প্রতিবাদী তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার, দুই অধ্যাপককে সাসপেন্ড করল বিশ্বভারতী


  • August 24, 2021
  • (0 Comments)
  • 377 Views

Groundxero | Report by Sudarshana Chakraborty

24 August, 2021

 

উপাচার্য এবং তাঁর ‘শিক্ষাবিরোধী নীতি’র সরাসরি প্রতিবাদ করায় গত আট-ন’মাস ধরে সাসপেন্ড করে রাখা তিন শিক্ষার্থীকে এবার তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করল বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দু’বার তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু, কর্তৃপক্ষ ঘনিষ্ঠ তদন্ত কমিটি তাঁদের বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছে। অর্থনীতি বিভাগে ‘ঝামেলা’ ও ‘সন্ত্রাস’ ছড়ানোর অভিযোগ এই তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সোমবার ২৩ অগস্ট আচমকাই বহিষ্কারের চিঠি পাঠানো হয় এই তিন জনকে। এই একই দিনে দুই অধ্যাপককেও আলাদা অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়েছে। বিজেপি ঘনিষ্ঠ উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর আমলে বিশ্বভারতীতে ‘হিন্দুত্ববাদী ও শিক্ষাবিরোধী কাজকর্ম চালাচ্ছেন এবং বিশ্বভারতীর ঐতিহ্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে” – এই অভিযোগে বহুদিন ধরেই উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, বিক্ষোভেও শামিল হচ্ছেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অধ্যাপকেরা। তারই মাঝে এই ঘটনা।

 

তদন্ত কমিটির যে দু’টি তদন্ত হয়, সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের নিজেদের সাক্ষ্যপ্রমাণের কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ। অথচ যে রিপোর্টটি পেশ করা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে গত ৯ জানুয়ারি ২০২১ এই তিন জনই নাকি বিশ্বভারতীর ছাতিমতলায় জমায়েত হয়ে বিশ্বভারতীতে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন এবং কমিটির কাছে তার যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে, যদিও শিক্ষার্থীদের দাবি তার কোনওটাই প্রমাণিত নয়। এই তিন জন সোমনাথ সো, ফাল্গুনী পান ও রূপা চক্রবর্তী প্রত্যেকেরই দাবি – উপাচার্য এবং তাঁর অনৈতিক, বিশ্বভারতীর প্রথা বিরোধী কাজকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রথমে সাসপেনশন, তারপর পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত কমিটি তৈরির পর শেষ পর্যন্ত যে তাঁদের বরখাস্তের রিপোর্ট-ই আসতে চলেছে এ বিষয়ে তাঁরা কয়েক দিন ধরেই নিশ্চিত ছিলেন। রূপা ছাড়া, সোমনাথ ও ফাল্গুনী জানিয়েছেন তাঁরা এই সিদ্ধান্তের এবং অনৈতিক ও বেআইনি নির্দেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন জারি রাখবেন এবং আইনি পথে যাবেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি ঘনিষ্ঠ উপাচার্য বলে অভিযুক্ত বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও দানা বাঁধতে চলেছে।

 

যে সমস্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্যের পরোক্ষ নির্দেশে এই রিপোর্ট দিল তদন্ত কমিটি তার দিকে একবার নজর দেওয়া যেতে পারে। বর্তমান উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর নানা কাজকর্মে অসন্তোষ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। প্রথম আন্দোলন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি বাড়ানোর বিরুদ্ধে। তারপর সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনেও শামিল হন পড়ুয়ারা। বিক্ষোভ দেখানো হয় এনআরসি সমর্থন করে এক আলোচনাচক্রের আয়োজনের বিরুদ্ধে, যা চাপের মুখে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এরপর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি এক অধ্যাপিকার নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি ও উপাচার্যের বিভিন্ন ছাত্রবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এই শিক্ষার্থীরা। এরপরই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে অর্থনীতি বিভাগের তালা ভাঙা হয়েছে এবং সেই কারণে ১৪ জানুয়ারি প্রথম তদন্ত কমিটি তৈরি করে তাঁদের সাসপেন্ড করা হয়, যার চূড়ান্ত ফলাফল তিন বছরের জন্য বহিষ্কার। এর মধ্যে পড়ুয়ারা সাসপেনশন তোলার দাবি নিয়ে অবস্থান বিক্ষোভ করলেও কর্তৃপক্ষ তাঁদের দাবির প্রতি কোনও রকম কর্ণপাত করেনি।

 

আন্দোলন, আইনি লড়াই জারি থাকলেও তাঁদের পড়াশোনা ও কেরিয়ারে এই বহিষ্কারের নোটিশ নিঃসন্দেহে এক বড়সড় ধাক্কা। বিশেষত কোভিড, লকডাউন পরিস্থিতিতে এমনিতেই যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশ তাঁদের ভবিষ্যতকে এক অনিশ্চয়তার দিকেই ঠেলে দিল। হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী রূপা চক্রবর্তী যেমন এই নোটিশ পাওয়ার পর কার্যতই বিধ্বস্ত, বললেন “আমাদের তো সব কিছু শেষ করেই দিল। আমি কোনও মুভমেন্ট করছি না আপাতত, আমি কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছি না। এখান থেকে আমি কুইট করলাম। আমাকে বিশ্বভারতী থেকে ছাড়িয়ে দিল। বাকি সাথীদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমি এখন থেকে মুভ অন করছি। যতদূর দেখলাম অনেস্টির কোনওই দাম নেই। না হলে উনি (উপাচার্য) কোনও প্রমাণ ছাড়া আমাকে এরকম একটা চরম শাস্তি কী করে দিতে পারেন? একটা বায়াসড এনকোয়ারি কমিটির বায়াসড মিটিং ছিল। আমরা নতুন এনকোয়ারি কমিটি গঠন করার কথা বলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম যে ল’ইয়ার নিয়ে এসে কথা বলতে চাই। সেটার জন্য তো মিনিমাম সময়টুকু ওরা দিল না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাকি সাথী ও লড়াইয়ের পাশে থাকব। কিন্তু আমি নিজে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ন’মাস ধরে আপনারা জানেন সাসপেনশন চলছে, আমার আর মানসিক ক্ষমতা নেই ওখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করার মতো। এটা আমার ফাইনাল ইয়ার ছিল। বিশ্বভারতী থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে মাস্টার্স-এর দুটি বছর আমাকে জলাঞ্জলি দিতে হল, বলিদান দিতে হল। আমি যদিও প্রচণ্ড আশাবাদী, নিশ্চয় আমার ভালো কিছু হবে। বাড়ির অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যোগাযোগ করেছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন, আমি তাঁদের বুঝিয়েছি যে ভেঙে পড়লে চলবে না এখন, সব ঠিক হবে। কিন্তু আপাতত আমি পুরো বিষয়টা থেকে বিরতি নিতে চাই।”

তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি ছাড়াও আমাদের হাতে এসেছে তিন জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন স্নাতক স্তরের তৃতীয় বর্ষের সোমনাথ সো-এর বরখাস্তের চিঠিটি। যোগাযোগ করেছিলাম তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, “১৪ জানুয়ারি আমাদের প্রথম সাসপেন্ড করা হয়েছিল। আমরা তিন বছর ধরে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে ক্রমাগত আন্দোলন করে গেছি। উনি (উপাচার্য) কোনও রকম দাবি শোনারও প্রয়োজন মনে করেন না, ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলারও প্রয়োজন মনে করেন না। উল্টে ছাত্রদের পেছনে গুন্ডা লেলিয়ে দিয়ে মার খাইয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে আমাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করেছেন, যার ফল আমাদের বহিষ্কার করা। আমরা অবশ্যই চুপচাপ এটা মেনে নেব না। আমাদের আইনি পরামর্শদাতা আইনজীবীরা রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমেই আমরা আইনি লড়াই লড়ব। এখানে উপাচার্যর অনৈতিক কাজকর্ম কিছুটা হলেও যারা আটকাতে পেরেছে তারা হল ছাত্রছাত্রীরাই। এখানে যদি ওঁকে টিকে থাকতে হয় ছাত্রছাত্রীদের শায়েস্তা করতেই হবে। সেইজন্যই আমাদের বিরুদ্ধে একটা মিথ্যে অভিযোগকে নাটকীয় আকারে সাজিয়ে ষড়যন্ত্র করে এটি করলেন। তদন্ত কমিটি তৈরি হলে তারা তো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটা চার্জশিট দেবে। সেই চার্জশিটই তারা আমাদের বিরুদ্ধে দিতে পারেনি, তাহলে কী করে আমাদের দোষী সাব্যস্ত করছে? আমরা দেখেছি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকদের ছ’ঘন্টা বন্দি করে রেখে সাসপেনশন, চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে উনি (উপাচার্য) আমাদের বিরুদ্ধে জোর করে একটা রেজুলিউশন নিয়েছিলেন। এরপর যে এনকোয়ারি কমিটি তৈরি করেন, তার প্রায় সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত আর তাঁরা কোনও সিদ্ধান্ত জানানোর আগেই উনি বলে দিয়েছিলেন যে এদের সাসপেন্ড করা হয়েছে আর কিছুদিন পর আমি বহিষ্কারও করে দেব। সুতরাং এই তদন্ত কমিটি বসানোটাও পুরোপুরি লোক দেখানো, ওঁর পছন্দের লোকজনদের নিয়ে তৈরি যাতে ওঁর ইচ্ছে মতো রিপোর্ট তৈরি হয়। এঁরা অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনলাইন পিটিশনে সই করেছেন আগেই। তাই শুরু থেকেই জানতাম কোনও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে না, পুরোটাই উপাচার্যর নির্দেশে হবে।”

 

অভিযুক্তদের তরফে আইনজীবী শামিম আহমেদ জানালেন, “আমরা অবশ্যই লিগালি চ্যালেঞ্জ করব। ওরা যে রিপোর্ট দিয়েছে ফাইন্ডিংস অফ এনকোয়ারি কমিটি বলে সেটাই খুব সাসপিশিয়াস। যেটা পাঠিয়েছে সেটা প্রপোজড পেনাল্টি। পুরো এনকোয়ারি রিপোর্ট দেয়নি। আমাদের একদিন মাত্র এনকোয়ারি কমিটির সামনে ডাকা হয়। আমরা চিঠি দিয়ে বলি যে পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই বায়াসড। আমাদের কোনো দাবিই মানা হয়নি। চিঠির উত্তর দেওয়া হয়নি। কমিটি রিকন্সিটিউট করতে বলেছিলাম করেনি। বলছে অনেক উইটনেস ডেকেছে, আইনে আমাদের অধিকার আছে তাদের নাম জানার, বক্তব্য দেখার, ক্রস এগজামিন করার। আমার এই পয়েন্টগুলো রেইজ করে একটা চিঠি পাঠিয়েছি। তার উত্তরে ওনারা কী জানান তার ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করব।”

 

বিশ্বভারতীর বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন অর্থনীতি বিভাগের স্নাতোকত্তর স্তরের প্রথম বর্ষের ফাল্গুনী পান। অবস্থান বিক্ষোভও শুরু করেছিলেন তিনি। বহিষ্কার হওয়ার পরও আন্দোলন থেকে সরে আসতে কোনওভাবেই রাজি নন। জানালেন, “পুরোটাই আমাদের প্রতি উপাচার্যর যে ব্যক্তিগত রাগ, তার ফলশ্রুতি। অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে আমাদের সঙ্গেই ছিল। লকডাউনের কারণে যেহেতু অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ক্যাম্পাসে নেই তাই সাবজেক্টিভ মাস’টা আমাদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারেনি, কিন্তু তাদের সমর্থন, সংহতি আমরা সব সময়েই পেয়েছি। এর মধ্যেও আমরা কনভেনশন করেছি, বিভিন্ন মানুষ বক্তব্য রেখেছেন, সকলের অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। আমরা এবার অবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের পথেই সম্ভবত হাঁটতে চলেছি এবং কলকাতা হাইকোর্টেও আইনজীবীদের মাধ্যমে আমরা কেস করার কথাও আলোচনা করছি।”

 

এই একই দিনে দু’জন অধ্যাপককেও সাসপেনশনের চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁরাও উপাচার্যের অনবরত চালিয়ে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের সাসপেন্ড করার আগে এমনকি বসেনি কোনও তদন্ত কমিটিও।

 

যে কোনও বিরোধী স্বরকেই দাবিয়ে রাখার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে রাখার পন্থা নিয়ে চলেছেন বর্তমান উপাচার্য। বিশ্বভারতীর ইতিহাস, ঐতিহ্য নষ্ট করে সেখানে জায়গা তৈরি করতে চাইছেন হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র শক্তির। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় এমন অভিযোগ বার বার উঠেছে রাজ্যের শিক্ষা ও রবীন্দ্র অনুরাগীদের মধ্য থেকেও। তাঁদের মতে উপাচার্যের কালাপাহাড়ি মনোভাবের সাম্প্রতিক উদাহরণ প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিনা প্রমাণে বহিষ্কার, অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অধ্যাপকদের সাসপেনশন। শিক্ষক ও পড়ুয়ারা জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন ও আইনি পথে লড়াইতেই এই অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ও উপাচার্যর স্বেচ্ছাচারীতা রুখতে এবার জোটবদ্ধ আন্দোলনের পথেই তাঁরা হাঁটতে চলেছেন।

 

Share this
Leave a Comment