“যোগী যদি জিতেও যান আবার, আমি নিশ্চয়ই উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে চলে যাব না। আমার লড়াই চলবে” – ডাঃ কাফিল খান


  • January 4, 2022
  • (0 Comments)
  • 285 Views

সম্প্রতি নিজের বই ‘দ্য গোরখপুর হসপিটাল ট্র্যাজেডি – আ ডক্টর’স মেমোয়ার অফ আ ডেডলি মেডিকাল ক্রাইসিস’-এর প্রকাশ উপলক্ষ্যে কলকাতায় হাজির ছিলেন ডাঃ কাফিল খান। উত্তরপ্রদেশে ২০১৭ সালের বিআরডি মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে অক্সিজেন শেষ হয়ে গেলে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অক্সিজেন সিলিন্ডার সংগ্রহ করে বেশ কয়েকজন শিশুর প্রাণ রক্ষা করতে পেরেছিলেন। এই ঘটনায় ৬০ জন শিশুর মৃত্যু৷ হয়েছিল। শিশুদের এই গণমৃত্যুর ঘটনা যোগী সরকারের নীতিহীনতা ও অকর্মণ্যতা সামনে চলে আসে। এর পরেই চাকরি থেকে বরখাস্ত হন ডাঃ খান। মিথ্যা অভিযোগে দীর্ঘকাল কারাবাস করেন। উচ্চ আদালতের রায়ের পরও বেকসুর এই দরদি চিকিৎসককে এখনও চাকরি ফিরিয়ে দেয়নি যোগী সরকার। অথচ বাকিরা ফিরে ফেরেছেন চাকরি। এদিকে, বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি উত্তরপ্রদেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে উত্তরপ্রদেশ দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার নিরিখে লাস্টবয়। ডঃ কাফিলের চিকিৎসক জীবনের ভয়াবহ সময়টির বৃত্তান্ত নিয়েই এই বইটি প্রকাশিত হল কলকাতা প্রেস ক্লাবে। বই প্রকাশের অনুষ্ঠান শেষে ডাঃ কাফিল খান গ্রাউন্ডজিরো-কে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানালেন, নিজের অধিকার কায়েমের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম ও জাতপাতের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই চলবে। গ্রাউন্ডজিরো-র পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

প্র: যোগী সরকার আপনাকে বরখাস্ত করেছে। মনে হচ্ছে যে কোনও অবস্থায় তারা আপনাকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তেও তৈরি নয়। মনে হচ্ছে, সরকার আপনার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাইছেন। এই আচরণের কারণ কী বলে মনে হয়?

 

উঃ এ কথা সত্যি যে যোগীজি আমাকে একটুও ছাড় দেবেন না। কিন্তু জানেন তো তাঁর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করছেন না। সেই সমস্ত তদন্ত যা তাঁর চিফ সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিরা করেছেন, তাঁরা সবাই আমাকে ক্লিন চিট দিয়েছেন। এমনকি আমার চাকরির পরিসমাপ্তির আদেশেও (টার্মিনেশন লেটার) তিনি লিখেছেন, আমি গোরখপুর হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনার সময় সেখানকার সবচেয়ে জুনিয়র ডাক্তার ছিলাম। আমি ১০ অগষ্ট ছুটিতে ছিলাম। আমি ক্যাজুয়াল লিভ-এ ছিলাম। তা সত্ত্বেও ঘটনা ঘটার সময়ে আমি রাত একটার সময়ে সবাইকে ফোন করতে থাকি, আমি প্রত্যেকটি জীবন বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলাম। এরকম কোনও তথ্য ‘অন রেকর্ড’ নেই যা আমার ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত অবহেলা প্রমাণ করতে পারে। বিআরডি হাসপাতালে যারা মেডিক্যাল অক্সিজেন যোগান দিত তাদের সঙ্গে আমার কোনোরকম যোগসাজস ছিল না, সমস্ত দায়িত্ব হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট-এর। এই আদেশে আরোপ সংখ্যা ৩, যেখানে চিকিৎসাক্ষেত্রে অবহেলা, দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা হয়, সেখানেও বলা হয়েছে যে আমার সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সত্য। তাহলে দেখা যাচ্ছে তিনি আমাকে ক্লিনচিট দিয়েছেন। কিন্তু আমার চাকরির পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন এই বলে যে আমি ২০১৪ সালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছিলাম। আমি ২০১৬ সালের ৮ আগষ্ট বিআরডি মেডিকেল কলেজে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম, তার আগে আমি পেশাগতভাবে কী করছিলাম সেটা কারোর দেখার কথা নয়।

 

প্র: এই যে যোগী সরকারের প্রশাসনিক আধিকারিকেরা আপনাকে ক্লিনচিট দিচ্ছেন, এমনকি টার্মিনেশন লেটারেও আপনার বিরুদ্ধে তেমনভাবে অভিযোগ করছেন না, মুখ্যমন্ত্রী যোগী ক্ষিপ্ত হতে পারেন জেনেও – এটা কেন বলে আপনার মনে হয়?

 

উঃ কারণ তাঁরা জানেন, নতুন সরকার আসতে চলেছে। এবং সেই সরকার সেই সমস্ত আধিকারিকদের ছেড়ে কথা বলবে না যাঁরা এই যোগী সরকারের কথায় উঠছেন, বসছেন। দেখুন, তাঁরা আধিকারিক, তাঁরা জানেন যে আমিও উত্তরপ্রদেশ পাব্লিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়েছি। তাঁরাও একই আয়োগের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়েছেন। আমি পাব্লিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে চাকরি পেয়েছি। এক্ষেত্রে একটা নিয়ম আছে যে, এভাবে নিয়োগ হলে দু’বছর প্রবিশন-এ থাকতে হবে। সেই সময়ে আপনার কোনও প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকবে না। সুতরাং সে সময়ে আপনি কোনও দুর্নীতি করতে পারেন না। আপনি সুপারিটেন্ডেন্ট৷ বা হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট নন। আমি ২০১৬-এর ৮ অগষ্ট মেডিক্যাল কলেজে যোগ দিই আর এই ঘটনা ঘটে ২০১৭-এর ১০ আগষ্ট। তাই এই আধিকারিকেরা জানেন যে, আমার সে সময়ে কোনোরকম ক্ষমতাই ছিল না। তাই কী করেই বা আমি কিছু করতে পারব? সেই জন্যই যখনই যোগী কোনও তদন্ত করছেন, তাঁরা আমাকে ছাড় দিচ্ছেন। কারণ তাঁরা জানেন, এই মানুষটি (নিজের কথা বলছেন) বারেবারে আদালতে যায় এবং এই মর্মে যদি আবার আদালতে যাওয়া হয়, তাহলে তাঁদের সত্যিই বড়সড় সমস্যায় পড়তে হবে।

 

প্র: আপনি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার চাকরি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে চলেছেন। যদি আপনি জিতে যান তাহলে কি আপনার যোগী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়ে যাবে? না কি আপনি লড়াই চালিয়ে যাবেন?

 

উঃ এই লড়াই যোগীর বিরুদ্ধে নয়। আমি সব সময় এটা বলি। এই লড়াই হল সেই সব মানুষদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে যাঁরা দু’জন মানুষকে বিভক্ত করেন ধর্ম ও জাতের ভিত্তিতে। লড়াই সেই মতাদর্শ, সেই ভাবনা, সেই ‘সোচ’-এর বিরুদ্ধে। আমি অনেক সময়ে বলি, আমি যোগীজি বা মোদীজির বিরুদ্ধে যাচ্ছি না। এঁরা তো সবাই আসলে মুখ। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানী ছিলেন, মোদীজি এলেন, তারপর এলেন যোগীজি। এই মানুষেরা আসবেন, যাবেন। কিন্তু এই মতাদর্শটা রয়ে যাবে। তাই কেউ যখন জানতে চান যে, আমার নাম কাফিল খান বলে যোগী আমার সঙ্গে এমন করছেন কি না – আমি বলি ‘না’। আমার নাম কাফিল জন, কাফিল মিশ্র হলেও উনি তাই করতেন, কারণ ওঁর নিজের লোকেদের বাঁচাতে হত। কোনও নির্দিষ্ট মানুষের বিরুদ্ধে নয়, আমার লড়াই তাই এই মতাদর্শের বিরুদ্ধে। আর আমি এই লড়াই চালিয়ে যাব।

 

প্র: আপনি খুবই আত্মবিশ্বাসী যে আগামী নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে নতুন সরকার আসবে। কিন্তু আপনি কি এই বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী যে, যে মতাদর্শের বিরুদ্ধে আপনার লড়াই তা সরকার বদলের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে? না কি তা একই থাকবে? বিরুদ্ধ স্বরকে দাবিয়ে দেওয়া, প্রান্তিক মানুষদের শোষণ কি বন্ধ হবে?

 

উঃ গত ১০০ বছর ধরে এই মতাদর্শ আমাদের দেশে কায়েম আছে। আমার সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই ভাবনা শিকড় ছড়াচ্ছে, যা উপড়ে ফেলতে হবে। কোনও সমাজে ঘৃণা ও হিংসার জায়গা থাকতে পারে না। একটি বিষয় আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ও আমি আত্মবিশ্বাসী – বিজেপি যোগীকে নির্বাচনের প্রথম সারি থেকে সরিয়ে নিচ্ছে আর মোদীকে নির্বাচনের মুখ করে তুলছে। কারণ তারা বুঝেছে গত ৫ বছরে যোগী সরকার কোনও কাজের কাজ করেনি শুধুই শ্মাশান-কবরস্থান, আলি-বজরংবলি, জিন্না-আব্বাজান এইসব বিভেদ সৃষ্টিকারী অপপ্রচার চালিয়েছে। আমি অবশ্যই আশা করব যে পরিবর্তন আসবে। আমাদের আশা হারালে চলবে না। ‘উম্মিদ পে দুনিয়া কায়েম হ্যায়’। ধরা যাক, যোগী যদি জিতেও যান আবার, আমি নিশ্চয়ই উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে চলে যাব না। আমার লড়াই চলবে। আমি মনে করি আমাদের শুধু সঠিক পথটা বেছে নিতে হবে।

 

Share this
Leave a Comment