিছুটা অংশ খুঁড়ে নষ্ট করে দেওয়ার কাজ শুরু হয়৷ তার পর পরই মাঠ মধ্যে থাকা পুকুরের পাশের কয়েকটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটা পড়ে এবং কেটে ফেলা গাছের গুঁড়িগুলিকে সরিয়ে ফেলা হয় চাতুর্যের সাথে৷ এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় পুকুর বুজিয়ে ফেলার কাজ৷

 

সকলের অলক্ষ্যে পুকুরটি বোজানোর জন্য প্রথমেই বড় রাস্তার ধারের দেওয়াল ভেঙে ভিতরে যাওয়ার আলাদা রাস্তা বানানো হয়, ধীরে ধীরে দেওয়াল সংলগ্ন পুকুরের অংশে মাটি ফেলা শুরু হয় এবং রাতের অন্ধকারে পুকুরের জল পাম্প করে বাইরে বার করার কাজ চলতে থাকে প্রায় এক মাস ধরে৷ এ ভাবে পুকুরটির প্রায় ৮০ শতাংশ বুজিয়ে ফেলা হয়েছে মাসখানেক আগেই, বাকি পুকুরটিকে ধীরে ধীরে বোজানোর কাজ চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে৷ হঠাৎ করেই কাজের গতি বাড়িয়ে গত এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য একটি পুকুর সম্পূর্ণ বুজিয়ে ফেলা হয়৷ এই মূহূর্তে সমগ্র মাঠে রোলার চালিয়ে, ঘাস তুলে, বালি ফেলে, বেশ কিছু গাছ কেটে ডুমুরজলাকে ধ্বংস করে দেওয়ার কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে৷

 

তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা যে অনেক আগে থেকেই করা, বেশ কিছু ঘটনা সেই প্রমাণ দেয়৷ ২০০৫ সালে মাঠের একধারে একটি পুকুর খোঁড়া হয়, যা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সরকারের প্রগতিশীল মানসিকতা বলে মানুষ ভুল করে৷ বর্তমানে সেই পুকুরেরই খুঁড়ে রাখা মাটি ব্যবহৃত হয়েছে সবচেয়ে বড় পুকুরটিকে বোজানোর জন্য৷ আরেকটি চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা হল, বিষ প্রয়োগ করে গাছগুলিকে হত্যা করা৷ এই কাজটি ভীষণই গোছানো পরিকল্পনা করে করা হয়েছে৷ বেশ কয়েকবছর ধরেই ডুমুরজলায় গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে দেখা গেছে, যা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে বয়স্ক গাছগুলি স্বাভাবিকভাবেই মারা যাচ্ছে৷ লক্ষ্য করলে দেখা যায় মৃত গাছগুলি একে অপরের থেকে বেশ কিছুটা দূরে দূরে অবস্থিত এবং বেশ কিছু জীবিত গাছের মধ্যে একটি বা দু’টি মৃত গাছ৷ শুধু তাই নয়, প্রায় প্রত্যেকটি মৃত গাছকেই কেটে দু’টুকরো করে ফেলা হয় হঠাৎ করেই৷ এইভাবে গত দশ বছরে অন্তত শ’দেড়েক গাছ মারা হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের৷

 

‘খেলনগরী’ প্রকল্পটি ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ বা পিপিপি মডেলে বাস্তবায়িত করার পরিকল্পনা হয়েছে৷ তৈরি হবে ২০০ কোটি টাকার একটি মাল্টিপ্লেক্স, যার মধ্যে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামই নয়; থাকবে জিমন্যাসিয়াম, সুইমিং পুল, শপিং কমপ্লেক্স, ১২ তলা পার্কিংলট সহ ৬০ তলা হাউসিং কমপ্লেক্স৷ ইতিমধ্যেই ২০১৯ সালে এই মাঠের অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকটি নষ্ট করে মমতা ব্যানার্জির সরকার একটি হেলিপ্যাড বানায় এবং সৌন্দর্যায়নের নামে পুরো মাঠটির স্বাভাবিকত্ব নষ্ট করে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চারপাশ বাঁধিয়ে দেয়৷

 

আদতে ডুমুরজলা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্ততন্ত্রের ধারক; ৫০০-র অধিক বিভিন্ন প্রজাতির পরিপূর্ণ গাছ (বট, পলাশ, সোনাঝুরি, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কামিনী, আম, জারুল, ছাতিম), পাখি (বেনে বৌ, বাজ, কুবো, ঘুঘু, মাছরাঙা, টিয়া, বক, ফিঙে, চড়াই), জীবজন্তু (সাপ, বেজি), প্রজাপতি, মৌমাছি, অন্যান্য কীটপতঙ্গ, জলজ জীব (জুপ্ল্যাঙ্কটন, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, মাছ,শামুক, জলজ গাছ) — এই বাস্তুতন্ত্রের উপাদানসমূহ৷ এ ছাড়াও এখানে শীতকালীন যাযাবর পাখিদের (তাইগা ফ্লাই ক্যাচার, অ্যামুর ফ্যালকন) আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়৷ উদবেড়াল ও ভাম এর বিচরণক্ষেত্র এটি, যারা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির অন্তর্গত৷ বস্তুত এলাকাটিকে জীববৈচিত্র্যের আধার বলা-ই যায়৷৷ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র এর সাথে সাথেই এই ডুমুরজলা অঞ্চল হাওড়া শহরের সকল শ্রেণির মানুষের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। ভোরবেলা থেকে ভিড় লেগে যায়।

 

অনেকেরই মনে হতে পারে খেলার জন্যই যখন এই জমি নেওয়া হয়েছিল, ‘খেলনগরী’ হতে অসুবিধা কোথায়? ‘খেলা’ মানে শুধু খেলাই বোঝায়। খেলার নগরীর মধ্যে ‘নগরায়ন’ শব্দতে স্পষ্ট হয়ে যায়, এখানে কংক্রিটের আস্তরণ পড়তে চলেছে। আর নগরায়ন মানে সেখানে বাড়িঘর, দোকানপাট হবে স্বাভাবিক। আর সেইজন্যই হিডকোর আগমন। কিন্তু প্রশ্ন হল, শহরের মধ্যে এ রকম ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে — গ্রিন বেঞ্চের এই নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন ঘনবসতিপূর্ণ হাওড়ায় এই প্রোজেক্ট আবার বাস্তবায়িত করতে সরকার বদ্ধপরিকর?

 

ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে এই এলাকাটি দ্বিতীয় হুগলি সেতুর একেবারে কাছে। ডুমুরজলার আশপাশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত থেকে একেবারে নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণির মানুষের বাস এখানে। ব্যবসায়ীক উন্নতিই আসল কারণ তাহলে? আর ব্যবসায়ীক উন্নতি যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য নয় বলাই বাহুল্য। রেস্তরাঁ মালিক, হোটেল মালিক, কফি শপের মালিক, রুফ টপের মালিকদের স্বার্থে। দামি ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প, দামি সুইমিং পুল-সহ এখানে প্রাতঃভ্রমণ এর ক্ষেত্রেও যে পকেটের কড়ি খসাতে হবে! বিশ্বায়নের যুগে উন্নয়নের যে মডেল ভারতবর্ষে গত তিন দশক ধরে অনুসরণ করা হচ্ছে, সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাতেই আসলে এই ‘খেলনগরী’।

 

মাস ছয়েক আগে খেলনগরী প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মাঠের নিয়মিত সদস্যরা এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করেন এবং সেই লড়াই সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সেভ ডুমুরজলা” নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ গঠন করেন৷ ইতিমধ্যে ১২ নভেম্বর, ২০২১-এ কয়েকশো মানুষকে নিয়ে একটি সমাবেশ হয় এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষ, মাঠের নিয়মিত সদস্য এবং কিছু পরিবেশপ্রেমী মিলে গড়ে তোলেন আন্দোলন৷ ২০ নভেম্বর, ২০২১-এ একটি গণকনভেনশনের ডাক দেওয়া হয় এবং আন্দোলনটিকে সুগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় ‘সেভ ডুমুরজলা জয়েন্ট ফোরাম’৷

 

ফোরামের সহযোগিতায় প্রথমেই আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি এবং ইমতিয়াজ আহমেদ কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন৷ বর্তমানে মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছে এবং হাইকোর্ট আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজ্য সরকারের কাছে এই প্রকল্পের হলফনামা চেয়ে পাঠিয়েছে৷ এর সাথে সাথেই ফোরামের সদস্যরা মানববন্ধন, স্ট্রিট কর্নারের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের মধ্যে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

 

এ ছাড়াও প্রতিবাদের জন্য দেওয়াল লিখন, লিফলেট বিলি করা, পোষ্টারিং, প্রতীকী পথ অবরোধের মতোও কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়৷ যার ফলে ফোরামের পাঁচ সদস্যের নামে পুলিশ একটি ভুয়ো মামলা করে এবং তাদের যথেচ্ছভাবে হয়রানি করা হয়৷ সর্বোপরি এই আন্দোলনকে দমানোর জন্য ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে ফোরামের দুই সদস্যাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয় এবং এক সদস্যাকে দিনেদুপুরে রাস্তার মধ্যে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়৷ এর পরেও দেওয়ালে পোষ্টারিং-এর সময় কিছু আন্দোলনকারীকে চ্যাটার্জি হাট থানার পুলিশ এসে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে, হুমকি দেয় এবং হাত থেকে পোষ্টার নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দেয়৷

 

এত কিছুর পরেও হাওড়াবাসী এবং ফোরাম তাদের লক্ষ্যে অবিচল থেকে এই লড়াই এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর৷ গতকাল ২৮ জানুয়ারি ফোরামের পক্ষ থেকে ডুমুরজলা-সহ জেলার দূরবর্তী স্থানের মানুষদের কাছে ডুমুরজলা বাঁচানোর আওয়াজ পৌঁছে দিতে একটি ট্যাবলো প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়৷ এই প্রচার ডুমুরজলা থেকে শুরু হয়ে দালালপুকুর, শ্যামাশ্রী, কালিবাবুর বাজার হয়ে হাওড়া ময়দান পর্যন্ত করা হয়৷ লিফলেট বিলি, পোষ্টারিং, কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বক্তৃতার মাধ্যমে এই প্রচার কার্য সম্পন্ন হয়৷ ভবিষ্যতে হাওড়ার আরও অন্যান্য এলাকায় এই জাতীয় প্রচারের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ফোরামের৷

সরকার অনুমোদিত এই প্রকল্পের ফলে শুধু গাছপালা, পশুপাখিরাই নয় আশেপাশের সকল মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে৷ সবথেকে বেশি অবহেলিত হচ্ছেন মাঠের মধ্যে থাকা বেশ কিছু বস্তিবাসী। প্রতি মুহূর্তে তাঁরা উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে বসবাস করছেন৷ এ সবের সাথে করোনা নিয়ে শাসকপক্ষের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এই মানুষগুলোর জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে৷ ঠিক মতো কাজ নেই, গত দু’বছর ধরে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ! এ অবস্থায় আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা উদ্যোগ নিয়ে এই বস্তির ছোট ছোট বাচ্চাদের আবার বইখাতার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে৷ চেষ্টা চলছে তাদের অধিকারের ‘শিক্ষা’ টুকু তাদের হাতে তুলে দেওয়ার৷ এই চেষ্টা থেকেই প্রকৃতির মধ্যে গড়ে উঠেছে ‘প্রকৃতির পাঠশালা’৷

 

‘হাওড়ার ফুসফুস ডুমুরজলা’, হাওড়া শহরবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের ভবিষ্যৎকে অনেকাংশে নির্ধারণ করে৷ পূর্ণবয়স্ক গাছগুলো প্রায় ১৫ লাখ হাওড়াবাসীর ৪০ শতাংশ অক্সিজেনের যোগান দেয়৷ এ ছাড়াও স্থানীয় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অনেকটাই জুড়ে আছে এই মাঠের সঙ্গে। বয়স্কদের অবসরকালীন জীবনযাপন থেকে কমবয়সিদের খেলাধূলা বা স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকদের বিশুদ্ধ বাতাস—এই সবটুকুকে একাই ধরে রেখেছে ডুমুরজলা৷ শুধু তাই নয়, দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বহু মানুষের রুজিরুটি আসে এই মাঠকে কেন্দ্র করে৷ অনেকগুলি চায়ের দোকান, নিয়মিত চলা বাজার, খাবারের দোকান, মাঠের মধ্যে থাকা স্পোর্টস ক্লাবগুলির মাধ্যমে খেলার সাথে যুক্ত মানুষের রুটিরুজি সবটাই।

 

মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে আঘাত এনে, পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত করে, মানুষকে তাদের সংস্কৃতি, তাদের ইতিহাস,তাদের মুক্ত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যে উন্নয়ন যজ্ঞ চলছে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও ব্যাপক নাগরিক আন্দোলন আজকের আশু প্রয়োজনীয় কর্তব্য হয়ে পড়েছে। না হলে একটা একটা করে সমস্ত পুকুর-জলাশয় ধ্বংস হবে, মাঠগুলো কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হবে, মানুষ তার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। সময় বড়ো কম। ডুমুরজলা বাঁচানোর লড়াই অনেকগুলো লড়াইয়ের মধ্যে একটা। ডুমুরজলা বাঁচাতে পারলে অনেকগুলো লড়াই দানা বেঁধে যাবে, হয়তো বা আরও কিছু প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যাবে।

 

Share this
Leave a Comment