ইউএপিএ আইন বাতিল: দিল্লীতে সরব হলেও পশ্চিমবঙ্গে কথা রাখেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


  • August 10, 2021
  • (0 Comments)
  • 412 Views

দিল্লীতে ইউএপিএ আইন বাতিলের জন্য সরব হলেও নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ৭০ জন রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি নিয়ে উদাসীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালে বন্দিমুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেও সেই কথা এখনও পালন করেননি তিনি। লিখছেন সৌরব চক্রবর্ত্তী

 

এলগার পরিষদ মামলায় গ্রেফতার হয়ে সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে বন্দি অবস্থায় মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের প্রবীণতম কর্মী স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর পরে পুনরায় UAPA (ইউএপিএ) আইন বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন সহ অনেকেই। বিজেপি সরকারের আমলে সন্ত্রাস-বিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে সরব হয়েছে দেশের নানা অংশের মানুষ। একাধিক প্রতিবাদীকেই বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে (ইউএপিএ) আটক করে রাখার নজির রয়েছে মোদী সরকারের। অসমের কৃষক নেতা অখিল গগৈ মোদী সরকারের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় তাঁকে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে আটক করে কেন্দ্র সরকার। দেড় বছর বন্দি থাকার পরে সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেই ইউএপিএ-র অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন তিনি। এই প্রসঙ্গেই কাশ্মীরের এক ব্যক্তির উদাহরণও তুলছেন অনেকে। জঙ্গি দমন আইনে আটক হওয়ার ১১ বছর পর আদালতে দীর্ঘ লড়াই করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পেরেছেন তিনি। দিল্লির হিংসার মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও দিল্লি পুলিশ ইউএপিএ প্রয়োগ করেছে।

 

পশ্চিমবঙ্গেও এই মানবাধিকার বিরোধী আইনের বিরোধীতায় পথে নেমেছে বিভিন্ন সংগঠন। এই আইন বাতিলের দাবি তুলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। স্ট্যান স্বামীকে পরিকল্পিত হত্যার পর ৯ টি বিরোধী দলের নেতা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে ইউএপিএ কে ‘ড্রাকোনিয়ান’ আইন বলেছিলেন। স্বাক্ষরকারী দের মধ্যে ছিলেন মমতা ব্যানার্জিও। কিন্তু তাঁর রাজ্যের চিত্র অন্য কথা বলে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার আগে সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পরেও নিজের দেওয়া কথা রাখেননি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এবং ২০২১-এ তৃতীয় বার ক্ষমতায় এসেও এখনও এ বিষয়ে কোনও ইতিবাচক ঘোষণা করেননি তিনি।

 

মানবাধিকার কর্মীদের দাবি ইউএপিএ আইনে এ রাজ্যে প্রায় ৭০ জন রাজনৈতিক কর্মীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। স্ট্যান স্বামীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নিয়ে যে প্রতিবাদ তৃণমূল কংগ্রেস করছে, সেখানে এই রাজ্যেই বিনা চিকিৎসায় তৃণমূল জমানাতে জেলেই ৭ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। প্রসঙ্গত প্রায় ৭০ জন রাজনৈতিক বন্দির মধ্যে মাত্র ৮ জন সাজাপ্রাপ্ত। বাকিদের বেশীরভাগই ১০-১২ বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় জেলে আটক আছেন। অর্থাৎ সাজা ঘোষণা করার আগেই এক দশকের উপর জেল খাটা হয়ে গেছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪ জনের ১৭ বছর জেল খাটা হয়ে গেলেও সরকার এখনও তাদের মুক্তির বিষয়ে উদাসীন। এই রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে ৬০-৬২ জনের বিরুদ্ধে ইউএপিএধারায় মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জন মহিলা এবং বেশীর ভাগই জঙ্গলমহলের বাসিন্দা।

 

গত ৭ অগাস্ট এআইপিডব্লিউএ, ডব্লিউএসএস, এফআইআর, ফেমিনিজম ডট কম, ডিটিডিএইচ, সিআরপিপি,  শ্রমজীবী মহিলা সমিতি-র মতো বিভিন্ন মহিলা সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ রাজ্যের বিভিন্ন জেলে মহিলা রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে দেখা করার এবং তাঁদের মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষার দাবি নিয়ে সংশোধনাগারের কর্তৃপক্ষ মূলত এডিজি-র সঙ্গে দেখা করে ডেপুটেশন দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এডিজি-র অবর্তমানে স্পেশাল আইজি তাঁদের সঙ্গে দেখা করে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষের তরফে আশ্বাস দেন – মহিলা রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারের কোনও সদস্য বা বন্ধু ব্যক্তি হিসাবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে অনুমতি দেওয়া হবে এবং এডিজি-র পক্ষ থেকে দ্রুত তাঁদের ডেপুটেশনের উত্তর পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজ্য সরকার ৬৩ জন বন্দিকে জেল থেকে মুক্তি দেবার ঘোষনা করেছে। তাদের মধ্যে ক’জন রাজনৈতিক বন্দি তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে। করোনাকালে বন্দিদের মুক্তির আলোচনা চলাকালীন ইউএপিএ, টাডা আইনে বন্দিদের মুক্তি নিয়ে কথাই হয়নি। ইউএপিএ আইন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে প্রবল আক্রমণ করলেও নিজের রাজ্যের রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়ে তিনি আদৌ কোনও আলোচনায় যেতেই রাজি নন।

 

২০১৯-এর ২৪ জুলাই ভারতের সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ) সংশোধনী বিল’ লোকসভায় পাশ করানোর সময় এর অপপ্রয়োগ হবে না বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই সংসদে দাঁড়িয়েই টাডা-র অপপ্রয়োগের কথা স্বীকার করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজেশ পাইলট। ’৯৪-এর ২৪ অগস্ট রাজেশ পাইলট সংসদে জানিয়েছিলেন, টাডা আইনে গ্রেফতার হওয়া ৬৭ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার জন নির্দোষ ছিলেন। বিচার চলে প্রায় ৮ হাজার জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে মাত্র ৭২৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়। পাইলট এ কথাও জানিয়েছিলেন যে, ৬৭ হাজারের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার জনের উপর টাডা প্রয়োগ যথাযথ হয়েছিল।

 

সংখ্যার জাদুখেলায় অমিত শাহরা ইতিমধ্যে এক সংশোধনী রাজ্যসভাতেও পাশ করিয়ে নিয়েছেন। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও আগামী দিনে শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদী সন্দেহেই যে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে। এ ছাড়াও আর একটি সংশোধনীতে বলা হয়েছে, আগামী দিনে যে কোনও রাজ্যের বাসিন্দার বাড়িতে তল্লাশি চালাতে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার থাকবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) হাতে। এরজন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশের অনুমতিও লাগবে না এনআইএ-র।

 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভারের অভিযোগ,

“এটাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা হবে। তার পরে জামিনের বিরোধিতা করে আটকে রাখা হবে। কিন্তু কী কারণে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল, তা ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থাকে ভাবতে হবে। কারণ এই ব্যবস্থাটাই ফাদারকে মেরে ফেলেছে। এই ঘটনায় বিচার ব্যবস্থার বিবেক কেঁপে ওঠা উচিত।”

 

প্রবীণ আইনজীবী কলিন গঞ্জালভেস-এর অভিযোগ,

“সরকারি পক্ষ চেয়েছিল, স্বামী জেলে মারা যান। সে রকম ভাবেই ছক কষা হয়েছিল যাতে সমাজকর্মী ও আন্দোলনকারীদের কাছে বার্তা যায়, সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে এই ভাবেই জেলে আমৃত্যু আটকে রাখা হবে।”

 

প্রবীণ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়-এর কথায়,

“এনআইএ-র মতো সংস্থা নিজেদের অভিযোগ প্রমাণের বদলে জামিনের বিরোধিতায় বেশি নজর দিচ্ছে। ফলে বিচারাধীন অবস্থায়, দোষী প্রমাণ হওয়ার আগেই কেউ ১০ বছর জেলে আটকে থাকছেন। বস্তুত, আগেই সাজা হয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে আইনের প্রক্রিয়াকেই শাস্তির প্রক্রিয়া হিসেবে কাজে লাগাতে দেওয়া হচ্ছে।”

 

স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া বিরোধী দলগুলির অভিযোগপত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাক্ষর করেছেন। যেখানে লেখা ছিল – মানবাধিকার বিরোধী ইউএপিএ আইন বাতিল ঘোষণা করতে হবে এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। অথচ নিজের রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীত্বে তৃতীয় বার শপথ নিলেও তৃণমূলের নেতৃত্বাধীন সরকারের অনেক না রাখা কথার মধ্যে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি না দেওয়াটিও একটি কথা। কেন্দ্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তুমুল সমালচনা করলেও নিজ রাজ্যের হালহকিকত নিয়ে তিনি এখনও চুপই। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন অনেকের মতো তৃণমূল কংগ্রেসেরও পাখির চোখ, কিন্তু কথা দিয়ে কথা না রাখার খেলা তিনি কতো দিন খেলে যাবেন তা নজরে থাকবে অবশ্যই।

 

Share this
Leave a Comment