ফাঁস হওয়া আইপিসিসি রিপোর্ট বলছে পুঁজিবাদের প্রবৃদ্ধি মডেল অস্থিতিশীল


  • September 23, 2021
  • (1 Comments)
  • 558 Views

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে গিয়ে বৈজ্ঞানিকরা দেখছেন, পুঁজিবাদী মডেল থেকে সরে আসা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক অসাম্য জিইয়ে রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না। আইপিসিসি রিপোর্ট। 

 

১৯৯০ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে বিতর্ক চলছে। নিস্ফলা ৩০টি বছর অতিক্রান্ত হবার পর বিতর্কটি তাদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত, যাদের এক দল মনে করে যে প্রবৃদ্ধি চলবে এবং কার্বন-নির্গমন প্রয়োজনীয় গতিতে কমে আসবে। অন্য দল মনে করে এটি আসলে এক ধরণের ‘জলবায়ু-বদল অগ্রাহ্যকারী’ মত, যা খুব সূক্ষ্ম কায়দায় শেষ পর্যন্ত তাদেরই লাভবান বানায় এবং রক্ষা করে, যারা একদা বিশ্ব-উষ্ণায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এখন, প্রশ্নটা একই থেকে গেছে – কে লাভবান হচ্ছে?

 

আইপিসিসি তিন নম্বর গ্রুপ রিপোর্টের দ্বিতীয় খসড়াটি, নিষ্পত্তির (mitigation) রণকৌশলের ওপর জোর দিয়েছে, বলেছে গ্রাহিক (planetary) সীমারেখা ছাপিয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু ও বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় এড়াতে আমাদের অবশ্যই পুঁজিবাদী মডেল থেকে সরে আসতে হবে। এটি সিটিএক্সটি ও গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের আগের রিপোর্টকেই নিশ্চিত করছে যে “গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন আগামী চার বছরে শীর্ষে পোঁছবে।” এই নতুন ফাঁস হওয়া তথ্য স্বীকার করেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (growth) সামান্য সুযোগ আছে অথবা আর কোনো পরিসরই অবশিষ্ট নেই।

 

নিম্নস্বাক্ষরকারী বিজ্ঞানী ও সাংবাদিকরা ষষ্ঠ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টের একটা নতুন অংশ বিশ্লেষণ করেছেন, যা স্পেনের Scientist Rebellion and Extinction Rebellion-ই, আগের বারের মতোই এবারও আমাদের কাছে ফাঁস করেছে। এই ‘লীক’টিতে (leak) সাধারণভাবে অনেক বেশি সন্ত্রস্ত অবস্থান দেখতে পাওয়া যাবে, আবার বেশ কিছু স্পষ্ট বক্তব্যও পাওয়া যাবে যা সাম্প্রতিক অতীতে কল্পনাও করা যেত না।

 

প্রসঙ্গত, আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৯০-এ প্রথম আইপিসিসি রিপোর্ট বলেছিল, “(তাপমাত্রার) পরিলক্ষিত বৃদ্ধি ব্যাপকভাবে ঘটে থাকতে পারে প্রাকৃতিক তারতম্যের কারণে।” যদিও পরবর্তী রিপোর্টগুলি এই মতকে সমর্থন করেনি। ষষ্ঠ রিপোর্টটি এই ধরনের যে কোনো সন্দেহের সম্ভাবনাকেই বাতিল করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রাহ্যকারী মতামতকে একেবারেই গ্রাহ্য করেনি কারণ  এই মতামতের প্রণেতা সেই জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস ইত্যাদি) লবি যারা এই ‘জলবায়ু-অপরিবর্তনের’ আখ্যানগুলিকে জিইয়ে রেখে, ঐতিহাসিকভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়ে এসেছে।

 

রিপোর্টটি উল্লেখ করছে লাগামহীন/অবাধ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। যেহেতু বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন, এখানে মূল প্রশ্নটি হল নিরন্তর প্রবৃদ্ধির মডেলগুলি থেকে সরে আসাকে কীভাবে দেখা হবে, সুফল হিসেবে নাকি শুধুই পরিত্যাগ হিসেবে? যে কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে (transition) বিভিন্ন দেশের নির্গমনের (emissions) পার্থক্য, গ্রাম-শহর বিশ্বের পার্থক্য এবং সবেচেয়ে বেশি করে ধনী ও গরিবদের মধ্যে ক্রমাগত অশ্লীলরকম বেড়ে চলা অর্থনৈতিক অসাম্য-বিচার করতে হবে। এই তিনটি দ্বন্দ্বের প্রতি নজর না দিলে যে কোনো পরিবর্তনই সমর্থনের বদলে বিরোধিতার মুখোমুখি হবে। খসড়াটি বলছে, পরীক্ষামূলক অর্থনীতি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা দেখাচ্ছে যে ‘অন্যায়’ হিসেবে স্বীকৃত কোনও ব্যবস্থা মানুষ গ্রহণ নাও করতে পারেন, এমনকি সেই প্রত্যাখ্যানের ব্যয় বেশি হলেও।

 

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, এমনকি গতিপথ পরিবর্তিত হলেও, “পরিবর্তন (transition) সাধারণত মসৃণ ও ধীরগতির হয় না, তা আকস্মিক ও বিঘ্নকারীও ( disruptive) হতে পারে।” তাঁরা মনে করাচ্ছেন, “পরিবর্তনের গতি ব্যাহত হতে পারে বর্তমান পুঁজি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নিয়মাবলী থেকে বিচ্ছিন্ন হলে।”  রিপোর্ট বেশ জোর দিয়ে বোঝাচ্ছে যে এই জড়তাগুলির (inertia) উৎস সম্পর্কে অবহিত থাকা কত জরুরি। বলছে, “বিগত ২০০ বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জীবাশ্ম শক্তির চূড়ান্ত কেন্দ্রীভবন বিকার্বনিকরণের (decarbonization–না-কার্বন শক্তি ব্যবহার) সম্ভাবনা সম্পর্কে আবশ্যিক কতগুলো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।”

 

জীবাশ্ম জ্বালানির কোম্পানিগুলোর পক্ষের নীতিগুলোই বাতাস, জমি, জঙ্গলের মত আমাদের সকলের সাধারণ সম্পদকে লুট করেছে এবং সমাজের খুব সংখ্যালঘু একটা অংশের হাতে তুলে দিয়েছে। অতএব ‘সবুজ নীতি’ গুলিকে (green policies) পুনর্বণ্টনমুখী (redistributive) হতেই হবে যখন অসাম্য গোটা বিষয়টাকে মাকড়সার জালে জড়িয়ে ফেলেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে একটি, কার্বন মূল্যের পশ্চাদপদতা (regressivity) কমিয়ে আনা, যা আসলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পক্ষে একটি রাজস্ব (tax revenue) পুনর্বণ্টন-এর প্রস্তাব। কিন্তু নৃতত্ত্ববিদ জেসন হিকস যেমন বলেছেন, “জীবাশ্ম জ্বালানি নিষ্কাশনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, বছর বছর ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে গোটা শিল্পটাকে বন্ধ না করতে পারলে, বাকি কাজ স্রেফ ওপরচালাকি।”

 

লক্ষ্যণীয়, যদিও অনেকেই এর আগে একই ধরণের মন্তব্য করেছেন, এই রিপোর্ট শুধু এই  দৃষ্টিভঙ্গীকেই স্পষ্ট করে তুলছে না যে শিল্প উন্নয়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছে, তা আরও বলছে, “পুঁজিবাদী সমাজের ধরণ (nature) অনুযায়ী তৈরি অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরিত্রই/ বৈশিষ্ট্যই (character) শেষ পর্যন্ত অস্থিতিশীল”

 

আমরা ভাল জীবন পেতে পারি কম ভোগ করে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি ছাড়া পুঁজিবাদ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। রিপোর্টটি এভাবে শেষ হয়েছে “(বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্র থেকে) সাম্প্রতিক কার্বন নির্গমন প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাই তা অবিলম্বে ও জোর করে বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।”

 

নির্গমন ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা অত্যন্ত প্রয়োজন। চলতি মডেলে, শক্তির ভোগ ও বস্তুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে, প্রবৃদ্ধি সম্পর্কিত পূর্বধারণা বজায় রেখে, স্বল্প সময়ে (short term) তা পাওয়া অসম্ভব।

 

এছাড়াও, রিপোর্টটি ২০১৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত এবং গৃহীত, ২০৩০ সালে পূর্ণ হবে এমন ১৭টি স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে নির্গমন কমানোর বিষয়টিকে জুড়েছেন। এই রিপোর্টে আমরা ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যেকার চলমান দ্বন্দ্ব ছাড়াও, অসাম্য কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা-র মতো প্রশ্নাতীত কিছু উদ্দেশ্যের সঙ্গে বেশ বিতর্কিত বিষয়, স্থিতিশীল উন্নয়নকে প্রচার করার মতো বিষয়ও পাচ্ছি।

 

১৯৯০ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে বিতর্ক চলছে। নিস্ফলা ৩০টি বছর অতিক্রান্ত হবার পর বিতর্কটি তাদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত, যাদের এক দল মনে করে যে প্রবৃদ্ধি চলবে এবং কার্বন-নির্গমন প্রয়োজনীয় গতিতে কমে আসবে। অন্য দল মনে করে এটি আসলে এক ধরণের ‘জলবায়ু-বদল অগ্রাহ্যকারী’ মত, যা খুব সূক্ষ্ম কায়দায় শেষ পর্যন্ত তাদেরই লাভবান বানায় এবং রক্ষা করে, যারা একদা বিশ্ব-উষ্ণায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এখন, প্রশ্নটা একই থেকে গেছে – কে লাভবান হচ্ছে?

 

রিপোর্ট বলছে “নিষ্পত্তি (mitigation – এমন ব্যবস্থা নেওয়া যাতে জলবায়ু-বদলের সঙ্কট কমে আসে) এবং উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো কিছু বাড়তি পরিবর্তন দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।” কেউ তর্ক করতে পারেন যে পাখির চোখ করা উচিত প্রবৃদ্ধিকেই। কারণ বাতাসে/বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউজ গ্যাসের ঘনীভবন হ্রাস করার প্রযুক্তি আবিষ্কার হতে পারে। কিন্তু এই ধরণের প্রযুক্তি (উদাহরণ : কার্বন ক্যাপচার ও সিকোয়েস্ট্রেশান) প্রতিশ্রুত ফল দেয়নি আদৌ। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের কার্বন জমা করার পরিমাণ যখন কমছেই, এবং পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু সঙ্কটের শেষসীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে বারবার, তখন অপ্রমাণিত প্রযুক্তির উপর আস্থা জারি রেখে অবাধ প্রবৃদ্ধির পক্ষ নেওয়া আসলে সবচাইতে ভয়ঙ্কর এবং জঘন্য একটা অপরাধ।

 

রিপোর্টটি একটি “সংগঠিত প্রতারণা”র কথা বলছে, যেখানে চুক্তি ও বক্তব্য, পদক্ষেপের (actions) সঙ্গে মেলে না, যা প্রকৃত নিষ্পত্তির (mitigation) পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবেই প্রতিভাত হচ্ছে। রিপোর্ট বলছে, কোভিড-১৯ থেকে সারা বিশ্ব বহু শিক্ষা নিতে পারত, যেখানে অসমাধিত/অনিরসিত (unmitigated) ফলাফলের তুলনায় প্রতিরোধের জন্য ব্যয় ও প্রস্তুতিকালীন পদক্ষেপ ছিল ন্যূনতম। জলবায়ু সংকটের সঙ্গে এর সাদৃশ্য খুব স্পষ্ট। বহু বিলম্বিত ব্যবস্থা, ব্যয় এতটাই বাড়িয়ে তুলতে পারে যে তা বওয়া কঠিন।

 

দ্রুত কিছু করা না হলে অকল্পনীয় ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গেই চ্যালেঞ্জগুলো অরৈখিক/বহুমাত্রিকভাবে বাড়তেই থাকবে। এসবের তাৎপর্য কী? প্রথমত, স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারণার অন্তঃস্থিত দ্বন্দ্ব ধরে নিলে, যে কোনো রকমের উন্নয়ন সম্পর্কে কথা বলা সম্ভব যেখানে জিডিপি সম্পদ হিসেবে পরিত্যক্ত হবে। অসাম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে একমাত্র অনুভূমিক প্রবৃদ্ধিই (অর্থাৎ, বৃদ্ধি হবে সার্বিক, সামাজিক, সুষম) স্থিতিশীল, উল্লম্ব (ওপর থেকে নীচে আসা, অসম) নয়।

 

দ্বিতীয়ত, শাসকদের ও সাধারণ মানুষজনকে এই সমস্যার বিপুল বিস্তৃতি সম্পর্কে বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। পরিবর্তনকামী বদলের (transformational change) ফলে বেশিরভাগ মানুষ লাভবান হবেন এমন বোধ তৈরি হলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলি সফল হওয়া সম্ভব। পরিবর্তনশীল বদল না ঘটলে, শেষ পর্যন্ত কেউই লাভবান হবে না।

 

তৃতীয়ত, অনুজীববৈজ্ঞানিক লিন মারগুলিস (Lynn Margulis) দেখিয়েছেন, প্রতিযোগিতার তুলনায় সহযোগিতা/সহভাগিতা বিপুল অভিব্যক্তিমূলক উল্লম্ফনগুলির (evolutionary leaps) মূল ব্যাখ্যা হিসেবে হাজির হয়েছে। আমরা এখন বাস্তুতান্ত্রিক ও জলবায়ু সংকটের সংযোগের (intersection) শুধু চূড়াটুকুই প্রত্যক্ষ করছি। একমাত্র যদি সহযোগিতা/সহভাগিতা অভ্যাসের মধ্যে আমরা থাকি, যদি বুঝি যে বহু কিছু যা ভাগাভাগি করে আমরা বাঁচি, তার মধ্যে বায়ুমণ্ডলও আছে, তবেই আমরা মহাপতন এড়াতে পারব।

 

স্বাক্ষরকারী

জুয়ান বোরদেরা,  ফার্নান্দো ভালাদারেস, আন্তোনিও তুরিয়েল, ফেরান পাগ ভিলর, ফার্নান্দো প্রিয়েতো, টিম হ্যুলেট

 

Originally published: CTXT (Contexto y Acción), August 22, 2021.

বাংলা অনুবাদ করেছেন : মৈত্রী

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: রজত on September 25, 2021

    খুব জরুরি, অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment