প্রাণ-প্রকৃতির সংকট না দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকট! প্রসঙ্গ: আইপিসিসি-৬ রিপোর্ট (দ্বিতীয় কিস্তি)


  • September 5, 2021
  • (0 Comments)
  • 442 Views

বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গী জাতিরাষ্ট্রেরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে বিশ্বকে বাঁচাবে এমন খোয়াব দেখার কোনো অর্থ নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্র বা কর্পোরেটের বিরোধিতা করে রাজনৈতিক আন্দোলন বিকশিত হলেও সমাজের অভ্যন্তরে উন্নয়ন বা প্রগতির ধারণার মধ্যে থাকা রাষ্ট্র-পুঁজি’র অ্যানথ্রোপোজেনিক প্রগতির ধারণা দিব্যি অটুট থাকে। ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, দেশের-দশের উন্নয়ন বললেই আমাদের সামনে উঠে আসে পুঁজি-রাষ্ট্রের ‘উন্নয়ন’ ধারণা, তার পণ্য-শোভিত মানব (মুনাফা)-কেন্দ্রিক একধরণের বিশ্বকল্প। ফলে, এর বাইরে বেরোতে গেলে সবার আগে ‘চেনা পথের বাইরে চলো’এছাড়া খুব উপায় নেই। লিখেছেন নন্দন মিত্র

 

দ্বিতীয় কিস্তি

 

আইপিসিসি ষষ্ঠ রিপোর্টে জলবায়ুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেযে সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, তার কোনোটাই খুব সুখের নয়। এই লেখার প্রথম ভাগ থেকে এ-কথা নিশ্চয় বোঝা গিয়েছে যে গত পঞ্চাশ বছরে জলবায়ুর সংকট মাত্রাছাড়া গতিতে বেড়েছে। জাতিরাষ্ট্রগুলির তরফে নানারকম সম্মেলন ও শীর্ষ বৈঠক ইত্যাদি করা হয়েছে ঠিকই, তবে সংকট মেটাতে সবার আগে যা করা প্রয়োজন, অর্থাৎ এই পুঁজি-ব্যবস্থার রাশ টেনে ধরা, সেটিই করা হয়নি। ফলে, একদিকে সভা-সম্মেলনে নানারকম বাকতাল্লা, অন্যদিকে মিসিসিপি থেকে আমাজন হয়ে হিমালয় এবং হোয়াংহো, প্রায় পুরো দুনিয়াটাই ট্রাম্প-বলসোনারো-থেকে-মোদি জাতীয় রাষ্ট্ৰনেতারা কর্পোরেট দৈত্যদের মুনাফা কামানোর জন্য খুলে দিয়েছে। এসবের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে জমি-কাজ-বাস্তু হারানো উদ্বাস্তুরা। এ-রাজ্য থেকে ও-রাজ্য, এ-দেশ থেকে ও-দেশ, আফ্রিকা থেকে ইওরোপ — জীবনের দায়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ক্লাইমেট রিফিউজি বা জলবায়ু সংকটের কারণে তৈরি হওয়া উদ্বাস্তুদের।

 

বিশেষজ্ঞদের অনুমান ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি মানুষ জলবায়ু সংকটের কারণে ভিটে-মাটি ছাড়তে বাধ্য হবে (World Migration Report 2020)। ২০১৮ সালের এক হিসেবে (Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC)) দেখা যাচ্ছে, ভারতে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বেশি, প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘরছাড়া হয়েছে, ২০২০ সালে সেই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লক্ষে। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে যে যে কারণে মানুষ ভিটে-মাটি-রাষ্ট্রহীন হচ্ছেন, তার প্রধানতম কারণ জলবায়ুর সংকট। বিভিন্ন গবেষণায় সে তথ্য বারেবারে উঠে আসছে (Migration and Climate Change)। আফ্রিকা, পশ্চিম-এশিয়া, আরবদেশগুলোর মধ্যে লেগে থাকা গৃহযুদ্ধ, ইওরোপে শরণার্থীর ভিড়, এই সব কিছুর পিছনে মূল কারণ হিসেবে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে জলবায়ুর সংকট।

 

অল্প কথায় দেখা যাক, আইপিসিসি রিপোর্ট মোদ্দায় কী কী সম্ভাবনার কথা বলছে।

 

জলবায়ুর ভবিষ্যৎ

জলবায়ুর ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য বদল বার করতে আইপিসিসি-র গবেষকরা বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গণনা পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছেন। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ভবিষ্যতে কতটা কমবে/বাড়বে তার সম্ভাব্য পাঁচ রকমের মডেল বা ছক থেকে এই অংশের তথ্যগুলো নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টা কিঞ্চিৎ জটিল ঠেকতে পারে। এই লেখা সে জটিলতার মধ্যে ঢুকবে না। মোদ্দা প্রবণতা হিসেবে কী উঠে এসেছে আমরা সেটুকুই বুঝে নেবার চেষ্টা করব। এমনিতেও, মাথায় রাখতে হবে যে এই সম্ভাব্যতার গণনা কতগুলো জানা বিষয় বা প্যারামিটারের ওপর দাঁড়িয়ে করা হয়েছে। আমাদের বুঝে নিতে হবে যে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যদি একই ভাবে কর্পোরেট পুঁজির অতি-মুনাফার নিয়মেই চলতে থাকে তাহলে জলবায়ু সংকটের ভবিষ্যৎ চেহারাটা মোদ্দায় কীরকম হতে পারে।

 

১) দেখা যাচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন যদি আগামিকাল থেকে ব্যাপক হারে কমিয়েও ফেলা হয় তাহলেও ২০৪০ সালের মধ্যে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। ২০৬০ সাল পর্যন্ত এই বৃদ্ধি চলতেই থাকবে, অন্তত ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অবধি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে পুরোপুরি রাশ টানলে এই শতকের শেষভাগে তাপমাত্রা ০.২ ডিগ্রি হ্রাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই হিসেবের বিপরীতে রয়েছে আরেকটি সম্ভাব্য অবস্থা, যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ব্যপক হারেই বৃদ্ধি পেতে লাগল, যেমনটা গত পঞ্চাশ বছরে বেড়েছে। গণনা জানাচ্ছে, সেক্ষেত্রে ২০৫০ নাগাদ ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২.৪ ডিগ্রি অবধি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শতক শেষ নাগাদ ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

 

২) তাপমাত্রার প্রতি ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই আবহাওয়ার চরম অবস্থাগুলো প্রায় গুণোত্তর প্রগতিতে বেড়ে যায়। অর্থাৎ, ব্যাপক বৃষ্টি অথবা বৃষ্টিহীনতা, বন্যা বা খরা, দাবানল, তাপপ্রবাহ, সাইক্লোন জাতীয় ঝড়ের ব্যাপক বৃদ্ধি, ঋতুচক্র বিপর্যস্ত হওয়া ইত্যাদি। তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই এমন সব অভূতপূর্ব দুর্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও রিপোর্টে জানানো হচ্ছে।

 

৩) দেখা যাচ্ছে প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির জন্য আগামী দিনে অতিবৃষ্টির পরিমাণ দিনে ৭% হারে বৃদ্ধি পাবে। উত্তর মেরু বছরে একবার (সেপ্টেম্বরে) বরফ শূন্য হয়ে যাওয়ার মত ঘটনাও ২০৫০-এর আগেই দেখতে হতে পারে বলে ইঙ্গিত উঠে আসছে।

 

৪) যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই আটকে রাখা যায় তবে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধিকেও ২-৩ মিটারের মধ্যে ঠেকিয়ে রাখা যাবে। ২ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমুদ্রতলের উচ্চতা ৬ মিটার পর্যন্ত এবং ৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে উচ্চতা ২২ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২ থেকে ৩ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধি হলেই পৃথিবীর অনেক উপকূলবর্তী শহর, দ্বীপ জলের তলায় চলে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। ভেবে দেখতে হবে সুন্দরবনের কথা। উষ্ণায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিপন্নতা বাড়ছে সুন্দরবনের। একই সঙ্গে শহর কলকাতাও ক্রমশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবার দিকে এগিয়ে চলেছে।

 

৫) যদি ভারতের কথা ভাবি তাহলে নানা দিক থেকেই আমরা গভীর সংকটে। অতিবৃষ্টির প্রবণতা যেমন দিনে দিনে বাড়বে, তেমনই খরাকবলিত এলাকাও ক্রমশ বেড়ে চলবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের বিপুল চাষ এলাকায়। সুজলা-সুফলা ভারত ‘চরম জলবায়ুর’ কবলে পড়লে দেশের খাদ্য ভাণ্ডারে সরাসরি টান পড়বে। একদিকে উষ্ণায়ন, সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি, অন্যদিকে অরণ্য ধ্বংস, গ্রিনহাউস গ্যাসের ব্যাপক নির্গমন। উপমহাদেশের ঋতুচক্র আগাগোড়া বদলে যাবে যদি-না এখনই রাশ টেনে ধরা হয়। প্রতি ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়বে আম্ফান, তাউকতের মত সাইক্লোনিক ট্রপিকাল ঝড়ের সংখ্যা। বাস্তুচ্যুত হবে মানুষ। প্রায় গোটা ভারতই এগিয়ে চলেছে জলবায়ু উদ্বাস্তু হবার দিকে।

 

৬) আইপিসি রিপোর্টে সম্ভাব্য যে যে ইঙ্গিত উঠে এসেছে তা থেকে মানবজাতি তথা প্রাণ-প্রকৃতির ভবিষ্যৎ সোজা কথায় অন্ধকার। এখনই যদি উষ্ণায়ন বৃদ্ধিকারী উৎপাদন প্রক্রিয়ার রাশ টেনে না-ধরা হয় তবে এত দিনের জলবায়ুর ভারসাম্য, প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্যের সমগ্রটাই আমরা বদলে ফেলব। এবং তা হলে কী কী হতে পারে তার ন্যূনতম ধারণা আমাদের নেই।

 

দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকট

“দেখিতে পাওনা তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে

অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহঙ্কারে!

সবারে না যদি ডাক

এখনো সরিয়া থাক,

আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান –

মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।”

 

আসলে যে গোল বেঁধে গিয়েছে তা এখনো আমাদের সমষ্টিগত চেতনায় আঘাত করছে না। আর এখানেই শুরু দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকটের। সংকটের সব থেকে বড় দিক হল, এটি যে প্রকৃত অর্থেই এক সার্বিক সংকট তাই-ই এখনো বুঝে ওঠা যায়নি। ফলে রাজনীতি রাজনীতির মতো চলছে, রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মতো, শ্রেণি শ্রেণির মতো, শোষিত শোষিতের মতো, শাসক শাসকের মতো। সংকটের কালে এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মানবেতিহাসে কখনো ঘটেছিল কিনা কে জানে! হিটলার-মুসোলিনির উত্থানও সারা বিশ্বকে অন্তত একটা প্রশ্নে এক করতে পেরেছিল। ফ্যাসিবাদ হ্যাঁ না না! তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি অভিঘাতের একটা ব্যাপার, যেখানে গোটা প্রাণ-প্রকৃতিই নিকেশ হয়ে যেতে পারে আগামী ৭০ বছরের মধ্যে, তা নিয়ে কারোর কোনো হেলদোল নেই। হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন দার্শনিক-রাজনৈতিক এই সংকটকে বোঝা, জানা।

 

জলবায়ু-সংকট যত গভীরতর হবে, আগামী কয়েক দশকে তত বেশি সংকটে পড়বে বিশ্বের খাদ্যভাণ্ডার তথা কৃষি-ব্যবস্থা। ভারতের কৃষকদের একটা বড় অংশ তিনটি কর্পোরেট-বন্ধু কৃষি আইনের বিরোধিতা করে দিল্লির রাজপথে বসে আছেন। তাদের লড়াইয়ের মূল অভিমুখ রাষ্ট্র এবং কর্পোরেটের আঁতাতের বিরুদ্ধে। সে অর্থে দেখলে, আসলে এই আন্দোলন তো গত পঞ্চাশ বছর ধরে চলে আসা অর্থনৈতিক মডেলেরই বিরোধিতা করছে। বলা বাহুল্য, পুঁজিবাদী অর্থনীতি আজ যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, এখান থেকে পেছনে ফেরার তার কোনো রাস্তা নেই। বাস্তবের বাজার নয়, পুঁজি অর্থনীতি এখন দাঁড়িয়ে থাকে সম্ভাব্য বাজারের অসংখ্য বুদবুদের ওপর। পণ্যের বাস্তব সীমানা অতিক্রম করে তার ব্যবসা ক্ষেত্র এখন অলৌকিক/কল্পিত পণ্যের ওপর নির্ধারিত। পণ্যের জাল আমাজন থেকে হিমালয় অবধি বিস্তৃত। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে প্রতিটি গাছের পাতা অবধি তার পণ্য-ক্ষেত্র, তার পুঁজির জাল বিস্তৃত। প্রতিনিয়ত এই জালকে আরো আরো বিস্তৃত করতে না-পারলে এই অর্থনীতি টিকবে না। ফলে হিসেব দাঁড়াচ্ছে, আরো-আরো বৃদ্ধির পথে অর্থনীতিকে এগোতে হবে, এবং যত সে এগোবে, গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়বে উষ্ণায়ন। সংকটের কাল ঘনীভূত হবে। সোজা কথায়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং জলবায়ুসংকট। ফলে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গী জাতিরাষ্ট্রেরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে বিশ্বকে বাঁচাবে এমন খোয়াব দেখার কোনো অর্থ নেই।

 

মুশকিল হল, এই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার বাস্তব দেখেও এ বিশ্বের মুক্তিকামী চিন্তায় দার্শনিক-রাজনৈতিক কোনো উত্তরণ ঘটে না। কেন ঘটেনা? সম্ভবত এতকাল যেভাবে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র-পুঁজি যৌথতাকে রাজনৈতিকভাবে বুঝতে চাওয়া হয়েছে, সেখানেই মূল সমস্যা। কয়েকটি উদাহরণ দিলে সমস্যাটা হয়তো বোঝা যাবে। ধরা যাক যে কৃষি আন্দোলন চলছে, নিঃসন্দেহে তা কর্পোরেট বিরোধী। এবং আজকের দিনে কর্পোরেট আগ্রাসনই সব থেকে বেশি প্রাণ-প্রকৃতিকে ধ্বংস ক’রে থাকে। অর্থাৎ এমনটা বুঝে নেওয়া অনুচিত হবেনা যে এই নাছোড়বান্দা কৃষি-আন্দোলনের ভেতর জলবায়ু-সংকট বিরোধী এক জনজাগরণের মর্মবস্তু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অথচ দেখুন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এবং তার মিডিয়া ম্যানেজারেরা আন্দোলনরত কৃষকদের কৃষি-ব্যবস্থাকে প্রকৃতি ধ্বংসকারী বলে চিহ্নিত করছেন। একদিক থেকে দেখলে কথাটা ভুল নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা-প্রস্তুতকারক কেমিক্যাল কোম্পানিরা রাসায়নিক সার কোম্পানির অবতারে ফিরে এলে, তাদেরই আন্তর্জাতিক ম্যানেজারদের বদান্যতায় ভারতবর্ষে প্রথম সবুজ বিপ্লব হয়েছিল। ভারতীয় কৃষিকে বাধ্য করা হয়েছিল রাসায়নিক সার নির্ভর কৃষিতে পরিবর্তিত হতে। পরবর্তীতে ক্রমশ উচ্চ-ফলনশীল বীজের নাম করে বীজ কোম্পানিদের একাধিপত্য কায়েম হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এর সাথেই যুক্ত হয়েছে ফসল তোলার পর খেত পোড়ানোর দীর্ঘকালের সংস্কৃতি। মোদ্দায় সব কিছু মিলিয়ে যে কৃষিপদ্ধতি টিকিয়ে রাখতে কৃষকেরা আন্দোলন করছেন তাকে কোনোভাবেই প্রকৃতি-সংবেদী বলা চলেনা। এবার এর বিপরীতে তিনটি আইনের মধ্যে দিয়ে যেভাবে ভারতীয় কৃষিতে বহুজাতিক অ্যাগ্রো-ফার্মেদের খুল্লমখুল্লা প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে তার থেকে বড় অরণ্য ধ্বংসকারী, প্রকৃতি বিনষ্টকারী, দেশের খাদ্য-স্বনির্ভরতা লুঠকারী দেশবেচা প্রকল্প কিছু হতে পারেনা। তাই, দিল্লির প্রান্তরে বসে থাকা কৃষকদের সংগ্রামী অভিবাদন। তাঁরা এক বড় লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু, এবার আপনি ওই প্রশ্ন সরিয়ে রেখে জলবায়ু সংকটের চোখ থেকে বিষয়টি ভাবুন। খানিক আগেই আমরা দেখলাম কৃষক আন্দোলনের মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতি সংবেদী মর্মবস্তু থাকা স্বাভাবিক, কারণ তা কর্পোরেট আগ্রাসনের হাত থেকে কৃষিক্ষেত্রকে রক্ষা করছে। অন্যদিকে, তারা যে কৃষি-ব্যবস্থাটিকে বকলমে টিকিয়ে রাখতে চাইছে তা আবার প্রাণ-প্রকৃতির পক্ষে বিপজ্জনক। এবার, দার্শনিক-রাজনৈতিক সংলাপের চরিত্র কী হতে হবে ভেবে দেখুন। অথচ কার্যত দেখা যাবে, এখানে সচেতন শক্তি অংশ নিচ্ছে এই আন্দোলন চরিত্রগতভাবে কর্পোরেট-বিরোধী বলেই। কিন্তু এইটুকু দিয়েই আসন্ন সংকটকালের রাজনীতিটির পুরোটাকে ধরা যাচ্ছে না। উদাহরণ আরো দেওয়া যেতে পারে। বস্তুত নাগরিক পরিসরের আন্দোলনে আমরা যা-যা দাবি করি তার অধিকাংশই বাস্তুতন্ত্রকে অক্ষ ধরলে গোলমালে পড়ে যাবে।

 

আসলে এখানে সমস্যার মাত্রা ভিন্নতর। পুঁজিবাদকে ছাপিয়ে যাওয়া সাম্যবাদী সমাজের যে ধারণা এতকাল আমাদের চোখে ছিল, তার মূল কথা ছিল মানুষের সামাজিক শ্রমে উৎপাদিত প্রতি-কিছুর ওপর আবিশ্ব মানুষের ‘সামাজিক মালিকানা’-র। সমস্যা হল, দার্শনিকভাবে এই প্রাণ-প্রকৃতিও তো মানুষেরই ‘উৎপাদন’। আবার তার ওপর মানুষের ‘মালিকানা’ ফলানো থেকেই তো যাবতীয় গণ্ডগোলের সূত্রপাত। মনুষ্যকেন্দ্রিক (কিছু ক্ষেত্রে মনুষ্যসর্বস্ব) চিন্তার যে সার্বিকতা থেকে ‘সামাজিক মালিকানা’-র প্রশ্ন এতকাল রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল সময় এসেছে সেটাকেও ফিরে দেখার। মানুষ এবং প্রকৃতির যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক-সমন্বয় তাকে দার্শনিকভাবে শুধু নয়, রাজনৈতিকভাবেও মূর্ত হতে হবে। পুঁজি-রাষ্ট্র যুগলের বর্তমান সমন্বয়ী-মূর্তিটি সেটার কোনো সমাধান নয় সে-তো বোঝা গেল। কিন্তু, মুক্তিকামী রাজনৈতিক শক্তির ‘রাষ্ট্রক্ষমতা দখল’-এর মধ্যে দিয়েও কি আদতে সেই সমস্যাটির সমাধানের দিকে এগোনো যায়? বা, এতকালের যত্নে লালিত সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ধারণা দিয়ে? এই জায়গাটা সুনির্দিষ্ট না-হলে আদতে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক-সমন্বয়ের চোখ দিয়ে বাস্তবে কোনো কর্তব্য নিরূপণ করা যায় না। প্রধান-দ্বন্দ্ব অপ্রধান-দ্বন্দ্বের পুরোনো প্রকোষ্ঠের মধ্যেই যাবতীয় কর্মকাণ্ড ঘোরা-ফেরা করতে থাকে।

 

ফলে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির যে ধারণা এতকাল ধরে রয়েছে, সেটি দিয়ে জলবায়ু সংকট উত্তীর্ণ কোনো সমাজ-ব্যবস্থায় বিপ্লবী রূপান্তরের শক্তি আমাদের নেই। এ-কারণেই জলবায়ু সংকট এখনো রাজনীতির বিষয় হতে পারে না। এদেশে বলে নয়, কোনো দেশেই সেভাবে রাজনীতির বিষয় হয়ে ওঠে না। যদিও কোথাও হয়ে ওঠে, দেখা যায় তার পিছনে ‘কর্পোরেট-বড় গ্রিন’-দের পুঁজি, নয়তো ‘জৈব লবি’, ‘রিনিউয়েবল এনার্জি লবি’-দের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। এর বাইরে যারা অন্তত ব্যবস্থাটিকে প্রশ্ন করছেন, তারাও মূলত সেটিকে সংশোধন, কর্পোরেটের ট্যাক্স বাড়ানো, কার্বন-নির্গমন কমানো, জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদির মতো বিষয়ের ওপরই জোর দিচ্ছেন। ‘ব্যবস্থা’-টিকে উপড়ে ফেলার মত স্লোগান কেউ কেউ তুললেও এই দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকট থেকে যাচ্ছে চর্চার বাইরে। তাই যাবতীয় কার্যক্রম সোস্যাল-মিডিয়া শাসিত প্রকোষ্ঠগুলির মধ্যেই ভাইরাল হচ্ছে, পারস্পরিক পিঠ-চাপড়াচাপড়ি চলছে।

 

অতএব

জলবায়ুর সংকট মুখ্য না দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকট মুখ্য এ নিয়ে বিচারের বিশেষ সুযোগ নেই। এ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে জলবায়ু সংকটের অন্য নাম আজকের দিনে মানব সভ্যতার এই দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকটই। পুঁজি-রাষ্ট্র যৌথের বিস্তার তো শুধু কতগুলো কর্পোরেট কর্পোরেশন আর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে হয় না। এর বিস্তার সার্বিক। স্মার্ট-ফোন ধরা নিও-লিবারাল মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-সঞ্চালন এখন যন্ত্রের নজরদারিতে। পণ্যবাজার এখন সর্বত্রগামী। মানুষের সামাজিকতা, মানুষের চৈতন্য প্রতিটা অন্দরে-কন্দরে চেপে বসে রয়েছে পুঁজি-রাষ্ট্রের দার্শনিক-সার্বিকতা, এক্ষেত্রে যেটাকে বুঝে নেওয়া যেতেই পারে মনুষ্য-সর্বস্বতার দার্শনিকতা। ফলে, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, দেশের-দশের উন্নয়ন বললেই আমাদের সামনে উঠে আসে পুঁজি-রাষ্ট্রের ‘উন্নয়ন’ ধারণা, তার পণ্য-শোভিত মানব (মুনাফা)-কেন্দ্রিক একধরণের বিশ্বকল্প। এর বাইরে বেরোতে গেলে সবার আগে ‘চেনা পথের বাইরে চলো’। এছাড়া খুব উপায় নেই। রাষ্ট্র বা কর্পোরেটের বিরোধিতা করে রাজনৈতিক আন্দোলন বিকশিত হলেও সমাজের অভ্যন্তরে উন্নয়ন বা প্রগতির ধারণার মধ্যে থাকা রাষ্ট্র-পুঁজি’র অ্যানথ্রোপোজেনিক প্রগতির ধারণা দিব্যি অটুট থাকে। দিল্লির প্রান্তরে এই বেলা কর্পোরেট হেরে গেলেও তারা জানে তারা চাকরির দাবিতে বেঁচে উঠবে। তারা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থানের দাবিতে আবারো অতি-মুনাফার হাজারো প্রকল্প নিয়ে খেটেখাওয়া মানুষের শরীর এবং মনের পূর্ণদখল নিজেদের কবজাতেই রাখবে।

 

ফলে, সামাজিক সংলাপের ব্যাপক নির্মাণ ছাড়া আশু কোনো সমাধানের পথ চোখে পড়ছে না। জলবায়ুর সংকটই বলি আর দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকটই বলি, কোনো ক্ষেত্রেই সংকটগুলির সামাজিকীকরণ হয়নি। সমাজের গণচৈতন্যে এখনো এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত। মূলত তত্ত্বকথার পরিসরের মধ্যেই আবদ্ধ। বড় জোর কিছু বিচ্ছিন্ন শক্তির প্রচার এবং বিক্ষোভের স্তরেই সীমাবদ্ধ। যতদিন না সমাজের অভ্যন্তরে এই সংকটের প্রবেশ ঘটছে ততদিন অবধি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা ‘উন্নয়ন ধারণা’ এবং ‘জলবায়ু সংকট’-এর মধ্যে সামাজিক মেরুকরণ সম্ভব হবে না। ফলে, জলবায়ুর সংকটের সমাধানের জন্যও মানুষ পুঁজি-রাষ্ট্রের বদান্যতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে। এবং মুক্তিকামী শক্তিদের ‘অপেক্ষা’ ছাড়া আর করার কিছুই থাকবে না।

 

প্রথম কিস্তি : প্রাণ-প্রকৃতির সংকট না দার্শনিক-রাজনৈতিক সংকট! প্রসঙ্গ: আইপিসিসি-৬ রিপোর্ট

 

লেখক সামাজিক কর্মী ও স্কুল শিক্ষক।

 

Share this
Leave a Comment