কোভিড পরিস্থিতিতে রাজ্যের পার্শ্ব শিক্ষকদের পক্ষে বড় রায় কলকাতা হাইকোর্টের


  • August 31, 2021
  • (0 Comments)
  • 331 Views

রাজ্যের চুক্তিভিত্তিক ও পার্শ্ব শিক্ষকদের প্রতি কোভিড মহামারিকালীন পরিস্থিতিতেও রাজ্য সরকারের বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা কোভিড পরিস্থিতিতেও নিজেদের অধিকার ও দাবির লড়াই চালিয়ে যেতে তাঁদের উৎসাহ দেবে। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

এবার রাজ্যের পার্শ্বশিক্ষকদের পিটিশনের পক্ষে রায় দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি জাস্টিস অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। এক অভূতপূর্ব রায়ে তিনি রাজ্য সরকারকে অনুরোধ করেছেন পার্শশিক্ষকদের যেন ‘শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়’। কী এমন ঘটেছিল যে এ রাজ্যের আনুমানিক ৪৮ হাজার পার্শ্বশিক্ষকদের প্রতিনিধিদের হাইকোর্টের শরনাপন্ন হতে হল?

 

ঘটনার সূত্রপাত জুন মাসের ৩০ তারিখ। সেদিন আচমকাই পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের রাজ্য প্রকল্প নির্দেশক (স্টেট প্রজেক্ট ডিরেক্টর) একটি নোটিস জারি করে নির্দেশ দেন আগামী ২১ দিন অর্থাৎ ২১ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের পার্শ্ব শিক্ষকদের তাঁদের কাজের এলাকার (ব্লক, পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি) মধ্যে ঘুরে অন্তত তিন থেকে চারটি বুথে চাইল্ড রেজিস্টার তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। এই কাজটি হল নিজস্ব অঞ্চলের মধ্যে ডোর-টু-ডোর ঘুরে শিশুদের সম্পর্কে বিশদ সমস্ত তথ্য নথিভুক্ত করা। কোনও শিশুর জন্ম থেকে কোন বয়সের শিশুরা অঙ্গনওয়াড়ি বা প্রি-পাইমারি না প্রাইমারি না কি সেকেন্ডারি স্কুলে যাচ্ছে তা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সব শিশুদের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ করে রেজিস্টার তৈরি করতে হবে।

 

কোভিড মহামারি পরিস্থিতিতে যখন সব পার্শ্ব শিক্ষকদের টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়নি, এমনকি অনেকের প্রথম ডোজও বাকি তখন এই কাজটি যে তাঁদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে সে কথা মনে করিয়ে পার্শ্ব শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল স্টেট প্রজেক্ট ডিরেক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অনুরোধ করে জানান, তাঁরা অবশ্যই এই দায়িত্বটি পালন করবেন, কিন্তু এখনও পুরোদমে চলতে থাকা কোভিড সংক্রমণের কথা মাথায় রেখে গত বছরের মতো এ বছরও যেন চাইল্ড রেজিস্টার তৈরির সময়সীমা চলতি বছরের ডিসেম্বর মাস করা হয়। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত যে পার্শ্বশিক্ষকদের কোভিড টিকাকরণ বাকি তাঁদেরও যেন টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা হয়। কিন্তু স্টেট প্রজেক্ট ডিরেক্টর স্পষ্টই জানিয়ে দেন ২১ জুলাইয়ের সময়সীমা পেছনো সম্ভব নয়। এরপর ৭ দিন পেরোলে পার্শ্ব শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একই অনুরোধ জানিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু তারও ৭ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনও উত্তর না আসায় তাঁরা আইনি পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

 

মানব সম্পদ উন্নয়ক সহায়ক কর্মী ইউনিয়ন (অ্যাফিলিয়েটেড বাই সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়ন), এ রাজ্যের পার্শ্ব শিক্ষকদের সর্ব বৃহৎ সংগঠন এরপরেই নিজেদের ন্যায্য দাবি যাতে মঞ্জুর হয় তারজন্য হাইকোর্টে একটি পিটিশন ফাইল করে। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পার্শ্ব শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ নামে আরও একটি সংগঠন। এই ইউনিয়নের সদস্য পার্শ্ব শিক্ষকদের জন্যই নয়, রাজ্যের সমস্ত পার্শ্ব শিক্ষকদের প্রতিনিধি হয়েই এই পিটিশন ফাইল করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যখন পিটিশনটি আদালতের বিচারাধীন তখন এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েক জন পার্শ্ব শিক্ষককে শো কজ নোটিসও পাঠানো হয় যাঁরা রেজিস্টারের খাতা তোলেননি বা মিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন না।

 

রাজ্যের পার্শ্ব শিক্ষকদের দায়িত্ব গত কয়েক বছরে ক্রমশই বেড়েছে। এমনকি বেশ কিছু জায়গায় স্থায়ী শিক্ষকদের নিয়োগ না করে পার্শ্ব শিক্ষকদের দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। মনে রাখা দরকার তাঁরা শুধুই শিক্ষাদানের প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত থাকেন না, আনুষঙ্গিক আরও বহু কাজের দায়িত্বও তাঁদের পালন করতে হয়। তারই মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল চাইল্ড রেজিস্টার তৈরি করা। এই কোভিড মহামারির পরিস্থিতিতেও পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পঠনপাঠনের সঙ্গে যুক্ত পার্শ্ব শিক্ষকদের বাড়ি থেকে নয়, স্কুলে গিয়ে অনলাইন ক্লাস করাতে হয়েছে। তাছাড়া মিড-ডে মিল বিতরণের প্রক্রিয়া দেখভালের দায়িত্বও ছিল তাঁদের উপরেই। বহু পার্শ্বশিক্ষকের যেখানে টিকা নেওয়া সম্পূর্ণ হয়নি, সেখানে অভিভাবকদের ভিড়ের মধ্যেই এই কাজ তাঁদের চালিয়ে যেতে হচ্ছে। স্টেট প্রজেক্ট ডিরেক্টরের নির্দেশের পর কয়েকটি জেলায় পার্শ্ব শিক্ষকেরা চাইল্ড রেজিস্টারের কাজ শুরুও করেছিলেন। কোচবিহার জেলার সেরকমই দু’জন কোভিড আক্রান্ত হন, সরকারের তরফ থেকে সেক্ষেত্রে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

পার্শ্ব শিক্ষকদের প্রতি বর্তমান সরকারের আচরণ তাদেরই আগের দু’বারের শাসনকালের মতোই এবারেও বৈষম্যমূলক। গত বিধানসভা নির্বাচনে শিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করার জন্য সরকারিভাবে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে পার্শ্ব শিক্ষকেরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নানা দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত হলেও তাঁরা নির্বাচনী আধিকারিকের দায়িত্ব না পাওয়ায় তাঁদের টিকাকরণের দায়িত্ব সরকার থেকে নেওয়া হয়নি। কোভিড পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি করে স্বাস্থ্য সাথী কার্ড তাঁদের দেওয়া হলেও তা পরিষেবা সব জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না এবং এর অধীনে খুব বেশি সুবিধাও পার্শ্ব শিক্ষকেরা পাচ্ছেন না। কাজ করতে গিয়ে কোভিড আক্রান্ত হয়ে কোনও পার্শ্ব শিক্ষকের মৃত্য হলেও সরকারিভানবে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ সরকার পার্শ্ব শিক্ষকদের কোভিডকালীন ঝুঁকির মোকাবিলায় কোনও রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই তাঁদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করছিলেন।

 

আদালতে পার্শ্ব শিক্ষকদের পিটিশনারদের অন্যতম মধুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, “আমরা কখনওই বলিনি চাইল্ড রেজিস্ট্রেশনের কাজটি করব না। শুধু কোভিড পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো না করে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শেষ করার আবেদন জানিয়েছিলাম। আর আমাদের দাবি ছিল এই কাজ সুরক্ষিতভাবে করার জন্য পার্শ্ব শিক্ষকদের সম্পূর্ণ টিকাকরণের দায়িত্ব যেন সরকার নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারের তরফ থেকে আমাদের দাবির প্রতি কোনও কর্ণপাতই করা হয়নি। ফলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায় ছিল না।”

 

কোভিড পরিস্থিতিতে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেও তাঁদের বেতন বৃদ্ধি বা জরুরি পরিস্থিতিকালীন কোনও ভাতার ব্যবস্থা রাজ্য সরকার করেনি। বামফ্রন্টের আমলে পঞ্চম বেতন কমিশনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রাইমারি ও আপার-প্রাইমারিতে নিয়মিত বিরতিতে তাঁদের বেতন বেড়েছে ৫০০-২০০০ টাকার মধ্যে। তারপর ৭ বছর কোনও বেতন বাড়ানো হয়নি। অথচ তৃণমূল সরকার ২০১১ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার সময় আশ্বাস দিয়েছিল তাঁরা পার্শ্ব শিক্ষকদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করবেন, রেগুলারাইজ করার যে প্রক্রিয়া তা শুরু করবে বলে ক্যাবিনেট মিটিং-এও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তা করা হয়নি। ৭ বছর পর ২০১৮তে বেতন বাড়ানো হলেও বামফ্রন্ট সরকার তিন বছর অন্তর ইনক্রিমেন্ট-এর যে ব্যবস্থা করেছিলেন তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পার্শ্ব শিক্ষকেরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরটিআই করলে ও আন্দোলন শুরু করলে তৃণমূল সরকার বাধ্য হয় তা ফিরিয়ে আনতে তবে তিন বছর অন্তর ৫% নয় বার্ষিক ৩%-এর ভিত্তিতে। পার্শ্ব শিক্ষকদের তরফ থেকে এই সরকারের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় সঠিক আচরণ করেননি বলেও অভিযোগ উঠেছে। বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, “আমাদের এ রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকরাও সম্প্রতি বেআইনি বদলির প্রতিবাদে প্রকশ্যে বিষপান করতে বাধ্য হয়েছেন। সরকারের আচরণ এতটাই অমানবিক হয়ে উঠেছে। আমাদের ক্ষেত্রেও কোভিড সংক্রমণের আশঙ্কার কথা মাথায় না রেখেই ঘুরে ঘুরে কাজ করতে বলা হচ্ছে। আমরা যেখানে দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসছি না, সেখানে সরকার আমাদের টিকাকরণের দায়িত্ব নিচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে মাননীয় বিচারপতির রায়কে আমরা আমাদের নৈতিক জয় বলেই মনে করছি।”

 

পিটিশনারদের তরফে আইনজীবী সুদীপ্ত দাশগুপ্ত জানান, তাঁরা মাননীয় বিচাপতিকে জানান যেহেতু অধিকাংশ শিশুর টিকাকরণ হয়নি ও কতজন অভিভাবকের হয়েছে তার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান নেই তাই রাজ্যের এক বড় সংখ্যক জনসংখ্যার বা পার্শ্ব শিক্ষকদের একটা বড় অংশের যতদিন পর্যন্ত না টিকাকরণ সম্পূর্ণ হচ্ছে ততদিন চাইল্ড রেজিস্ট্রেশনের কাজটি করা সম্ভব নয়।

 

মাননীয় বিচারপতি জাস্টিস অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ২৪ আগস্ট প্রকাশিত এই রায়ে সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন কোনও রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে পার্শ্ব শিক্ষকদের জীবন যেন কষ্টকর করে তোলা না হয়। তাঁদের যেন শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়। তিনি এও বলেছেন পার্শ্ব শিক্ষকেরা কখনওই তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন না এমন বলেননি, শুধুমাত্র এই পরিস্থিতিতে কিছুটা অবকাশ চেয়েছেন ও সরকারের টিকাকরণের উদ্যোগে দু’টি ডোজের ক্ষেত্রেই কিছুটা অগ্রাধিকার চেয়েছেন। এই রায় প্রকাশের পর স্টেট প্রজেক্ট ডিরেক্টর ২৬ আগস্ট নতুন নির্দেশ ইস্যু করে ৩০ জুনের নির্দেশ স্থগিত করেন ও মাননীয় বিচারপতির পর্যবেক্ষণগুলি উল্লেখ করে নতুন নির্দেশ প্রকাশ করেন।

 

রাজ্যের চুক্তিভিত্তিক ও পার্শ্ব শিক্ষকদের প্রতি কোভিড মহামারিকালীন পরিস্থিতিতেও রাজ্য সরকারের বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা কোভিড পরিস্থিতিতেও নিজেদের অধিকার ও দাবির লড়াই চালিয়ে যেতে তাঁদের উৎসাহ দেবে।

 

Letter No 03-Legal-509-PBSSM dt 26082021

 

Share this
Leave a Comment