ত্রিপুরায় মুসলমান সংখ্যালঘুদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণ, পুর ভোটের আগে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচেষ্টা বিজেপির 


  • October 25, 2021
  • (0 Comments)
  • 397 Views

আগামী ২৫শে নভেম্বর ত্রিপুরায় পুরভোট, শাসক বিজেপি অনেকটাই ব্যাকফুটে। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া এডিসি নির্বাচনে তিপ্রা মথার কাছে পরাজিত হতে হয়েছিল তাঁদের। এই অবস্থায় দুর্গাপূজায় বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ এবং মন্দির ভাঙ্গার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরায়  মুসলমান সংখ্যালঘুদের উপর সমপ্রতি হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণ বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকে জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনাই মনে হচ্ছে। কারণ উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় জিগির তুলে ভোটের আগে সাধারণ হিন্দু ভোটারকে বিভ্রান্ত করার কায়দা তাঁদের পুরোনো। গ্রাউন্ডজিরো-র রিপোর্ট।

 

 

উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্য ত্রিপুরা এখন প্রায় প্রতিদিনই নানান কারণে সংবাদমাধ্যমে খবর হয়ে উঠে আসছে। কখনও বিরোধী দলের অফিস পুড়িয়ে ফেলা, কখনও মুখ্যমন্ত্রীর বয়ান হাসির খোরাক হয়ে। ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই ত্রিপুরা নিয়ে দেশের অন্যান্য অংশেও আগ্রহ বেড়েছে অনেক। তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুখকর নয়। বিধানসভা নির্বাচনের পরে পঞ্চায়েত নির্বাচনেই বিরোধী দলগুলিকে প্রার্থী দিতে না দেওয়ার খবর হয়েছিল জোরালোভাবে। সমালোচিত হয়েছিল বিপ্লব কুমার দেবের সরকার। তবে সাড়ে তিন বছরে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোন কিছুই রাখতে পারেনি বর্তমান বিজেপি সরকার। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ছোট ও মাঝারি শিল্প, পরিবহন, মানুষের নিরাপত্তা ইত্যাদি প্রায় সবকিছুতেই ব্যর্থ হয়েছে বিপ্লব দেবের সরকার। ২০১৮ সালের ভোটে প্রচুর বামপন্থী মানুষও নতুন আশায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু সেইসব কিছুই পূরণ হয় নি। ক্ষমতায় আসার পরে দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা বন্ধ থাকে, বন্ধ থাকে টিপিএসসি পরীক্ষা, পুলিশ ও অন্যান্য দপ্তরেও নিয়োগ বন্ধ। গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম জায়গা রেগার কাজ অনিয়মিত, আবাস যোজনার ঘর নিয়ে নানান কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, পরিবহনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমে গিয়ে শুরু হয়েছে মাফিয়াতন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত। তাছাড়া বিরোধীদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া, সংবাদপত্রগুলিকে হুমকি দেওয়া এইসমস্ত ফ্যাসিস্ত কাজকর্ম ত্রিপুরায় চলছে নিয়মিত।

 

এরসাথে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে মুসলমান সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ। এই দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ এবং মন্দির ভাঙ্গার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই রাজ্যের মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ভাবনায় গত কিছুদিন ধরে মসজিদ ভাঙ্গা, মুসলমান পরিবারগুলির ওপর আক্রমণ এবং হেনস্থা শুরু হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এই আক্রমণগুলির পেছনের মূল শক্তি। ২১ ও ২২ অক্টোবর এই দু’দিনে সারা রাজ্যে মোট সাত থেকে আটটি মসজিদে হামলা করা হয়। গোমতী জেলার উদয়পুরে একটি মসজিদে আক্রমণ হওয়ার পর রাজ্য সরকার সেখানে ১৪৪ ধারা মোতায়েন করে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের উপর হামলা চালানো হয় তার মধ্যে কৃষ্ণনগর, ধর্মনগর, পানিসাগর, চন্দ্রপুর, সাব্রুম, বিলোনীয়া, কৈলাশহর, বক্সনগর, বিশালগড় এই জায়গাগুলোর নাম প্রকাশ্যে এসেছে। মসজিদ আক্রমণের পাশাপাশি বেশ  কিছু মুসলিম পরিবারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়।

 

ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭% মুসলমান। ত্রিপুরার জাতি-উপজাতি দাঙ্গা কয়েকবার হলেও হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা প্রায় কখনই হয় নি। কৈলাশহরের বাসিন্দা ইমরান শেখ গ্রাউন্ডজিরোকে জানান, “জয় শ্রী রাম ধ্বনি দিয়ে প্রথমে এলাকায় মিছিল করা হয় তারপর বেছে বেছে মুসলমান পরিবার এবং মসজিদে আক্রমণ চালানো হয়, দেখে পরিষ্কার ভাবেই বোঝা যাচ্ছিল যে আক্রমণগুলি পূর্বপরিকল্পিত এবং বাংলাদেশের  হিন্দুদের উপর আক্রমণের বদলা হিসেবে নেওয়া হয়েছে।”

 

চন্দ্রপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার এক দোকানদার রমেশ দাশ আমাদের জানান, “এই মসজিদটি অনেকদিন আগের, আমরা ছোট থেকে দেখেই বড়ো হয়েছি। কোনোদিন হিন্দু-মুসলমান এই ভেদাভেদ তৈরী হয়নি। সেদিন দেখলাম এখানে কিছু লোক এসে ঝামেলা করে গেল। এইসব ঘটনা না হওয়াই ভালো।”

 

উদয়পুরের ফজলুল হক খুবই হতাশ হয়ে আমাদের জানান, “উদয়পুর সংস্কৃতির শহর, এখানে ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির আছে, মসজিদও আছে। আজ অবধি এই জঘন্য কাজকর্ম হয় নি। বাংলাদেশে যা ঘটেছে আমরার প্রতিবাদ করছি এবং এখানে যা ঘটেছে তারও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

 

শুক্রবার ত্রিপুরার জমিয়ত উলেমা (হিন্দ) অভিযোগ জানিয়েছে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হিংসার ঘটনার পর রাজ্যের কিছু কিছু মসজিদ এবং সংখ্যালঘু আবাস হামলার শিকার হয়েছে। রাজ্য সরকারকে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে সংগঠনটি। সংগঠনের একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের কার্যালয় এবং রাজ্যের পুলিশের ডিজির কাছে অভিযোগ পত্র জমা দিয়ে এসেছে। কারা এর সাথে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তোলা হয়। আগরতলার গেদু মিয়া মসজিদে সংগঠনের সভাপতি মুফতি তায়েবউর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “ত্রিপুরার হিন্দু বা মুসলিম, কোনো সম্প্রদায়ের কেউই বাংলাদেশে এই ধরনের হিংসা সমর্থন করে না। এর প্রতিবাদেও সোচ্চার হয়েছি আমরা।”

 

ইতিমধ্যে এইসমস্ত সাম্প্রদায়িক ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সিপিআই(এম), সিপিআই(এম-এল) এবং তিপ্রা মথা। লিবারেশন রাজ্য কমিটি এবং সিপিআই(এম) এর রাজ্য কমিটি সারা রাজ্যে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণের ঘটনায় সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানিয়েছে। তিপ্রা মথার সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর টুইট করে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।

 

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণে এই রাজ্যের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে প্রতিবাদ এবং নিন্দার বার্তা নিয়ে সরব হয়েছিলেন, রাজ্যের মুসলমানদের ওপর আক্রমণে ঠিক ততটাই মৌনতা পালন করছেন তারা। তবে কেউ কেউ অবশ্য এই দুই আক্রমণেরই নিন্দা করেছেন।

 

২১ ও ২২ অক্টোবর ঘটে যাওয়া এই সমস্ত ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয় নি। মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব এখনও এই বিষয়ে নীরব। আগামী ২৫শে নভেম্বর রাজ্যে পুরভোট, শাসক বিজেপি অনেকটাই ব্যাকফুটে। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া এডিসি নির্বাচনে তিপ্রা মথার কাছে পরাজিত হতে হয়েছিল তাঁদের। রাজ্যে এখন তৃণমূল কংগ্রেসও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিপিআই(এম)ও সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মন দিয়েছে। এই অবস্থায় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের তাসকে জাগিয়ে তোলার মতোই মনে হচ্ছে। কারণ উগ্র জাতীয়তাবাদ  এবং ধর্মীয় জিগির তুলে ভোটের আগে সাধারণ হিন্দু মানুষকে বিভ্রান্ত করার কায়দা তাঁদের পুরোনো। ত্রিপুরার সমাজ কখনও ধর্মীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ছিল না, এইবারের ঘটনাগুলিও মানুষ ভালোভাবে নেয় নি। অনেক জায়গাতেই প্রতিবাদের সুর জেগে উঠেছে, আগামীদিনে হয়তো আরও উঠবে।

 

Share this
Leave a Comment