মচ্ছব শেষ হলেই জারি হবে অতিমারির বিধিনিষেধ


  • December 29, 2021
  • (2 Comments)
  • 317 Views

যা জরুরি ছিল, উৎসবে লাগাম পরানোর, তা দুর্গাপুজো থেকেই করা উচিত ছিল। দুর্গাপুজো থেকে বড়দিন পালনের এই মাতনকে প্রশ্রয় দেওয়াও তো একরকম আর এক দফার অতিমারিকে আবাহন। এই দায় নেবে কে? দায় কার? প্রশ্ন তুললেন দেবাশিস আইচ

 

সিদ্ধান্ত নবান্নে বসেই নেওয়া হয় বলেই আমরা জানি। অতিমারি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ জারির সিদ্ধান্ত  মন্ত্রী-আমলা-পুলিশকর্তা-রেলকর্তা সকলে মিলেই নেবেন এমনই প্রশাসনিক রীতি। অশোক স্তম্ভের ছাপ মারা লিখিত ঘোষণাটি মুখ্যসচিব করবেন। সেটাই নিয়ম। রেলের ঘোষণা করেবেন রেল কর্তা। তবে নাটকীয়তা জনবাদী নেতা-নেত্রীদের খুবই পছন্দ। তাই সাগরমেলার মঞ্চে বসে মুখ্যসচিবকে নির্দেশ জারির ভঙ্গিতে এমন ঘোষণা। যেন তিনিই সব সিদ্ধান্ত নিলেন। কলকাতা থেকে সাগরদ্বীপে আসতে আসতে ভেবে নিয়েছেন যেন। এমনটা গত ১০ বছর ধরে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায়। এই হাস্যকর কুনাট্যরঙ্গে দেশের সেরা শ্রী শ্রী ‘হিন্দুহ্রদয়সম্রাট’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী। আর এইতো সেদিন কপিলমুনির মহন্ত ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, মমতা প্রধানমন্ত্রী হবেনই, কেউ রুখতে পারবে না। নিন্দুকরা সন্দেহ করতে শুরু করেছেন, মহন্ত বোধহয় বলতে চেয়েছেন — মমতার মোদী হওয়া কেউ রুখতে পারবেন না। তাঁর ভক্তরাও কী মনে মনে ভাবতে শুরু করেছেন, মমতা একদিন  ‘হিন্দুহৃদয়সম্রাজ্ঞী’ হয়ে উঠবেন? ভাবনাটা অমূলক নয়। এই যে ভাঁড়ে মা ভবানী এক ক্ষুধার্ত, কর্মহীন, উন্নয়নহীন, উদ্যমহীন, গণতন্ত্রহীন রাজ্যে ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে দিঘাতেও এক মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত; এই সাগরমেলার প্রাক্কালে কপিলমুনির মন্দিরের মহন্ত, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মহারাজদের আশীর্বাদী মাখামাখি দেখে তেমনই মনে হতে পারে। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের মুখে কাশীতে প্রধানমন্ত্রীর জমকালো ধর্মীয় প্রদর্শনী দেখে মোদীভক্তদের যেমন মনে হয়। তবে, ধারে ও ভারে আধিপত্যবাদী, সংখ্যাগুরুবাদী সম্রাট তুলনারহিত।

 

দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দান নিয়ে এমনই এক স্পেকটাকলের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে  একদলীয় প্রভাবে প্রভাবান্বিত, তৃণমূল কংগ্রেসের পুরপিতার নেতৃত্বে পুজো কর্তারা মাতিয়ে দিলেন। তাঁদের বাইটে, কোটে, বক্তৃতায়, ব্যানারে মায় মুখ্যমন্ত্রীর কথায় যেন ঘোষিত হয়ে গেল পুজো, কলকাতার এই দুর্গাপুজো যেন এ-শহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা পেল। যে পুজোর বয়স হবে মাত্র সাড়ে ১০ বছর। এভাবেই মিথ গড়ে ওঠে। মিথ্যা গড়ে ওঠে। কলকাতার রাজপথে ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ  জ্ঞাপনের এই কার্নিভাল-সম মচ্ছবে দেখে কি মনে হল — এই শহরে ওমিক্রন ভাইরাস সিঁধ কাটছে। মনে হল,  রাজ্যের কর্তারা আদৌ মনে করেন যে, এখন মচ্ছবের সময় নয়? এ বছর দুর্গাপূজায় স্বয়ং দমকল মন্ত্রীর পুজোয় যেভাবে সব আইনকানুন, পুলিশ-দমকলের বিধিনিষেধ, মায় উড়ান চালনার আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ লঙ্ঘিত হল — কলকাতার পুজোয় তাই হল এই সরকারের দান। প্রতিবছর পুজোর অন্তত চারদিন আগে থেকে এবং অন্তত আরও চারদিন পর অবধি কলকাতা অচল করে দেওয়াও আরনেক অবদান। ঘোষিত হয়ে গিয়েছে এবার তা আরও অন্তত ১০ দিন বাড়বে।

 

এই ভাঙা বেড়ার ফাঁক গলে রাজ্যে কি — ও – ওমিক্রন এল তেড়ে? বড়দিনের লাগামহীন আনন্দের ফোয়ারা কি জোয়ার আনল সংক্রমণে? মুখ্যমন্ত্রীর সাগরের ঘোষণায়  এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া গেল। সেই লোকাল ট্রেনের উপরে কোপ, সেই কলকাতা শহরে কনটেইনমেন্ট জোনের সিদ্ধান্ত, খুলতে না-খুলতে সেই পড়াশোনা বন্ধের আশঙ্কা, সেই অফিস-কাছারি, কল-কারখানায় ৫০ শতাংশ কর্মী সংকোচন। কিন্তু ট্রেনটি পুরো বন্ধ নয় কেন? যেমন, হিন্দুত্ববাদীদের মন রাখতে, ভোট রাখতে কোভিড ০২ আবহে কুম্ভমেলা করেই ছেড়েছিলেন মোদী-যোগীরা। সাগরমেলাও সেই কারণেই বন্ধ হওয়ার কারণ নেই। তাই ট্রেন পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ তাই। ইদ, মহরম সবই ঘরের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে পালন করার মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন কিন্তু মান্যতা পেয়েছিল। পেয়েছিল কি এ জন্যই যে, এ দেশ ক্রমে হিন্দুত্ববাদীদের দেশ হয়ে উঠছে?

 

এই সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় পরিসরে যেকোনও সমালোচনা, ভিন্ন স্বর, ভিন্ন মত, প্রতিবাদ গর্হিত অপরাধ। যেখানে, ছাত্র-শিক্ষক-মানবাধিকার-মানবাধিকার কর্মী-স্বাস্থ্যকর্মী-পরিবেশকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন, উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা বিধি মেনে প্রতিবাদে, অবস্থানে নামলেও সোজা লকআপে তাদের স্থান হয়। সরকার কিংবা দলের সভা-সম্মেলন, মিছিল, মিটিং চলতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নৈব নৈব চ। এই তো মানবাধিকার সংগঠনের রাজ্য সম্মেলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল আগের রাতে। এই পরিসরেই  রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগে আটক করা হয়। বিনাবিচারে বন্দি করা হয় ইউএপিএ-র নানা ধারায়। কিন্তু নির্বাচনী বিধিনিষেধ মানা হয় না। মানা হয়নি যেমন কলকাতা পুরসভায়। শিক্ষা নেওয়া হয়নি বিগত বিধানসভা নির্বাচন থেকে। আসন্ন পুরসভা নির্বাচনেও যা কেউ মানবে না।

 

তবে, জনবাদী নেত্রী নিউ ইয়ার ইভস পালনের, ইংরেজি নববর্ষ পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি।  দু’দিনের মচ্ছব বইতো আর কিছু নয়! ব্যবসায়ীদের অনুরোধও তো ফেলতে পারা যায় না। বছর শেষের, নতুন বছরের উৎসবের, পর্যটনের, বাণিজ্যের সব আয়োজন যখন সারা, তখন দুম করে কী করেই-বা মুখের উপর বিধিনিষেধের পর্দা নামিয়ে দেওয়া যায়? অর্থনীতি বলেও তো একটা বিষয় আছে।  যা জরুরি ছিল, উৎসবে লাগাম পরানোর, তা দুর্গাপুজো থেকেই করা উচিত ছিল। এই দুর্মর স্বৈরচেতনার, একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে ওঠার উদগ্র আকাঙ্খার শেষ কোথায়? এই অন্যায় আর কতকাল সহ্য করা হবে! কবে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা হবে ‘না’। প্রতিস্পর্ধায় বলা হবে, “না মানে, না।”

 

দেশের নাগরিকরা যখন অক্সিজেনের অভাবে দমবন্ধ হয়ে মরছে; হাসপাতালে-হাসপাতালে, মর্গে, শ্মশানে, কবরস্থানে ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই রব। প্রধানমন্ত্রী তখন একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের কুম্ভমেলার আয়োজন আর অন্যদিকে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে চরম ব্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের নির্বাচনী সভার ভিড় দেখে উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত তিনি। তখনও এই রাজ্যে তিন দফা নির্বাচন বাকি। গণচিতার ধোঁয়ায় অন্ধকার সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেদিন ‘সুপার স্প্রেডার’-এর আখ্যা পেতে হয়েছিল। দুর্গাপুজো থেকে বড়দিন পালনের এই মাতনকে প্রশ্রয় দেওয়াও তো একরকম আর এক দফার অতিমারিকে আবাহন। এই দায় নেবে কে? দায় কার?

 

Share this
Recent Comments
2
  • comments
    By: নীলমণি ধর on December 29, 2021

    ‘লেসার ইভিল’ এই দায় কেন নেবে?

  • comments
    By: Asit Ray on January 4, 2022

    ভালো বক্তব্য, শাসকের কারসাজি।
    মানুষ কিন্তু মূর্খ‌ই থাকলো।
    দায় আমাদের ব্যবস্থার।

Leave a Comment