দিলীপ কুমার ও তৎকালীন ভারতীয় সমাজ


  • July 22, 2021
  • (0 Comments)
  • 323 Views

দিলীপ কুমার অভিনীত চরিত্রগুলি আত্মসচেতন, তারা পর্দায় আগ্রাসী পৌরুষের ছাপ রাখে না। মুঘল শাহজাদা থেকে দেহাতি গ্রামবাসীর জীবনে তাঁর অনায়াস চলন। তাঁর অভিনয় চরিত্রবিশেষে কখনও জান্তব, কখনও সূক্ষ্ম – নিচু তারে বাঁধা। তবু বলিউডের দর্শক তাঁকে বস্তাপচা ট্র্যাজেডি কিং-এর তকমা দিয়েছে। চল্লিশের দশকের ফিল্মি দুনিয়া ও তৎকালীন সমাজ থেকে শুরু করে আজকের পুঁজি ও রাষ্ট্রবাদী বলিউডের প্রেক্ষাপটে ফেলে এই সদ্যপ্রয়াত অভিনেতাকে দেখলেন প্রসিত দাস 

 

“Life beats down and crushes the soul and art reminds you that you have one.” – Stella Adler

 

সাদাত হাসান মান্টোর মতে, পেশোয়ারের কিসসা খোয়ানি বাজারের যুবকটি প্রথমবার বম্বে টকিজের সর্বেসর্বা দেবিকা রানির নজরে পড়েছিল পুনের মিলিটারি ক্যান্টিনে। সালটা ১৯৪২ কি ’৪৩। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। যুবকটি তখন সেই ক্যান্টিন চালাবার বরাত পেয়েছিল। এরপর আবার মোলাকাত ঘটে নৈনিতালে, পারিবারিক ফলের ব্যবসার হাল ধরার পর যুবক ইউসুফকে কর্মসূত্রে সেখানে যেতে হয়েছিল। এবার বম্বে ফিল্মের এক নম্বর নায়িকা তাকে সরাসরি সিনেমায় নামার প্রস্তাব দিলেন। ইউসুফ কিন্তু এককথায় রাজি হতে পারেনি। অভিনয়ের অ না-জানা যুবকের কাছে প্রস্তাবটা একরকম অবিশ্বাস্যই ঠেকেছিল। এর কিছুদিন পর বোম্বের ট্রেনে তার সঙ্গে পরিচয় হল অভিনেতা, প্রযোজক ও দেবিকা রানির স্বামী হিমাংশু রায়ের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার মাসানির সঙ্গে। মাসানি সাহেবও ইউসুফকে সেই একই কথা বললেন, ছবিতে অভিনয় করার পক্ষে তার চেহারাটি নাকি আদর্শ। এরপর শেষমেশ মহম্মদ ইউসুফ খানের বম্বের চলচ্চিত্র-জগতে প্রবেশ এবং দিলীপ কুমার নামে পর্দায় আত্মপ্রকাশ।

 

সে আমলে বম্বে শহর ছিল ফাটকা পুঁজির স্বর্গরাজ্য। সুতোকলের মুনাফা শেয়ার বাজারে হইহই করে খাটছে। টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের মতো নয়া প্রযুক্তির দৌলতে খবর চালাচালির পথ সুগম হয়ে গিয়েছিল। উনিশ শতকের শেষ পাদেই বম্বে পেয়ে গিয়েছিল তার শেয়ার বাজার, বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জই এশিয়ার প্রথম শেয়ার বাজার। শহরের বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে প্রথম থেকেই শেয়ার বাজারের নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। ফাটকা পুঁজির খেলায় নেমে পড়ে সুতোকলের মালিক, শেয়ার বাজারের দালাল আর ভুঁইফোড় বিনিয়োগকারীর দল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশিয় শিল্পপতিরা নানান সরকারি ছাড় পাওয়াতে এই ফাটকা বাজারেরও পোয়াবারো হয়। ঔপনিবেশিক সরকার কিন্তু এই ফাটকা বাজারের উপর আঁটসাট নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। ধাপে ধাপে বেশকিছু কড়া বিধি সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা হয়। অগত্যা ফাটকা বাজারের মুনাফা অন্যদিকে চালান করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা ছিল না। কিন্তু কোনদিকে? কেন, হাতের কাছেই তো আছে একেবারে আনকোরা একটা শিল্পক্ষেত্র, বিনোদন-বাণিজ্য। তাই প্রথম সবাক হিন্দি ছবি আলম আরা (১৯৩১) থেকেই ফাটকা পুঁজি আর চলচ্চিত্র-জগতের গাঁটছড়ার সূত্রপাত। এ ছবির পুঁজি এসেছিল শেয়ার বাজারের মুনাফা থেকেই। সে আমলে চলচ্চিত্র-শিল্পের উপর সরকারি কড়াক্কড়ি প্রায় ছিল না বললেই চলে। ঔপনিবেশিক সমাজে এই নতুন মাধ্যমটির সম্ভাবনা ব্রিটিশ প্রভুরা তখনও ঠিক হৃদয়ঙ্গম করে উঠতে পারেননি। তাই বম্বের শহরতলি মালাডে বম্বে টকিজ স্টুডিওটি তৈরি করার পেছনেও ফাটকা পুঁজি খাটানোর মতলব, অর্থাৎ এ স্টুডিও তৈরির জন্যও পুঁজির জোগান এসেছিল সুতোকল আর শেয়ার বাজার থেকে। (দ্রষ্টব্য Bombay Hustle: Making Movies in a Colonial City, Debashree Mukherjee)।

 

এই ছিল তাহলে সেদিনের চলচ্চিত্র-জগৎ যেখানে পা রেখেছিলেন দিলীপ কুমার। পরিচালক থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে কলাকুশলীরা সক্কলে সেখানে স্টুডিও মালিকদের বাঁধা মাইনের কর্মী। শেয়ারের বাহারের তেজি-মন্দির উপর নির্ভর করে চলচ্চিত্র-শিল্পের ভবিষ্যৎ। বাজারের দৌলতে হঠাৎ-বড়লোক হয়ে যাওয়া কোনও ভাগ্যবান দুম করে স্টুডিও খুলে বসে দুম করে বনে যান প্রযোজক। আবার দুম করেই একদিন সে স্টুডিওয় লালবাতি জ্বলে উঠতে পারে।

 

বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই মূল শহরে জমির দাম আর বাড়ির ভাড়া অত্যধিক বেড়ে যেতে থাকায় শহরের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির বাসিন্দারা আশ্রয় নিতে থাকে পারেল কিংবা কামাথিপুরার মতো প্রান্তবর্তী এলাকায়। এসব এলাকায় একইসঙ্গে গড়ে উঠেছিল শ্রমিক-মহল্লা, গণিকালয় আর শহরের একেবারে গোড়ার দিককার সিনেমা হলগুলো। অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক কারণে শহরের নকশা পালটানোর সঙ্গে সঙ্গে বম্বের বৃহদায়তন শ্রমিক শ্রেণির বিনোদনের বন্দোবস্তটাও রাখা হল।

 

ছবি – গোপী

 

নিজের মুদ্রাদোষে একা

 

দিলীপ কুমার যখন ফিল্মি দুনিয়ায় পা রাখেন, সে সময় বম্বে সিনেমার অবিসংবাদী নায়ক নিঃসন্দেহে অশোক কুমার। এই বঙ্গসন্তানই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সেই ধরনের নায়ক যাঁর চুলের ছাঁট কিংবা সিগারেট ধরানোর কেতা ছেলে-ছোকরারা নকল করতে শুরু করে। অর্থাৎ সে অর্থে তিনিই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম তারকা। পর্দায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁর চেহারা-ছবির মধ্যে একজন আম ভারতীয়র রূপ ফুটে উঠেছিল। তাই কিসমত (১৯৪৩) ছবিতে পকেটমারের ভূমিকায় অভিনয় করেও তিনি দর্শককুলের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন। সম্ভবত তাঁর মধ্যে স্বাধীনতার দিকে হাঁটি-হাঁটি পা-পা দেশ চিনে নিয়েছিল গণতান্ত্রিক সমাজের কিছু নতুন মূল্যবোধকে। অশোক কুমার-দেবিকা রানি অভিনীত কিসমত কলকাতার রক্সি সিনেমা হলে টানা তিন বছর চলে রেকর্ড করেছিল। শুরু হয়েছিল নতুন এক শিল্প-মাধ্যমকে কেন্দ্র করে গণ-উন্মাদনার কাহিনি।

 

আর কিসমত-এর ঠিক পরের বছরই বম্বে টকিজের ১২৫০ টাকা মাইনের “আর্টিস্ট” দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি জোয়ার-ভাটা (১৯৪৪) মুক্তি পায়। নতুন নায়ক কিন্তু ডাহা ফ্লপ। সে যুগে যে হাতেগোনা কয়েকটা ফিল্ম পত্রিকার অস্তিত্ব ছিল, তার মধ্যে সবার আগে নাম করতে হয় ফিল্ম ইন্ডিয়া-র। সম্পাদক বাবুরাও প্যাটেলের কোদালকে কোদাল বলার জন্য বিশেষ নামডাক। তিনি দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি দেখে রায় ঘোষণা করে দিলেন যে চলচ্চিত্র-জগতে এ নায়কের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু সময়ের গতি প্যাটেল সাহেবের ভবিষ্যৎবাণীকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিল। আরও কয়েকটা ব্যর্থতা আর মাঝারি গোছের সাফল্যের পর স্বাধীনতার বছরে মুক্তি পেল দিলীপ কুমার ও নুরজাহান অভিনীত জুগনু। সে আমলে এ ছবি বাজার থেকে লাখ পঞ্চাশেক টাকা আয় করেছিল। সুতরাং এর পরে আর নতুন তারকার উল্কার গতিতে উত্থান রোখে কে! দিলীপ কুমারের কট্টর সমালোচক বাবুরাও প্যাটেলকেও তাঁর অভিনয়-প্রতিভার কথা মেনে নিতে হল।

 

ছবি – জোয়ার ভাঁটা

 

একথা বহুচর্চিত যে দিলীপ কুমারের সমসাময়িক অন্য দুই প্রধান নায়কের হাতে নিজেদের পর্দা-ভাবমূর্তি গড়ে নেওয়ার যে বিশেষ সুবিধেটি ছিল, তা ইউসুফের হাতে ছিল না। রাজ কাপুর স্বয়ং পরিচালক-প্রযোজক, আর দেব আনন্দ তাঁর অভিনয়-জীবনের গোড়ার পর্যায়ে পরিচালকের আসনে না-বসলেও পারিবারিক প্রযোজনা-সংস্থা ও দুই গুণী পরিচালক ভাইয়ের সমর্থন তাঁর পেছনে ছিল। তাই এই দুই নায়ক তাঁদের ইমেজটি খানিকটা সচেতনভাবেই গড়ে নিতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে বাঁধাধরা চিত্রনাট্যের ব্যবসায়িক যুক্তি আর পরিচালকের নির্দেশমাফিক অভিনয় করা দিলীপ কুমারের পথটা ছিল অপেক্ষাকৃত কঠিন। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে দীর্ঘ পঞ্চাশের দশক জুড়ে তিনি আনপড় গ্রামবাসী থেকে শুরু করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পর্যন্ত নানান ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবু আসমুদ্র-হিমাচল তাঁকে বিরহী প্রেমিক হিসেবেই মনে রাখতে চেয়েছে। ফিল্মি সংবাদ-মাধ্যম তাঁর কপালে সেঁটে দিয়েছে “ট্র্যাজেডি কিং”-এর বস্তাপচা তকমাটি। এর কারণ বুঝতে গেলে তাঁর সমসাময়িক অন্যদের কথাও কিছু কিছু বলতে হয়।

 

হৃদয় তবু বিষাদে ভ’রে ওঠে / নিরুদ্দেশ শূন্যে যবে চাই

 

পর্দায় রাজ কাপুরের অভিনীত ভবঘুরে চরিত্রটি নেহরুর ভারতবর্ষের শহুরে আধুনিকতাকে দেখে নীতিবাগীশের চোখ দিয়ে। রাজ কাপুরের ছবিগুলোতে তাই বেশিরভাগ সময় খারাপ-ভালো, সৎ-অসৎ নিয়ে এত বাছবিচার। দুর্নীতি নিয়ে এত কথাবার্তা। যেন চোখে আঙুল দিয়ে নীতিবাক্য শুনিয়ে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার কী এক প্রকল্প এই ছবিগুলোর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে দেব আনন্দের প্রথম পর্যায়ের ছবিগুলোতে এসব বালাই নেই। হলিউড-আশ্রিত থ্রিলার গোছের এসব ছবিতে নায়ক বরং বেশিরভাগ সময়েই আইন আর নীতির সীমার পরপারেই অবস্থান করে। তাই শহরের ভুলভুলইয়ায় অনিশ্চয়তার সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলাই তার মনপসন্দ। দেব আনন্দ তাঁর পরবর্তী জীবনের ছবিগুলোতে এক “লার্জার-দ্যান-লাইফ” সমাজ-সংস্কারকের ভূমিকায় নামতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু বক্স-অফিসের নারায়ণ-শিলাই সাক্ষী যে সত্তরের দশক থেকে তাঁর সেসব ছবি বিশেষ কল্কে পায়নি। তাঁর এই গোড়ার পর্বের ইমেজটি কিন্তু দর্শকানুকূল্য থেকে সচরাচর বঞ্চিত হয়নি। নেহরুর ভারতবর্ষে এছাড়া আরেক ধরনের নায়কের দেখা পাওয়া যায়। সে ভাগ্যবিড়ম্বিত, স্বাধীনতার মোহ তার আর বিশেষ অবশিষ্ট নেই, সমাজের কাঠিন্য তার কোমল মনটিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সাধারণত গুরু দত্তকে এই জাতীয় চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে।

 

কিন্তু এই সব ধরনের নায়কদেরই আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল তাদের কখনও বয়োঃপ্রাপ্তি ঘটে না। পর্দায় তাদের হরেক কাণ্ডকারখানা শুধু যে বাণিজ্যিক ছবির নিজস্ব যুক্তিতেই উতরে যায় তা নয়, এসব লীলাখেলা কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাণ্ড নয় বলেও তাদের সাতখুন মাফ। এই কারণেই বোধহয় অন্ধ নায়কের বিষয়বস্তুটা হিন্দি ছবির এত প্রিয়। এ নায়ক অনেক কিছুই দেখতে পায় না, বিশেষ করে যখন প্রেমের প্রসঙ্গ আসে। (বিশদ আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, Idelogy of Hindi Film: A Historical Construction, Madhav Prasad)। তাই সঙ্গম (১৯৬৪) ছবিতে রাজ কাপুর যখন বংশীধারীর ভূমিকায় নায়িকা বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে বস্ত্র-হরণ পালার অভিনয় করেন, তখন সেটাকে নায়কের বাল্যলীলার অংশ বিশেষ বলেই ধরে নেওয়া যায়। আবার পিয়াসা (১৯৫৭)-র যে কবিটি (অভিনয়ে গুরু দত্ত) প্রেমে আর জীবনে দাগা খেয়ে তাওয়ায়েফ গুলাবোর কাছে আশ্রয় চায়, তাকেও ঠিক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বলা চলে না। সম্ভবত নাগরিকের বয়োঃপ্রাপ্তি রাষ্ট্রের আদপেই কাঙ্খিত নয় বলেই পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই রোম্যান্টিক স্বপ্নচারী কিংবা একবগ্গা‌ প্রেমিক নায়কদের আধিপত্য (সত্তরের দশক থেকে হিন্দি ছবির এই ব্যাকরণের ভোল বদলের শুরু, তবে সে গল্প অন্য)।

 

 

আর ঠিক এখানেই দিলীপ কুমারের সঙ্গে অন্যদের ফারাক। পর্দায় তাঁর অভিনীত চরিত্ররা সকলেই আত্মসচেতন। তাই প্রেমের ব্যর্থতার অভিঘাতে আত্মক্ষয়ী বিষাদই তাদের নিয়তি হয়ে ওঠে। সেই কবেকার আন্দাজ (১৯৪৯) ছবিতেই তো নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল এই প্রেমিকের ভাগ্য। এ ছবির নায়ক-নায়িকা রাজ কাপুর-নার্গিস পালটি খানদানের রাজযোটক জুড়ি। পারিবারিক ঠিকুজি মেনে তাদের মিলনের পথে কোনও বাধা নেই। লক্ষনীয় যে গোটা ছবিটাতে কোনও প্যাট্রিয়ার্ক জাতীয় চরিত্রের উপস্থিতি নেই। বরং নায়কের বাল্যকালের শিক্ষকটিকে নিয়ে খানিকটা ক্যারিকেচারই করা হয়েছে। তবু গোটা ছবি জুড়ে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির অমোঘ উপস্থিতি। তাই দিলীপ কুমারের কপালেই যে এহেন প্রেক্ষাপটে অবহেলিত ব্যর্থ প্রেমিকের ভূমিকা জুটবে এবং ছবির শেষে যে প্রেমিকের জন্য মৃত্যুই বরাদ্দ হবে, তা বোধহয় একরকম অবধারিতই ছিল।

 

 

দিদার (১৯৫১) থেকে দেবদাস (১৯৫৫) পর্যন্ত ছবির পর ছবিতে যে দিলীপ কুমার তাঁর অভিনয় দিয়ে এই ব্যর্থ প্রেমিকের নির্জ্ঞান মনটিকে পরতে পরতে মেলে ধরেছেন। মার্লন ব্রান্ডো ও রবার্ট ডি নিরোর মতো অভিনেতারা তাঁদের নিজেদের সময়ে শরীর আর স্বর-প্রক্ষেপণকে ব্যবহার করে তাঁদের অভিনীত চরিত্রের নির্যাসকে এভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। দিলীপ কুমারও সেই কাজটাই করেছেন অনেক দুর্বল মাল-মশলা নিয়ে। তাই তাঁর প্রেমিকের অভিনয়ও বারুদে ঠাসা, কারণ তার মধ্যে আছে স্বাধীন দেশের আত্মসচেতন নাগরিকের নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার অভিব্যক্তি। আবার আরেকটা স্তরে সে অভিনয়-রীতি লোকরঞ্জনেও কখনওই ব্যর্থ হয় না। তাই তো দিদার ছবিতে অন্ধ গায়কের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দেখে হলভর্তি দর্শক হায়-হায় করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা ধরা আছে বিক্রম শেঠের এ স্যুটেবল বয় উপন্যাসে।

 

আরও যা বলার তা হল দিলীপ কুমার অভিনীত এই প্রেমিক চরিত্রগুলো সাধারণত (অর্থাৎ ব্যতিক্রম আছে) পর্দায় কোনও আগ্রাসী পৌরুষের ছাপ রাখে না। হিন্দি ছবির প্রেমিক নায়কদের মার্কামারা যে প্রবল পৌরুষের দীর্ঘ ছায়াপাত পর্দায় দেখা যায়, তার অভিব্যক্তি তাঁর অভিনীত এসব চরিত্রের মধ্যে পাওয়া যায় না। নায়িকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তেও কোথাও একটা স্বপ্নমদির প্রেমের ভাষা পর্দা জুড়ে থাকে। এর সেরা উদাহরণ বোধহয় মুঘল-এ-আজম (১৯৬০) ছবিতে মধুবালার সঙ্গে তাঁর অভিনয়। হাতে পাঁজি থাকতে আর ব্যাখ্যানের মধ্যে গিয়ে লাভ কী! মধুবালার সঙ্গে তাঁর যে কোনও দৃশ্য একবার দেখে নিলেই তো হয়! শুধু চোখের ভঙ্গিমা আর হাতের চলনে যে ধরনের প্রেমের মুহূর্ত মুঘল-এ-আজম-এ তৈরি হয়, তার তুলনা হিন্দি ছবির ইতিহাসে খুব বেশি পাওয়া যাবে না।

 

ছবি – মুঘল-এ-আজম

 

যে জন দেয় না দেখা

 

ক্রমাগত ট্র্যাজিক চরিত্রের চাপে যে দিলীপ কুমার মনোচিকিৎসকের পরামর্শে হালকা গোছের কমেডি ছবিতে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সে তথ্য তো বলিউডের লোকগাথার অংশ বিশেষ। কথা হচ্ছে কৌতুক অভিনয়েও তিনি বিশেষ। হিন্দি ছবির নামজাদা কমেডিয়ানদের ভাঁড়ামির মুদ্রাদোষ থেকে মুক্ত। এ প্রসঙ্গের বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। শুধু রাম আউর শ্যাম (১৯৬৭)-এর একটা বিশেষ দৃশ্যের কথা উল্লেখ করব। এ ছবির এক জায়গায় চালিয়াত শ্যামকে হঠাৎ ধরে-পড়ে-যাওয়া থেকে বাঁচতে গোবেচারা রামের নকল করতে হচ্ছে। অর্থাৎ দিলীপ কুমার নিজেই তাঁর অভিনীত আরেকটা চরিত্রের নকল করছেন। আবার রামের নকল করার কাজটা যে শ্যাম ঠিকমতো করতে পারছে না, সেটাও চিত্রনাট্যের যুক্তি অনুযায়ী স্পষ্ট হতে হবে। এই সবকটা পরত শুধুমাত্র দিলীপ কুমারের সংলাপ বলার কায়দায় পর্দায় উঠে আসছে। অর্থাৎ কৌতুকাভিনেতার ভূমিকাতেও দিলীপ কুমার তাঁর অভিনীত চরিত্রের নানান পরতকে খুলে ধরার কাজটা করে গেছেন। বলিউডি ফর্মুলার পাঁচপেঁচি কমেডিও তাই তাঁর অভিনয়-রীতির গুণেই বিশেষ হয়ে উঠেছে।

 

তবে দিলীপ কুমারের অভিনয়-জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের ছবিগুলোর মধ্যে যে ছবিটার কথা না বললেই নয়, সেটা নিঃসন্দেহে গঙ্গা যমুনা (১৯৬১)। নীতিন বসু পরিচালিত এই ছবির চিত্রনাট্য নিঃসন্দেহে চম্বল আর আর মোরেনার বিখ্যাত ডাকাতকুলের ভাবনা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে ডাকাতদের বহু হিন্দি ছবি এর আগে ও পরে তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেসব ছবির মধ্যে শোলে (১৯৭৫) নিঃসন্দেহে একটা মোড়-ঘোরানো ঘটনা। শোলে থেকেই যে হিন্দি ছবিতে যে ছকটা চালু হয়, সেখানে ডাকাত আর নায়ক নয়। সে এমন খলনায়ক যার কোনও পূর্ব-ইতিহাস নেই। তাই রাষ্ট্রের প্রতিভূ প্রাক্তন পুলিশ কর্তাটি তাকে শায়েস্তা করার জন্য দুজন ছোটখাটো অপরাধীর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। হলিউডি ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবির সঙ্গে শোলে-র মিলটা নেহাতই কাকতালীয় নয়, সে জাতীয় ছবির মতোই এখানেও যেন-তেন-প্রকারেন শত্রু নিকেশ করে এলাকা দখল করাই পাখির চোখ। ইন্দিরা গান্ধীর বজ্রমুষ্টির শাসনে এবং বিশেষ করে জরুরি অবস্থার যুগে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের এহেন ঐক্যের মধ্যে দিয়ে শত্রু নিকেশের বার্তা দেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। মনে রাখতে হবে যে এই দশকেই জয়প্রকাশ নারায়ণের মধ্যস্থতায় চম্বলের ডাকাতদের একটা বড় অংশের আত্মসমর্পণের ঘটনাটাও ঘটেছিল। সীমান্ত পারের শত্রু আর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ছকটা তখনও হিন্দি ছবিতে অতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। অগত্যা গব্বরই খলনায়ক।

 

 

গঙ্গা যমুনা-র অবস্থার ফেরে ডাকাত হয়ে ওঠা চরিত্রটি কিন্তু খলানায়ক নয়, যেমন নয় শোলে-র আগের ও পরের আরও একগণ্ডা ছবিতে। এ ছবির গঙ্গা বরং গ্রাম-ভারতের সামন্ততান্ত্রিক শোষণের জেরে বাগী হয়ে ওঠে। মনিব জমিদারের অনাচার সইতে না-পেরে বিদ্রোহ করে সে আত্মরক্ষার খাতিরেই গ্রাম ছেড়ে ডাকাত দলে আশ্রয় নেয়। হয়ে ওঠে এলাকার ত্রাস। বলা বাহুল্য যে শোলে-র কল্যাণে এই সামন্ততান্ত্রিক শোষণ আর জাতপাত কিংবা জমির লড়াইয়ের বয়ান হিন্দি ছবির ডাকাত-আখ্যান থেকে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়। গঙ্গা যমুনা-এ এর সঙ্গে অবশ্যই আছে সেই চিরাচরিত দুই ভাইয়ের কাহিনি। এক ভাই দুর্ধর্ষ দস্যু তো আরেক জন রাষ্ট্রের হয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী। তাই শেষ দৃশ্যে দেবতার মূর্তির সামনে কোন ভাইয়ের মৃত্যু হবে তা-ও আন্দাজ করা কঠিন নয়। এ ছবির শেষ দৃশ্যের সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনের দিওয়ার (১৯৭৫)-এর শেষ দৃশ্যের মিলটা লক্ষনীয়। অমিল এখানেই যে গঙ্গা যমুনা-এ কোনও মা হাজির নেই। ভারত-মাতার প্রতিমূর্তি মায়ের কোলে তাই অপরাধী ও অনুতপ্ত পুত্রের ফিরে যাওয়ার কোনও অবকাশ নেই। দিলীপ কুমারের অভিনীত চরিত্র তাই এক্ষেত্রেও একা। ধরা দিয়েও সে ধরা পড়ে না।

 

গঙ্গা যমুনা ছবিতে দিলীপ কুমারের অভিনয় নিয়ে বলতে গেলে একটা আলাদা লেখা লিখতে হয়। এটুকু বলাই যথেষ্ট যে শুধু নিখুঁত পুর্বিয়া ডায়ালেক্টে সংলাপ বলছেন বলেই নয়, দিলীপ কুমার এ ছবিতে তাঁর হাঁটা-বসা-দৌড়নোর প্রতিটি ভঙ্গির মধ্যে, তাঁর শারীরিক চলনের মধ্যে নিয়ে এসেছেন দেহাতি গ্রামবাসীর আদল। রাজ কাপুর থেকে আমির খান পর্যন্ত হিন্দি ছবির আরও কত নায়কই তো গ্রামবাসীর ভূমিকায় অভিনয় করলেন, কিন্তু অভিনীত চরিত্রকে এভাবে শরীরি করে তোলার নামগন্ধও আর কারোর অভিনয়ে চোখে পড়ে না। এর আগেও তিনি বিআর চোপড়ার নয়া দৌড় (১৯৫৭)-এ দেহাতি টাঙ্গাওয়ালার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু নয়া দৌড়-এর সেই টাঙ্গাওয়ালার অভিনয়ের বিন্দুমাত্র ছাপ গঙ্গা যমুনা-র গঙ্গার মধ্যে দেখা যায় না। আর এটাও উল্লেখযোগ্য যে আনপড় গ্রামবাসীর চরিত্রে অভিনয় করছি, তাই গোটা ছবি জুড়েই একটা মোটা রকমের ছাঁদ অভিনয়ের মধ্যে রেখে যাব, এমন কোনও রীতি দিলীপ কুমার অনুসরণ করেননি। তাই ছবির প্রথম পর্বের হালকা গোছের দৃশ্যে, হঠাৎ ঘনিয়ে-আসা সঙ্কটে অসহায়ত্বের দৃশ্যে, আর ডাকাত হয়ে ওঠার পরবর্তী পর্বের দৃশ্যে দিলীপ কুমারের অভিনয়-ভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। রাগ কিংবা অসহায়ত্বের কোনও কোনও দৃশ্যে তিনি তাঁর অভিনয়ের মধ্যে একটা প্রায়-জান্তব ভঙ্গি নিয়ে এসেছেন, আবার নিজের গ্রামে, নিজের ঘরে ফেরার আকুলতার দৃশ্যে তাঁর অভিনয় অনেক নিচু তারে বাঁধা।

 

সত্তর-আশির দশকে রমেশ সিপ্পি বা সুভাষ ঘাইয়ের মতো পরিচালকদের হাতে পড়ে দিলীপ কুমারকে হিন্দি ছবির মার্কামারা প্যাট্রিয়ার্কের ভূমিকাতে অভিনয় করতে হয়েছে। সেসব চরিত্রেও তিনি অন্যদের থেকে আলাদা বটে, কিন্তু তাঁর সেসব কাজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয় না। তাঁর মৃত্যুর পর নাসিরুদ্দিন শাহও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। ইতিমধ্যে আরব সাগর দিয়েও বিস্তর জল বয়ে গেছে। চল্লিশের দশকের ফাটকা পুঁজির খেলোয়াড়দের জায়গায় ষাট-সত্তরের ছবিতে টাকা ঢালতে এসেছে আবাসন-শিল্পের মালিকরা। ক্রমেই সংগঠিত পুঁজি আর মিডিয়া বাণিজ্যের সঙ্গে বলিউডের সম্পর্কটা আরও পাকাপোক্ত হয়েছে। তার ছাপ ছবির আদলেও পড়েছে। বিশ্বায়ন-উত্তর জমানায় যে নতুন ধরনের নায়করা পর্দায় হাজির হয়েছে তারাও আজ অতীত। আজকের সর্বগ্রাসী ভারতীয় রাষ্ট্রে বলিউডি ছবির নায়ক “জাতির স্বার্থে” কোনও বেআইনি কাজ করতেই পিছপা হয় না। ফোনে আড়ি পাতাও তার কাছে জলভাত। পর্দায় তার আগ্রাসী উপস্থিতি নতুন রাষ্ট্রের মেজাজ-মর্জিরই পরিচায়ক। তাই সরকারি গোয়েন্দা হোক কি বিজ্ঞানী, এই নতুন নায়কের (মূলত অক্ষয় কুমার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে এই ঝোঁকটা স্পষ্ট) প্রতিটি পদক্ষেপই জাতি-রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলার উদ্দেশ্যে চালিত। তার একটি মহিলা প্রতিরূপও আছে, মূলত যে ধরনের চরিত্রে বিদ্যা বালনকে আজকাল দেখা যায়। এই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের আগ্রাসী চলচ্চিত্রে অভিনীত চরিত্রের সূক্ষ্ম পরত-টরত নেহাতই অবান্তর। দিলীপ কুমারের পক্ষেও তাই বোধহয় মিউজিয়ামের স্মারকে পরিণত হওয়াই ভালো।

 

Share this
Leave a Comment