পথে নামলেন দু’বছর ধরে উচ্ছেদ হওয়া টালা ব্রিজ সংলগ্ন বস্তিবাসী মানুষেরা


  • January 28, 2022
  • (0 Comments)
  • 668 Views

২০১৯ সালে উত্তর কলকাতার বি টি রোডের সাথে সংযোগকারি টালা সেতুর পুর্ননির্মাণের জন্য সেতু সংলগ্ন বসবাসকারি প্রায় ১৫০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়ে। ২৭শে জানুয়ারি টালা ব্রীজ মেরামতির কারণের উচ্ছেদ হওয়া সকল মানুষের উপযুক্ত বাসস্থান ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা সহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা অঞ্চলে মিছিল ও পথসভা সংগঠিত করেন। গ্রাউন্ডজিরোর জন্য সৌরব চক্রবর্তীর রির্পোট।

 

২৮ জানুয়ারি : শ্রমজীবী মানুষদের শ্রমের হাত ধরেই ঘোরে শহরের চাকা। কিন্তু নগর-উন্নয়নের নামে তাদের উপরেই সবার আগে প্রতিঘাত নেমে আসে। ২০১৯ সালে উত্তর কলকাতার বি টি রোডের সাথে সংযোগকারি টালা সেতুর পুর্ননির্মাণের জন্য সেতু সংলগ্ন বসবাসকারি প্রায় ১৫০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়ে। ২৭শে জানুয়ারি টালা ব্রীজ মেরামতির কারণের উচ্ছেদ হওয়া সকল মানুষের উপযুক্ত বাসস্থান ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা সহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা অঞ্চলে মিছিল ও পথসভা সংগঠিত করেন।

 

বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ হওয়ার পরেই গঠিত হয়েছিল — বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি। ২০১৯ সাল থেকে তারা আন্দোলন করে যাচ্ছে। টালা সেতু নির্মাণের কাজ সুরু হওয়ার পর দুই বছর কেটে গেছে। নির্মাণ কাজ প্রায় শেয। শীঘ্রই আবার চালুও হয়ে যাবে উড়ালপুলটি, কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ১৫০ পরিবারের কোনও রকম সংস্থান এখনও হয়নি। টালা ব্রীজ সংলগ্ন বস্তিবাসীদের থাকার জায়গাটি ইতিমধ্যে ব্রিজের কাজ করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, সুতরাং তাদের সেখানে ফেরত যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। রাজ্য সরকার এবং কলকাতা পুরনিগম তখন মৌখিক প্রস্তাব দিলেও লিখিত কোনও প্রস্তাব দেয়নি। লিখিত প্রস্তাবের দাবি করাতে সরকারি নোটিশেই তাদের অবৈধ জবরদখলকারী বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ তাদের কাছে রেশন কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, গ্যাসের বিল, বিদ্যুৎ বিল সহ যেখানে থাকতেন সেখানকার কাগজপত্র সবই ছিল। পুনর্বাসনের কথা বললে কখনও ‘গ্রামে চলে যাও’ কিংবা কখনও ‘অন্য জায়গায় বাড়ি বানাও’ এইসব কথা শুনতে হয়েছে তাদের। মোদ্দা কথা সরকার কোনও দায়িত্ব নেয়নি এই উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের।

 

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ তারিখ তৎকালীন কাউন্সিলর ও বোরো চেয়ারম্যান তরুন সাহা এলাকায় এসে বস্তিবাসীদের বলেছিলেন, শুধুমাত্র টালা ব্রীজ নির্মাণের দিনগুলোতে এই মানুষেরা যেন অন্যত্র চলে যান। তিনি আরও বলেন, তাদের জিনিসপত্র সব বাড়িতেই থাকুক এবং ব্রীজ সারানো হয়ে গেলে তারা আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবেন। এমনকি এলাকার সকল মানুষের জন্য (ব্রিজ সারানোর দিনগুলোতে) অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু ২৫ তারিখ তিনি আবার এসে জানান যে জিনিসপত্রসহ তাদের বেরিয়ে যেতে হবে এবং বিকল্প থাকার ব্যবস্থা হিসেবে মানিকতলা সাহিত্য পরিষদের কাছে অনির্দিষ্ট একটি জায়গার কথা বলে তিনি চলে যান।

 

এর কিছু দিনের মধ্যে আবার জানানো হয় যে মানিকতলা সাহিত্য পরিষদের কাছে জায়গাটিতে থাকতে দেওয়া যাবে না আইনি জটিলতার জন্য। এবার ওই টালা বস্তি এলাকার লোকজন প্রবল বিক্ষোভ দেখালেও সুরাহা কিছুই হয়নি। বাধ্য হয়ে তারা তখন ক্যানাল সংলগ্ন পাড়ে এবং চিৎপুর রেলওয়ে ইয়ার্ডে থাকতে শুরু করেন।

 

বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি ২০১৯ সাল থেকে আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের চারটি মূল দাবি হলো,

 

১) টালা ব্রীজ মেরামতির কারণের উচ্ছেদ হওয়া সকল শ্রমজীবী মানুষের জন্য অবিলম্বে উপযুক্ত বাসস্থান ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার সুব্যবস্থা করতে হবে।

২) অবিলম্বে বস্তির মানুষের সুরক্ষা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট আইন প্রনয়ণের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে রাজ্য সরকারকে। UN Habitat III সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে বর্ণিত বস্তিবাসী মানুষদের বাসস্থান, জমির ওপর অধিকার, নাগরিক পরিষেবার ওপর অধিকার ইত্যাদি নাগরিক অধিকারগুলোকে আইনি রূপ দিতে হবে। সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “জীবনের অধিকার” ও ১৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “বসবাসের স্বাধীনতা”কে মান্যতা দিয়ে সকলের জন্য বাসস্থানের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সরকারকে।

৩) কলকাতা শহরের সকল বস্তিকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সেগুলোর মানোন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প ঘোষণা করতে হবে পুর নিগমকে।

৪) শ্রমজীবী মানুষের জন্য ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সুলভ ক্যান্টিন চালু করতে হবে।

 

গতকাল ২৭শে জানুয়ারি তারা মিছিল ও পথসভা করেন টালা ব্রীজের উপরে। এদিনের মিছিলের পর পথসভায় আলোচনা করতে গিয়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক রুবি হরি বলেন,

“আমাদের সংবিধানে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারের কথা বলা আছে। তাহলে আমরা কেন আমাদের সন্তান ও পরিবার নিয়ে রাস্তায় থাকবো? দুই বছর হয়ে গেছে আমরা রাস্তায় থাকছি, আগে যা ছিল সবই গেছে। ভোটের আগে নেতারা এসে বলে গেছেন যে আবার ক্ষমতায় এলে আমাদের সব দাবি মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তাদের কোনও হদিশ নেই। এখন বলছে আমরা নাকি অবৈধভাবে এখানে থাকছি। অথচ আমাদের গ্যাসের বিল, কারেন্টের বিল সব আছে। আর কিছু দিন পরে  টালা ব্রীজ চালু হয়ে যাবে। এটা ভালো খবর কিন্তু আমাদের সংস্থান করে দিতে হবে সরকারকে।”

 

বক্তব্য রাখতে গিয়ে সন্ধ্যা জয়সাবারা বলেন,

“কালো প্লাস্টিকের নিচে আমাদের দুই বছর কেটে গেল, সরকারের লোকজন দেখতেও আসেনি। শৌচাগার নেই, খাবারের জলের অভাব আমাদের প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে। তাছাড়া আম্ফানের সময় সব ভেসে গিয়েছে আমাদের। বয়স্ক মানুষেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।”

 

টালা ব্রীজের বস্তির সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। এদের বড়ো অংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। মহিলারা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন, পুরুষেরা গাড়ি চালান, ভ্যান চালানো কিংবা অনলাইন খাবারের ডেলিভারির কাজ করে দিন গুজরান করেন। সেই অবস্থায় কেউ কেউ টালির ছাদ ও পাকা দেওয়ালের ঘর তুলেছিলেন যা  ব্রীজ নির্মাণের সময় পুরনিগম ভেঙে দেয়। সভায় গুঞ্জা গুপ্তা বলেন,

“কালো প্লাস্টিকের ঘরে যেকোনও সময় আগুন লেগে যাওয়ার আশংকা থাকে। গত এক বছরে পাঁচ বার  আগুন লেগেওছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও সরকারপক্ষ এখনও কোনও উদ্যোগ নেয়নি আমাদের যথাযত পুনর্বাসনের বিষয়ে। দুই বছরে আমরা কোনও সুরাহা না পেয়ে এখন রাস্তায় নেমে এসেছি। আগামী দিনে টালা ব্রিজ চালু হওয়ার আগে যদি আমাদের ঘরের ব্যবস্থা না করে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা রাস্তা অবরোধে যাবো।”

 

২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এতোগুলি মানুষ প্রায় রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। অনিশ্চিত জীবনযাপন, বাচ্চাদের পড়াশোনা, অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পরিসেবা, ঝুপড়িতে আগুন লাগার আতঙ্ক তাদের অবিরাম ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। এবং সবচেয়ে বড় কথা একটা গোটা মহামারিতে সম্পূর্ণ অসুরক্ষিত অবস্থায় দিন কাটালেন ও কাটাচ্ছেন এই মানুষেরা। ন্যূনতম নিরাপত্তা অনুপস্থিত, যাতে কোভিডের মোকাবিলা করা যায়। প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথার খেলাপ করেছে বর্তমান তৃণমূল সরকার। পুরভোটের আগেও আরেকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের জন্য কোনও পদক্ষেপ এখনও নেয়নি তৃণমূলের পুরনিগম। ভোট আসে এবং ভোট যায়, খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলে ভোট বৈতরণী পার করে নিতে পারলে তাদের কথা বেমালুম ভুলে যায় রাজনৈতিক দলগুলি। পূর্বতন বামফ্রন্ট আমলেও এই ঘটনা দেখা গেছে। হাইকোর্ট তখন সরকারের উপর আশাভরসা রাখার কথা বললেও সুরাহা কিছুই হয়নি।

 

টালার যে মানুষগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানেই ছিল তারা এখন সরকারের চোখে অবৈধ বসবাসকারী। তাদের একটা বড়ো অংশই অবাঙালি, নয়তো সরকার বাংলাদেশি তকমা দিয়ে দিতে পারতো সহজেই। টালা ব্রিজ এলাকার মানুষেরা পরিস্কারভাবে জানিয়েছেন, পুনর্বাসন না পাওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে এবং আগামী দিনে ব্রীজ চালু হলে ব্রীজ অবরোধ করা হবে। এদিনের মিছিল যেভাবে পুলিস প্রশাসনের চোখে চোখ রেখে এগিয়ে গেছে এবং জমায়েতে বস্তিবাসিদের কথা তাতে সরকারকে যে তারা ছেড়ে কথা বলবেন না তা পরিস্কার।

 

Share this
Leave a Comment